-এইভাবে চুপিসারে আপনার সাথে দেখা করতে আমার অনেক ভয় লাগ।
-এইভাবে চুপিসারে প্রেমিকের দেখা করাটাকে কি বলে জান ?
-আমি জানব কি করে?
-তুমি দেখা কর, তুমি জানবা না?
-“দেখা আমি একাই করি ? তাহলে এরপর আর দেখাই করবো না !”, কণ্ঠে অভিমানের সুর।
-এইভাবে দেখা করাটাকে ‘অভিসার’ বলে সুন্দরী, ‘অভিসার’ বলে !
-আপনি কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে নিয়ে মজা করছেন ?
-আর কয়েকটা দিন সবুর করো, আমি একটু গুছিয়ে নেই। কারুর পরিবারই তো আর আমাদের বিয়ে মেনে নিবে না, তাই পালিয়ে গিয়েই আমাদের বিয়েটা করতে হবে।
-বাবা আমাদের বিষয়টা জানতে পারলে আমাকে আর আস্ত রাখবে না।
অনুপমার ভয়টা যে কতটুকু যৌক্তিক ছিল, তা পরের দিনই হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছিলাম।
সেদিন সকাল হয়েছিল চিৎকার আর চেঁচামেচির শব্দে। দেখলাম, বিধান রায় চৌধুরীর নায়েব লিয়াকত মণ্ডল তার তিন লাঠিয়ালসহ আমার বাবা নিজাম উদ্দিন তালুকদারের সাথে বৈঠকখানার সামনে আঙ্গুল তুলে কথা বলছেন। বুঝলাম, সংঘর্ষের ঘনঘটা; কিন্তু তার কারণ যে আমি, সেটা বুঝেছিলাম বাবা আমাকে ডেকে পাঠানোর পর।
-গতকাল সকালে কি তুমি রঘুনাথপুর পুকুরঘাটে বিধানবাবুর মেয়ের সাথে দেখা করেছিলে?
-জ্বি বাবা।
-তোমাকে ইউনিভার্সিটিতে পড়াচ্ছি কি ক্লাস নাইনে পড়ুয়া হিন্দু একটা মেয়ের সাথে এসব করার জন্য ?
-না মানে –
-এ ব্যাপারে আর কোন কথা শুনলে আমি কিন্তু তোমাকে ত্যাজ্যপুত্র করবো, একদম বলে দিচ্ছি।
হঠাৎ মাকে সামনে পেয়ে এক হাত নিলেন, যার সারার্থ হলো, মা’র লাই পেয়েই আমি এসব করছি। এরপর লাঠিয়াল সর্দার সোলায়মান পালোয়ানকে ডেকে পাঠালেন।
আমার পরিবারে মেঘের গর্জন শুনলেও চিন্তিত হয়ে পড়লাম অনুপমার কথা ভেবে। অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতে থাকলাম অনুপমাদের দূরবর্তী প্রতিবেশী রতনের জন্য, যার মাধ্যমে অতি সন্তর্পনে আমাদের মধ্যে যোগাযোগটা রক্ষা হতো।
অবশেষে বিকেলের দিকে তার দেখা মিললো। যে খবর পেলাম, তা অনুপমার আশংকার চেয়েও অনেক বেশি ভয়াবহ। বাবার কারণে আমি কিছু করতেও পারছিলাম না।
আমাদের তালুকদার পরিবার আর অনুপমাদের রায় চৌধুরী পরিবারের মধ্যে আভিজাত্যের প্রতিযোগিতাটা কয়েক পুরুষ ধরেই চলে আসছিল। আর আমরা ছিলাম এই দুই পরিবারের ক্ষয়িষ্ণু পর্যায়ের একেবারে শেষের দিকের প্রতিনিধি।
