মনে রাখবেন আমি শরিফুল আলম। বিজ্ঞাপন পেয়ে প্রথম আপনাকে ফোন করেছি। আমার মেয়ে সুশ্রী নয় কিন্তু মেধাবী। রুয়েটে পড়ে। ট্রিপল-ই। দশম ব্যাচ। বললাম, সুন্দর মানুষের মন। আচার ব্যবহার। আপনার কথা আমার মনে থাকবে। আর একটি ফোন এসেছে আমাকে সে ফোন রিসিভ করতে হবে।
-মনে রাখবেন আমি শরিফুল আলম।
আচ্ছা মনে থাকবে বলে ফোন রাখলাম। সাথে সাথেই বেলি রোড থেকে ফোন বেজে উঠলো।
আমি স¦রাষ্ট্র মন্ত্রনালয়ের সচিবের ওয়াইফ। আমার মেয়ে কুয়েট থেকে ট্রিপল ই এর ইঞ্জিনিয়ার। তার ব্যাচ জিরো ফোর। বললাম ছেলের থেকে দুবছরের বড়। এছাড়া মেয়ের ভাই নেই। তারা চার বোন। এ কারনেই সরি বলতে হচ্ছে। কুমিল্লা দেবীদ্বার থেকে একজন বাবা ফোন করেছে, এই আপনার বিজ্ঞাপন খুবই বাজে। আমার মেয়ে কী মেধাবী নয়? সে বিবিএ পড়ে। বললাম, নিশ্চিয়ই মেধাবী। কিন্তু ছেলে চায় ইঞ্জিনিয়ার। পাবলিক ভার্সিটির মেয়ে। আমি কী করতাম! ভদ্রলোক আচ্ছামতো গালি দিয়ে ফোন রেখে দিলো। ভাবলাম মেয়ের বাবা হলে কী এমনই মানসিকতা হতে হয়! ধসঢ়; নাকি আমার ছেলের আমেরিকার ভিসা দেখে সবাই এতো উথলে উঠছে। সেদিন যাচ্ছিলাম নবাব গঞ্জ। স্কুল ভিজিটে। বাবুগঞ্জ ব্রিজে ওঠার সাথে সাথেই আমার ফোন বেজে উঠলো। এবার বিরক্ত হলাম। কেন যে বিজ্ঞাপন দিতে গেলাম! ড্রাইভার শাহীন হাসে। ম্যাডাম ভাইয়াকে বিয়ে করাবেন তো বিজ্ঞাপন দিলেন কেন? বিজ্ঞাপনের পণ্য ভালো হয় না। আমি অবাক হয়ে গেলাম।

বললাম, তুমি তোমার কাজ করো। আমি ফোন ধরলাম। শাহিন ফোঁড়ন কাটে, আমরা ছোট চাকুরি করি। আমাদের কথার কোন মূল্য নেই কিন্তু আমরাও মানুষ! হাতের ইশারায় বললাম গাড়িতে মনোযোগ দাও। আমি ডাক্তার মাহিনের বউ। আমার মেয়ে নওরীন। আটলান্টায় পড়া শোনা করছে। আমি মনোযোগ দিলাম।
মেয়ের নাম নওরীন। আটলান্টায় পড়ে। মেয়ের নানা এক সময় ইত্তেফাকের সম্পাদক ছিলেন । দাদা কে ছিলেন? খোঁজ নিলাম। বাড়ি ফেনি জেলায়। মেয়ের মাও ছিলেন রেডিও আর্টিস্ট। টিভির সংবাদ পাঠিকা। আমার ভীষণ ভালো লাগলো। নওরিন নর্থ সাউথে পড়েছে। আমার ছেলে কিছুতেই তা মানতে রাজি নয়। তবুও এগুতে থাকলাম। মেয়ের প্রোফাইল চলে এলো। দেখলাম। আমার ছোট ছেলে মারাত্মক গবেষক। এবং তার কথা অক্ষরে অক্ষরে ফলে। সে নওরীনের মায়ের এক সেশনের টেলিফোনের আলাপ শুনে হাসতে হাসতে নাস রেখেছে রেডিও বাংলাদেশ নওরিনের মা। আমাকে সতর্ক করলো। বিজ্ঞাপন আমরা দিয়েছি বলে কোন মেয়ের মা এভাবে পুষ করতে পারে না। সে সোজাই বলে দিলো এ মেয়ের বেসিক কোন সমস্যা আছে। আমার মাথায় কিছুতেই ঢুকছে না সমস্যাটা কী?

