কষ্টের বাতায়নে কবি কষ্ট নিয়ে পুরোটা জীবন করে গেলেন কষ্টের ফেরি।প্রেমিক পুরুষ মানেই কষ্ট। তাই বলে এতোটা কষ্টের ভার কেন নিতে গেলেন আমাদের এ কবি! তা যেমন আমাদের ভাবায় তেমনি তাঁর মানবরূপি মানবতার কষ্টে পাই আরেক চিত্র।যে চিত্রে কবি বলেন – “নিউট্টন বোমা বোঝ মানুষ বোঝ না” বিশ্বপূঁজিবাদের ভন্ডামি এবঙ বিজ্ঞানের উৎকর্ষতার ভেতরে মানুষের হত্যা নামক তাবিজটি নিয়ে এরকম চমৎকার কথা বলতে সক্ষম হয়েছে ব্যথাতুর প্রেমের বলিদানের পাঁঠা কবিতার রাজপুত্র কবি হেলাল হাফিজ। মানবতার কথা যেমন বলতে চেয়েছেন তেমনি তুলে ধরেছেন বিজ্ঞানের সচেতনতার কথা। অপব্যবহারের কথা, ইতিহাসের কথা।
কবির ভাষায় – প্রেমের কষ্ট ঘৃণার কষ্ট নদী এবং নারীর কষ্ট্/অনাদর ও অবহেলার তুমুল কষ্ট/ভুল রমনী ভালবাসার /ভুল নেতাদের জনসেবার/হাইড্রোজনের দুটি জোকার নষ্ট হবার কষ্ট আছে / কষ্ট নেবে কষ্ট! এরকম চমৎকার কষ্টফেরির মাধ্যমে কবি নিয়ে গেলেন সমাজবাস্তবতার মিথের কাছে। কবিতার পাঠে যেমন বিরহ পাই তেমনি পাই প্রতিবাদের এক শক্তিশালীভাষা।

কবিরা সাধারণত প্রেম ও প্রকৃতির নৈসর্গিক রুপেরঘরে বসবাস করে রচনা করেন কবিতা। পাঠক ও ভাবুক অথবা আলোচকগণ কবির কবিতাকে দেখে রাখে তৃতীয়চোখে। কারণ কবিরা শব্দ, বাক্য, উপমাকে সবসময় একার্থে ব্যবহার যেমন করেন না তেমনি রুপকার্থের বাসনে রেখে বাক্যের ভাঙচুর দেখেন। তখন কবিতা হয়ে যায় আলোচনার খোরাক।কবি হয়ে যান দর্শনশাস্ত্রের কেতাবি পুরুষ। তখন পাঠকমাত্রই কবিতার কবিকে খুঁজে নেন বাক্যের ঘ্রাণ অথবা আঁচল ধরে। তাই কবির ভাষায় “তোমার বুকের ওড়না আমার প্রেমের জায়নামাজ”,যখন এরকম কবিতার লাইন পড়া হয় তখন চোখের সামনে জ্বল জ্বল করে প্রেমের কথা, প্রেয়সির কথা। কিন্তু একই লাইন যখন কবিতার আদল ঠেলে বেগানার দিকে হাত বাড়াই তখন আমরা পাই দেশের কথা, দেশাত্ববোধের কথা। পুরো ভূমি কবির কাছে জীবনের জায়নামাজের আদর্শ বহণ করে। ভেতরে কাজুবাদাম ঠিক না থাকলেও কবি বিশ্বাস রাখেন দেশ ও ধর্মের উপমার কথা। প্রেয়সির বুকে এঁকে গেলেন জীবনের কথা, সুন্দেরের কথা, স্বাধীনতার কথা।

কবি আল মাহমুদের ভাষায়- কবিরা স্বপ্ন দ্রষ্টা” কবিরা প্রজন্ম ও জাতিকে সামনে যাবার পথ যেমন বাতলে দেয় তেমনি ভবিষ্যতের স্বপ্নের চারা রোপনে থাকে পথদ্রষ্টা। হেলাল হাফিজও তার ব্যতিক্রম নন। কবির ভাষায় – কথা ছিল একটি পতাকা পেলে /পাতা কুড়োনির মেয়ে শীতের সকালে/ওম নিবে জাতীয় সঙগীত শুনে পাতা মর্মরে” এরি নাম স্বপ্ন। আবার প্রত্যয়ও বটে। কবিতাকে ভালবাসতে জানলে প্রেয়সির সাথে মিলিয়ে ঘর করা যায় সাদা দ্যুতির আঁচল ধরে। নিদারুন কষ্টকে কবি বুকে নেন। ভালবাসেন আজল ভরে।কবির ভাষায়- এক জীবনে আর কতোটা নষ্ট হবে / এক মানবী আর কতোটা কষ্ট দেবে। ভেতরের কষ্টকে লালন করে কাটিয়ে দিলেন এক মানবীর জন্য। যে মানবীও আজ কষ্ট করে নষ্টের শ্বেত শাড়ি পরিধান করে বাতায়নে খুঁজে ফিরে তার প্রিয়কে। এক আশ্চর্য রসায়নের নাম যেমন কবিতা তেমনি আরেক আশ্চর্যের নাম হচ্ছে প্রেম। প্রেম নজরুলকে করেছে নারগিস হীনে, হেলেনা করেছে হেলাল হাফিজকে ঘরছাড়া। বিরহীর সাতকাহনে কবিরা আজ প্রেম পূজরি হতে হতে ভোগের পেয়ালায় রেখে যাচ্ছে তিতাপাতা স্বাদের আস্বাদন।

