বাঙালি মুসলমানের মাঝে রাজনীতি ও খেলাফত নিয়ে ধারণা নানা মাত্রায় বিভাজিত হয়ে আছে। সিয়াসত নাজায়েজ বলে যারা জিগির তুলেছিল, তাদেরই এখন দেখা যায় হেফাজতে ইসলামের ছায়ায় কিংবা চরমোনায় পীরের নেতৃত্বে কায়েমী রাষ্ট্র ও রাষ্ট্রযন্ত্রের সাথে নানা মাত্রার সখ্যতা। ফলশ্রুতিতে যা হওয়ার তা- সামাজিক নেতৃত্বের ব্যর্থতায়, ধর্মীয় নেতৃত্বের বিভ্রান্তিতে, শিক্ষিত বাঙালি মুসলিম তরুণ প্রজন্ম এখন রাজনীতি বিমুখ। আর সামাজিক অবস্থা গ্রীক দার্শনিক প্লেটোর মন্তব্যের মতোই-
‘রাজনীতিতে অংশগ্রহণ না করার শাস্তি হচ্ছে নিজের তুলনায় নিকৃষ্টদের দিয়ে শাসিত হওয়া।’ (প্লেটো)।
বিশ্ব ব্যবস্থাপনায় যে দিকেই তাকানো হোক না কেনো, দেশ কাল সময়ের প্রেক্ষিতে সবখানে তুলনামুলক অবস্থা এমনই। অন্যদিকে আধুনিক গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাপনা, নাকি রাজতন্ত্র কোনটাতে তারা ছুটবে এটা নিয়ে দিক বিদিক। অথচ রাষ্ট্র পরিচালনা নিয়ে আল ফারাবি থেকে ইবনে খালদুন, শাহ ওয়ালীউল্লাহ, এর পর সাইয়েদ আবুল আলা থেকে সাম্প্রতিক সময়ের ড.কারযাবি ও ড.তারিক রামাদানের চিন্তাদর্শনগুলো কত বেশী সময় ঘনিষ্ট তার খোঁজ চলছে না বাঙালি মুসলিম শিক্ষিত সমাজে। এটাই এখন জাতিগত আমাদের রাজনৈতিক চিন্তন পরিস্থিতি। সম্প্রতি তরুণ গবেষক বোরহান উদ্দিন খেলাফত চিন্তার ধারণাকে সারৎসার করেছে এভাবে-
‘আমরা যদি ইসলামে রাজনৈতিক দর্শনের ইতিহাসের দিকে তাকাই তাহলে দেখতে পাই যে, রাজনীতি বা সিয়াসাত শব্দের সর্বপ্রথম ব্যবহার করেন বিখ্যাত দার্শনিক আবু নসর আল ফারাবী (রহঃ) তার বিখ্যাত বই আল মাদিনাতুল ফাদিলাহ এবং আস-সিয়াসাতুল মাদানিয়্যা নামক গ্রন্থদ্বয়ে। তার পরে ইসলামী রাষ্ট্রবিজ্ঞানকে সবচেয়ে বিস্তারিতভাবে তুলে ধরেন আল মাওয়ারদী (রহঃ ) তার বিখ্যাতগ্রন্থ ‘ আহকামুস সুলতানিয়া’ তে। তার এই বইকে আংশিক ও অপর্যাপ্ত আখ্যাদিয়ে ইসলামী সভ্যতার ইতিহাসে রাজনৈতিক দর্শনের উপর সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ গ্রন্থ রচনা করেন ইমাম গাজ্জালীর উস্তাজ, বিখ্যাত মুতাকাল্লিম ইমাম জুয়াইনী (রহঃ)। তার সেই কালজয়ী গ্রন্থের নাম হল غياث الأمم في التياث الظلم ।

তাদের পরে ইমাম ইবনে তাইমিয়া (রহঃ) রচনা করেন আস-সিয়াসাতুশ শারইয়্যাহ। এবং এই সকল আলেম ও দার্শনিকদের পরে ইসলামে রাজনীতি কেমন হবে এটাকে পরিপূর্ণভাবে তুলে ধরেন ইবনে খালদান তার الدائرة السياسة ( দায়েরাতুস সিয়াসাত) নামক বৃত্তের মাধ্যমে। এখানে তিনি বলেন ‘الدولة سلطان (আদ-দাওলাতু সুলতানুন) অর্থাৎ রাষ্ট্র হল একটি শক্তির নাম, تحيا به السنة (তাহিয়া বিহি আস সুন্নাহ) আর সুন্নাহ এই রাষ্ট্রের মাধ্যমে বেঁচে থাকে।

