মাঠের বর্ণনা : প্রাণধারণের বাস্তবভূমি

সে অনেক কথা। একটি মাঠ। যার দিগন্তজোড়া বিস্তৃতি নেই। মাঝারি আয়তনের। চারিদিকে ছোটো ছোটো গ্রাম।উত্তরে একটি সরু পথ। কাঁচা। পশ্চিমের ক্যানেল বাঁক নিয়েছে দক্ষিণে। দক্ষিণ-পূর্বের পাকা রাস্তা, গ্রাম ও শহরের সংযোগ স্হল।মাঠের মাঝখানে বেশ কয়েকটি পুকুর রয়েছে। রয়েছে দু-একটি দীঘি।কয়েকটি ছোটো ছোটো ডোবা আছে। খাল বা খানাখন্দও আছে। পুকুরগুলোর নাম বেশ শ্রুতিমধুর। বটটিঙা, বাহনপুকুর, বর্ধুনমান, শেয়ালঘড়া, জালমালু ইত্যাদি। এইসব নামের দ্বারা মাঠের এক একটি অঞ্চল নির্দিষ্ট নাম পেয়েছে। মাঠের এক একটি জমিরও নামকরণের বিভিন্ন রীতি রয়েছে। যেমন জমির মালিককের নামানুসারে নাম শঙ্করের ভুঁই, সামসোর মোড়লের ভুঁই প্রভৃতি। গ্রামবাংলায় বড়ো জমিকে কীর আর বীজতলার জমিকে বিচোড়া বলা হয়। আবাসনের আগ্রাসনে হারিয়ে যাচ্ছে ডাঙ্গা-ডহর।খানাখন্দও লুপ্তপ্রায়। তবে বৈদ্যুতিক পাম্প ভুঁইফোড়ের মতো গজাচ্ছে। মাঠে দেখা যাচ্ছে পোল্ট্রি ফার্ম। দেখা যাচ্ছে ইটভাটা বা ইটখোলা। কারো শখের পেয়ারা বা আমবাগান। চোখে পড়ছে স্পর্ধী, ঊর্ধ্বমুখী ইউক্যালিপটাসরা। ধূর্ত শেয়ালের আস্ফালন বা ইঁদুরের শস্যকর্তনও মাঠে দেখা যাচ্ছে। বড়ো বড়ো পুকুরপাড়ের গাছেরা হাত-পা দোলায়। মেঠো হাওয়ার দৌলতে। সবুজ ঘাসও জানান দেয়, মাঠের জেল্লা। মাঠেই পাওয়া যায় মিষ্টি আলু, যাকে গ্রাম্যভাষায় স্যাকারকুম বলা হয়। পাওয়া যায় শাখালু বা ঠান্ডা আলু, যা শরবতি নামেও পরিচিত। পালং, পিড়িং, পুঁই ডাঙ্গা-ডহরকে সবুজের চাদরে ঘেরে। হরেক কিসিমের ফসলেরা পরে রংধনুর রং। চাষীর চোখ জুড়ায়। চোখ-মুখে এক প্রাপ্তি-রেখা ফুটে ওঠে। আলবান্ধা ক্ষেতগুলো চাষীকে স্বপ্ন বিলোয়। চাষী স্বস্তি পায়। কোনো কোনো লেখকের কলমের কালিতেও মাঠ অঙ্কিত হয়। তবে চাষীরও কপাল পোড়ে। মাঠ যখন অতি বন্যায় হাবুডুবু খায়। জল-তেষ্টায় বুক ফেটে চৌচির হয়। ধু ধু খরায় কেবল “খাঁ খাঁ মাঠ ঝা ঝা করে। “কীটপতঙ্গের নাশকতায় চাষী সর্বনাশের প্রহর গোণে। একসময় বুকে বল বাঁধে। বরষার ভরসায়। মকমকি ইঙ্গিত দেয় বরষার। মাঠের আকাশে কালো মেঘের ভেলা ভাসে। সাদা বক আকাশে পাখা মেলে। ঝমঝম আওয়াজে শুরু হয় ধারাবর্ষণ। চলে অবিরাম।সব সাফ হয়। চাতকও পরিতুষ্ট হয়। ক্ষেতের আল উপচে গড়ে যায় জল আর জল। উপচে পড়া জলে চাষীর স্বপ্নে রং ধরে। উদ্যম চিত্তে বীজ বুনে। বীজেরা বড়ো হয়ে ফসল হয়। চাষীর রক্ষণে, পালনে, বহনে ফসলেরা গৃহে আসে। চাষীর দেহে প্রাণ আসে। মনে প্রশান্তি।