বিধান চৌধুরীর নায়েব লিয়াকত মন্ডল সম্পর্কে আমাদের দূরসম্পর্কের চাচা, তবে বৈষয়িক বিরোধের কারণে বাবার সাথে উনার সাপে-নেউলে সম্পর্ক। আর আমাদের দুই পরিবারের মধ্যে বিদ্যমান আভিজাত্যের প্রতিযোগিতাটা প্রভাব-প্রতিপত্তির লড়াইয়ে রূপ নেয় মন্ডল চাচা বিধান কাকার নায়েব হিসেবে যোগদানের পর থেকে।
এর আগে দুই পরিবারের মধ্যে সম্প্রীতির একটা সম্পর্ক ছিল, পারিবারিক ও ধর্মীয় বিভিন্ন অনুষ্ঠানে দুই পরিবারের মধ্যে আসা-যাওয়াও ছিল। আর সেভাবেই অনুপমার সাথে আমার পরিচয়। বাবা তো বলেন, আমাদের দুই পরিবারের মধ্যে রেষারেষি সৃষ্টির পিছনে এই লিয়াকত চাচা দায়ী, বিধান কাকা এখন তার হাতের ক্রীড়ানক; বিধান কাকার সম্পত্তি কব্জায় নেয়ার জন্যও তার দুরভিসন্ধি আছে।
লিয়াকত চাচার বড় ছেলে জুলমত মন্ডল আমার সমবয়সী। এলাকায় জনশ্রুতি আছে, অনুপমাকে সে বিয়ে করতে চায়, বিধান কাকার সম্পত্তি গ্রাস করা যার পরের ধাপ। আমার ও অনুপমার মধ্যে সম্পর্কের ব্যাপারেও একটা প্রচলিত কানাঘুষা ছিল। এজন্য অনুপমার গতিবিধির উপর সে তীক্ষ্ণ নজর রাখত সবসময়। কাজেই আমার সাথে সেদিন অনুপমার দেখা করাটা তার নজর এড়াতে পারেনি। রতন আমাদের মধ্যে যোগাযোগ রক্ষা করে, তাও সে জানত।
পরেরদিন সকাল হতেই জানাজানি হয়ে গেল, অনুপমা গলায় দড়ি দিয়েছে আর রতন খুন হয়েছে। শুনে স্তব্ধ হয়ে গেলাম আমি। আমার জন্য আরও চমক অপেক্ষা করছিলো, বেলা বাড়তে না বাড়তেই লিয়াকত চাচা আমার বাড়িতে পুলিশসহ হাজির। আমার মাথায় আকাশ ভেঙে পড়লো যখন শুনলাম, অনুপমার শ্লীলতাহানি আর রতনের খুন হওয়ার জন্য অভিযুক্ত হিসেবে পুলিশ আমার নাম উচ্চারণ করল।
আমাকে হাতকড়া পরিয়ে নিয়ে যাবার সময় আমার মা কেবল চিৎকার করে বললেন, “এ সবই লিয়াকতের ষড়যন্ত্র।” বাবার চোখ দিয়ে তখন আগুন ঝরছিল, লিয়াকত চাচার কিছু শ্লেষোক্তি বাবার চোখের সে আগুনকে আরো উস্কে দিয়েছিলো।
প্রতিবার বাড়ি এসে যখন আবার ইউনিভার্সিটির হলে ফেরত আসতাম, তখন সাথে অনেক ব্যাগ ও বাক্স থাকতো, মিছিলের মতো একটা জনস্রোত বাড়ি থেকে রঘুনাথপুর পুকুরঘাট পর্যন্ত আমাকে এগিয়ে দিত। আর বাবা-মা আর ছোট দুই ভাই-বোনের স্নেহদৃষ্টি যে যতক্ষণ আমাকে দেখা যায় ততক্ষন পর্যন্ত আমার পিঠের মাঝে প্রতিফলিত হতো, তা আমি পরিষ্কার বুঝতে পারতাম। তাই মাঝে মাঝে পিছন ফিরে তাদের উদ্দেশ্যে হাত নাড়তাম।
