নিলয় ও তার চাচাতো ভাই মামুন, বাসের সিটে বসে আছে, নীড়ে ফেরার প্রয়োজনে। সামির ভাবছে প্রিয় কবিটাকে। সবুজ প্রিয় কবিটাকে। দারুন মানিয়েছে শাড়িটা। সবুজ শাড়ির বেগুনি আচলে সেজেছিল আজ পৃথিবীটা। বসন্তের কবিতার মাঠ। মায়াবতীর অবয়ব স্পর্শে ধন্য যেন সবুজ রং।
-ভাই অ ভাই, এখনো কিন্তু বললে না?
মামনের ডাকে ভাবনার শিকলটা ছিড়েগেল। নিলয় বলল, কী বলবো?
-ভাই তুমি দশ বছর পর বিদেশ থেকে বলা নেই কওয়া নেই হুট করে চলে এলে কাল রাতে। এসে-ই আজ সকালে ঢাকা চলে এসছো!
-হ, এসছি ত।
-কবিতা আড্ডাতো এখন মাসে কয়েকটাই হয়, ফেসবুক খুললে-ই-তো দেখা যায়, এ গ্রুপের আড্ডা, ও গ্রুপের আড্ডা।
-নিলয় বলল, হ ঠিকই বলছিস, আজকাল গ্রুপ আর গ্রুপ। কত গ্রুপে যে আমার আইডিটা এড করা, আল্লাই জানে, যে ই নতুন ফ্রেন্ড হচ্ছে, সে ই একটা না একটা গ্রুপে এড করছে।
-সপ্তাহ খানেক পর অন্য কোন আড্ডায়ও ত যেতে পারতে।
-পারতাম। তবে ঐ আড্ডাগুলোতে আমার প্রিয় কবিটা থাকবে না।
-সারাদিন কবিতা আড্ডায় তোমার সাথে ছিলাম, কিন্তু তোমার প্রিয় কবি কে, সে-টা তো দেখলাম না।

প্রিয় কবি’র সাথে দেখা হয়েছে, কথা হয়েছে, অটোগ্রাফও নেয়া হয়েছে।

কই। আমি তো দেখলাম না? যা দেখলাম, একটা অপরিচিত মেয়ের সাথে কথা বলেছ, অটোগ্রাফ নিয়েছ, ফুল দিয়েছ।

-এটাই আমার প্রিয় কবি।
-এইমেয়ে কবি, আবার তোমার প্রিয় কবি।
-হুম, এই মেয়ে কবি এবং আমার প্রিয় কবি, দেখতে ছোট মনে হলেও ওর কবিতা পড়লে মনে হবে, একজন পাঁকাপোক্ত কবি।

-তবে ভাই আমি কিন্তু একটা জিনিস লক্ষ করেছি?
-কি সে-টা?
-যখন তুমি বকুলফুল দিচ্ছিলে,শেষ বকুলটা ছাড়তে গিয়ে তুমি কিন্তু ইচ্ছেকরে মেয়েটার হাতে টাচ করেছ।
মামনের কথাশুনে নিলয় জানালার কাঁচের ওপাশের গাছপালার দিকে তাকিয়ে হাসছে!
-তোমার কবি কিন্তু লজ্জা পায়ছে! তবে; তোমার
প্রিয় কবিতো তোমাকে চিনে- নাই!

সুমিতার সাথে পরিচয় লগন থেকে আজ পর্যন্ত চ্যাটে যত কথা হয়েছ, সব কথপোকথন নিলয় তার ডায়রিতে তুলে রেখেছে। মামুনের কথা শুনে নিলয় ব্যাগ থেকে ডায়রিটা খুলে ওর হাতে দিয়ে বলল, এই নে, ডায়রির লেখাগুলো মন দিয়ে পড়। পড়লে বুঝতে পারবি, আমার কবি আমাকে চিনে কি না।

মামুন ডায়রির লেখাগুলো পড়তে থাকে, তিন পৃষ্ঠা পড়ার পরে জিজ্ঞাসা- ভাই, তোমার নামের সাথে যে বসন্ত লেখ, এই নাম তাহলে এই কবি আপার দেয়া?

-হুম, ওর সাথে এমন বসন্তে আমার প্রথম বন্ধুত্ব হয়।তাই কবি আমার নাম দিয়েছে বসন্ত।
-হ বুঝছি। তবে তুমি পরিচয় দিলে না কেন? আরে বোকা পরিচয় দিলেতো খেলাই শেষ।

মামুন আবার পড়তে থাকে,
-“কখনো কি আপনার সাথে দেখা হবে?”
-“পৃথিবী যখন গোল, আর দু’জন যেহেতু একই পথের যাত্রী, কোথাও দেখা হয়ে ও যেতে পারে।”
-“তাই। যদি কখনো দেখা হয় আমি আমার এ হাত থেকে আপনার ও হাতে এক মুঠো বকুল ফুল দেবো। কি নেবেন?”
-“ওকে, নেবো। বকুল আমার পছন্দ।”
-“কারো কাছ থেকে কি কখনো বকুল ফুল নিয়েছেন?”
“-না। এই প্রথম আপনি দিতে চায়লেন। আমিও নিতে রাজি হলাম।”

ও তাই! তাহলে তো আমি মহা ভাগ্যবান। তবে একটা অনুরুদ?”

-“কী?”