আম্মু আমার কাজ আমি শেষ করেছি আপনার কাজের খবর কী! পুত্রের এই একটি কথাই যেন হাজার কথার দ্যোতনা। কোমর বেঁধে লেগে গেলাম কন্যা দেখতে হবে। নওরিনের ছবি পাঠিয়েছে। যেন পটে আঁকা কোন মূর্তি। রাজু কেন বোঝে না মেয়েটি সুন্দর! বড় ভায়ের সাথে সুর মিলিয়ে বলে, দেখতে সুন্দর হলেই সে সুন্দর নয়। মেয়ে জিরো সিক্স ব্যাচ। তাহলে চৌদ্দতে এসেও কেন ব্যাচেলর শেষ হয়নি! প্রশ্ন বটে! আমি ভেঙে যাচ্ছিলাম এই ভেবে যে নারীর অবমাননা হচ্ছে কী! আমার ছেলেরা আমাকে বলে, না আম্মু,সারাজীবন যার সাথে থাকবো তাকে তো বাজিয়ে নিতে হবে। আমরা নওরিনের বাসায় গেলাম। তার আর একটি বোন তার ছোট সে মেডিকেলের পড়া শেষ করেছে। তাকে সবার পছন্দ হলো। কিন্তু ছেলের শর্তে ডাক্তার নেই। তাই বাদ দিলো সবাই। নওরিনের মা সুন্দও আয়োজন করলো। কাজী পাড়ায় ডুপ্লেক্স বাড়ি। আমাদের উদ্দেশ্য ছিলো মেয়ের সাথে আমরা স্কাইপিতে আলাপ করবো। আমাদের ছেলের সাথে কথা বলিয়ে দেবো। কিন্তু নওরিনের মায়ের দোতলা থেকে নামার বিলম্ব দেখে রাজু বললো, আম্মু, উঠেন। মেয়ে রাজি নেই। বললাম , তুই কেমনে জানলি? দেখেন তাহলে নওরিনের মা অনেক আগেই নিচে নেমে আসতো। মেয়েকে বুঝিয়ে পারেনি। তবুও আমি এগুতে থাকলাম। পরদিন নওরিনের মা বাবা আমাদের বাসায় এলো। চমৎকার করে মিষ্টির প্যাকেট সাজিয়ে নিয়ে এলো। আমিও অনেক আয়োজন করলাম। একটি মেয়েকে পাত্রস্ত করার জন্য মা বাবার যে আকুলি বিকুলি তা আমাকে ব্যথিত করতে লাগলো। ভাবলাম জগমের মানুষের যে আচরণ নারীর প্রতি হয়তো সেজন্যই তারা ভরসা পাচ্ছে না। হয়তো সেজন্যই আমাকে নানা ভাবে ইনস্ধিসঢ়;সট করার চেষ্টা করছে। আমি সহজ থাকলাম। যাতে তারা নির্ভার হতে পারে। যাতে তাদের বিশ^াস জাগতে পারে আমার কাছে তাদের মেয়ে নিরাপদ। কিস্তু মেয়েটিকে এখনো দেখিনি। সুতরাং কী বলবো ভেবে পাচ্ছি না। নওরিনের মা তার ডিমান্ডগুলো জানাতে লাগলো। কোথা থেকে বিয়ের শাড়ি, কোথা থেকে জুতো, কোথা থেকে লিপস্টিক কিনতে হবে সব এনাউন্স করতে লাগলো। আমি এবারও প্রমাদ গুণতে লাগলাম্ধসঢ়; কারণ এখনো ছেলে মেয়ের কথা হয়নি, দেখা হয়নি। মেয়ের অনেকগুলো বিষয়ে এখনো অন্ধকারে