তবে সেদিন আমার সাথে সেরকম কোন জনস্রোত ছিলনা। তিন জন পুলিশ আর লিয়াকত চাচার বাইরে আমার সাথে রঘুনাথপুর পর্যন্ত ছিলেন শুধু রহিম চাচা, যিনি আমাকে ছোটকাল থেকে কোলে পিঠে করে মানুষ করেছেন। এই পথটুকু আসতে তিনি একটাও কথা বলেননি, তবে তাঁর চোখ থেকে যে বৃষ্টি ঝরছিল, তা আমি বুঝতে পারছিলাম। হয়তো আরো কিছুদূর আসতেন, কিন্তু পুলিশের ধমকে তিনি থেমে যান।
রঘুনাথপুরের পুকুরঘাটে পৌঁছাতেই চোখে পড়লো পুকুরের এক কোণে শব পোড়ানোর প্রস্তুতি, আর অনুপমাদের বাড়ি থেকে কান্নার রেশটাও থেমে থেমে কানে আসছিল।
আমাকে দেখে কেউ কেউ মারমুখী ভঙ্গিতে আমার দিকে তেড়ে আসতে চাইল, তবে লিয়াকত চাচা তাদের নিবৃত্ত করলেন।
এ ঘটনায় এলাকায় আমার বাবার সুউচ্চ মাথা হেট্ হয়ে গেল, আর বিধান কাকার হার্টের ব্যামোটা আরও বেড়ে গেল। ফলে বিধান কাকার পক্ষে মামলার সব দেখভাল লিয়াকত চাচাই করলেন।
আদালতে আমি জানলাম, আমি অনুপমার শ্লীলতাহানির জন্য অভিযুক্ত এবং তা দেখে ফেলায় রতন আমার হাতে খুন হয়। আমাকে অবাক করে দিয়ে পরিচিত দুইজন সাক্ষ্যও দিল।
মায়ের পীড়াপীড়িতে আমাকে ত্যাজ্যপুত্র না করা হলেও রাগ আর ক্ষোভের কারণে বাবা আমার মামলার কোনো দায়ভার নেননি। গোপনে মায়ের চেষ্টায় একজন জুনিয়র উকিল লড়লেন বটে, কিন্তু তা আমার অভিযোগমুক্তির জন্য যথেষ্ট ছিল না ! তবে এতে আমার সাজা কিছুটা কমেছিল বটে।
সাক্ষ্য প্রমাণ শেষে আমার বাইশ বছরের জেল হয়। মা মাঝে মাঝে রহিম চাচাকে আমার সাথে দেখা করতে পাঠাতেন, বাবার কঠিন নিষেধাজ্ঞা থাকাতে তিনি নিজে আসতেন না, আমার ছোট ভাই-বোন দুটিকেও পাঠাতেন না, পাছে আবার বাবার ‘মরা মুখ দেখেন’ !
এর মধ্যে রহিম চাচার কাছে সংবাদ পাই, অনুপমাকে পোড়ানোর সময় মরদেহ বার বার দাঁড়িয়ে যাচ্ছিল, তার প্রেতাত্মা রঘুনাথপুরের পুকুরঘাট এলাকায় ঘুরে বেড়ায় ইত্যাদি। অনেকেই নাকি সন্ধ্যা ও মধ্যরাতে তাকে পুকুরঘাটে ঘুরতে দেখেছে।
লিয়াকত চাচা অনুপমাদের সব সম্পত্তির হাত করতে পারলেও অনুপমার প্রেতাত্মাকে বশে আনতে পারেননি, সেই প্রেতাত্মা নাকি মাঝে মাঝে তার ছেলে জুলমতের গলা চেপে ধরতে চায়, ঘর মটকে দিতে চায়। এজন্য রায় চৌধুরীদের বিশাল বাড়ি এখন সম্পূর্ণ পরিত্যক্ত, জরুরি প্রয়োজন ছাড়া কেউ সেই রাস্তা মাড়ায় না। আর জুলমত বডিগার্ড ছাড়া এখন চলতে আর সাহস পায় না।
দিন যায়, মাস যায়, বছর যায়, শুধু মাঝে মাঝে রহিম চাচার দেখা মিলে। এভাবেই জেনে যাই, বিধান কাকার মৃত্যুর কথা, সম্পত্তি বেহাত হয়ে যাওয়ায় তাদের পরিবারের ইন্ডিয়া চলে যাওয়ার কথা।
