১৯৭৪ সালের ১৯ অক্টোবর। তারিখটার কথা আমার মনে আছে। কি বার ছিলো এখন আর মনে করতে পারবো না। সম্ভবত রোজার ঈদের পরের দিন। অক্টোবর মাসে শীত তেমন নামে না বাংলাদেশে- কিন্তু শীতের আমেজ থাকে। হেমন্তের আকাশ থাকে বিষণ্ন আলোতে ভরা- বাতাস প্রবল থাকে না। কিন্তু বাতাসে থাকে এক ধরনের শান্ত অবিচ্ছিন্ন সংলাপ। প্রায় সাধারণ সবকিছু। যেমন হয় যে কোনো অঘ্রাণের শেষ দিকে। চুয়াত্তর সালের ১৯ অক্টোবর অগ্রহয়ণ ছিলো কিনা মনে নেই তবে সকালটা ছিলো পরিচ্ছন্ন। আকাশে কিছু মেঘ ছিলো সম্ভবত আর ঢাকা শহরের উপরে ছিন্নবিছিন্ন সব ছায়া ছিলো সেই সকালের আলোতে মেশানো। সেই সকালে অক্টোবর মাসের উনিশ তারিখ ১৯৭৪ সালে, বেলা ন’টার দিকে আমার কাছে একটি ফোন এলো।
শামসুর রাহমানের ফোন।
ফজল, ফররুখ ভাই মারা গেছেন। ওর নিজের বাসায়- ইস্কাটনের সরকারি ফ্লাটে।
ফররুখ ভাই নানা অসুবিধায় আছেন সেটা জানতাম। কিন্তু ফররুখ ভাই অসুস্থ তেমনটি শুনিনি।
শামসুর রাহমান শুধালেন, আপনি কি বাসাটা চেনেন ?
না, আমি যাইনি কোনোদিন সে বাসায়।
ফ্লাটের নম্বরটা লিখে নেন। দোতলায়। হলি ফ্যামিলি হাসপাতালের উল্টোদিকে। আমি সেখানে যাচ্ছি সাড়ে ন’টা থেকে দশটার মধ্যেই। আপনি চলে আসেন।
রিসিভার রেখে দিলেন শামসুর রাহমান।
আর আমি। আমি মনে হয় বলতে থাকলাম হায় একী হলো। এ কেমন হলো। আমি হাত থেকে রিসিভারটা রাখলাম আর বসে পড়লাম- বিছানার উপর- বসে থাকলাম। বেশ কিছুক্ষণ শুধু বসে থাকলাম।
আমাদের বাসাবোর বাড়িটা সেই সময় একটা গ্রামের বাড়ি ছিলো- বাড়ি থেকে বেরুনোর সময় আমরা বলতাম শহরে যাচ্ছি। এক বিঘা জমির উপর একটা বড় টিনের ঘর। কয়েকটা নারকেল গাছ, আমগাছ নতুন করে লাগানো। চারদিকে খোলামেলা। আমাদের বাড়ি থেকে সরাসরি তখন দেখা যেতো যাত্রাবাড়ির মোড়- মাঝে মাঝে গাড়ি যাচ্ছে মাঝে মাঝে রিকশা। কখনও কখনও বাতাস চলে আসতো যাত্রাবাড়ির মোড় থেকে আমাদের নারকেল গাছের পাতায় আম গাছের ডালে।
আমি আমাদের ঘরের জানালা দিয়ে তাকাতে চেষ্টা করলাম বিস্তীর্ণ সেই ক্ষেত আর গ্রামের দিকে। আমরা এ এলাকার বাসিন্দা দীর্ঘদিন ধরে। আগে ছিলাম কমলাপুরে। কমলাপুরে ছিলো দুই ভাগে ভাগ করা- কায়েৎপাড়া আর ঠাকুরপাড়া। আর ছিলো কমলাপুরের নতুন নির্মাণ কমলাপুরের নতুন অংশ কমলাপুর বাজার।
আমরা থাকতাম কমলাপুর কায়েৎপাড়ায়- চাকলাদার বাড়িতে।
ফররুখ ভাই থাকতেন কমলাপুর বাজারের কাছে।
একটা মোটামুটি বড় টিনের ঘরে।
