আমাদের অলি মেম্বার একজন কবিও বটে। উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ইংরেজি পড়ান। উনার বড় ছেলেটা ইংরেজি মাধ্যম বিদ্যালয়ে পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ে। ছোট মেয়েটা এখনো বিদ্যালয়ের চৌকাঠে পা দেয়নি। তবে তার আগেই শ খানেক ইংরেজি শব্দের মানে শিখে গেছে। সন্ধ্যাবেলায় উনার বৌ ছোট মেয়েকে পড়াচ্ছেন সিএটি ক্যাট মানে বিড়াল, ইওয়াইই আই মানে চোখ। তখন অলি মেম্বার গলার আওয়াজ বাড়িয়ে বললেন, ভাষার মাস, মেয়েটাকে বাংলা শব্দার্থ শেখাও রজনী মানে রাত, উদীচী মানে উত্তর। এক কথায় প্রকাশ শেখাও অনেকের মধ্যে একজন- অন্যতম, বাগধারা শেখাও দুধের মাছি মানে- সুসময়ের বন্ধু। তার আগে শেখাও ধ্বনি, বর্ণ, অক্ষর, শব্দ, বাক্য, উপসর্গ, অনুসর্গ, সন্ধি।
মেম্বারের বৌ মেম্বারকে গরম দিয়ে বললেন, ব্যাকডেটেড থিংকিং বাদ দাও। গ্লোবালাইজেশনের যুগ। ইংলিশ না শিখলে পিছিয়ে যাবে সন্তানরা।
বিকালে পাঁচজন ছেলের একটা দল এলো। মেম্বারকে গুড আফটারনুন বলে একটি পৃষ্ঠা ধরিয়ে দিলো। মনোযোগ সহকারে মেম্বার পৃষ্ঠাটি পড়লেন, পড়ে বললেন, ণ-ত্ব বিধান, ষ-ত্ব বিধান কি তোমরা পড়োনি?
মিন্টু বললো, পড়েছিলাম স্যার ক্লাস নাইন টেনে। কেন স্যার হঠাৎ এ কোয়েশ্চন?
মেম্বার বললেন, পৃষ্ঠাটিতে এত বানান ভুল কেন? হি এর পর ভার্ব এর সাথে তো এস বা ইএস ঠিকই দাও। বাংলা শেখার সময় একটু সতর্ক হওয়া যায় না? যাহোক, একুশে ফেব্রুয়ারি উদযাপন করবে তো আমার কাছে কিসের জন্য?
মাহফুজ বললো, স্যার, আমরা একটি একুশ কেন্দ্রীক লিটল ম্যাগাজিন বের করতে চাচ্ছি। আপনি তো ভালো কবিতা লেখেন। আমাদের একটি একুশের কবিতা লিখে দিতেই হবে।
মেম্বার বললেন, একুশের জন্য কবিতা লিখতে হবে? সারাবছর তো একুশ নিয়ে কিছুই লিখি না। তোমরাও তো অন্য সময় পত্রিকা বের করো না। একুশ না এলে কি একুশকে উদযাপন করা যায় না?
শুনে মেম্বারের বৌ বললেন, ফেনাচ্ছো কেন? ওদের কবিতা দেবে।
ছেলেগুলো খুশি হয়ে চলে গেলো। মেম্বারের বৌ বললেন, এটাই তো কবি হওয়ার মোক্ষম সময়। একুশ নিয়ে লিখতে হবে, একুশ নিয়ে ভাবতে হবে, একুশ বিশেষজ্ঞ হতে হবে। নতুবা সম্মান ও সম্মানি পাবে কি করে? পদক পাবে কি করে?
বৌর কথা শুনে মেম্বার নাকে হাসলেন। ওদিকে ছেলেগুলো মশিউরকে ধরলো, বললো, তোকে একটা গান লিখতে হবে?
মাহফুজ বললো, গান তো আছেই, আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো…
মিন্টু বললো, ওরে ওটাতো ওল্ড সং। সবাই জানে৷ নতুন করে, নতুন শব্দে, নতুন কথায় একুশের গান রচনা করতে হবে।
মাহফুজ হতবাক হয়ে গেলো। কাওছার বললো, তবে গাইবে কে? শিল্পী কি ভাড়া করবি?
নিশীথ বললো, গান গাইবে আমাগো বর্ষা আপা!