এখানে ইবনে খালদুন তুলে ধরেছেন যে, সুন্নত রাষ্ট্রের মাধ্যমে বেঁচে থাকে। ভালো করে খেয়াল করুন এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ ‘রাষ্ট্র বিহীন সুন্নাহ বেঁচে থাকতে পারে না’। কারণ রাসূলে আকরাম (সঃ) জনপদ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গুহায় বসবাস কারী কোন ব্যক্তি ছিলেন না কিংবা মসজিদে নববীতে বসে শুধুমাত্র ওয়াজ নসিহত করেননি। তিনি একটি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেছিলেন এবং সেই রাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতি ছিলেন তিনি নিজে!

এই জন্যই ইবনে খালদুন এইভাবে তুলে ধরেছেন, যে রাষ্ট্র ছাড়া সুন্নত তার ধারাবাহিকতা রক্ষা করতে পারবে না। কারণ রাষ্ট্র না থাকলে সুন্নত শুধুমাত্র ব্যক্তিগত জীবনের মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়বে। অথচ সুন্নত শুধুমাত্র আমাদের ব্যক্তিজীবনকেই প্রভাবিত করে না, সামগ্রিকভাবে সমগ্র সমাজ ও রাষ্ট্র ব্যবস্থাকে প্রভাবিত করে। আর সেটা কেবলমাত্র রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মাধ্যমেই হতে পারে। ইবনে খালদুন এখানে সুন্নাহর একটি অসাধারণ ধারণা প্রদান করেছেন। আমরা সুন্নত বলতে কি বুঝি? সুন্নত বলতে শুধুমাত্র কিছু আনুষ্ঠানিকতা বুঝে থাকি। অপরদিকে ইবনে খালদুন সুন্নতকে সমাজের একটি নিজাম (ব্যবস্থা) হিসেবে দেখে থাকেন। এর তিনি সুন্নত কি এর উত্তর দিতে গিয়ে বলেন, السنة سياسة (আস-সুন্নাতু সিয়াসাতুন)। চিন্তা করুন কত অসাধারণ ও বড় একটি কথা! তিনি বলেন, সুন্নত হল সিয়াসাতুন বা রাজনীতি!

আমরা সুন্নতের নামে কি শিখি আর ইসলামী চিন্তা দর্শনের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় চিন্তাবিদ ইবনে খালদুন সুন্নতকে কিভাবে দেখেন? সুন্নতের এমন এই ব্যাখা আমরা কোথাও দেখেছি? তবে; হ্যাঁ। ইবনে খালদুনের মত একজন আলেম, দার্শনিক, সমাজবিজ্ঞানী ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানীই পারেন সুন্নতের এমন একটি ধারণা দিতে।

অর্থাৎ সমাজকে পরিচালনা পদ্ধতি, একটি সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা। তবে এখানে সিয়াসাত কে সংকীর্ণ ‘রাজনীতি কিংবা পলিটিক্স’ অর্থে গ্রহণ করা উচিত হবে না। বিস্তৃত অর্থে, এর নিজস্ব বৈশিষ্টের আলোকে সামাজিক সিস্টেম ও রাষ্ট্রীয় সিস্টেম হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। তাছাড়া সুন্নতকে শুধুমাত্র ব্যক্তিজীবনকে গঠনকারী একটি বিষয় হিসেবে নয় ম্যক্রো বা সামগ্রিক অর্থে সমগ্র দুনিয়াকে শাসনকারী একটি ব্যবস্থার নাম বলে তিনি সুন্নতকে সঙ্গায়িত করেছেন। এর পর তিনি বলেন, يسوسها الملك ( ইয়াসুসাহা আল মূলক বা আল মালিক) । অর্থাৎ সুন্নাহ থেকে উৎসারিত এই রাজনীতিকে কে বাস্তবায়ন করবে? এর জবাবে তিনি রাষ্ট্র এর বাস্তবায়ন করবে। যার অর্থ হল রাসূল (সঃ) সুন্নতের একটি রাজনৈতিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় ধারণা রয়েছে।’