রয়ে গেছি। সব শেষে ছেলের মেয়ের একাডেমিক সার্টিফিকেট চেয়েছে। নওরিনের মা বলে বিয়ে কী চাকরি নাকি! সার্টিফিকেট কেন লাগবে। আমার ছেলে বলে, এটা তো চাকুরির চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ! নওরিনের মা তা দিতে অনীহা প্রকাশ করায় আমরা না করে দিরাম এখানে বিয়ে হবে না। নওরিনের মা আমাকে আচ্ছামতো অপমান করে ফোন রেখে দিলো।

ভাবলাম, আমাদের অতিরিক্ত টাকা নেই। ছেলে এখনো ছাত্র। মেয়ের বাবা মা কেন এ রকম লেগে আছে? নারী কী এতা সস্তা! আমার ছেলের ডিমান্ড অনুযাযী আমি মেয়ে খুঁজতেই পারি। কিন্তু তারা কেন তাদের মেয়েকে সঙ এর মতো উপস্থাপন করে? কেন ছেলে পক্ষের পেছনে এমন করে লেগে থাকতে হবে! আমার ছেলের আমেরিকা বলে? নানান প্রশ্ন মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে। মেয়ে বিয়ে দেয়া জরুরী নাকি মেয়েকে লেখাপড়া শিখিয়ে নিজের পায়ে দাঁড় করানো উচিত! যাই হোক নওরিনের মায়ের কথাগুলো চুপচাপ শুনে কেবল একটি দীর্ঘশ^াস ফেললাম। নারী নিজেকে নিজে না চিনলে কে তাকে চেনাকে! আমার নওরিন বিয়য়ে আগ্রহের ভাটা পড়লো। আর জানতে চাইনি কেন তার ব্রেক অফ স্টাডি কেন হয়েছে? কেন দেশ রেখে আমেরিকার রাস্তার পাশে গড়ে ওঠা সস্তা স্কুলে তাকে টাকা দিয়ে পড়তে হচ্ছে! আমেরিকাই কী তাহলে একজন সুপাত্রের উত্তম যোগ্যতা? এসব কথা বাবতে বাবতে ঘুমিয়ে পড়লাম। শরিফুল আলমের কথা ভূলেই গেছি। বউ খোঁজা সত্যি খুবই কষ্টের! কাহিন আবারো ফোঁড়ন কাটে। ম্যাডাম বলেছিলাম না বিজ্ঞাাপনের জিনিস ভালো হয় না। আমি যেন চমকে উঠলাম। এই মানুষ কী করে জিনিস হয়! আবার নতুন উদ্যমে বউ দেখতে লাগলাম। নানান জায়গায় নক দিতে লাগলাম। সোনালী পরিবারের একটি মেয়ে দারুণ পছন্দ হলো। মেযেটি ঢাকা
ভার্সিটি থেকে মাস্টার্স করেছে। কিন্তু ছেলের একটিই কথা তার বিষয়ের মেয়ে লাগবে নইলে সে কথা বলবে কী করে। আশ্চর্য হলাম বউয়ের সাথে তুই লেখাপড়ার কথা বলবি? সাফ উত্তর, হ্যাঁ। এ জন্যই বাবার সাথে আপনার ঝামেলা হয়; আপনি বাবার মতো একই বিষয়ের হলে হতো না। মনে বড়ো ব্যাথা পেলাম। তবুও হাসলাম। আচ্ছা দেখি তোর জন্য কোথায় বউ পাই!