সেই টিনের ঘরে আমি বহুবার গেছি। আমাকে শোনাতেন ‘হাতেমতাই’ গ্রন্থ থেকে- অর্থাৎ হাতেমতাই-এর পান্ডুলিটি থেকে। দশবছর সময়টা তো খুব কম নয়। কতোবার গেছি কতো যে শুনেছি, কোনো কোনোদিন আমরা চলে যেতাম ছান্দার মাঠে- অপরাহ্নের ছায়ায়।
ফররুখ ভাই-এর মৃত্যু সংবাদ আমাকে যে অগোছালো অবস্থায় এনে দিল তা থেকে স্থিত হওয়ার চেষ্টা হয়তো করছিলাম মনে মনে। ছান্দার মাঠে হাঁটতে হাঁটতে ফররুখ ভাই-এর সঙ্গে কবি আর কবিতা নিয়ে কতো যে কথা বলেছি একদিন। মনে মনে ভাবছিলাম সেইসব দিনগুলির কথা। রবীন্দ্রনাথ মাইকেল নজরুল আর ইরানি কবিদের কথা। বিশেষ করে ফেরদৌসীর কথা। মহাকাব্যের কথা।
এমনি সময় আমার কাছে এলো মীরা- আমার স্ত্রী। বয়স দুয়েক হলো আমাদের বিয়ে হয়েছে। শুধালো, কী ব্যাপার চুপচাপ বসে আছো যে। মন খারাপ নাকি।
বললাম, কবি ফররুখ আহমদ মারা গেছেন।
মাই গড- কী হয়েছিলো ওনার। শরীর খারাপ তো শুনিনি।
বললাম, শরীর খারাপ ছিলো সে কথা আমিও শুনিনি। শরীর খারাপ ছিলো না। তাহলে ?
শুধু মারা গেছেন।
মীরা জানতো ফররুখ ভাই- এর সঙ্গে আমার ঘনিষ্ঠতার কথা। সম্ভবত বুঝতে পেরেছিল আমি আক্রান্ত।
বললো, তোমাকে সংবাদটা দিলো কে ?
শামসুর রাহমান।
তুমি কি যাচ্ছ সেখানে ?
বললাম হ্যাঁ, আমি এক্ষুনি যাচ্ছি। শামসুর রাহমান আসবেন সেখানে দশটার মধ্যে।
মীরা আমার দিকে তাকালো, বললো, নয়টা তো বেজে গেছে।
সেইদিন সকাল দশটার আগেই আমি ইস্কাটন পৌঁছে গিয়েছিলাম।
দেখলাম, শামসুর রাহমান এসে গেছেন সেখানে।
অনেক ভিড় ফ্লাটের নিচে সবুজ মাঠটাতে।
আমরা সিঁড়ি বেয়ে উপরে গেলাম- আমি আর শামসুর রাহমান।
নিচে যত ভিড় দেখলাম উপরে ফ্লাটের ছ্ট্টো বসার ঘরটাতে ভিড় তার চেয়ে অনেক বেশি। প্রায় ঠাসা। এই এতোদিন পরে ভালো করে কিছুই মনে করতে পারবো না। তবে হুদা ভাই- মানে শামসুল হুদা চৌধুরী, তালিম ভাই- মানে কবি তালিম হোসেন, কবি বেনজীর আহমদ, তখনকার গানের জগতের অনেক শিল্পী আর সুরকার- যেমন আহাদ ভাই- মানে আবদুল আহাদ, আবদুল হালিম চৌধুরী, সোহরাব হোসেন, বেদার উদ্দিন এদের দেখেছি বলে মনে হয়। রেডিওর অনেক সহকর্মী এবং সাংবাদিকও ছিলেন। আর ছিলেন যে সময়কার উচ্চপদস্থ আমলারাও।
এতোদিন পরে সবকিছুই কেমন অস্পষ্ট হয়ে এসেছে।
তবে সেই দিনের সেই সকালে একটি ঘটনাকে আমরা প্রত্যক্ষ করেছিলাম অনেকেই।
