কাকভোরেই উঠে পড়ে ইদ্রিস আলী। বাইরে যায়। ওযু করে। নামাজ পড়ে। কিছুক্ষণ কোরান তেলাওয়াত করে। তারপর গ্রামের রাস্তা ধরে চলে যায় অনেকদূর। এই রাস্তার তিনটি মোড়ে বড় হচ্ছে তিনটি বটবৃক্ষের চারা। চারাগুলো নিজহাতে রোপন করেছে ইদ্রিস। শুধু রোপন করেই ফেলে রাখেনি। বেড়া দিয়েছে। চারপাশের আগাছা পরিস্কার করেছে। আর এখন প্রতিদিন ভোরে এসে একবার করে দেখে যায়। রাস্তার শেষ মাথায় আছে আরেকটা বটবৃক্ষ। সেটাও লাগিয়েছিল ইদ্রিস আলী। গাছটা এখন অনেক বড় হয়েছে। বড়বিলের বিশাল ফাঁকা মাঠ। মাঠের মাঝখানে এই একটাই গাছ। শুকনো মৌসুমে কৃষকরা মাঠে কাজ করতে করতে যখন ক্লান্ত হয়ে পড়ে। রোদের তেজ যখন অসহ্য লাগে। তখন সবাই এসে একটু জিরিয়ে নেয় ইদ্রিস আলীর বটতলায়। এই পথ দিয়ে যাতায়ত করা পথিকেরাও একটু বসে যায়। অসংখ্য পাখির কিচিরমিচিরে মুখর হয়ে থাকে বটবৃক্ষের ডালগুলো।

অনেকদিন পর ইদ্রিস আলী আজ বড় বটগাছটা পর্যন্ত চলে এসেছে। প্রতিদিন আসা হয় না তার। শুধু চারাগাছগুলো দেখেই বাড়ি ফেরে। আজ হাতে বেশ সময় আছে। তাই সে এসেছে রাস্তার শেষ মাথায়। যেখানে দাঁড়িয়ে আছে তার হাতে লাগানো বটগাছটি। আস্তে আস্তে গাছের নীচেই চলে আসে। একটা কাঠবিড়ালী শিকড়ের ওপর খেলছিল। ইদ্রিস আলীকে দেখে তরতর করে উঠে যায় উঁচু ডালে। দেখতে খুব ভালো লাগে তার। এখনো ভোরের রেশ কাটেনি। তাই থামেনি পাখিদের কলরব। জোরে জোরে চেচাঁমেচি করছে পাখিরা। পুরো বটগাছ জুড়ে পাখি আর পাখি। এ যেন পাখিদের মেলা। যাক, এই শূন্য মাঠে বড় একটা আশ্রয় পেয়েছে পাখিগুলো। মনে মনে প্রশান্তি অনুভব করে ইদ্রিস আলী।

বড় বাজারে দর্জির কাজ করে ইদ্রিস আলী। প্রতিদিন ভোরে বটগাছের চারাগুলো দেখাশোনা করে বাড়িতে যায়। বাড়ি বলতে আটখানা টিনের ছাপড়াঘর। অল্প একটু জায়গার ওপর সেই ঘরখানি। সে একাই সেই ঘরের মালিক। ছোটোবেলাতেই বাবা-মা মরে গেছে। ভাইদের কাছে বড় হয়েছে। ভাইয়েরাও যার যার সংসার নিয়ে ব্যস্ত। কিন্তু বিয়ে করে সংসার পাতা হয় নাই ইদ্রিস আলীর। এবার ছাপান্ন নম্বর বসন্ত সে একাই পার করেছে। বাজারে দর্জির কাজ করে দু-বেলা খাবার ব্যবস্থা সে নিজেই করে। প্রতি শনিবার বন্ধ থাকে বাজারের সব দোকানপাট। আজ শনিবার। সে কারণেই বাড়ি ফেরার তাড়া নাই ইদ্রিস আলীর। তাই বটগাছটার নিচে অনেকক্ষণ বসে থাকতে ইচ্ছে করে তার। কিন্তু আজও বেশ কাজ আছে ইদ্রিস আলীর হাতে। কেননা, গ্রামের এই রাস্তার বটগাছগুলোই নয়। আশেপাশের গ্রামে আরও অনেক বটগাছ তারই লাগানো। একেবারে কিশোরবেলা থেকেই বটগাছকে ভালোবাসে ইদ্রিস। আর তখন থেকেই যেখানে যেমন সুযোগ পেয়েছে বটগাছ লাগিয়েছে সে। আজও কয়েকটা গাছ লাগাতে হবে। কিছু টাকা জমেছিল দর্জিগিরি করে। সেই টাকায় গতকাল হাট থেকে চারা কিনেছে। আজ চারাগুলো লাগাতে যাবে দূরের একটা গ্রামে। সেখানে হাট বসে। নতুন হাট। কোন গাছ-গাছালি নাই হাটে। চারাগুলো সেই হাটের মাঝখানে লাগাতে যাবে ইদ্রিস আলী।