সেদিন সকালে সকালে অফিসে যাবো। তড়িঘড়ি রেডি হচ্ছি। ফোন বেজে উঠলো। আননোন নাম্বার। দুবার ধরিনি। তৃতীয়বারে ধরেছি। আমি শরিফুল আলম। আপনার ছেলের বিয়ের বিজ্ঞাপন পেয়ে ফোন দিয়েছিলাম। আচ্ছা ঠিক আছে মেয়ের প্রোফাইল পাঠিয়ে দিন। আচ্ছা দিচ্ছি।

সেদিন শরিফ্রল আলম তার মেয়ের প্রোফাইল পাঠালো। অদ্ভূত ভঙ্গিতে বসা য়েয়ের ছবি দেখলে যে কেউ অপছন্দ করবে। কিন্তু আমি যেন কোথাও প্রাণের ছোঁয়া পেলাম; তথাপি মেয়ের বাবাকে চূড়ান্ত কোন কথা বলিনি। কারন ছেলেকে আগে দেখাতে হবে; কথা বলাতে হবে; শূধু বললাম ছেলে আসা পযর্ন্ত কোন কথা বলা যাচ্ছে না। তবে শর্ট লিস্টে আপনার মেয়ের নাম আছে। এসব কথা যখন বলি তখন যেন নিজের ভেতর অদøূত নিরবতা বাস করে। রাতে যখন সবাই মিলে মেয়েদর ছবি বের করে চুল ছেঁড়া বিশ্লেষণ করে তখন গলা পর্যন্ত বমি উঠে আসে। যেন আমাকেই কেউ ছিঁড়ে ছিঁড়ে দেখছে। বাজারের পণ্যের মতো আমিও হাতে হাতে ঘুরছি। ছেলের বাবার সাথে রীতিমতো দ্বন্দ্ব যুদ্ধে লিপ্ত হয়েছি। এভাবে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখা যাবে ন্ধাসঢ়; কার দাঁত উঁচু, কার নাক বেঁটে, কে লাস্যময়ী ছেলের বাবা আমার সাথে তর্কে জড়ায়, তো আমার ছেলে কেমন মেয়েন সাথে থাকবে আমি তা দেখবো না?
বললাম নিশ্চয়ই দেখবে। কিন্তু সম্মানের সাথে।
আরে অসম্মান করলাম কোথায়!
কেমনে বোঝাই এতে নারীর সম্মান যায়! গরুর হাঁটের মতো মেয়ে নিয়ে বাবারা দাঁড়িয়ে আছে। আমরা একটা একটা করে চোখ, নাক, কান, হাতের আঙুল পায়ের আঙুল পরখ করছি আর নাকচ করছি। এভাবে হতে পারে না!
যে ভাবে হলে হতে পারে সে ভাইে করো।
আমরা মেয়ের শিক্ষা আর ফ্যামিলি ট্রি দেখে রাখতে পারি। বাকিটা সাজু ফিরলেই হোক।
ঠিক আছে।
এ দিকে শরিফুল পোন দিয়েই যাচ্ছে কবে আনাদের ছেলে আসবে? আমার মেয়ের জন্য বিয়ের প্রপোজাল আরো আছে। আমি কী তাদের সাথে কথা বলবো? বললাম, মেয়ে আপনার, বলতে পারেন। আমি আমার ছেলে আসার আগে ফাইনাল কোন কথা বলতে পাবো না। অপেক্ষা করতে হবে। মেয়ে তো পড়ছেই। তাকে পড়তে দিন।
সাজু ফিরলো। প্রোফাইর দেখে যে মেয়েটিকে দেখার আগ্রহ প্রকাশ করলো হিসেবে সে মেয়েটি আর সাজু সমান বয়সের। সে একই বয়সি বউ চায় না। পরে শরিফুলকে ফোন করলাম। এতা বোকা আমি ছিলাম যে ছয় মাসেও একবার মেয়ের বাবা মায়ের সাথে দেখা করতে যাইনি। কারন একটাই- আমার পছন্দ অপছন্দ ভেলুলেস। কিন্তু যদি মায়ায় জড়াই তখন সমস্যায় পড়তে হবে। যেমন করে কাশেমের মা নন্দিতাকে দেখতে গিয়ে সোনার অলংকার পরিয়ে দিয়ার পরও বিয়ে ভেঙে দিয়েছে। এতে মেয়েটি সুইসাইড করেছে। আমি

তো আর কাশেমের মা নই। আমাকে হিসেব করে চলতে হবে। সাজু বলে আম্মু ভাবছেন কী?