হুদা ভাই শামসুর রাহমান তরিকুল (তরিকুল আলম শামসুর রাহমানের ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন, কবিতা লিখতেন- যার স্ত্রী ছিলেন বিখ্যাত ক্লাসিক্যাল গায়িকা আভা আলম) আমি এবং সম্ভবত দৈনিক পাকিস্তানের সহকারী সম্পাদক সানাউল্লাহ নূরী ঘরের একপাশে বসেছিলাম। ঘর মানে ফ্লাটের বসার ঘর। কেউ আমরা তেমন কথা বলছি না- কেমন যেন একটা ভাঙা ভাঙা নিস্তব্ধতা সেখানে। ভেতরে কান্নার শব্দও ক্রমশ স্থিত হয়ে আসছে।
এমনি সময় কে যেন একজন এলো ঘরের ভেতর থেকে।
বললো, হুদা ভাই।
হুদা ভাই ফিরে তাকালেন সেই লোকটির দিকে। যেন বলতে চাইলেন, কী ব্যাপার।
লোকটি বললো, একটা আতরের শিশি লাগবে- আতর আনা হয়নি।
হুদা ভাই বললেন, আচ্ছা আমি দেখছি কাউকে পাঠিয়ে আনানো যায় কিনা।
কার একটা নাম যেন বললেন ও আসুক।
এরপর ঘরে আবার সেই ভাঙা ভাঙা নিস্তব্ধতা।
অদ্ভুত এক ঘটনা ঘটলো ঠিক সেই সময়। প্রায় অসম্ভব প্রায় অলৌকিক।
সেই প্রায় নিঃশব্দ ঘরের দরোজায় কে যেন বাইরে থেকে কড়া নাড়ালো।
একবার দুইবার।
হুদা ভাই বিরক্ত হয়েছেন সেটা তার চেহারা দেখেই বোঝা গেল- রেডিওর একজনকে বললেন দেখতো লোকটা কে ?
মধ্যবয়েসী একটা লোক। লম্বা পাঞ্জাবি পায়জামা পরা- মস্তকে সম্ভবত একটা টুপি কিংবা ক্ষুদ্রকার একটি পাগড়ি। মুখে অল্প দাড়ি।
দরোজা খুলতেই- লোকটা বললো, বেশ সংযত বলিষ্ঠ কন্ঠে- বললো, আসসালাম আলাইকুম। এইটা কি কবি ফররুখ আহমদ সাহেবের বাসা। আমি বাগদাদ শরীফ-এর বড় পীর সাহেবের মাজার থাইকা আসছি- আমি ওইখানেই থাকি। কবি সাহেবের জন্যে দুইটা আতরের শিশি আনছি। ওনার এক বন্ধু ভক্ত দিছেন। উনি কেমন আছেন ?
মনে আছে লোকটার কথা শুনে হুদা ভাই উঠে গিয়েছিলেন দরোজার কাছে। সেই লোটার হাত থেকে আতরের শিশিগুলি নিয়ে বলেছিলেন, শুকরিয়া কবি সাহেবের শরীর ভালো নেই।
আরও কী যেন বলেছিলের হুদা ভাই এবং লোকটা চলে গিয়েছিল।
ঘরের ভেতরে অদ্ভুত এর নিস্তব্ধতা নেমে এসেছিলো। একী ঘটলো আমাদের চোখের সামনে।
আমাদের কারো মুখে কোনো কথা নেই। শামসুর রাহমান আমি হুদা ভাই আহাদ ভাই বেনজীর আহমদ নূরী সবাই যেন হঠাৎ একটি বিস্ময়ের মধ্যে নিক্ষিপ্ত। এ কেমন করে সম্ভব। কোনো এক বন্ধু ভক্ত আতরের শিশি পাঠিয়ে দিয়েছে সেই বাগদাদের বড় পীরের মাজার থেকে। সঠিক দিনে যথামুহূর্তে। আমরা কেউ কিছু বলতে পারলাম না। সেই একটা লোক আতরের শিশিগুলি নিয়ে গেলো ভেতরে। কবির লাশের জন্যে।
আমার মনে হলো ফররুখ ভাই, বেঁচে থাকলে বলতেন, শেকসপিয়র থেকে নিয়ে are more thinks in heaven and earth horatio যা তোমাদের ডিকশেনারিতে লিপিবদ্ধ নেই।