২) চাষী : ফসল উৎপাদনের মূলভিত্তি

চাষী মাটি চষে।মাঠ চষে। ক্ষেত চষে।মনের আনন্দে। ওজস্বী ছন্দে। চাষী মাঠের বুকেই প্রাণবায়ু নেয়। বিলাসী অক্সিজেন নেয় গাছ থেকে। কল্পনার মানসজগতে পরিতৃপ্ত হয়। চাষী তৃপ্ত হয়, তার মাঠভরা ফসলে। চারিপাশে আল দেওয়া নির্দিষ্ট ভূমি বা জমিই তার আপন জগত হয়ে উঠে। হয়ে উঠে বিচরণক্ষেত্র। যত বিলাস, যত অভিলাষ সবই চাষীর ক্ষেতমাঝারে। চাষী কর্মের সুতোডোরে বাঁধা। চাষী দিনরাত খেটেখুটে গরীব-দুঃস্থদের মুখে ভাত-রুটি জোগায়। বিলাসীদের মুখে দেয় ভ্যারাইটিজ খাবার। মাঠে, ঘাটে, বাতাসে বসন্ত আসে। প্রকৃতি বিলাসক্ষেত্র হয়, বিলাসীদের কাছে। চাষী বিলাসী চাষের কাজে। ঋতুর বদল হয়। বৈচিত্র্য আসে মাঠের ফসলে। চাষীর হৃদয়ে ভোরের আলো ফুটে উঠে। ঘ্রাণে আসে চষা মাটির গন্ধ। হরিতহলুদ ফসলের ডগায় জমে শিশিরবিন্দু। মাঠভরা শস্য-সিন্ধুতে চাষীর চোখ ডগমগে হয়। চাষী স্ফূর্তিতে কাজ করে। তার মাঠেই কাটে সকাল-সন্ধ্যা। হলকর্ষণে বের হয় ঘাড়ে লাঙল নিয়ে। মাথার মাথাল হয় গ্রীষ্ম, বরষার ছাদ। ধানের বীজ বপন করার পূর্বে চাষী জমিতে ভুতের খাটুনি খাটে। জোরে জোরে কোদাল চালিয়ে আলগুলোকে মেরামত করে। জমির ঢিপঢাপ গুলোকে চারিয়ে দেয়। জমিকে সমতল করে। আলু, কচু চাষের ক্ষেত্রেও চাষীর কোদালের কাজ বেড়ে যায়। পেঁয়াজ, রসুন তিলের ক্ষেতে চাষীকে নিড়ুনির কাজ করতে হয়। জমিকে বিভিন্ন আবর্জনা বা প্লাস্টিক মুক্ত করার দায়ভার চাষীর উপরেই পড়ে। চাষী নির্দ্বিধায় সে দায়িত্ব পালন করে। শ্রম অপনোদনে চাষীর মুখ থেকে বেরিয়ে আসে হৃদয়োৎসারিত গান। চাষীর গান মেঠোবাতাসে ভাসে। মেঠোলোকেরা যেন বলে উঠে, চাষীবন্ধুর গান, “কানের ভিতরে প্রবেশ করিয়া আকুল করিল মোর প্রাণ।” তবে যুবচাষীদের পকেটবন্দি মোবাইল ফোন আজ সেই ভূমিকা নিয়েছে। চাষী প্রেমিকও বটে। আদর-যত্ন দিয়ে মাটির সাথে পিরীতি করে। মাটির শুকনো বুকে প্রেমের ঢেউ তোলে। মাটির প্রেম ধান,গম, সরষের শীষে ঝিলিক দেয়। চাষীর হৃদয় জুড়ায়। হাড়-ভাঙা খাটুনি সার্থক পরিণতি পায়। চরম দাপট নিয়ে আসে লোহালক্কড়ের যন্ত্রেরা। এই শ্রমহারক যন্ত্রেরা কৃষিকাজে অভূতপূর্ব। ফলস্বরূপ লাঙল, কাস্তেরা যাবার দিন গুণছে। কীটনাশকের কারণে আজ ধানের জমিতে নিড়ুনি প্রয়োজন হচ্ছে না। ট্রাক্টর, হারভেস্টররা কৃষিকাজে রাজ চালাচ্ছে। লহমায়, পতিত জমি চাষযোগ্য হচ্ছে। আবাদি জমির শস্য মুহুর্তেই গৃহবন্দি হচ্ছে। চাষীর বদল হচ্ছে। চাষের উপকরণও বদলাচ্ছে। বদলাচ্ছে না, মাঠ ও চাষীর সম্পর্ক।

৩) জলসেচ: বৃষ্টির জল, যেন প্রাণফ

মাঠের অপার সৃষ্টির মূলে জল বড়ো কাজ করে। মাঠের তৃষ্ণার্ত হৃদয়কে শীতল করে। বৃষ্টি বা ক্যানেলের জল চাষীকে নিশ্চিত স্বস্তি দেয়। বুকে বল দেয়। গ্রামবাংলায় জলসেচের কাজে টুলু পাম্প, ছোটো চায়না মেশিন, দমকল প্রভৃতি ব্যবহার করা হয়। চায়না মেশিন ছোটো হলেও সেচের কাজে বড়ো ভূমিকা নেয়। দমকল কেরোসিনের দ্বারা চললেও জল তোলে ভালো। কূপ, নলকূপকেও সেচের কাজে দেখা যায়। তবে কূপ এখন কুপোকাত। মোটরচালিত নলকূপের চল কিছুটা রয়েছে। প্রত্যন্ত গ্রামের মানুষেরা এখনও মাঠের জমিতে ব জল সেচ করে। বালটি বা চারকোনা টিন দিয়ে। অবশ্য, টিনটিকে দড়ি দিয়ে বেঁধে দুজনকে ধরতে হয়। তবে বালটি বা টিনের পদ্ধতি খুব কমই দেখা যায়। একসময় বর্ষা কাল শুরু হয়। পুকুর, দীঘি বরষার বর্ষণে পরিপুষ্ট হয়। খানাখন্দও টইটুম্বুর হয়। জল সংরক্ষিত হয়। কৃষিকাজে জলের সংকট হলে সংরক্ষিত জল ব্যবহার করা হয়। এহেন সময় ভুঁইফোড় পাম্পগুলোও সাহায্য করে। এই পাম্পগুলোর উপর ভর করেই বোরো ধান বড়ো হয়। একসময়, আমার এলাকায় দুন নামক এক যন্ত্রের সাহায্যে জলসেচ করা হত। সেই কষ্টসাধ্য সেচব্যবস্থার চল আর নেই। জলসেচের ফলে মাঠভরা শস্য সবল হয়।সতেজ হয়। চাষীর শুষ্ক ঠোঁটে হালকা হাসির রস লাগে। ফসলের বৈচিত্র্য বাহারে নয়ন তৃপ্ত হয়। দিগন্তজোড়া সরষের ক্ষেতকে হলুদ ফুলের মেলা মনে হয়।সবুজ শৈবালের সারি মনে হয় কচি কচি গম জমিকে। পাকা ধানের ক্ষেতে লাগে সোনা-রঙের বাহার। ক্ষেতে ক্ষেতে রংধনুর সাত রং ফুটে উঠে। বৈদ্যুতিক পাম্পের দরুন ডাঙ্গা-ডহরে বারোমাসি ফসল হয়। কখনো দেয় আলু, পেঁয়াজ, রসুন। কখনো দেয় বিভিন্ন রকমের শাকসবজি। জলই জীবন।ফসলের ক্ষেত্রেও তা স্বতঃসিদ্ধ। মাঠের জীববৈচিত্র্যকে রক্ষা করে জল। ক্যানেল বা পুকুরের জলে সাপ, ব্যাঙ, মাছেরা খেলে। আষাঢ়-শ্রাবণে হইহুল্লোড় করে কোলাব্যাঙ, কাঁকড়া, শামুক, ঝিঝিরা। জলের সুবাদেই মাঠের আনাচকানাচে হাজার হাজার জীব বেঁচে থাকে। জলজ উদ্ভিদেরা দৃপ্ত হয় মাঠের পুকুর বা ডোবাগুলোতে। কচুরিপানা, পদ্ম,শালুকেরা বেড়ে ওঠে।বড়ো হয়। মাছ শিকারে আসে পানকৌড়ি, মাছরাঙা, বকেরা।আষাঢ়ের কর্দমাক্ত জমিতে কীটপতঙ্গের সাবাড় করতে আসে শঙ্খচিল। অন্যান্য শিকারী পাখি বা সরীসৃপেরাও আসে। গ্রামবাংলায় মোটামুটিভাবে কয়েকটি সেচপদ্ধিতে অবলম্বন করা হয়। যেমন, বর্ষণ সেচ, প্লাবন সেচ, নালা সেচ, ড্রিপ বা বিন্দু সেচ। অর্থাৎ, ফসলেরা বাঁচে, মেঘের বর্ষণে। ক্যানেলের জলধারায়। ডোবার রক্ষিত জলে।পাম্পের ক্ষীণ জলরেখায়।