২.
এখন আসা যাক আল মাওয়ার্দীর খিলাফাত ভাবনা নিয়ে। আল মাওয়ার্দী(৩৬৩–৪৫০ হিঃ খৃঃ ৯৭৩-১০৫৮)। আল মাওয়াদীর পুরা নাম ছিল আবুল হাসান আলী বিন মুহাম্মদ বিন্ হাবিব আল মাওয়ার্দী। তিনি বসরায় জন্ম গ্রহণ করেন এবং বাগদাদে শিক্ষা গ্রহন করে , অল্প বয়সে আরবী সাহিত্যে খ্যাতি লাভ করেন। আইন শাস্ত্রের প্রতি তাঁর ঝােক ছিল। আইনকেই তিনি পেশা হিসাবে গ্রহণ করেন। শিক্ষা শেষ তিনি বিচার বিভাগে কাজী নিযুক্ত হন। নানা জায়গায় বিচার কার্য সমাধা করে তিনি খিলাফতের রাজধানী বাগদাদ নগরীতে কাজীর পদ অলংকৃত করেন। ৪২৯ হিঃ/ ১০৩৬ খৃঃ খলিফা আল কাদির চারটি প্রসিদ্ধ সুন্নী মযহাবের আইন প্রণয়ন করার জন্য চারজন বিজ্ঞ আইনবেত্তাকে অনুরোধ করেন। এতে আল-কুদুরী, হানাফী মযহাবের ও আল মাওয়াদী, শাফেয়ী মযহাবের আইন প্রণয়ন করার জন্য দায়িত্ব প্রাপ্ত হন।
আল কুদুরী রচনা করেনঃ আল মুখতাসর ’

আল মাওয়ার্দী রচনা করেন: ‘কিতাব আল ইকনা। এদু’টি ছাড়াও অন্যান্য রচনাগুলির মধ্যে আল মাওয়ার্দীর গ্রন্থটি সর্বশ্রেষ্ঠ বলে বিবেচিত হয়। এর পুরস্কার স্বরূপ আল কাদির তাঁকে মহা বিচারপতি নিযুক্ত করেন এবং আন্দার কদাত ইয়াকুতী। (কাজীয়াদি -কাজী) উপাধিতে ভূষিত করেন। আল-মাওয়ার্দী যদি ও একজন শাফেয়ী মাযহাবের ইমাম এবং সুন্নী আইন বেত্তা ছিলেন তবু ধীর মস্তিষ্ক ও শাসন কার্যে সহিষ্ণুতার জন্য তিনি বুওয়াইহিদ শিয়া শাসক গােষ্ঠির নিকটও বিশ্বাসভাজন ছিলেন। তাঁর অসাধারণ ধীশক্তির জন্য বুওয়াইহিদেরা তাঁকে প্রশংসার চোখে দেখতেন এবং সুন্নী খলিফাও তাঁদের মধ্যকার গরমিল ও মনোমালিন্য নিরসনের জন্য প্রায়শ: তাঁর মধ্যস্থতা গ্রহণ করতেন। এটা সহজেই বুঝা যায় , আইন ও রাজনীতির উভয় ক্ষেত্রে তিনি অত্যন্ত পারদর্শী ছিলেন এবং পঞ্চম হিজরী একাদশ খৃঃ শতাব্দীর একজন অন্যতম খ্যাতিসম্পন্ন ব্যক্তিত্ব বলে পরিচিত ছিলেন। তাঁর প্রসিদ্ধ গ্রন্থগুলোর মধ্যে রয়েছে?
(ক) কিতাব আল হাবী
(খ) কিতাব-আল-ইকনা
(গ) আদব আল দুনয়া ও’দদীন
(ঘ)সিয়াসত আল মুল্ক
(ঙ) কাওয়ানিন আল ওযারা এবং
(চ) আল-আহকাম আল সুলতানিয়া।
শেষ গ্রন্থটিই আমরা এখানে বিশেষ ভাবে আলোচনা।