মাহফুজ বললো, বর্ষা? সারেগামা সাগরে কি সাঁতার কেটেছে? উচ্চারণই তো ঠিক নেই। এক লাফে বনেদি শিল্পী, গুণবতী শিল্পীতে বনে যাবে নাকি? কত ভড়ং দেখবো আরো!

ছেলেগুলো স্থানীয় বাজারে গেলো। দোকানে দোকানে দোকানদেরকে ধরছে আর বলছে, আমরা আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উদযাপন করতে যাচ্ছি। অর্থায়নের জন্য দোকানে দোকানে আসছি। কিছু ডোনেট করেন।
দোকানদার বললেন, আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস কি?
আকাশ থেকে পড়লো ছেলেগুলো, বললো, ১৯৫২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারি ভাষার জন্য জীবন দিয়েছিলো রফিক, শফিক, জব্বার… জানেন না?
দোকানদার বললো, না তো। এটা আবার কেন উদযাপন?
ধৈর্য বললো, সেদিন যদি আমার ভাইয়েরা জীবন না দিতো তবে আজ আমরা বাংলায় কথা বলতে পারতাম না।
দোকানদার ক্রেতার দিকে মনোনিবেশ করলেন। বিষয়টি তাঁর কাছে গুরুত্বপূর্ণ মনে হলো না। পাশের দোকানে গেলো ছাত্ররা। তৌহিদ বললো, একুশ কি জানেন?
দোকানদার বললেন, খালি পায়ে প্রভাতফেরি, ফুল নিয়ে শহিদ মিনারে সমর্পণ।
কাওছার বললো, আর?
দোকানদার বললেন, শিল্পীদের কণ্ঠে গান সুরে সুরে… ঐ যে… আমার ভাইয়ের…
কাওছার বললো, এর হিস্টোরি জানেন?
দোকানদার চুপ থাকলেন। তবে অনুদান দিতে কার্পণ্য করলেন না।
ওরা সকলে একটি স্থানে বসলো। অর্থ সংগ্রহ কোন রকমে সম্পন্ন হয়েছে। মাহফুজ বললো, তাহলে ফুল কেনার দায়িত্ব কে নিচ্ছে?
নিশীথ হাত তুলে বললো, ফুলডি আমি কিনুমনে, হেইডা লইয়া চিন্তা করিস না।
সদ্য বললো, উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত হচ্ছিস। শুদ্ধ বাংলায় কথা বলিস না কেন? অঞ্চলভেদে অাঞ্চলিক কথা চলে, চলবে। তাই বলে সুন্দর, শ্রুতিমধুর ভাষার চর্চা আমাদের মাঝে না থাকলে সোনার ভাষার সৌন্দর্য যে হারিয়ে যাবে।
মাহফুজ বললো, ব্যানার, প্লাকার্ড কে লিখিয়ে আনবে?
ফজল বললো, ওটার দায়িত্ব আমার কাঁধেই থাক।
মাহফুজ বললো, স্টেজ সাজানোর জন্য কারা কারা থাকবি?
সানন্দে হাত তুললো তিনজন। মাহফুজ এবার বললো, আলোচনা সভায় উপস্থিত গণ্যমান্য ব্যক্তির সার্বক্ষণিক দেখাশোনার ভার নিবি কে কে?
এ প্রশ্নেও আশানুরূপ সাড়া পড়লো, তখন মাহফুজ বললো, আলোচনা শেষে তো সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হবে, গানের জন্য তো ইন্সট্রুমেন্ট লাগবে। ডুগডুগি, একতারা, ঢোল, তবলা, বাঁশি, খঞ্জনিওয়ালাদেরকে কে আনবে?
নিশীথ বললো, এডি কি গানের যন্ত্র? গিটার, কীবোর্ড, ড্রাম, ব্যান্ড বাজনা আনতে হইবো। এডি সম্বন্ধে আমি ভালা বুঝি, আমি দেখুমনে।
মাহফুজ বললো, জারি, সারি, ভাটিয়ালি, পল্লীগীতি কি ব্যান্ড বাজনায় সাজবে?
নিশীথ বললো, সাজতো না কেন? বহুত সাজবো। মাতবো দর্শকে।
এভাবে দায়িত্ব বন্টিত হলো। যে যার বাড়ি ফিরে গেলো। মিন্টু তার টেলিভিশনটা অন করলো। হিন্দী সিনেমার ঘোর পাগল সে। তা দেখছে আর বিজ্ঞাপনের সময় ইংরেজি সিনেমা দেখছে। সদ্যকে কল করে যে সিনেমা দেখছে তা দেখতে বললো আর বললো, বাংলা সিনেমা কেউ দেখে?