৪) কৃষিজ উপকরণ : মাঠ যেন কলকব্জার দুনিয়া

অত্যাধুনিক প্রযুক্তি কষিকাজে বিপ্লব এনেছে।কৃষিতে শুরু হয়েছে সবুজ বিপ্লব। মার্কিন কৃষিবিজ্ঞানী ড. নরম্যান বোরলাউগ ‘সবুজ বিপ্লবের জনক’ হিসেবে খ্যাত হয়েছেন। লাভ করেছেন বিশ্ব খাদ্য পুরস্কার। কেননা তিনি মাঠের ফসল চাষে কল্পনাতীত উন্নতি ঘটান। ব্যাপকভাবে খাদ্য উৎপাদনের হার বাড়ান। এমনকি তিনি শান্তিতে নোবেল প্রাইজও লাভ করেন। নতনের পাশাপাশি এখনও গ্রাম-বাংলায় পুরনো কৃষিজ উপকরণের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। দা, কোদাল, লাঙল, জোয়াল আজও বহাল আমার এলাকায় আজও বহাল আছে টাংলি, পাশনা। গ্রামবাংলায় একখন্ড দীর্ঘ শুকনো বাঁশও কৃষিজ উপকরণ রূপে ব্যবহৃত হয়। পাকা ধান কাটার আগে সমস্ত ধানকে একমুখী করতে বাঁশ চালানো হয়। যাকে বাঁশ দেওয়া বলে। রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, জসীমউদ্দীনদের কবিতায় ঠাঁই পেয়েছে লাঙল, মই বা কাস্তে। আধুনিক কবি দীনেশ দাস আবার ‘কাস্তে কবি” নামে পরিচিত হয়েছেন। গেঁয়ো চাষী বলদ বা মোষের ঘাড়ে জোয়াল দেয়। মনের আনন্দে লাঙল বায়। শস্যভর্তি গাড়ি টানে গোরু বা মোষ। এছাড়াও শস্য মাড়াই বা ঘানি টানারও কাজ করে। আখও পেষে। নতুন প্রযুক্তি আসায় গবাদি পশুরা একটু রেহাই পেয়েছে। পরিবহনে বা ভূমিকর্ষণে পাওয়ার টিলার, তার পাওয়ার দেখাচ্ছে। মাটি চষতে আর শস্য ঘরে আনতে ট্রাক্টর সদা তৎপর। ধান কাটার কাজে প্যাডি রিপারও তৎপরতা দেখায়। মাটি চিরে ঝুরঝুরে করছে রোটাভেটর। ধানের চারাকে ক্ষণিকেই সারিবদ্ধ করছে রোপণযন্ত্র। শস্য বহনে ট্রলিট্রাক্কর গোরুগাড়িকে প্রায় গিলে ফেলেছে। হারভেস্টর করছে কাটাই, মাড়াই ও ঝাড়াই।এক দানবীয় যন্ত্র নিমিষেই বিঘার পর বিঘা গম কেটেই চলেছে। আসলে এই দানবযন্ত্রের নাম রিপার মেশিন। উত্তোলন যন্ত্র মৃত্তিকা খুঁড়ে বের করে আনছে আলু, কচু। আবার বীজ বপন যন্ত্র বীজ আলু বা কচু সারিবদ্ধভাবে বপন করে চলেছে। জমি থেকে আগাছা দূর করতে হাইড্রোটিলার বেশ তেজ দেখাচ্ছে। ফসলকে কীটপতঙ্গের মুখ থেকে বাঁচাতে কীটনাশক প্রয়োগ করা হচ্ছে।মাঠের মাটি কর্ষণ থেকে ফসল গৃহে তোলা পর্যন্ত কৃষির আধুনিক যন্ত্রপাতিরা অতি তৎপর। মাঠে কিছু মজার দৃশ্যও দেখা যায়। জমি বা ডাঙ্গার কচুপাতাকে নিয়ে।পুকুর বা ডোবার পদ্মপাতাকে নিয়ে। কচুপাতা বা পদ্মপাতা ঝমঝম বৃষ্টিতে চাষীর ছাতা হিসেবে কাজ করে। আবার চাষীদের খাবারের পাতা বা ঠোঙা হিসেবেও কাজ করে। অর্থাৎ, এখানে ফসলই চাষীকে রক্ষা করে। এ যেন এক রক্ষা চুক্তি। এভাবেই চাষের মরশুমে চাষীর মাঠ হয়ে উঠে যন্ত্রপাতির কারখানা।