৩.
আল আহকাম আল সুলতানিয়া:
এটি ১৯৮৮ সালে প্রথম বাংলায় অনুবাদ করেন খ্যাতিমান পণ্ডিত ড. মঈনুদ্দিন আহমদ খান ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক সামসুদ্দীন। তিনটি পরিচ্ছদে বিভাজিত। আল আহকাম আল সুলতানিয়া গ্রন্থটি মুলত ২০ পরিচ্ছদে রচিত হয়েছে। এতে- ইমামত; ওজারত, প্রাদেশিক শাসন ব্যবস্থা, সৈন্য বাহিনী, পুলিশ, বিচার বিভাগ, ফৌজদারী, হুদুদ বা ক্রিমিনাল আইন, মসজিদের ইমাম, আমীরে হজ্জ্ব, জিজিয়া ও খরাজ, নৈতিকতা এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ শাসনতান্ত্রিক বিষয়গুলি এক এক পরিচ্ছদে আলোচনা করা হয়েছে।

মুকদ্দমা বা ভূমিকায় আল মাওয়ার্দী বলেন:
“সমস্ত কৃতজ্ঞতা আল্লাহর জন্যে, যিনি ধর্মের সূত্রগুলো আমাদের জন্য বিশ্লেষণ করে দিয়েছেন, কিতাব অবতীর্ণ করে আমাদের প্রতি দয়া করেছেন এবং আমাদের জন্য ভালমন্দ বিচার করার মাপকাঠি ’ প্রদান করেছেন। এটাকে দুনিয়ার ব্যাপারে বিচারক হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন যার মাধ্যমে আল্লাহর সৃষ্টির কল্যাণগুলো সুনির্দিষ্ট হয়েছে এবং সত্য ও অধিকারের সূত্রগুলো পরিস্কার রূপ লাভ করেছে। তিনি শাসন, কর্তাদের উপর তাঁর সৃষ্টির রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব অর্পণ করেছেন, যাতে দুনিয়ার সুব্যবস্থা কায়েম থাকে।”
আল মাওয়ার্দী রাহ. রসুলুল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে বলেন- যিনি আল্লাহর আদেশগুলো জারি করেছেন এবং এ গুলোর সত্যতাকে সুপ্রতিষ্ঠিত করেছেন। যেহেতু শাসনতন্ত্র ও প্রশাসনিক আইন কানুন, যে গুলোর মাধ্যমে সরকারের কর্তৃত্ব পরিচালিত হয়, এমনিতেই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, তদুপরি ক্রমশঃ এ গুলোর জটিল আকার ধারণ করার কারণে কর্মকর্তাদের ব্যস্ত সমস্ততার দরুন, এ গুলোর প্রতি অবহেলা প্রদর্শিত হওয়ার কারণে এ বিষয়ে একটি স্বতন্ত্র পুস্তক রচনা করার প্রয়াজোজন হয়ে পড়েছে। যাতে সরকারে গুরুত্বপূর্ণ ক্ষমতা গুলোর বর্ণনা লিপিবদ্ধ করা হবে। এরপর তিনি বলেন, আল্লাহ তায়ালা জনগণকে সৎ পথ প্রদর্শন করার জন্য একজনকে নবুয়ত প্রদান করেন এবং তাঁকে এদের কেন্দ্রস্থল রূপে প্রতিষ্ঠিত করেন। তাঁকে হকুমত বা শাসন ক্ষমতাও প্রদান করেন, যাতে তিনি আল্লাহ প্রদত্ত ধর্মের আদেশগুলো জারি করতে পারেন, আর যাতে লোকজন তাঁর কথা মান্য করে চলে।
আল মাওয়ার্দীর মতে ইমামত হল সামাজিক ব্যবস্থার কল্যাণের উৎস এবং সামাজিক আইন কানুনের ভিত্তি এবং ইমামত’ নবুয়তের প্রতিনিধিত্ব হওয়ার কারণে, রসুল স. এর আদেশের উপর প্রাধান্য লাভ করবে। সুতরাং ইমামের কর্তব্য হল— দেশের মধ্যে ধর্মীয় প্রশাসনগুলোর (শরীয়তের) প্রতিষ্ঠা করা।
আল মাওয়ার্দীর মতে খিলাফতের রাষ্ট্রনীতির গোড়ার কথা হল:
(ক) ইসলামের সিয়াসতের ভিত্তি স্বইচ্ছায় আল্লাহ প্রদত্ত হিদায়তের অনুসরণ করার সংকল্প।
(খ) আল্লাহ প্রদত্ত হিদায়ত বা পথ নির্দেশগুলো রসুলুল্লাহ স. এর জীবনে বাস্তব রূপ লাভ করেছিল এবং আল্লাহ প্রদত্ত এই হিদায়তের বাস্তবরূপ সুন্নাহ!
(গ) রসুলুল্লাহ স, এর নেতৃত্ব সুন্নাহর অনুসরণ করে মানব জীবনকে সার্বিক রূপে কল্যাণময় করা সম্ভব।
(ঘ) মানব জাতিকে সত্য, ন্যায় ও কল্যাণের পথে পরিচালিত করার জন্য রসুলুল্লাহ স. আল্লাহর নিকট থেকে যে নেতৃত্ব লাভ করেছিলেন, তাঁর মৃত্যুর সময় ইহা তিনি কাকেও সমর্পণ করে যাননি।
(ঙ) অতএব, অন্যান্য দায়িত্বের মত নেতৃত্বের দায়িত্বও মুসলিম সমাজের উপর বর্তিত হয়েছে।
(চ) সুতরাং, এই ক্ষেত্রে নেতৃত্ব প্রদান করার জন্য মুসলিম সমাজ সর্বসম্মতিক্রমে একজন নেতা নির্বাচিত করলে, ‘পদাধিকার বলে তিনি রসুলুল্লাহ স. এর নেতৃত্বের স্থলাভিষিক্ত বা খলিফা হয়ে যানঃ তিনি রসুলের স. খলিফা, এরই অর্থ হল- নবুয়তের প্রতিনিধিত্ব খিলাফত।