আস্তে করে বললাম, কিছু না। চল, আজ মিতাকে দেখে আসি।
মিতা কে?
পাঁচ নাম্বার মেয়েটি।
ছেলে হাসে এতো থাকতে পাঁচ নাম্বার কেন?
মেয়ের বাবা বেশি আগ্রহ দেখাচ্ছে।
আমার বাবা আমাকে নিয়ে এমন করে ভেবেছেন কি না জানি না। প্রায় দুশোটি পরিবাবারের সাথে আমি কথা বলেছি। সবাই মেয়ে নিয়ে উদ্বিগ্ন। একটা ভালো ছেলে চাই। আমার ছেলে ভালো আমি জানি। তারা তো জানে না। তথাপিও তারা আমাকে বিশ^াস করতে চায়। মেয়েরা বাইরে পড়তে গিয়ে নিজেকে ধরে রাখতে পারে কি? আমাদেও দেশের প্রেক্ষাপটে একটি ছেলে বারো/তেরো বছওে একটি মেয়ে দশ এগারোতে বয়োঃপ্র্রাপ্ত হয়। কজন ছেলে বা মেয়ে আছে তারা রিলেশনশীপে জড়ায় না! মা বাবারা ছেলে মেয়ের ছলন দেহের গড়ন দেখেই বুঝেনে তারা আগের সেই মূল্যবোধ ধারণ করে না। খুব কম পরিবার আছে যারা সন্তানকে আগলে রাখতে সমর্থ হয়। আমি পেরেছি কারণ তারা লেখাপড়া নিয়েই ব্যস্ত থাকে। তাদের বেসিক শিক্ষা কঠিন ভাবে দিয়েছি। আবার ভাবি সৎ সঙ্গে স্বর্গে বাস। কী জানি তাদের তেমন কোন ঝামেলাা আছে কি না? বাইরে থাকা ছেলে মেয়েদের অনেকের সাথে আমার অন্তরঙ্গ সম্পর্ক ।আমি জানি তাদের গতিবিধি কেমন? আর করবেই বা না কেন? ক্ষুধা সামলে রাখা বিপজ্জনক।

যাই হোক, যে মেয়ে দেখতে যাচ্ছি তার যদি কারো সাথে এেেফয়ার থাকে সে যেন সত্য কথা বলে । বাপের চাপে যেন কাবু না হয়। এটাই চাচ্ছিলাম। আমরা তিনজন যাচ্ছি আমাদেও ব্যক্তিগত গাড়িতে। মেয়েকে মেয়ের বাবা রিকশায় করে নিয়ে এসেছে। স্থান বসুন্ধরা শপিংমল। আমি দেখলাম দূর থেকে মেয়ে তার বাবার হাত ধওে হাঁটছে। কুব সাদাসিধে একটি পোশাক পরা। অতিরিক্ত সাজগোজ কিছুই নেই। তার প্রতিটি পদক্ষেপ যেন আমার বুকেই পড়ছে। ভাবলাম মেয়েটি আমার হলে কী করতাম। তার বাবার চোখ দেখে মনে হচ্ছে সংশয়ে লেপ্টে যাচ্ছে। আশা-নিরাশার মাঝখানে দোদুল্যমান। কিন্তু আমাকে পরক করে দেখতে হবে। মেয়ের বাবার সেন্ডেল ছেঁড়া, গায়ের কোট পেচনে কুচকানো। সামনের বোতাম ঠিক মতো লাগানো নেই্ধসঢ়; আমি হাসলাম। আমার হাসি দেখে শরিফুল আলম হতচকিত হয়ে গেলেন। পরে বললাম, তেমন কিছুই না। আপনাদের দেখে ভালো লাগছে।