৫) চাষ পদ্ধতি : ক্ষেতভরা ফসল

চাষের পদ্ধতির উপর নির্ভর করে মাঠভরা ফসল। বিভিন্ন শস্য চাষের বিভিন্ন পদ্ধতি রয়েছে। গ্রাম বাংলায় রবি ও খারিফ শস্যের প্রাধান্য। বরষার খারিফ শস্যের মধ্যে ধানেরই তারিফ বেশি। ধান চাষাবাদে কয়েকটি নির্দিষ্ট পদ্ধতি অবলম্বন করা হয়। ধান প্রধানত বাদা অঞ্চলে ভালো হয়। বাংলার ধান মৌসুমীর আদরে বড়ো হয়। প্রথমত, নীরোগ ধান বীজ হিসেবে নির্বাচন করতে হয়। তারপর বীজতলা তৈরী করতে হয়। বীজতলা শুকনো, কাদাময় বা জলাময়ও হয়। তারপর বীজবপন, পরিচর্যা, চারা উঠানো ও বহন। পরে বপনযোগ্য জমিতে চারা আসন পাতে। ধানগাছে কীটপতঙ্গের আক্রমণ ঘটলে কয়েকবার স্প্রে করতে হয়।দীর্ঘ লালন পালনের পর ধান চাষীর ঘরে ঢুকে। শীতের রবিশস্যকেও খুব আদর করতে হয়।বীজ গম খুব লাজুক। তাকে নভেম্বরের হালকা তাপে বুনতে হয়। জলসেচের জন্য গমের জমিতে লাঙল দিয়ে সরু সরু নালা কাটতে হয়। প্রয়োজনমাফিক ইউরিয়াসহ অন্যান্য সার প্রয়োগ করতে হয়। বীজ গমকে অনেকসময় পাখিরা খেয়ে ফেলে। তাই জমি থেকে দিন বারো পাখি তাড়াতে হয়। ইঁদুরের উপদ্রব থেকে গমকে রক্ষা করতে জমিতে বিষটোপও ব্যবহার করা হয়। গমের চিটা রোগ হলে কীটনাশক স্প্রে করা হয়। হরিত থেকে হলুদ হলে চাষীর গৃহে গমের আগম হয়। চৈত্রের দাবদাহকে উপেক্ষা করে কিছু ফসল বাঁচে। অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখে। মাটির দেহ শুকোলেও হৃদয়ে তার প্রেম থাকে। সেই প্রেমরস থেকেই রসদ নিয়ে চৈতালিরা বাঁচে। লাউ, কুমড়োরা মোটা মোটা পেট নিয়ে পড়ে থাকে। পেঁয়াজ, রসুন, আদা, হলুদ শান্ত হয়ে রবির রোদ পোহায়। সূর্যমুখী সারাক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকে সূর্যের দিকে মুখ করে। সরষে বা তিল অল্প সময়ে বা সহজ পদ্ধতিতে বেড়ে ওঠে। তিলচাষে প্রথমত, বীজকে জলে ভিজিয়ে একটু ঝরঝরে করতে হয়। মাটিকে ঝুরঝুরে করে, আগাছা মুক্ত করে জমি প্রস্তুত করতে হয়। কিছু সার প্রয়োগ করতে হয়। তারপর বীজ বুনতে হয়। জলসেচ করতে হয়। পাকলে গৃহে এনে জাগ দিতে হয়। তবে আখ বা পাট চাষে দীর্ঘদিন ধরে চাষীকে খাটতে হয়। আখ চাষের পদ্ধতি খুব কঠিন ও জটিল। একে খুব আদর-যত্ন করতে হয়। বীজ আখকে গোছ গোছ করে পুকুরের ঠান্ডা জলে রাখতে হয়। তারপর জমিকর্ষণ, রোপণ ও দরকার মতো আগাছা দমন। আখগাছের বড়ো বড়ো শাখাগুলোকে অতি যত্নে বাঁধন দিতে হয়। এই কাজ আখচাষীদের খুব সাবধানে করতে হয়। কারণ আখের ধারালো পাতায় চাষীর হাত-পা কেটে বা চিরে যায়। যাইহোক, আখচাষের লম্বা পদ্ধতি আর লম্বা করলাম না। ঠিকঠাক পদ্ধতিতেই চাষী পায় মাঠভরা ফসল।