একদিন দেখি রহিম চাচা দাড়ি রেখেছেন, দেখতে দেখতে চুলের সাথে সেই দাড়িতেও সাদার প্রাধান্য দেখা যায়। জানতে পারি, আমার ভাই-বোন দুটিও এখন ইউনিভার্সিটিতে পড়ে।
জেলে থাকাকালীন সব নিয়ম-শৃঙ্খলা ঠিকমতো মানায় আমার সাজাও দুই বছর কমে যায়। তবে আমি এটি আর রহিম চাচাকে জানাইনি।
অপবাদের গ্লানি মাথায় নিয়ে বিনা দোষে বিশ বছর জেল খাটার পর যখন পহেলা জানুয়ারী, ১৯৯৭ তারিখে নেত্রকোনার কেন্দুয়া উপজেলার রঘুনাথপুর গ্রামের গাছপালায় ঘেরা সেই পুকুরঘাটের দিকে এগোচ্ছিলাম, তখন কয়েকটি ছোট ছেলে আমাকে ঐদিকে যেতে নিরুৎসাহিত করতে চেষ্টা করল। আমি বললাম, “প্রেতাত্মার সাথেই আমি দেখা করতে যাচ্ছি।” তারা তো আর জানেনা প্রেতাত্মার ক্ষোভের কারণটা।
আমার লম্বা কাঁচা পাকা অগোছালো দাড়ি আর কথার ধরণে তারা আমাকে ‘পাগল’ বলে হাসাহাসি করল।
শেষবারের মতো অনুপমার সাথে যেখানে দেখা করেছিলাম সেখানে গিয়ে থামলাম। করমচা গাছটি এখন আর নেই, তবে শান বাঁধানো ঘাটটি ভঙ্গুর অবস্থায় পুরনো দিনের কথা মনে করিয়ে দিতে ঘাস আর শেওলায় একাকার হয়ে এখনো আছে।
সেখানে যখন পৌঁছাই, তখন সূর্য মধ্য গগনে। সেই সময়কার সব ঘটনা মনে করতে করতে কখন যে সূর্য পশ্চিম আকাশে হেলে পড়েছে টেরই পাইনি। হঠাৎ সম্বিৎ ফিরে পেলাম পরিচিত কণ্ঠের ডাক শুনে। দেখলাম, রহিম চাচা একটা লাঠিসহ আমার দিকে দৌড়ে আসছেন।
-ছেলে গুলোর কাছে নতুন আগন্তুকের বর্ণনা শুনেই বুঝেছিলাম, এ আর কেউ নয়, আমাদের ছোট সাহেব, আসলাম উদ্দিন তালুকদার।
-হাতে লাঠি কেন চাচা, প্রেতাত্মার ভয়ে?
-প্রেতাত্মার বাস তো বাবা অপরাধীর মনে। এদিকটায় বেজি আর বিষধর সাপের বেশ উৎপাত, জুয়াখোর আর নেশাখোরদের আড্ডাও চলে রাত বিরাতে।
রহিম চাচা বলে চললেন, জুলমত কেন প্রেতাত্মার ভয়ে অস্থির, তা এলাকায় সবাই দেরিতে হলেও বুঝতে পেরেছে।
তোমার বাবাও এখন শুধু রাগের বশে তোমার সাথে করা অবিচারের জন্য অনুতাপে বিলাপ করেন। তোমার মা, ভাই-বোনও তোমার জন্য পথ চেয়ে আছে। আর তোমার লিয়াকত চাচা এখন তালুকদার পরিবারের সম্পত্তি হাত করার চেষ্টায় আছে।
কথা শেষ হতে না হতেই রহিম চাচা আমাকে সেই ছোট্ট বেলার মত হাত ধরে টেনে নিয়ে বাড়ির দিকে হাটা ধরলেন, আমাকে কিছু বলার সুযোগই দিলেন না।
হঠাৎ চোখ পড়লো অনুপমার শব দাহ করার স্থানটির দিকে, দেখলাম সেখানে এখন রয়েছে বড় দুটি তালগাছ, যাতে বেশ কয়েকটি বাবুই পাখির বাসা ঝুলছে।
পুকুরঘাটের এত সব ঘটনা ও দুর্ঘটনা তাদের সুখের নীড়ে এতটুকু প্রভাব ফেলতে পারেনি !