রাজারবাগ পুলিশ লাইনে পাক সেনারা অতর্কিতভাবে হামলা চালিয়েছে। হতাহতের ঘটনাও ঘটেছে। মুহূর্তের মধ্যেই বিদ্যুত গতিতে চারদিকে এখবর ছড়িয়ে পড়েছে। এই নিয়ে চারদিকে ভীতিকর পরিবেশ বিরাজমান। এই অশান্ত পরিবেশ এখনো মাহিন ঘরে ফেরেনি। বাবা হারা ছেলেটার জন্য মা দুঃচিন্তায় পানি পর্যন্ত গিলতে পারছেন না। মনে মনে ভাগ্যটাকে ধিক্কার দিচ্ছেন বিধবা সালমা বেগম। আজ থেকে আঠারো বছর আগে তাদের গাঁয়ের নিরীহ সুন্দর সুঠাম দেহের শক্তিমান এক ছেলে সালামত আলীর সাথে তাকে বিয়ে দিয়ে ছিলেন বাবা। বিয়ের পরের বছরই কুল জুড়ে আসে আদুরে মানিকধন মাহিন। খুব সুন্দর ছিম ছাম সাজানো সংসারে হঠাৎ মেঘের কালো ছায়া নেমে আসে। মাহিনের এক বছর হতে না হতেই ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়ে মারা যান মাহিনের বাবা। কোনো চিকিৎসা করার উপায় ছিলনা। গ্রামাঞ্চলে ডাক্তার ছিলোনা, শহরের সাথে যোগাযোগ ব্যাবস্থা ছিলোনা। গাঁয়ের মানুষ সুবিধাবাদী কিছু কবিরাজ, ফকির, ওঝার স্মরনাপন্ন হয়ে ভুল চিকিৎসা নিতো। মাহিনের বাবার বেলায় তাও নেয়া সম্ভব হয়নি। কারন রাত দুটোর দিকে তিনি অসুস্থ হোন, এতরাতে কাউকে ডেকে পাওয়াও মুশকিল , তাই সকাল পর্যন্ত অপেক্ষা করা ছাড়া কোনো উপায় ছিলো না। কিন্তু সকাল পর্যন্ত অপেক্ষা তার দ্বারা হয়নি ফজরের আগমুহূর্তে তিনি ইহলোক ত্যাগ করেন। এরপর গত এক যুগেরও বেশি সময় খেয়ে না খেয়ে ছেলেটার মুখের দিকে চেয়ে গাঁয়েই পার করেছেন সালমা বেগম। দু চার বার সম্বন্দও এসেছিলো। কিন্তু ছেলের কথা ভেবে তিনি রাজি হননি।

গত ককয়েকটি বছর ধরে গাঁয়ে খুব অভাব চলছিলো। দুঃখজনক সত্য যে পশ্চিম পাকিস্তানের শাসকেররা সামান্যও নজর দেননি পূর্ব পাকিস্তানের এসব প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলের দিকে। অসহায় সালমা বেগম ছেলের কথা চিন্তা করে একবেলা একমুঠো খবারের আশায় গত দু’ তিন বছর হতে ঢাকায় থিতু হয়েছেন। গত নির্বাচনে নৌকা মার্কায় ভোট দেয়ার জন্য মাঝখানে একবার গাঁয়ে যাওয়া হয়েছিল।এরপর আর যাওয়া হয়নি। নৌকা মার্কা জিতলেও পশ্চিম পাকিস্তানিরা ক্ষমতা না দিয়ে আজ উল্টো রাজারবাগে হামলা চালিয়েছে। যেখানে যে দেশের পুলিশের উপর হামলা হয় সেখানে সাধারণ মানুষের কতটা সুরক্ষা আছে তা সহযেই অনুমেয়। সালমা বেগম আকুল হয়ে এসব ভাবছেন। রাত গভীর হয়ে গেছে মাহিন এখনো ফিরেনি। সাত মার্চের মুজিবুর রহমানের ভাষণ শুনে এসে মাহিন যা বলেছে সে অনুযায়ী মাহিনের ঘরে ফেরার কথা নয়। মায়ের মন বলে কথা, কত কিছুই যে ভাবনায় আসছে তা বলে শেষ করবার মতো নয়।

মাহিন সত্যিই সেদিন বাসায় ফেরেননি। দেশের এমন অবস্থা দেখে মাহিন গোপনে চলে গেছে মুজিব আদর্শবাদীদের সহযোদ্ধা হয়ে। মাকে বলে যাওয়ার সময় পর্যন্ত সে পায়নি। দেশ মাতার সম্মান বাঁচাতে নিজের মাকে সঁপে দিয়ে গেছেন বিধাতার হাতে।

রাত দুটোর দিকে ছেলের মায়ায় মাহিনের মা রাস্তায় বেরিয়ে পড়লেন। রাজারবাগের প্রতিটি এলাকা খুঁজে দেখলেন ছেলেকে কোথাও পেলেননা তিনি। রাস্তায় এদিক ওদিক পড়ে থাকতে দেখলেন বিস্তর সংখ্যক লাশ। প্রতিটি লাশের মুখেই সালমা বেগম ছেলের মুখের প্রতিচ্ছবি দেখতে পেলেন। তার মাথা ঘুরে গেলো, নিজেকে আর নিয়ন্ত্রণ করতে পারলেন না তিনি। নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে পড়ে গেলেন রাস্তার পাশের এক নর্দমায়। এরপর আর ফেরা হয়নি এ দুঃখিনী মায়ের। লাশটার কি গতি হয়েছিলো সে খবরও আর জানা যায়নি। মাহিনেরও জানা হয়নি মা’র এমন মর্মান্তিক অবস্থা।

দেশমায়ের টানে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিয়ে অনেক গুলো সম্মুখ যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করেছিলো কিশোর মাহিন। এরপর হয়তো কোন এক শেষ যুদ্ধে তিনিও শহিদ হয়ে আমাদের দিয়ে গেছেন স্বপ্নের স্বাধীনতা।