৬) ফসল রক্ষণ : চাষীর মানসিক পরিতৃপ্তি

বীজ বুনলেই ফসল হয় না। ফসলকে কীটপতঙ্গ থেকে রক্ষা করতে হয়। পোকামাকড়ের উৎপাতে শস্য নষ্ট হলে চাষীর মাথায় হাত ওঠে। চোখ কপালে ওঠে। মাটি চষে বেড়ায় যে কেঁচো,আর সবুজ ধানে চিপ্টে থাকে যে মাজরা পোকা, সবই কীটপতঙ্গ। কেউ ফসলের বন্ধু, কেউ বা শত্রু। শত্রু আছে।শত্রু নিধনের উপায়ও আছে। কীটপতঙ্গ বা পোকামাকড়কে নাশ করার জন্য কৃষিবিজ্ঞানীরা কীটনাশক তৈরি করেছেন। কীটনাশক বা বিষাক্তপদার্থ পোকামাকড়কে নির্মূল করে। বিভিন্ন কীটপতঙ্গের বিচিত্র উপদ্রব। কেউ গাছের কান্ড বা পাতার রস চুষে চুষে খায়। আবার কেউ শস্যের লোমকূপে প্রবেশ করে বিষক্রিয়া ঘটায়। বেশিরভাগ পোকায় ধানকে ধ্বংস করে। পামরী, চুংগী, ল্যাদা, ঘোড়া, ছাতরা, গান্ধি, কেড়ি ইত্যাদি। ল্যাদা পোকা নাশ করতে চাষী এন.পি.ডি.প্রয়োগ করে ।কুমড়োকে বিভিন্ন পোকার কবল থেকে রক্ষা করতে ফেরোমোন ট্রাপ প্রয়োগ করা হয়। এটি টমেটো, পটলকেও পোকার হাত থেকে রক্ষা করে। সরষের গাছে জাবা লাগলে চাষী তরল বিষ স্প্রে করে। গমের কচি দানায় দুধ আসতে না আসতেই স্টিংবাগ, তার স্টিং অপারেশন চালায়। ফলে গমের গাছ চিটা হয়। দানাও চিটা হয়।চাষী তখন সেভিন সেবন করে স্টিংবাগকে ভাগায়। ডায়াজিনন, রোটেটন, ডিডিটি, গ্যামাক্সিনের প্রয়োগেও মাঠের ফসল সুরক্ষিত হয়। কিছু ঘরোয়া উপায়েও ইঁদুর, ফড়িং, কাঁকড়ার কবল থেকে বিভিন্ন শস্যকে রক্ষা করা হয়। অনেকসময় ধান বা গমের ক্ষেতে কঞ্চি পুঁতে দেওয়া হয়। তাতে শিকারি পাখিরা বসে। তারা শস্য অনিষ্টকারী পোকামাকড়কে ভক্ষণ করে। গোরু, ছাগল বা হাঁস, মুরগির অত্যাচারেও চাষী অতিষ্ঠ হয়ে উঠে। শস্যক্ষেত্রের চারিপাশ জাল বা বাঁশের বেড়া দিয়ে ঘেরে দেয়। লাউ, করলা, পটল চাষের জন্য চাষী জমিতে মাচা বেঁধে দেয়। ফসলের ধারণ ক্ষমতা অনুযায়ী জমিতে জলসেচ করে। আবার জলনিকাশও করে। ধানের সোনালী শীষ, গমের হালকা হলুদ শিখা, সরষের হলুদ ফুল, ভালো ফসলের ইঙ্গিত করে। পাটের উচ্চ গ্রীবায়, ইক্ষুর ঊর্ধ্বমুখে, ছোলা গাছের সবুজ-উজ্জ্বলতায়, চাষীর চেহারায় জেল্লা আসে। আর সেই জেল্লা ফুটে উঠে চাষীর লক্ষ্মীপূজায় বা নবান্ন উৎসবে। চাষীকে মাঠের আম, তাল, খেজুর গাছকেও রক্ষা করতে। রাখাল বা উচ্চ্যাংড়ারা এইসব গাছের উপর অত্যাচার চালায়। তারা ফল পেড়ে খেয়ে নেয়। তাল বা খেজুরের রস চুরি করেও খায়। বাবলা,ইউক্যালিপটাস প্রভৃতি গাছের প্রতিও চাষীকে নজর দিতে হয়। কারণ এইসব গাছ চুরি হয়ে যায়। চোরেরা কাঠের লোভে চুরি করে।” শস্য শ্যামলা সুফলা ” মাঠই চাষীকে মানসিক পরিতৃপ্ত দেয়।

৭) ফসল : জীবকুলের খাদ্যভান্ডারের উৎস

মাঠে প্রায় বারোমাসই চাষাবাদ হয়। ঋতু অনুযায়ী বিভিন্ন রকমের ফসল ফলে। তবে কিছু কিছু ফসলের সারাবছরই চাষ হষ। বাংলায় ব্যাপক হারে চাষ হয় খারিফ, রবি ও চৈতালি শস্যের। এছাড়াও হরেক রকমের ফসল বাংলার উর্বর মাটিতে দেখা যায়। খারিফের জীবৎকাল জুন থেকে অক্টোবর পর্যন্ত। ধান, পাট, কুমড়ো, শসা, ঝিঙে, কচু প্রভৃতি খারিফ শস্যে মাঠ ভরে উঠে। নেংটা হয়ে থাকে ঢেড়শ, লঙ্কারা। রবিশস্যের আলু, গম, ছোলা, মটর, মূলো, গাজরেরা খুব যত্নশীল। কেউ মাটির নীচে থাকে। কেউ আবার খোলসের মধ্যে নিজেকে গুটিয়ে নেয়। ফুলকপি, বাঁধাকপি, টমাটো ক্ষেতের সৌন্দর্য বৃদ্ধি করে। সরষে, সূর্যমুখী, সয়াবিন সাধারণত সূর্যের আলোয় বেড়ে ওঠে। পেঁয়াজ, রসুনের মূল প্রোথিত হলেও তার শাখা-প্রশাখা মাটির ওপরে থাকে। হাওয়ার সঙ্গে তাল মিলিয়ে নাচে। এই রবিশস্য মাঠকে অক্টোবর থেকে মার্চ পর্যন্ত মনোমুগ্ধকর করে রাখে। এইসময় কেবল সেচের উপর নির্ভর করে চাষ করা হয় বোরো ধান। এই উচ্চ ফলনশীল ধান বসন্তকালে চাষ হয় বলে, একে বাসন্তিক ধানও বলা হয়। মার্চ থেকে জুন পর্যন্ত চৈতি ফসলের সময়। চৈত্র মাসে ওঠে বলে লোকে চৈতালি বলে। চৈতি ডাল দেয়, রসালো ফল দেয়। শাকসবজিও দেয়। এই ত্রয়ী শস্যের বাইরে বহু ফসল পাওয়া যায়। খাদ্যশস্য, ডাল, তৈলবীজ পাওয়া যায়। আদা, হলুদ, ধনেপাতার মতো মশলাও মাঠেই উৎপন্ন হয়। তন্তু, নেশা, পশুখাদ্য বা রঙজাতীয় শস্য মাটির বুক চিরেই আসে। তবে ইংরেজদের উচ্ছেদের সঙ্গে সঙ্গে দেশের মাটি থেকে নীলগাছেরও উচ্ছেদ ঘটে। ভেষজ, শর্করা এমনকি কাঠ উৎপাদনকারী ফসলও মাঠ থেকেই পাওয়া যায়। মাঠের পুকুর বা ডোবায় শালুক পাওয়া যায়। এটি হ্যালা নামেও পরিচিত। এই রসভরা ফল গ্রামের লোকেরা খায়। পানিফলও পাওয়া যায়। এই ফলটির শিং থাকে বলে একে শিংড়া বলা হয়। এটি বাজারে বিক্রি হয়।সকাল থেকে রাত পর্যন্ত গোগ্রাসে যা গিলি, তার নিরানব্বই শতাংশেরই উৎস হচ্ছে মাঠ। ব্রেকফাস্টে চা বা কফি, বিস্কুট বা মুড়ি; টিফিনে চিড়ে বা কেক; লাঞ্চে ভাত; ডিনারে স্বল্প ভাত বা রুটি; এসবেরই মূল উৎস একটি মাঠ। চড়া রোদে এক গ্লাস ফলের জুস বা ইক্ষু রসের উৎসও ঐ একটি মাঠ। এক একটি দেশ বা স্থান এক একটি ফসলে প্রভূত উন্নতি করেছে। ফলে ভূগোলে তার ইতিহাসও তৈরী হয়েছে। নাটাল হয়েছে “চিরসবুজের দেশ”। “শস্যভান্ডার” হয়েছে ইউক্রেন। “চিনির গামলা”তে বসে আছে কিউবা। “বিশ্বের রুটির ঝুড়ি” হয়েছে প্রেইরি অঞ্চল। “দারূচিনির দ্বীপ” নামে খ্যাত হয়েছে শ্রীলঙ্কা। আবার “সোনালি আঁশের দেশ” হয়েছে বাংলাদেশ। আর, আমার বাংলার বর্ধমানকে বলা হয়েছে “ধানের গোলা”। এসবেরই পিছনে লুকিয়ে আছে একটি মাঠ। এককথায় মাঠই হল অগণিত জীবের বিভিন্ন খাদ্যের একমাত্র উৎস।