আমি ছাড়া অন্য কাহারো কাছ থেকে ততদিন, বকুল ফুল নিতে পারবেন না। যত দিন আমার ফুলগুলো আপনার হাত স্পর্স না করবে।

-“কেন?”
-“আমি দ্বিতীয় হতে চাই না,প্রথম হতে চাই।

ওকে,বন্ধু বসন্তকে কথা দিলাম, বসন্তছাড়া কারো কাছ থেকে অন্তত বকুল ফুল নেবো না।”

-“ধন্যবাদ কবি”
-ঠিক আছে।

-“আচ্ছা বকুল দিতে গিয়ে যদি আপনার হাতটা ধরে ফেলি, তাখলে কি করবেন?”

“জানি না;আমাদের এখানে বৃষ্টি হচ্ছে, ঝুম বৃষ্টি। লাইনে থাকুন, আমি জানালা দিয়ে বৃষ্টিতে হাত ভেজাবো, বৃষ্টির জল ছুঁতে আমার অনেক ভালো লাগে।”

-“ওকে তাহলে যান। আর হে আমার বৃষ্টি চাই যে, হাত বেয়ে ঝরে পড়া বৃষ্টি।”
-“বাহিরে হাত বাড়ান পেয়ে যাবেন।”
-“এই বৃষ্টিতো সরাসরি আকাশ থেকে পড়ছে, আমার যে, কারো হাত বেয়ে ঝরেপড়া জল চাই, যে হাতটা কোন কবির হাত।”

আবারো জিজ্ঞাসা, ভাই অ ভাই,
-বল শুনছি।
-আজকে যে দেখা হলো এ কথা কি তোমার কবিকে জানাবে না?
-জানাব।রাতে যখন চ্যাটাং হবে তখন।
-অ তাই।
এই বলে আবারো পড়ায় মন দিলো মামুন
-“এই।”
-“হুম।”
কেমন আছেন কবি। মনটা ভালো তো?
-“না। ভালো নেই।”
-“কেন, কি হয়েছে?”
-“জানি না।”
মন সে-ত মন-ই, ভালো থাকলেও মন খারাপ থাকলে ও মন।
-“হুম”।
-এই।”
-“কী।”
-বলছিলাম কী মনটা যেহেতু ভালো নেই তাহলে, আজ বিকেলে আপনার অসুস্থ মনটাকে আমাকে দু’ ঘন্টার জন্য ধার দিন।
-এ কি করে সম্ভব?
-ধরেন আপনি দিলেন, আমি নিলাম।
-ও তাই। মনটা দিয়ে কি করবেন?
-আপনার মনটাকে বুকপকেটে নিয়ে, সারাটা বিকেল ঘুরবো, আমার পছন্দের জায়গাগুলোতে।
-হা হা হা, আপনি কিন্তু হাসালেন!
-অ তাহলে আপনি হেসেছেন?
-কেন? আমার কি হাসতে মানা।
-না, তা নয়। তবে পরিচয় লগ্ন থেকে এপর্যন্ত যতবার-ই জানতে চেয়েছি একবারো বলে নি আপনি ভালো আছেন। শুধুই বলে গেলেন ভালো নেই, মন খারাপ।
-আপনি হেসেছেন যেনে ভালো লাগল। বেশি বেশি হাসবেন। বিষণ্ণতাগুলো কিছুটা হালকা হবে।
-হুম।
আবারো ডিস্টাব, ভাই, ও ভাই।
-ক শুনতাছি।
-ভাই মেয়েটার সাথে কি শুধু চ্যাটিং ই করো, ফোনে কথা হয় না?
-না।
-কথা বলো না কেন?
-সাহস পাইনা। ওর সাথে কথা বলার মত সাহস আমার নেই।
-এটা কোন কথা হলো ভাই। এই বলে আবারো পড়াতে থাকে।

-এই।
-কী।
-আপনার হাতটা একটু দিবেন?
-কেন? আমার হাত দিয়ে কি করবেন?
-একটু ছুঁয়ে দেখবো।
আজ কাল দেখছি আমার হাত ছোঁয়ার ইচ্ছেটা আপনার বেড়েই চলছে। এতোই যখন হাত ধরতে ইচ্ছে হয় তাহলে দেশে এসে বিয়ে করে বৌয়ের হাত ধরুন।
-আরে কবি, বিয়ে করলে তো ওটা হবে বউয়ের হাত, আমার বউ তো আর কবি হবে না। আমিতো ছুঁতে চাই কবির হাত। কবির হাত ছুঁয়ে দেখতে চাই আমার কল্পনা আর বাস্তবতার তফাৎ।
-আমি আপনার সাথে কোন দিনও দেখা করবো না।
-তাহলে আমার স্বপ্নের বুকুল ফুলগুলোর কি হবে?
-আপনার সাথে দেখাই হবে না। আর বকুল ফুলতো অনেক দূরের কথা।
-দেখা করবেন না কেন? আমার অপরাধ?
-আপনার ভাবনাগুলোতে পোকা ধরেছে, ছোঁয়াছুঁয়ির পোকা।
-এভাবে বলতে পারলেন?
-হুম পারলাম।
-একটা কথা।
-কী কথা?
-আমি যে করে-ই হোক, একদিন না একদিন আপনার হাত ছুঁব-ই, এটা আমার প্রতিজ্ঞা।
-আমিও প্রতিজ্ঞা করলাম, আপনার একমুঠো বকুল আমি কখনো নেবো না। আমার হাতও আপনাকে ছুঁতে দেবো না।