সদ্য বললো, ভাষার মাস। অপসংস্কৃতিতে বুদ থেকে নিজেদেরকে আর কলঙ্কিত করিস না।
মিন্টু বললো, তোর এত জ্ঞানের কথা ভালো লাগে না।
এই বলে মিন্টু কল কেটে নিশীথকে কল দিলো। নিশীথ বললো, হিন্দী সিনেমা দেখতাছোস? ইংলিশ মুভি দেখ্। ইংলিশ মুভি না দেখলে ইংলিশ কথা শিখমু কেমনে?

ফুল গাছগুলো ফুলশূন্য। সবার হাতে ফুল। ব্যানারে মাত্র কয়েকটি লাইন কিন্তু বানান ভুল প্রতি লাইনে গড়ে তিনটি। খালি পায়ে প্রভাতফেরি করে শহিদ মিনার পানে যাত্রা। কোন চেতনা নেই, আছে সবাই হাসি তামাশা নিয়ে। শহিদ মিনার ভরে গেলো ফুল আর ফুলে। গাছে একটি কোকিল ছিলো, ওটা না ডেকে উড়ে কোথায় যেন চলে গেলো। কাক ছিলো, ওটা কেবল কা কা করতে থাকলো। সবাই ফটোসেশন করতে থাকলো। ইচ্ছামত ঢঙে ঢঙে ফটো তোলা চলছে। পুষ্পার্পণ শেষে সবাই স্টেজের সামনে এলেন। চেয়ারম্যান সাহেব কোট টাই পরে এসেছেন। ছেলেগুলো প্রিন্স কোট, জিন্স কোট, কেউবা কোট টাই আর সু পরে বিদেশি বাবু হয়ে এসেছে। মেম্বার সাহেবের বাচ্চা দুটোও এসেছে, তাঁর বৌ বাচ্চা দুটোকে মনের মত করে সাজিয়ে এনেছেন। নিজে পরেছেন শর্ট কামিজ। কেবল মেম্বার সাহেব পরেছেন পাজামা, পাঞ্জাবি, পাঞ্জাবির উপর কালো চাদর।
লিটল ম্যাগাজিনটা মেম্বার সাহেব একটু দেখলেন, প্রচ্ছদে একটি নগ্ন অপ্সরীর ছবি। তিনি ভেবে পেলেন না একুশের সাথে নগ্ন অপ্সরীর সম্পর্ক কি? সৌজন্য সংখ্যাটা তাই সৌজন্যস্বরূপ সাথে রাখলেন আর ভাবলেন, বাড়ি পৌঁছে অগ্নিতে দেবেন।
চেয়ারম্যান সাহেব বক্তৃতা দিলেন। কথার মাঝে ইংরেজির সংখ্যায় বেশি। না আছে একুশ সৃষ্টির ইতিহাস, না আছে ছাত্র জনতার আত্মত্যাগের কথা, না আছে কিভাবে শহিদ দিবস আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হলো তার তথ্য।
মেম্বার সাহেব স্টেজে নেই। তিনি কাউকে কিছু না বলে বাড়ি চলে আসছেন। ভাবছেন, ইংরেজি বিষয়ের শিক্ষক আমি, আমার মুখ দিয়ে ইংরেজি বের হয় না কেন? এত পাগল কেন আমি?
পথে রিক্সাওয়ালা বললেন, স্কুল মাঠে কি হচ্ছে স্যার?
মেম্বার সাহেব বললেন, জানো না যখন আর জানবার দরকার নেই। জানলে মুষড়ে যাবে।
শ্রেষ্ঠ কবি কে হলেন? মেম্বার। মেম্বারের অনুপস্থিতিতে মেম্বারের স্ত্রী পুরস্কার নিলেন, খুশি তাঁর দেখে কে?
সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আরম্ভ হলো। বাংলার কিছু জনপ্রিয় গান বিকৃতি করে ব্যান্ডের তালে গাওয়া হচ্ছে। ঘরে বসে শুনছেন মেম্বার। ভাবছেন, আজ শহিদ দিবস, নাকি থারটি ফার্স্ট ডিসেম্বর!