৮) মাঠের জীববৈচিত্র্য: কারো বাথান, কারো বাসস্থান

মাঠ শুধু ফসল ফলায় না। অনেক পশুপাখির চারণভূমি। অসংখ্য জীবের বাসভূমি। সাধারণত ডাঙ্গা-ডহরে বা পতিত ভূমিতে বাথান বা তৃণক্ষেত্র গড়ে ওঠে। দূর্বা, মুথা বা নাম না জানা অসংখ্য ঘাস বা লতাপাতায় বাথান ভরে ওঠে। আগাছাও স্থান পায়। গৃহপালিত ও গবাদি পশুরা সেখানে চরে বেড়ায়। গ্রাসাচ্ছাদন করে।জাবর কাটে। গোরু, ছাগল, মোষ, ভেড়া, ঘোড়ারা চারণভূমিতে পেটপূর্তি করে।হাঁস, মুরগি, খরগোশ, পায়রা, টিয়া, ঘুঘু বাথানের কচি কচি ঘাস ছিঁড়ে খায়। একশ্রেণির পায়রা কেবল মাঠেই চরে বেড়ায়। গ্রামবাংলায় যাকে ‘মাঠগোলা’ বলে ডাকে। গাধা, গিনিপিগেরাও পেটপুজা করে বাথানে। ঘাসফড়িং ঘাস খায়। পঙ্গপালও ঘাস খায়। কচি ঘাসে মত্ত হয়ে ময়ূর পেখম নাচায়। জীবনানন্দের সুন্দর বাদামি হরিণ আজও “… সবুজ সুগন্ধি ঘাস ছিঁড়ে ছিঁড়ে খাচ্ছে…”। এছাড়াও অনেক পশু, পাখি, কীটপতঙ্গ, পোকামাকড় মাঠের ঘাস খেয়েই জীবনধারণ করে। পশুপালনকে কেন্দ্র করে অনেক দেশই মুনাফা অর্জন করে। অর্থাৎ মাঠের চারণভূমির কারণেই সেসব দেশ ইতিহাসে পরিচিতি পায়। এক্ষেত্রে উল্লেখ্য হল, “পশুপালনের দেশ” তুরস্ক। বছরের বেশিরভাগটাই শিয়াল পন্ডিত মাঠেই অতিবাহিত করেন। ‘কৃষকের বন্ধু’ কেঁচোর বাস কৃষকের ক্ষেতে। মলত্যাগের মাধ্যমে মাটিকে উর্বর করে বলে কেঁচোকে ‘প্রকৃতির লাঙল’ও বলা হয়। কৃষকের শত্রু ইঁদুর, কাঁকড়া, বক, স্বর্ণগোধিকা, বেজিরা কৃষকের ক্ষেতেই আস্তানা গড়ে। কোলাব্যাঙ, বিভিন্ন ধরনের সাপ, কেন্নো, জোঁক বা জোনাকি মাঠেই থাকে। বর্ষাকালে দেখা মেলে গেড়ি বা শামুকের। মশা, মাছি, ঝিঝি, পিঁপড়েরা মাটির ভিতরে বা উপরে বাস করে। ডাহুক সাধারণত মাঠের ঝোপঝাড়ে দেখা যায়। ছোট্ট চড়ুই মাঠের টিলার ভিতর বাসা বাঁধে। মাঠের পুকুরের ধারে গর্ত খুঁড়ে থাকে ভোঁদড় বা উদবিড়াল। মাঠে বা মাঠের বাথানে জন্ম নেয় অনেক ভেষজ বা ঔষধি উদ্ভিদ। আফিম, আলকুশি, আশশেওড়া, কন্টিকরী, কালকাসুন্দা জন্মে। জন্মে কুলেখাড়া, গোলপাতা, টগর। এই টগর আবার দুধফুল নামেও পরিচিত। মহার্ঘ্য দূর্বাও মাঠেই জন্মে। ঢোলকলমি, থানকুনি, পানি লজ্জাবতীরও মাঠেই বাস। ভুঁই-এর আলে দেখা যায় ভুঁই ওকরা। এটি সাদা বা গোলাপি রঙের ফুল। হেলেঞ্চা বা হিঞ্চা, মাধবী লতা, হলুদ আমরুল মাঠে প্রচুর পরিমানে উৎপাদিত হয়। বিশেষ করে বাথানে মুক্তাঝুরি বা মুক্তবর্ষী জন্মায়। মহোষধি মেথিও মাঠেই পাওয়া যায়। মিশ্রিদানা বা চিনিপাতা, উচুন্ডী বা ফুলকুড়ি, শ্বেতদ্রোণ বা ধুলফি বাথানে জন্মেবর্ষাকালে চাষী ইলাইমাস রেপেনস চাষ করে। এটি পালঙ্ক ঘাস বা ডগ ঘাস নামে পরিচিত। এটি গোরু বা মোষকে তেজী করতে খাওয়ানো হয়। বাথানে আকন্দও পাওয়া যায়। যা শ্বাসকষ্টের ক্ষেত্রে খুবই উপকারী। এভাবেই মাঠের জীববৈচিত্র্য গড়ে ওঠে।