মনে হল আমার এই পৃথিবীতে কতো যে ঘটনা ঘটে লৌকিক অলৌকিক কতো যে ফুল ফোটে কতো বর্ণে কতো রঙে কতো যে উল্লাসে, কতো পাখি গান গায়। কোথাও বৃষ্টি নামে কোথাও রৌদ্র খেলা করে।
আমরা তার কিছুই বুঝতে পারি না।
সেইদিন জোহরের নামাজের সময় লাশ নিয়ে ইস্কাটন মসজিদের যাওয়ার কথা জানাজার জন্যে। ফররুখ ভাই-এর শবদেহ নামানো হল দোতলা থেকে নিচে। হঠাৎ কবি বেনজীর আহমদের উত্তেজিত কন্ঠে শোনা গেলো।
কাউকেই কিছু করতে হবে না। আমার ফররুখকে আমি আমার বাড়িতেই নিয়ে যাব।
কিছু তর্ক বিতর্কেরও শব্দ পাওয়া গেল।
অল্পক্ষণের মধ্যেই জানা গেলো ফররুখ ভাইকে কবি বেনজীর আহমদ-এর শাজাহানপুরের বাড়িতেই সমাধিস্থ করা হবে।
এবং পরে তাই হয়েছে। সেখানেই তার সমাধি তার মাজার।
বহুদিন পরে শুনেছি, শুনেছি সেদিনকার তর্ক-বিতর্কের সূত্রপাত হয়েছিলো ফররুখ ভাইকে কবর দেয়ার প্রসঙ্গটি নিয়েই। কথা হয়েছিল তাকে বনানী গোরস্তানে কবর দেয়া হবে। কিন্তু সরকারি পক্ষের কারা কারা যেন সেটা হতে দেয়নি। তাদের যুক্তি আর দাবি ছিলো যত বড় কবিই হোক না কেন তারা একজন রাজাকারকে সরকারি গোরস্তানে স্থান দিতে পারেনা এবং দেননি। এই ঘটনা সত্যি হলে এর পক্ষে বা বিপক্ষে কারোই কিছু বলা ঠিক হবে না। শুধু বাহাদুর শাহ জাফরের অমর পঙ্ক্তিগুলো একটু এদিক ওদিক করে আমরা উচ্চারণ করতে পারি। -এ্যাতনা হ্যায় বদনাম ফররুখ কী দাফন কে লিয়ে দু’গজ সরকারি জমিন ভী না মিলি ঢাকা শহরমে।
এবং মাঝে মাঝে জানতে ইচ্ছা করে আসলেই ফররুখ ভাই কতটুকু পাকিস্তানি ছিলেন। এবং তার পাকিস্তানি হওয়াটা কতটুকু অপরাধের।
আমার জ্ঞানমতে কবি ফররুখ আহমদ কখনোই পশ্চিম পাকিস্তান নামক ভূখন্ডে যাননি। তার ব্যক্তিগত শহর ছিল কোলকাতা এবং ঢাকা।
কবিতা রচনা এবং একজন সৎ কবি হিসেবে বেড়ে ওঠেন এবং অচিন্তনীয় পরিণতি অর্জন করেন এই দুই শহরেই। ‘পাকিস্তান রাইটার্স গিল্ড’ নামে একটি সংস্থা সারা পাকিস্তানের লেখকদের নিয়ে গঠিত হয়েছিলো আইয়ুবের আমলে যার প্রধান স্থপতি ছিলেন কুদরতউল্লাহ শাহাব। উর্দূ ভাষায় বড় মাপের লেখক। আমাদের কবি গোলাম মোস্তফা ছিলেন রাইটার্স গিল্ডের সেন্ট্রাল কমিটির সদস্য। পরবর্তীকালে ছিলেন কবি আবুল হোসেন এবং কবি শামসুর রাহমান। কবি হাসান হাফিজুর রহমান আর আমি দু’জনে মিলে ঢাকায় এই রাইটার্স গিল্ডের পক্ষ থেকেই পাঁচ দিনব্যাপী একটি মহাকবি স্মরণোৎসব করেছিলাম। ঢাকার ইঞ্জিনিয়ার ইন্সটিটিউটে। সম্ভবত পাঁচজন কবি ছিলেন মীর্জা গালিব, আল্লামা ইকবাল, মাইকেল মধুসূদন, রবীন্দ্রনাথ আর নজরুল। হাসানকে তখন পূর্ব পাকিস্তানে গিল্ডের সেক্রেটারি নির্বাচিত করা হয়- আর আমি ছিলাম হাসানের নিশান বরদার- আমি রাইটার্স গিল্ডে চান্স পাইনি।
