দুয়ার এঁটে ঘুমিয়ে আছে পাড়া
কেবল শুনি রাতের কড়ানাড়া
‘অবনী বাড়ি আছো?’

বৃষ্টি পড়ে এখানে বারোমাস
এখানে মেঘ গাভীর মতো চরে
পরাঙ্মুখ সবুজ নালিঘাস
দুয়ার চেপে ধরে–
‘অবনী বাড়ি আছো?’

আধেকলীন হৃদয়ে দূরগামী
ব্যথার মাঝে ঘুমিয় পড়ি আমি
সহসা শুনি রাতের কড়ানাড়া
‘অবনী বাড়ি আছো?’

অবনী বাড়ি আছো/শক্তি চট্টোপাধ্যায়

প্রথম গল্প
ছোটবেলায় শুনতাম বাবা সুর করে ‘হাতেমতাই’ পড়তেন। লন্ঠনের ছায়াময় আবছা আলো-আঁধারি যেন সেই সুরে সুরে নেচে উঠত। হাতেমতাই আশ্রয়ের খোঁজে একটা বাড়ির বাইরে দরজায় দাঁড়িয়ে চেঁচাচ্ছে অথচ কেউ দরজা খুলছে না। বাড়িটি কি রহস্যময় বাড়ি?

চারিদিকে ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন হয়ে যাচ্ছে, মনে হচ্ছে মেঘ। ঘনকালো তেজি মেঘ। মেঘের ইশারায় বেড়ে উঠছে ঘাস। লতাপাতা। দরজা ঢেকে ফেলছে।

হৃদয়ে কিসের যেন ব্যথা জেগে উঠছে। অনেক রাত। ভয়ংকর একটা পরিবেশ ও পরিস্থিতি। গল্পের মধ্যে লীন হয়েও ওই দূরত্বে হৃদয় যেতে সাহস করছে না। ঘুম আসছে আমার। তাহলে বেচারা হাতেমতাই এর কী হবে?

আবার ঘুম ভেঙে যাচ্ছে। চেতন অচেতনে যেতে যেতে আবার ফিরে আসছে। এক অদৃশ্য পথ। এই পথেই কি আমি বাস্তবের মুখোমুখি হতে চাইছি? বহুদিন পর ফরাসি নাট্যকার ও ফুটবল খেলোয়াড় এরিক ক্যান্টোনার (Eric Cantona) মুখে শুনলাম সেকথা : I am searching for abstract ways of, expressing reality, abstract forms that will enlighten my own mystery. অর্থাৎ আমি বাস্তবের প্রকাশ, বিমূর্ত রূপগুলির বিমূর্ত উপায়গুলি অনুসন্ধান করছি যা আমার নিজের রহস্য আলোকিত করবে। এই রহস্যই আমাকে ভাবনার পথে গতি এনে দিতে সাহায্য করল। ছাত্র জীবনের উজ্জ্বল কোনো এক সকালে এই কবিতাটি এভাবেই আমার হৃদয়কে প্রথম বিদ্ধ করেছিল।

দ্বিতীয় গল্প
অনুভূতির তরঙ্গ সহজে থামে না। একবার জেগে উঠলে তা জন্ম থেকে মৃত্যুর তীর পর্যন্ত পৌঁছায়। তরঙ্গ সঞ্চারিত হতে থাকে অন্তরীক্ষে। স্তব্ধতায়। দার্শনিক বোধে। তাই নিয়েই গড়ে উঠে সমগ্র জীবনচেতনা। জীবন চেতনায় থাকে চেতন-অচেতনের ধারাই। মাঝে মাঝে তাই স্বয়ংক্রিয়তাও জেগে ওঠে।

বাড়ির কাছে আরশিনগরে পড়শি বসত করে, কিন্তু পড়শির খোঁজ কি আমরা পাই? লালন ফকিরের সেই বাউল আমাকে জাগিয়ে দেয়। পাড়াটি তো আমারই দেহ। দেহ তার প্রতিবেশীদের নিয়ে ঘুমিয়ে আছে। অথচ আমার আত্মসত্তা তার আত্মসত্যকে জাগাতে চায়। ‘অবনী’ পৃথিবী হলে দেহও মাটি, অবনীর স্বরূপ। আর আত্মসত্যকে ‘অবনী’ নামেই ডাকা। কিন্তু সাড়া কি পাওয়া যায়?

না, সাড়া পাওয়া যায় না, বলে ডাকেও ক্ষান্তি নেই। দুয়ার আকাশে অনিত্য মায়া ও বস্তুতে। মোহ মাৎসর্য নিজেকে চিনবো কেমন করে মোহ ও মাৎসর্যে। নিজেকে চিনব কেমন করে?