৯) আগলদার : মাঠের পুলিশ বা আরক্ষক

দেশরক্ষায় প্রয়োজন পুলিশ-প্রশাসন।মাঠের ফসল রক্ষায় আগলদার। আগলদার মাঠের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। আগলদার হল মাঠের ফসল আগলানোর বা পাহারা দেয়ার জন্য নিযুক্ত লোক। সারাবছরই তারা মাঠের ফসলকে আগলিয়ে রাখে। পশুপাখির থেকে; চোর বা বদমাশ লোকের থেকে। কেননা, গোরু, ছাগল, মোষ সবুজ শস্যকে সাবাড় করে দেয়। হাঁস, মুরগি, পায়রা, ঘুঘরা গম, ছোলা, মটরের বীজে ঠোঁট বসায়। আগলদারকে ঘেসেড়ার প্রতি নজর রাখতে হয়। অনেক সময় ঘেসেড়া ইচ্ছাকৃতভাবে ঘাসের সঙ্গে কচি ধান, গম বা সরষেকেও কেটে ফেলে। সাধারণত মহিলারা জলাময় ধানের জমিতে শুষনী শাক তোলে। তখন তাদের পায়ে কচি ধান দলিত হয়। ধান নষ্ট হয়। এব্যাপারেও আগলদারকে লক্ষ্য রাখতে হয়। গম বা সরষে ক্ষেতে বথুয়া শাক জন্মায়। আমার এলাকায় এটি ‘বাস্তকী শাক’ নামে পরিচিত। এই শাক গ্রাম এলাকায় খুব জনপ্রিয়। এটি গবাদিপশুরা খুব খায়। মানুষও রান্না করে খায়। এই শাক তুলতে গিয়ে অনেক দুর্বৃত্তপরায়ণ মানুষ শস্যক্ষেত থেকে শাকের সঙ্গে অনেক শস্যও তুলে নেয়। আবার শস্যকে মাড়িয়েও দেয়। অবশ্য আগলদারের নজরে এলে ঐ দুর্বৃত্তদের জরিমানা করা হয়। ছোটো ছেলে বা মেয়েরা ধান বা গমের শীষ কুড়োতে মাঠে যায়। সেই সময় তারা চাষীর গচ্ছিত ধান বা গমের শীষকে ভেঙে বা কেটে নেয়। সেটাও আগলদারের নজরাধীন। রাখালের গোরুর পাল অনেকসময় চাষীর ফসল খেয়ে ফেলে। অনেক মানুষ ছাগল, ভেড়া চরাতে গিয়েও চাষীর ফসল খায়িয়ে ফেলে ছেলেরা মাঠে ক্রিকেট খেলতে গিয়ে চাষীর ফসল নষ্ট করে। ফুটবল খেলতে গিয়েও নষ্ট করে।কোনো কোনো সময় ধানের ক্ষেতে লোকে মাছ ধরে। তখন তাদের পায়ে ধান দলিত হয়। ধান নষ্ট হয়। এগুলোও আগলদারকে তদারক করতে হয়। অর্থাৎ আগলদার এক্ষেত্রে একজন তদারকি হয়ে উঠেন। এতো গেলো আগলদারের দিবসপালা। গ্রামবাংলার মাঠে ধান পাকে। কাটা হয়।খড় শুকনোর উদ্দেশ্য কাটা ধান জমিতে সারিবদ্ধভাবে পড়ে থাকে। বিশেষ করে এহেন সময় চোরের উপদ্রব বাড়ে। আগলদারের কড়া পাহারা সত্ত্বেও কখনো কখনো কিছু ধান চুরি হয়ে যায়। আবার পেঁয়াজ, রসুন, শসা, ছোলাও চোরের নজর পড়ে। আগলদারেরা সতর্ক হয়। তাদের সাবধানে রাত কাটে। রাত জাগে। চৌকিদারের মতো উচ্চস্বরে হাঁক মারে। চৌর্যবৃত্তি কমে। ফসল চুরি হওয়া থেকে রক্ষা পায়। আগলদারির বিনিময়ে তারা শস্যের এক নির্দিষ্ট পরিমাণ অংশ পায়। ধানের মরশুমে তারা মাঠের একদিকে অস্থায়ী খামার গড়ে। সেখানে তারা তাদের প্রাপ্য ধান তোলে। ধান ঝাড়াই হয়। তারপর ভাগবাটোয়ারা হয়। চাষীরা খুশি হয়ে স্বল্প পরিমাণ অন্যান্য শস্যও তাদের দেয়।