কবি ফররুখ আহমদ- গিল্ডের আশপাশে তাকে অন্তত আমি দেখিনি।
একটি কথা শুধু আমি জানি- ১৯৪৬ সালে একটি সুষ্ঠু ও সৎ গণভোটের মাধ্যমে আমরা পূর্ব বাঙলার বাঙালি মুসলমানেরা পাকিস্তান নামক একটি রাষ্ট্রের পূর্বাঞ্চল হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেছিলাম- একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে। সেটা আমরা নিজেদের প্রয়োজনে ঐতিহাসিক কারণেই করেছিলাম। এবং পরে নিজেদের প্রয়োজনে, সত্যিকার স্বাধীনতা অর্জন এবং বাঙালির জন্যে একটি নতুন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার কারণে আমরা পাকিস্তানকে ফেলে দিয়েছিলাম। স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের জন্যে মাঝখানে একটি পূর্ব পাকিস্তানের প্রয়োজন। নইলে ইন্দিরা গান্ধী ভারত ভূমি কর্তন করে আমাদের জন্যে বাংলাদেশ ছেড়ে দিতেন না। আসল কথা হল আজকের বাংলাদেশের আমরা সবাই একসময় অখন্ডিত বঙ্গদেশের বাসিন্দা ছিলাম, খন্ডিত পূর্ব পাকিস্তানের নাগরিক ছিলাম এবং এখন আমরা বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রটির বাসিন্দা। সবকিছুই আমরা নিজেরা করেছি- আমাদের প্রয়োজনে- ঐতিহাসিক কারণে। আমরা সবাই এই প্রক্রিয়ার অংশ অঙ্গ এবং যোদ্ধা।
এবং কবি ফররুখ আহমদ আমাদের মতোই একজন ছিলেন। একজন সৎ বাঙালি একজন সৎ মানুষ এবং সবার উপরে একজন সৎ ও মহৎ কবি।
ফররুখ ভাই- এর সঙ্গে ছান্দার মাঠে অনেক হেঁটেছি। এই পদভ্রমণের সময় আমরা অনেক অনেক কথা বলতাম। এবং বেশিরভাগে কথা কবিতা নিয়ে কবিদের নিয়ে। মাইকেল আর রবীন্দ্রনাথ আর নজরুল থেকে মুখস্থ আবৃত্তি করতেন ফররুখ ভাই- বেশি করতেন মাইকেল থেকে।
মাঝে মাঝে শেকসপিয়র থেকে আর টিএস এলিয়ট থেকে আবৃত্তি করতেন।
প্রথম তার কন্ঠে শেকসপিয়র শুনে আমি ভিষণ অবাক হয়েছিলাম। অনেকের মতো তখন আমারও ধারণা ছিলো ইংরেজি এবং ইউরোপীয় কবিতা সম্পর্কে ফররুখ ভাই- এর অনুশীলন সীমিত।