ফেরার পথে দেখা হয় গ্রাম থেকে মাঠের দিকে যাওয়া কৃষকদের সাথে। তাঁদের কেউ চাচা বলে। কেউ ভাই বলে। কেউ বলে, গাছপাগলা। যে যাই বলুক না কেন, ইদ্রিস আলী সবার সাথে হাসি মুখে কথা বলে। লোকেরা তাকে সম্মানও কম করে না। কেউ কেউ ‘বটবৃক্ষ প্রেমিক’ বলে উপাধি দিয়েছে। দেশের বিশাল একটা রাজনৈতিক দল তাকে উপজেলা কমিটিতে পদ দিয়েছে। যদিও রাজনীতি করতে তার মন সায় দেয় না। তবু স্থানীয় বড় বড় নেতারা তাকে ডেকে নিয়ে ‘বন ও পরিবেশ সম্পাদক’ হিসেবে মনোনীত করেছে। তার এ পাওনা জুটেছে গাছের প্রতি ভালোবাসার কারণেই। ত্যাগও সে কম করেনি। মানুষের কাপড় সেলাই করে যে টাকা উপার্জন করেছে, তার সবটাই বটগাছ লাগাতেই ব্যয় করেছে সে। কারও কাছে হাত পাতেনি ইদ্রিস। তার টাকাতেও কেউ ভাগ বসায়নি। সে বার ইদের আগে অনেক রাত করে বাড়ি ফিরছিল ইদ্রিস। রাস্তায় পথ আটকে ছিল ছিনতাইকারীরা। কিন্তু তাকে চিনতে পেরেছিল তারা। ফলে সামান্য ক্ষতিও করেনি ওরা। ইদ্রিস আলী আজও ওদের চেনে না। কেউ একজন পাশ থেকে বলেছিল, গাছপাগলারে ছেড়ে দে। সেই কণ্ঠটাও বুঝতে পারেনি ইদ্রিস আলী।

নতুন হাটে গাছ লাগাতে লাগাতে দুপুর গড়িয়ে গেল। তারপর বাড়ির পথে পা বাড়াল। চলতে চলতে ভাবল, রামুদের হোটেলে দুটো রুটি খেয়ে যাওয়াই ভালো হবে। প্রতিদিন দুপুরে বড় বাজারের রামুদের হোটেলেই ডাল দিয়ে দু-খানা রুটি খায় ইদ্রিস আলী। আজও খেয়েই ফিরবে সে। তবে এখান থেকে বড় বাজারে যেতে চিথুলিয়ার মোড় ঘুরে যেতে হবে। সে পথেই পা বাড়ায় ইদ্রিস। দ্রুত হাঁটে। গ্রামের আঁকাবাঁকা পথ। পথের দূরত্বও কম না। হাঁটতে থাকে সে। মাইলের পর মাইল হাঁটার অভ্যেস আছে তার। তাতে কষ্ট হয় না। কষ্ট হয় যখন দেখে, অনেক ফাঁকা জায়গা পড়ে আছে। যেখানে গাছ লাগানো যেত। কিন্তু সেদিকে কারও খেয়াল নাই। যার যার জীবন সংসার নিয়েই মহাব্যস্ত সবাই। তারা আসলে বুঝেও বোঝে না। গাছপালা কমে যেতে যেতে একদিন পরিবেশের মারাত্মক বিপর্যয় ঘটবে। দীর্ঘ খরা আসবে। প্রবল বন্যা হবে। অতি বৃষ্টিতে ভেসে যাবে সব। কিংবা বহুদিন অপেক্ষা করতে হবে তুমুল বৃষ্টির জন্য। গাছ লাগানো ছাড়া এ বিপদ থেকে রক্ষার পথ নাই। এখনও সে কথা মাথায় ঢুকছে না মানুষের। চিন্তায় অন্ধকার দেখে ইদ্রিস আলী।