৪.
আল মাওয়াদী’র খিলাফতের রাজনীতির মূখ্য আলোচনা একমাত্র আল্লাহ প্রদত্ত হিদায়তের আলোই মুসলমানদের ব্যক্তিগত, সামাজিক ও রাজনৈতিক জীবনের দিশারী। মানব জাতির কল্যাণের জন্য, পরম করুণাময় আল্লাহতা’লা বিশ্ব নবী হযরত মুহাম্মদ স. এর উপর তাঁর হিদায়তের আলো অবতীর্ণ করেছেন। হযরত মুহাম্মদ স. প্রচারিত আল্লাহ প্রদত্ত শান্তির ধর্ম (দীনে ইসলাম গ্রহণ করে ও তাঁর আদর্শ জীবনের উদাহরণ দ্বারা সুপ্রতিষ্ঠিত প্রশস্ত জীবন পথের (সুন্নাহ) অনুসরণ করে মানুষের জীবনকে ন্যায় ও সত্যের পথে সুখী ও সুন্দর করে গড়ে তোলার নীতিই ইসলাম ধর্মের কর্মপন্থা। এরূপ একটি প্রশস্ত জীবন পথ গড়ে তোলার জন্য হযরত মুহাম্মদ স. তিন পর্যায়ে কঠোর সাধনা করেছেন।

প্রথমত: তাঁর নবুয়ত পূর্ব ৪০ বছর বয়স পর্যন্ত তাঁকে আমরা একটি সততার সাধনায় ব্যাপৃত দেখতে পাই।

দ্বিতীয়ত: নবুয়ত প্রাপ্তি থেকে হিজরত পর্যন্ত প্রায় ১৩ (তের) বছর ধরে তাঁকে মক্কার অবিশ্বাসীদের দাপটে নিষ্পেষিত অবস্থার মধ্যে জীবনের অভিজ্ঞতালব্ধ সততার সাথে আল্লাহর বাণী পাঠের মাধ্যমে প্রাপ্ত ‘ সত্য বিশ্বাস এর সংযোগে অর্থাৎ সৎচরিত্রের মধ্যে জ্ঞানের আলো’ প্রবিষ্ট করে ব্যক্তিত্ব গঠনের সাধনায় মগ্ন দেখতে পাই।