একটা কথা বলে রাখি আর যাই থাকুক না কেন কবি ফররুখ আহমদ বাংলাদেশের চলতি অর্থে কখনোই মোল্লা ছিলেন না। তিনি ছিলেন সত্যিকার অর্থেই একজন আধুনিক মানুষ। আর কবি ছিলেন এমন একটি জগতের যাকে বাংলা কবিতায় সম্পূর্ণ নতুন এক পরিমন্ডল বলে আমি শনাক্ত করতে চাই। সেই আরব্য উপন্যাসের সিন্দাবাদের জগত যেখানে সমুদ্র থেকে সমুদ্রের ঘোরে দরিয়ার শাদা তাজী- যেখানে সিন্ধু ঈগল পাড়ি দেয় পাশে যেন উত্তাল রাত- যে ঈগলের তনু তুফানের ছাঁচে ঘূর্ণাবর্তে সুগঠিত- যেখানে দীর্ঘছন্দা নারিকেল শাখে মুক্তি উঠিছে বাজি- সরন্দ্বীপের তীরে তীরে যেথা পাখিরা ধরেছে গান- এ জগত আধুনিক বাংলা কবিতার যারা সৎ পাঠক, তাদের কাছে এক বিস্ময়কার চমক এক অবিশ্বাস্য স্বপ্নলোকের একান্ত উন্মোচন।
আমার বলতে দ্বিধা নেই আমি ফররুখ আহমদের এই সমুদ্র মন্থিত স্বপ্ন মুখরিত আবর্তে আবর্তে দিশেহারা পাখি আর হাওয়া আর গজল দ্বারা প্রবলভাবে আক্রান্ত হয়েছিলাম। তাকে একদিন বলেছিলাম, ফররুখ ভাই আপনার কবিতাকে আপনি যে জগতে নির্মাণ করেছেন একবার পৌঁছে গেলে পাঠককে পাগল হতেই হবে।
ফররুখ ভাইকে বলতাম, আপনি আধুনিক বাংলা কবিতার এক অসামান্য একাকী সিন্দাবাদ।
কী সহজে আপনি বলতে পারেন, আফতাব ঘোরে মাথার উপরে মাহতাব ফেলে দাগ- উচ্চারণ করতে পারেন, কেটেছে রঙিন মখমল দিন নোনা দরিয়ার ডাক, নতুন পানিতে সফর এবার হে মাঝি সিন্দাবাদ।
ফররুখ আহমদকে আমি মনে করি আধুনিক বাংলা কবিতার এক অসামান্য নির্মাণ শিল্পী রূপকার। তিনি সমুদ্রের কবি দরিয়ার বিরল চিত্রকার।
বাংলা কবিতার চল্লিশ দশকের সর্বশ্রেষ্ঠ কবি।
আমি কবি সুভাষ মুখোপধ্যায়কে তার ঘনিষ্ঠ বন্ধু কবি ফররুখ আহমদ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করেছিলাম- জানতে চেয়েছিলাম কোলকাতায় ওদের বন্ধুদিনগুলোর কথা। সুভাষদা শুধু বলেছিলেন- ফররুখ অনেক বড় মাপের কবি।
মুক্তিযুদ্ধের পর ঢাকায় এসে সুভাষদা যার সঙ্গে প্রথম দেখা করতে চেয়েছিলেন তিনি কবি ফররুখ আহমদ।
কবি আবদুল গনি হাজারী সুভাষদাকে নিয়ে গিয়েছিলেন ফররুখ ভাইর কাছে। আমার পরম শ্রদ্ধেয় এককালের সাংবাদিক রহিম উদ্দীন সিদ্দিকী একদিন আমাকে আর শামসুর রাহমানকে বলেছিলেন, ফররুখের চোখের দিকে তাকিয়ে দেখেছো কোনোদিন- ফররুখের চোখের সঙ্গে ঈগলের চোখের যেন কোথায় একটা মিল আছে।
এতোদিন পরে আমার মনে হয় কথাটা হয়তো ঠিক। ফররুখ ভাই- এর জন্যে ঈগল পাখি ছাড়া অন্য পক্ষীর কথা আমি ভাবতেও পারি না। মাল্লা দরিয়া কিশতী আসমান নোনাপানি অফুরান জিন্দিগী, হারামী মহ্রত আর শাহের জাদীর সঙ্গে মিতালীর জন্যে সিন্ধু ঈগলের একান্ত প্রয়োজন।
তাই তো অনায়াসে এই একাকী সিন্দাবাদ যেতে পারেন জানতে পারি আমরা এখন নতুন দিনের যাত্রী। নতুন পানিতে সফর এবার হে মাঝি সিন্দাবাদ।