আমরা পাঁচজন মুখোমুখি। কথা বলছি আমি আর মেয়ে। কবে এসেছে খুলনা থেকে, কবে যাবে, পড়াশোনা ইত্যাদি নিয়ে কথা বলছি। মেয়ে আড়ষ্ঠভঙ্গিতে উত্তর দিয়ে যাচ্ছে। যখন মেয়ে বললো মুদু আজকের মিটিং এর জন্য সে এসেছে গতকাল আবার আজ রাতেই চলে যাবে। কার তার পরীক্ষা। কেমন খারাপ লাগলো। শুধু পাত্রের কাছে ইন্টারভিউ দিতেই আসা তার! মেয়ের চোখে আত্মোবিশাবাসের কোন ছাপ দেখছি না বরং জায়গা করে নিয়েছে একটি অপমান আর গ্লানিময় একটি চ্যাপ্টার হয়তো আজ তার জীবনে যোগ হবে সে শঙ্কা। আমি নানা ভাবে কতা বললাম কিন্তু কিছুতেই সে স্থির হতে পারছে না। এবার মেয়ের বাবা এবং আমার রাজু উঠে গেলো খাবারের অর্ডার করতে। ছেলেকে বললাম, তুই মিতার সাথে কথা বল। ছেলে আমার বলেই ফেললো, তোমাকে আমার পছন্দ হয়েছে আমাকে কী তোমার পছন্দ?
আমি যেন হাফ ছেড়ে বাঁচলাম। মেয়েটি কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললো, আব্বু আম্মু যা বলে। এরপর আমি কোন কথাই বললাম না। মেয়েটির মুখের দিকে তাকিয়ে থাকলাম। তার মুখে আমার অনাগত প্রজন্মের ছবি আঁকতে লাগলাম। যেন আমি গর্ভবতী নারী। আমার একটি মেয়ে বাচ্চা আসবে তাকে আমি কী ভাবে লালন পালন করবো, কী খাওয়াবো, কী শেখাবো, কোথায় রাখবো নানান চিত্র কল্পে আমি হারিয়ে গেলাম।

বসুন্ধরা থেকে বেরিয়ে ছেলে হাসে আর বলে আর কোন মেয়ে দেখতে হবে বলেন। আমি বললাম তুমি মেয়েটিকে বলেছো, তোমার তাকে পছন্দ হয়েছে। তখন তার চোখের ভাষা আমি দেখেছি। ফিরবে কী বলে! তাৎক্ষণিক ছেলে বললো, ওকে। বলেছি তো বলেছি। এখানেই বিয়ে করবো। মেয়েটির চলে যাওযার দৃশ্য অবলোবন করলাম। যে পায়ে ছিলো কিছুক্ষণ আগেও সংশয় সে পায়ের শুনি এখন দৃপ্ত আওযাজ। একবার পেছনে ঘুরে দেখেই কিশোরী মেয়ের মতো বাবার হাত ধওে হাসতে হাসতে চলে যাচ্ছে। এ অনুভূতি কোথাও যেন আমাকেও ধাক্কা দিলো। আমার ছেলেও হাসতে হাসতে উড়তে উড়তে আমার ধরেই চললো…

আমি কাজে মন দিলাম। এ দিকে ছেলে ফেরার সময় হয়ে এলো।

দ্বিতীয় পর্ব

বৃহস্পতিবার। অফিস শেষ। সবাই যার যার প্রিয়জনের সাথে দেখার করার জন্য ছুটলো। কেউ বরিশাল গেলো, কেউ ঢাকা, কেউ নারায়ন গঞ্জ যে যার গন্তব্যের দিকে যাত্রা করলো সবার চোখে মুখে এক ধরণের ঝিল্লির আভরণ ঝিলিক দিয়ে যাচ্ছে। দুপুর প্রায় গড়িয়ে পড়লো। নুরুল আমিন জানতে চায় আপা যাবেন না। হাসতে হাসতে বলি যাবো। পা ভারি হয়ে আসে ঢাকা যাবার কথা মনে হলে। রাস্তার এ অসহ্য জ্যাম ঠেলে রাত দশটায় বাসায় যেতে আদতেই ভালো লাগে না। তাছাড়া বাসা নিষ্প্রাণ। কেবল প্লেট-কাপের ঠোকাঠুকি। কেবল চায়ের কাপের নিরব আর্তনাদ! কেবল রাত্রির দীর্ঘশ^াস। আরো অস্থির হয়ে উঠি। জানি না আমার মা কেমন করে সারা জীবন এ ভাবে এক নিয়মে জীবন কাটিয়েছেন।