চিথুলিয়ার মোড় পার হয়েই থমকে দাঁড়ায় ইদ্রিস আলী। রাস্তার টং দোকানের পাশেই তার লাগানো বটগাছ। বিশাল ছাতার মতো দাঁড়িয়ে আছে। অনেকদিন আসা হয় না এ পথে। গাছটা বেশ বড়ই হয়ে গেছে। এতো বড় যে, ইদ্রিস আলী দেখে অবাক হয়ে যায়। সেই সাথে ভয়ানক একটা ব্যথা বুকের ভেতর টের পায়। বটবৃক্ষের ডালে বড় বড় পেরেক ঠুকিয়ে বিলবোর্ড লাগিয়েছে দোয়াপ্রার্থী এক নেতা। এই মুহুর্তে পেরেকগুলো যেন ইদ্রিস আলীর বুকের ভেতর ঢুকে যাচ্ছে। ব্যথায় কুঁকরে উঠছে সে।

বটগাছের নিচে শিকড়ের ওপর বসে পড়ে ইদ্রিস আলী। কিছুক্ষণ ভাবে। তারপর শুরু করে অনশন। ঢং দোকান থেকে লোকজন এগিয়ে আসে। ইদ্রিস সবাইকে জানিয়ে দেয়, বটবৃক্ষের ডাল থেকে পেরেক না উঠালে এখান থেকে সরবে না সে। এ খবর চলে যায় সেই নেতার কাছে। নেতার লোকজন আসে। কথা কাটাকাটি চলে বেশ সময় ধরে। ইদ্রিস তাদের বোঝাতে চায়, গাছেরও জীবন আছে। স্যার জগদ্বীশ চন্দ্র বসু তা প্রমাণ করেছেন। ইদ্রিসের কোনো কথা শুনতে চায় না তারা। ‘গাছেরও জীবন আছে’ এ কথা অট্টহাসি দিয়ে উড়িয়ে দেয়। এক পর্যায়ে তারা জোর করে সরিয়ে দিতে চায় ইদ্রিসকে। তখন শরীরের সব শক্তি দিয়ে গর্জে ওঠে ইদ্রিস। ইদ্রিসকে তারা চেনে। বহুদিন ধরে দেখে আসছে। কিন্তু এই গর্জন তারা দেখেনি কোনোদিন। পিছু হটে চলে যায় নেতার লোকজন। ঠাঁয় বসে থাকে ইদ্রিস আলী। হঠাৎ এক ফোটা পানি এসে পড়ে তার মুখের ওপর। চমকে ওঠে সে। বটগাছটা কাঁদছে! কষ্টে বুক ভারী হয়ে ওঠে তার। ইদ্রিস জানে, গাছেরা পাতার মধ্যে রান্না-বান্না করে। আর সেই খাবার খেয়ে তারা বেড়ে ওঠে। শিকড় দিয়ে শোষণ করা পানি, সূর্যের আলো আর কার্বন-ডাই-অক্সাইড মিশিয়ে চলে তাদের রান্নার কাজ। রান্না শেষে অতিরিক্ত পানি তারা ফেলে দেয়। পত্ররন্ধ দিয়ে তাই ফোটা ফোটা পানি মাঝে-মধ্যে ঝরে পড়ে। গ্রামের অজানা মানুষগুলো এটাকে ভূতের থুথু অথবা প্রসাব বলে ভয় পায়। পরপর আরও দু-ফোটা পানি পড়ে ইদ্রিস আলীর গায়ে। কষ্টটা তার আরও বেড়ে যায়।

খবর পেয়ে তিনজন সাংবাদিক আসে। ইদ্রিস আলীর সাক্ষাৎকার নেয়। ছবি তোলে। বিলবোর্ডগুলোর ছবিও তোলে। লোকজন জড়ো হয়েছে অনেক। ভোটপ্রার্থী নেতাও আসে। অবস্থা বেগতিক দেখে নিজেই ক্ষমা চেয়ে নেয় ইদ্রিস আলীর কাছে। তার লোকজনকে বিলবোর্ড খুলে ফেলার আদেশ করে। কিছুক্ষণ আগে ইদ্রিস আলীর সাথে খারাপ ব্যবহার করা লোকগুলো মাথা নিচু করে বিলবোর্ড খোলে। দোয়াপ্রার্থী নেতা কথা দেয়, আর কখনো গাছে পেরেক ঠুকে বিলবোর্ড লাগাবে না। কাউকে লাগাতেও দিবে না। সবার সামনে সে পাকা কথা দেয়। সে কথায় অনশন ভঙ্গ করে ইদ্রিস আলী। কিন্তু তার চোখে ভেসে ওঠে অসংখ্য গাছ। গাছের সাথে লাগানো বিলবোর্ড। অসংখ্য পেরেক যেন তীরের বেগে ধেয়ে আসছে। ইদ্রিস আলীর চোখের দিকে।