তৃতীয়ত: হিজরতের পরবর্তী যুগে মদিনাকে কেন্দ্র করে, জুলুম মূক্ত ন্যায় বিচার ভিত্তিক একটি সামাজিক গঠনতন্ত্রের ভিত্তিতে (মদিনার সনদ এবং একটি মৌলিক মানবাধিকারের নিরাপত্তামূলে’ (বিদায়ী হজ্জের ভাষণে) একটি বিশ্বজনীন সমৃদ্ধশালী সুখী সমাজ এবং একটি রাষ্ট্রের নমুনা কায়েম করার কঠোর সংগ্রামের বিরামহীন ব্যস্ততার মধ্যে তাঁকে দেখতে পাই। মহানবীর স. ইন্তেকালের পর এরই প্রেক্ষিতে মুসলিম সমাজ ও রাষ্ট্রের নেতৃত্বের প্রশ্ন দেখা দেয়। ইমাম গাজ্জালী (রঃ) বলেন যে, হযরত মুহাম্মদ স. এর অন্তর্ধানের পর এমনকি তার শবদেহ সমাহিত করার পূর্বে তৎকালীন মুসলমানেরা হযরত আবু বকর (রাঃ)কে নেতা নির্বাচিত করেন এবং তখন থেকে মুসলমানদের সর্ববাদী মত (ইজমা) হল, সরকারী কর্তৃত্ব ও বিচার ক্ষমতা আইনতঃ এমন একজন নেতার বা ইমামের কর্তৃত্ব থেকে উৎসারিত হতে হবে, যাকে মুসলমানের সবাই নেতা বলে মান্য করে। এ ব্যাপারে আল মাওয়ার্দী, ইমাম গাজ্জালী (রঃ) ও শাহ ওলিউল্লাহ’র মতামতে ঐক্য রয়েছে। এ তিনজন বিশ্বাস করেন যে, ইসলামের নেতৃত্ব বা ইমামত শরীয়তের অংগ, ইমামত ইজমার’ মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হয় এবং ইমাম নির্বাচনের মাধ্যমে নিয়োজিত হয়। আর মুসলিম সমাজে ইজমার মাধ্যমে নির্বাচিত ইমাম মুসলিম সমাজ ও রাষ্ট্রের নেতৃত্বের ব্যাপারে রসুল স. এর স্থলাভিষিক্ততার জন্য ইমামত কায়েম হয় যাতে ধর্মের রক্ষণাবেক্ষণ ও সংস্কারের সুব্যবস্থা কায়েম থাকে।
এই স্থলাভিষিক্ততার নাম ‘খিলাফত’ ও যিনি স্থলাভিষিক্ত হলেন তিনি খলিফা। সুতরাং খলিফা অর্থে ‘রসুলের খলিফা’ (খলিফাতু-রসুল)। মুসলিম সমাজে নির্বাচনের মাধ্যমে নেতা নিযুক্ত হওয়ার কারণে তিনি রসুলের খলিফা হন। অন্য কথায় মুসলমানদের নির্বাচিত নেতা পদাধিকার বলে রসুলের স্থলাভিষিক্ত হন। স্থলাভিষিক্তের আরবী কথা খলিফা। সুতরাং নির্বাচনের মাধ্যমে ইমাম কায়েম করার নীতিকে আমরা খিলাফতের রাষ্ট্রনীতি বলে অভিহিত করতে পারি। হ্যা, এ নির্বাচন ইজমার ভিত্তিতে, সচ্চ ও শরয়ী পদ্ধতিতে হওয়াও মূখ্য বিষয়। এ সংক্রান্ত বিস্তারিত ধারণা আমরা পাবো আল মাওয়ার্দীর ‘আহকাম আল সুলতানিয়ায়।

৫.
ইমাম নির্বাচনের নিয়মাবলী
আল মাওয়ার্দী’র মতে, চুক্তিবদ্ধ ও চুক্তিরহিত করার অধিকারীরা অর্থাৎ নির্বাচক মণ্ডলী যখন ইমাম নির্বাচন করার বিষয় বিবেচনা করবেন। তখন-

প্রথমত: তাঁরা ইমামতেরউপযুক্ত লোকদেরকে পরীক্ষা করে দেখবেন। যার মধ্যে ইমামতের গুণ ও শর্তগুলো সবচেয়ে বেশী পূর্ণরূপে পাওয়া যায় এবং এতদসঙ্গে জনসাধারণ যাকে বিনা দ্বিধায় গ্রহণ করে নেবে এমন লোকটিকে বেছে নেবেন। এতে কোন প্রকারে দ্বিধা বা বিলম্বের অবকাশ থাকা উচিত নয়।