আমি কাজে মন দিলাম। অনেক কাজ পেন্ডিং পড়ে আছে। সরকারি কাজে জবাবদিহিতা প্রচুর। বাইরের মানুষ জানে না সরকারি চাকুরিজীবীরা সত্যিকার অর্থেই প্রজাতন্ত্রের চাকরের মতো। কেবল কাজ আর কাজ্ কেউ যদি ফাঁকি দেয় সেটা তার দায়িত্বে অবহেলা। করি শিক্ষকতা। এখানে কী ভাবে ফাঁকি দিতে হয় আমি জানি না। শিক্ষার্থীদের বোধগম্য করে একটি পাঠ উপস্খাপন অনেক সময়,শ্রম এবং কষ্টসাধ্য ব্যাপার। পারি কি না জানি না, চেষ্টা করি মানুসের প্রাণের কাছে থাকার। কিন্তু কোথায় যেন একটি দূরত্ব সবার তেকে আমাকে আলাদা করে রাখে। মানুষকে ছুঁতে ছুঁতেও যেন ছুঁতে পারি না। এক সাথে বসে, আড্ডা হয় কথা হয় কিন্তু সম্পর্ক হয় না। কেউ কেউ মনোযোগ দিয়ে শোনে , সায় দেয় কিন্তু হৃদয়ের কাছের কেউ হয় না। ছেলে দুটোই যেন আমার সব। হ্যাঁ , তাই তো। মায়ের কাছে সন্তানের চেয়ে আর কে আপন হতে পারে!
ছেলেদের ঘিরেই আমার হাসি আনন্দ। তাদের জন্য কখনো বাপের বাড়িতে গিয়েও রাতিও যাপন করি না।
-ম্যাডাম, একনো কাজ করবেন? চাঁস মিয়া ফোকলা দাঁতে হাসে।
-কেন?
-সবাই চলে গেছে তো!
-বড়ো স্যার গিয়েছেন?
-না, স্যার কাজ করছেন। তবে এক্ষুনি উঠবেন।
-তুমি বাসায় যাবে?
-মানে, একটু কাজ ছিলো!
-আচ্ছা তুমি যাও। আমি দরজা লক দিয়েই যাবো।
ঠান্ডা মাথায় কাজ না করলে ভুল হতে পারে। এতে কারো না কারো ক্ষতি হয়ে যাবে। কারণ শিক্ষার্থীদের নাম্বার দেয়ার কাজ করছি। এ্যাসাইনমেন্ট দেখছি। কাতাগুলো দেকতে দেখতে ভাবছি আমাদের আসলে গোড়ায় গলদ।
মিজান এসে ঝামেরা পাকালো। খাতাপত্র বন্ধ করে তার দিকে মনোযোগ দিলাম।

ভালো গান গায়। আবেগ ভরপুর। হওয়ারই কথা। কাঁচা হলুদের মতো বয়স। ম্যাডাম একটা কথা ছিলো।
-বলো।
-মানে ব্যাক্তিগত!
-বেশ তো বলো,
তার লাজুক চেহারা দেখে মনে হচ্ছে কোথাও সে রঙধনু দেখেছে! আমি চেয়ার ঘুরিয়ে পুরোপুরি তার দিকে ঘুরে বসলাম।
রাত বারোটায় মিজানের ফোন বেজে ওঠে। মিজান ফোন ধরে না। একবার দুবার তিনবার। এবার কিছুটা কৌতুহল কিছুটা বিরক্তি নিয়ে ফোন ধরে।
গমগম স্বরে হ্যালো বলার সাথে সাথে ওপাশ থেকে একটি নারী কন্ঠ হালকা মোলায়েম স্বরে বলে, কেমন আছো?