১০) বিভিন্ন কার্যকলাপের সমাবেশ : মাঠও মিলনক্ষেত্র, কর্মক্ষেত্র, সাহিত্যক্ষেত্র

মাঠ শুধু চাষী,কৃষক বা মুনিষের বিচরণক্ষেত্র নয়। একটি মাঠ বিভিন্ন জনসমাবেশেরও মিলনক্ষেত্র হয়ে উঠে। ছোটো বড়ো মেলা মাঠে স্থাপন করা হয়। সেখানে মানুষে মানুষে মিলন হয়। জালসা বা ধর্মীয় অনুষ্ঠানের জন্য মাঠের ফাঁকা স্থানে বড়ো বড়ো প্যান্ডেল করা হয়। গ্রাম্য এলাকায় কোনো সিনেমা আর্টিস্ট বা নেতা-মন্ত্রী এলেও চোখধাঁধানো প্যান্ডেল করা হয়। ডাঙ্গা-ডহরে, দীঘি বা পুকুরপাড়ের গাছতলায় পিকনিক করা হয়। গ্রামের ছেলারা মাঠের ফাঁকা স্থানকেই অস্থায়ী খেলার মাঠ বানায়। মাঠের মধ্যেই পোল্ট্রি ফার্ম করে অনেকে অর্থোপার্জন করে। মাঠের মধ্যেই পাম্প মালিকদের এক কক্ষের পাকাবাড়ি নির্মিত হয়। অবশ্য ,কাঁচা বাড়িও দেখা যায়। মাঠের কোথাও দেখি কবরস্থান, কোথাও শ্মশান। আবার কোথাও দেখি, ঈদগাহ, দেখি মুখাগ্নি বেদী। বলতে ইচ্ছে হয়, “বাঁচার সাথেও মাঠ,মরার পরেও মাঠ।” নায়িকা অভিসারের সংকেতকুঞ্জ হিসেবে মাঠের নির্জন ঝোপঝাড়কেই নির্বাচন করে থাকে। কল্পনাপ্রবণ যাত্রীরা যাত্রাকালে মাঠবিলাসী হয়ে উঠে। শরীর জুত রাখতে অনেকে প্রাতঃভ্রমণ মেঠোপথেই সারে। শখ করে মেঠো হাওয়া খেতে যুবরা মাঠে যায়। সন্ধ্যার প্রাক্কালে আজও আড্ডা বসে মাঠের ধারে। মাঠের পুকুরে স্নান সারে চাষীরা। তারা কাদামাখা গোরু, মোষেরও গা ধোয়ায় মাঠের পুকুরেই।অনেক সময় চাষী, গোরু, মোষ, ছাগলেরা পিপাসা নিবারণ করে মাঠের পুকুরে বা ডোবায়। এই দীঘি বা পুকুরে মাছ চাষ করা হয়। মাছচাষীর সচ্ছলতায় সংসার চলে। ধীবর বা জেলে মাঠের পুকুরে, ডোবায়, খানাখন্দে, ক্যানেলে জাল ফেলে মাছ ধরে।অনেক সময় এভাবেই তার জীবিকা নির্বাহ হয়। অবাক করার বিষয় হল, মাঠেও বিক্রি-বাটা হয়। জমির শুকনো ধান গল্লা বা গোছ করার সময়। এসময় কেক, রুটি, জিলিপি বা বিভিন্ন মিষ্টি দ্রব্য নিয়ে মাঠে এক বিক্রেতার আবির্ভাব হয়। যাকে ,আমার এলাকায় গোস্তিওয়ালা বা সংক্ষেপে গোস্তি বলে। এসব বিক্রি হয় কেবল ধানের গল্লার বিনিময়ে। এক্ষেত্রে বিক্রেতা চাষীদের যাচ্ছেতাই ঠগায়। সে তার দ্রব্যমূল্যের দুই থেকে তিনগুণ আদায় করে। সে কয়েক দিনের বিক্রিতে কয়েক মাসের খাবার উসুল করে নেয়। মাঠে ব্যবসা করাও হয়।মাঠের অল্প উচ্চ পরিত্যক্ত ভূমিতে ইটভাটা করা হয়। ভাটা থেকে মালিক প্রচুর টাকা আয় করে। মাঠ ইতিহাসেও স্থান পেয়েছে। যেমন যুদ্ধের মাঠ ‘পলাশীর প্রান্তর’ আর শোকের মাঠ ‘কারবালার ময়দান’। মাঠকে নিয়ে আবার গ্রামবাংলায় কয়েকটি বাগধারাও তৈরি হয়েছে। যেমন মাঠময়দান (একদম ফাঁকা, শুন-শান), মাঠুন্যা (গেঁয়োলোক), ফাঁকা মাঠে গোল দেওয়া (বাধাহীন), মেঠোবাতাস (সুস্বাস্থ্যকর বায়ু) প্রভৃতি। মুষ্টিমেয় লেখকের সাহিত্যে মাঠ বর্ণিত হয়েছে।তবে সেটাও অতিসংক্ষিপ্ত ও অসম্পূর্ণ। নামসহ মাঠের সংক্ষিপ্ত রূপ বর্ণিত হয়েছে দু-একটি গল্প-উপন্যাসে। যেমন মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘পদ্মানদীর মাঝি’ উপন্যাসে দেখি ‘অন্নবাবার মাঠ’ আর সুবোধ ঘোষের ‘ফসিল’ গল্পে দেখি ‘অঞ্জনগড়ের মাঠ’, বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘শাবলতলার মাঠ’ গল্পে দেখি ‘শাবলতলার মাঠ’, জসীমউদ্দীনের ‘নকশী কাঁথার মাঠ’ কাব্যে দেখি ‘নকশী কাঁথার মাঠ’। আজকাল আধুনিক সভ্যতা সাহিত্যে আদরের সামগ্রী হয়ে উঠছে। অথচ প্রকৃতির মুক্তাঙ্গন অর্থাৎ মাঠ অবহেলিত হচ্ছে। শেষে দুটি লাইনই বলবো-
“তুমি যতই দেখাও অট্টালিকা, দেখাও সভ্যতার ঠাট।
আমার বাড়ির পাশে থাকবে, শুধু একটি মাঠ ।”

বুলচাঁদপুর, বীরভূম, ২-৩ এপ্রিল ২০২০
পশ্চিমবঙ্গ, ভারত