প্রকৃতির লীলাময় সান্নিধ্য, বৃষ্টিতে উজ্জীবন ফিরে আসে। মেঘ গাভী হয়ে যায় অসত্যেরই কারণে। সেও এক লীলাময় রহস্য। সবুজ নালিঘাস তাকে আকৃষ্ট করে। যদিও তা ‘পরাঙ্মুখ’। পরাঙ্মুখ অর্থাৎ বিমুখ বা ফাঁকিবাজ বা অক্রিয়মান। যে শব্দটিতে অনিত্যতার আভাস কবি দিলেন, যা শুধু ছলনার মহিমায় ব্যঞ্জিত হল। দুয়ার তো সেই-ই চেপে ধরে। ব্যক্তিসত্তার সঙ্গে যে ‘মনের মানুষ’ মিশে থাকে তাকে তো প্রতিটি মানুষই ডাকতে চায়, কিন্তু সবুজ নালিঘাস সেই ডাক শুনতে দেয় না। সবুজ নালিঘাস প্রতীক মাত্র। নিজের প্রকৃত মুখ দেখার যে আরশি, সেটাও পৌঁছাতে দেয় না দরজা খুলে। এই আত্মঅন্বেষণ করতে করতে একসময় অবচেতনও গ্রাস করে। আধেকলীন তো চেতন অবচেতনের সমষ্টি মাত্র। টানাপোড়েনের মাঝখানে ব্যথা। নিজেকে না-পাওয়ার আবার বাস্তব ছলনা থেকে সরে যাবার। দুই দিকই কবিকে বজায় রাখতে হয়। তার ফলে কোনো দিকেই কবির আর যাওয়া হয় না। আত্মজাগরণকে ঘুম পাড়িয়েও ঘুমের মধ্যে আবার আত্মজাগরণের ডাক শোনেন। ‘সহসা’ কথাটির দ্বারা বোঝা যায় এটি কবির যেন অনভিপ্রেত ছিল কিন্তু অনপনেয়। অবনীর বাড়ি এই দেহ, দেহ থেকেই কবির দার্শনিক অভিযাত্রা, আবার দেবের কাছেই ফিরে আসা। টি এস এলিয়ট ঠিক যেমনটি বলেছিলেন : We shall not cease from exploration, and the end of all our exploring will be to arrive where we started and know the place for the first time. অর্থাৎ আমরা অনুসন্ধান থেকে বিরত থাকব না এবং আমাদের সমস্ত অন্বেষণের সমাপ্তি হবে যেখানে আমরা শুরু করেছি এবং সেখানে প্রথমবারের মতো জায়গাটি জানতে হবে। সুতরাং ঘুমিয়ে পড়া জেগে ওঠার মধ্যেই আমাদের অন্ত ও অনন্ত বিরাজ করে। একটা গল্প বহু গল্পের জন্ম দেয়।

শাশ্বত কবিতা
কৈশোর থেকে অনন্ত কৈশোরে কবিতাটির বোধ চালিত হয়ে চলেছে। গল্প না-গল্প ভাবনা অনুভাবনায় ধাবিত হচ্ছে। ওয়াল্টার ডি লা মেয়ারের ‘দি লিস্ নার্স’ পড়েছিলাম। সেখানেও চাঁদের আলোয় রহস্যময় দরজা নাড়ার শব্দ ছিল। কিন্তু কী এক ভুতুড়ে ভয়ার্ত পরিবেশ। কান্নার শব্দ। যদিও শোনা গেছে : Their stillness answering his cry! তবুও মনে হয়েছে এত অবনীর বাড়ি নয়। এ তো বাউলের আরশিনগরও নয়। হৃদয়ের শাশ্বত উপলব্ধি এখানে নেই। শুধু একটি গল্প আছে মাত্র। আবার এই গল্প তো বহুমুখী অনবদ্য এক সোপান। মানবমুহূর্তের দার্শনিক চেতনায় সর্বদা এক প্রশ্নের সম্মুখীন করে। যে প্রশ্ন ভারতীয় জীবনধারার সমূহ আবেগ থেকে প্রতিফলিত হয়। বৈষ্ণব চেতনা থেকে ব্রহ্ম চেতনা, রবীন্দ্রনাথ থেকে বিবেকানন্দ পর্যন্ত যা সকলের মধ্যেই জেগে উঠেছে। কবি নিজেকে চেনার মধ্যে দিয়েই জগৎকে এবং পরাজগত উপলব্ধি করেছেন। চিত্রকল্প সৃষ্টি করেও মায়াব্যঞ্জনার সম্মোহনকে খন্ডিত করেছেন ‘পরাঙ্মুখ’ শব্দ ব্যবহার করে। চেতনকে অবচেতনের স্বয়ংক্রিয় প্রভাবে চালিত করেছেন। একটা সামান্য মাত্রাবৃত্ত ছন্দে লেখা কবিতায় সুদূরপ্রসারী ভাবনার পরিচয় এবং চিরন্তন দর্শনের দুর্নিবার প্রয়োগ খুব কমই ঘটে। যদি মৃত্যু এসেই কড়া নেড়ে থাকে জীবনের দরজায়, তবু কি আমরা জানতে চাই?

জানতে চাই না ,কারণ মৃত্যু কারও কাছেই কাঙ্ক্ষিত নয়। জীবনের রূপ রস গন্ধ স্পর্শ বারবার জীবন সংগ্রামের গল্প তৈরি করে। তবু অবচেতনের কোনো রহস্যময় সিঁড়িতে আমরা দাঁড়িয়ে থাকি। জীবনের পরম সত্যের দরজা খুলতে চাই। কৈশোরবেলার হাতেমতাই-ই হোক, অথবা লালনের গানের সুর-ই হোক একটা সামঞ্জস্য খোঁজার আশ্রয় আমাদের। কবি সেই সত্যের কাছেই এনে দাঁড় করালেন এই কবিতাটিতে। যে কথা যে প্রশ্ন নিজের ,সেই কথা সেই প্রশ্নের উত্তর নিজের কাছেই পাই। আমেরিকান নাট্যকার ও লেখক জর্জ কারলিন (George Carlin) এই জন্যই বলেছিলেন : The reason I talk to myself is because I’m the only one whose answers I accept. এই আত্মপ্রত্যয়ের বোধিতেই উজ্জ্বল হয়ে আছে আমার ভালবাসার কবিতাটি।

(কবিতাটি নেওয়া হয়েছে ‘ধর্মে আছো জিরাফেও আছো’ কাব্যগ্রন্থ থেকে কাব্যগ্রন্থ থেকে)।