-কে? কে?
-সাাদিয়া।
-সাদিয়া কে?
-তোমার আগামী।
-মানে কী!
ফোন কেটে যায়। মিজান চুপচাপ ভাবতে থাকে। মনে মনে বলে, নো মোর উইম্যান!
একবার দাগ পেয়েছি দ্বিতীয়বার নয়!
রাত প্রায় মেষের দিকে। মিজানের চোখে ঘুম নেই। সুবর্ণা কেন আমায় চেড়ে চলে গেলো?
বাবা-মাকে ছেড়ে তাকে নিয়ে আলাদা বাসা নিইনি বলে? অনেক টাকা নেই বলে? মানুষের বিপদে, মানুষের সাহায্যেও জন্য মানুষের কথা বলি বলে? এ পৃথিবী মুষ্টিমেয় মানুষের কেন হবে? এ মাটি ব্যক্তির কেন হবে? এ মাটি রাষ্ট্রের । কেন মানুষ দখল করবে? যতোদিন সা মানুষের অধিকার ফিরিয়ে দিতে না পারবো ঘরে ফিরবো না। সুবর্ণা আমার সহযাত্রী হতে পারতো! মিজানের চোখের কোল বেয়ে উপছানো জল বালিশ ভিজিয়ে দেয়। এর পরেই ধাতস্থ হয়। না, মিজান তোমার কান্না সাজে না। তুমি সে জাতির বার নিজেই নিজের কাঁধে নিয়েছো যে জাতি এখনো নিজের মায়ের ভাষার বর্ণ চিনে না। কী ভাবে তারা তাদের অধিকারের কথা বলবে? তোমাকেই বলতে হবে। তুমি জানো বর্ণের গায়ে রক্তের ছাপ লেগে আছে। সালাম রফিক বরকতের রক্তের দাগ তো শুকায়নি! অথচ এ জাতি এখনো জানে না রক্তের কোন বিনিময় হয় না। রক্তের দাম কেবল প্রাণ দিয়ে ধারণ করতে হয়। নিজেকে সম্মান করতে হয়। অপরকে সম্মান দিতে হয়। এ রাষ্ট্রযন্ত্র প্রায় বিকল হয়ে আছে। কোষে কোষে রয়েছে দুর্গন্ধ! আমি কী ভাবে ফিরি ঘরে, সুবর্ণা। তুমিই আমাকে স্বপ্ন দেখিয়েছিলে একটি সাম্যের দেশ। যেখানে সব মানুষের অধিকার সমান থাকবে। ভূমির মালিক রাষ্ট্র হবে। রাষ্ট্র হবে জনগনের। যেখানে শিশুরা বেড়ে উঠবে রাষ্ট্রের পরিচয়ে ব্যক্তির নয়, যেখানে নারী-পুরুষ সমান ভাবে কাজ করবে এক অপরের হাত ধরে পথ চলবে। যেখানে কেউ কারো কাছে হাত পাতবে না। যেখানে সিনিয়র সিটিজেন সম্মানের সাথে বাস করবে। প্রতিটি পরিবার যৌথ হবে, প্রতিটি গ্রাম যৌথ হবে। এখানে ধর্ম-বর্ণ ভেদাভেদ থাকবে না। তুমি চেয়ে ছিলে এমন রাষ্ট্র যেখানে তোমারই সন্তান মুক্ত-স্বাধীন বেড়ে উঠবে। তারপর কী হলো তোমার? আমি যখন কারাগারের অন্ধকারে লড়াই করছি তুমি তখন রাজপথে মিছিল করেছো। আমাদের যৌথ দিনগুলো একবারো ভাবলে না? তুমি জানতে আমাকে আমি ভাঙতে পারি তোমাকে নয়। তুমি ফিরে গেলেও আমি ফিরিনি সুবর্ণা!