দ্বিতীয়ত: এরূপ উপযুক্ত একজন লোক পাওয়া গেলে ইমামতের গুরুত্বপূর্ণ পদটি নির্বাচক মণ্ডলী তার নিকট পেশ করবেন। উনি যদি এ গুরু দায়িত্ব ভার গ্রহণ করতে সম্মত হন, তবে কালবিলম্ব না করে নির্বাচক মণ্ডলী আঁর হাতে বায়আত করবেন এবং এতদসঙ্গে তিনি ইমাম নির্বাচিত হয়ে যাবেন। তখন তাঁর হাতে ‘ রায়আত করাও তাকে মেনে নেওয়া জনসাধারণের জন্য কর্তব্য হয়ে যাবে। অবশ্য তিনি এই গুরু দায়িত্ব গ্রহণ করতে রাজী না হলে, তবে তাঁর উপযুক্ত ব্যক্তিকে বিবেচনা করা হবে। দুইজন সমান উপযুক্ত ব্যক্তির মধ্যে যদি একজন অন্যজন থেকে অধিকতর বিদ্বান ও অপরজন অধিকতর সাহসী হন তবে শান্তির সময়ে বিদ্বানকে ও অশান্তির সময় সাহসীকে।অগ্রাধিকার দেওয়া যাবে। অন্য সবদিক সমান হলে অধিকতর বয়সের ভিত্তিতেও অগ্রাধিকার দেওয়া যাবে, যদিও তা বাধ্যতামূলক নয়। কিন্তু দুইজন বা ততোধিক প্রার্থী যদি সব দিকে সমান বাছাই করা যায়। কিন্তু অন্য একদলের মতে, নির্বাচক মণ্ডলী এই অবস্থায় স্বাধীনভাবে একজন বেছে নিতে পারেন। আল মাওয়ার্দী মনে করেন যে, ইমাম নির্বাচনের ব্যাপারে শ্রেষ্ঠত্বের প্রশ্ন গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, এক দল আইনজ্ঞ মনে করেন যে, নির্বাচক মণ্ডলীকে যাচায়ের এখতিয়ার দেওয়ার অর্থ হল তাদের হাতে অধিকতর উত্তম ব্যক্তিকেও বেছে নেওয়ার দায়িত্ব অর্পণ। তবে মৌলিক গুণগুলো মওজুদ থাকলে কম উত্তম ব্যক্তিকেও তাঁরা বাছনী করতে পারেন। অন্যথায় তাঁদের বাছনী করার ক্ষমতা খর্ব করা হবে। অবশ্য আইনজ্ঞদের অধিকাংশ, ইমাম বাছনীর ব্যাপারে, উত্তম হওয়ার ভিত্তিতে অগ্রাধিকার দেওয়ার প্রয়ােজনীয়তা অনুভব করেন না। কারণ, তাদের মতে, বাহনীর জন্য মৌলিক গুণাগুণই যথেষ্ট। কিন্তু এক সময় যদি ইমামতের শর্তগুলি কেবল একজন লোকের মধ্যে পাওয়া যায়, তবে তাঁর জন্য ইমামত নির্দিষ্ট হয়ে যাবে এবং অন্য কাউকে ইমামের পদে অধিষ্ঠিত করা যাবে না। আল মাওয়ার্দীর আলোচনায় অনেক ক্ষেত্রে কূটনৈতিক দুরদর্শী দৃষ্টিকোণ পাওয়া যায়। অনুবাদকদ্বয় ক্ষেতবিশেষের তার মতগুলো পর্যালোচনা করেছেন।

৬.
ইসলামের রাজনৈতিক দর্শনের ঐতিহাসিক পরম্পরাগুলো পাদপ্রদীপের আলোয় নানা ভাবে উপস্থাপিত হওয়া এখন বিশ্ব রাজনীতির এ করুণ সময়ে প্রয়োজন। বিশেষ করে আল ফারাবি রাহ., ইমাম মাওয়ার্দী রাহ., ইমাম গাজ্জালী রাহ., ইমাম জুয়ায়ইনী রাহ. ইমাম তাইমিয়া রাহ. ইবনে খালদুন রাহ, শাহ্ ওয়ালীউল্লাহ রাহ্ সহ সমস্ত ক্লাসিক চিন্তকদের ভাবদর্শন পুন:আলোচনার মাধ্যমে নতুন পৃথিবীর আলোময় পথ রচনায় নতুন ভাবে বিশ্লেষণের আলোয় তুলে আনা প্রয়োজন।