“আধুনিক কালের বিশিষ্টতা হচ্ছে শব্দের সম্ভাবনাকে সম্প্রাসারিত করা,তার ঐতিহ্য সন্ধ্যান, তার বর্তমান পরিচয়কে আবিস্কার করা এবং তার ভবিষ্যত সম্ভাবনা সম্পর্কে কৌতুহল জাগ্রত করা”(সৈয়দ আলী আহসান)
এ রকম কথার সাজুয্য খুঁজে পেতে বেগ পেতে হয়নি কবি হেলাল হাফিজের কবিতায়। কবির কবিতায় আমরা মধ্যযুগের সুশৃঙ্খল অট্টালিকার শৈলিও মাঝে মাঝে পেয়ে যায়।তবে সেকালে কবির স্বাধীনতার সীমাবদ্ধতা থাকলেও একালে তা নেই। তাই তার কবিতায় বিচরণ শীলতার চমকারিত্বে বিমোহিত হই।যত্নশীলতার ভেতরের কাঁথায় কবি এঁকে দিতে সক্ষম হয়েছেন কবিতার গতরখানি।

“এখন যৌবন যার যুদ্ধে যাবাার তার শ্রেষ্ঠ সময় ” কবি স্বাধীনতার কবি। মুক্তিযুদ্ধের কবি। এ রকম শ্লোগান নির্ভস্ব কবিতার প্রয়োজনীয়তা অথবা আবেদন সব সময় সব কালের জন্য প্রযোজ্য।কবি দেশস্বাধীনের প্রাক্কালে যুবসমাজের উপলব্দি এমনভাবে তুলে ধরে যুবক ও যুবাত্বকে স্মরণ করে দিলেন আজীবনের জন্য। সমাজ ও কবিতার আবেদন যতদিন থাকবে ততোদিন “এখন যৌবন যার মিছিলে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময়/এখন যৌবন যার যুদ্ধে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময় “চেতনাকে নাড়িয়ে দিবে নিশ্চিত।এ রকম অসংখ্য কবিতার লাইন কবিকে বাঁচিয়ে রাখবে। মাত্র একটি কবিতার বই এ কবিকে এনে দিলেন দেশের সর্বোচ্ছ সম্মান। কেনই বা আসবে না! যদি কবিতায় থাকে সমাজের কথা,মানুষের কথা,মা-মাটিও দেশের কথা তখন কবিকে পেছন,ফিরে আর তাকাতে হয় না। কবিতাই তাঁকে নিয়ে যাবে দ্বারে দ্বারে, মুখে মুখে প্রবাদের বাণীর মতো।

যে জলে আগুন জ্বলে ” দর্শন চিত্তের পতাকাবাহি অনেক ভারী একটি বাক্য এটি। যে জল থেকে একটি সমাজ,সভতা ও মানবতার আদল বের হয়ে আসে সে জলে ভস্মিভূত হবে সকল কলুষতা। তেমনি নেথ্যের জলে ছাই হওয়ার সুযোগ থাকে জীবনের সৌন্দর্যবোধ, সুস্থতাবোধ এবঙ শুভ্রতার লালিমা। কবির স্বপ্ন ও কামনার বস্তু কবিকে দিতে পারে একটি আদর্শের পতাকা। কবি আপনাকে সাধুবাদ। ভালবাসতে বাসতে ফুতুর করে দিলেন জীবনর পুরোটা অংশ। শব্দকে ভালবেসে কবিতা বানান যেমন করে তেমনি আগামী প্রজন্মের জন্য আপনার একটা অংশ রেখে যাবেন কবিতার ঘরে, ভালবাসাময় প্রজন্মের আঙ্গিনায়।

এরকম অসংখ্য সময়ের দাবি নিয়ে ভালবাসার কথা বলতে বলতে দেশ প্রেম ও সৌন্দর্যের সীমানায় কবিতার মাধ্যমে এঁকে দিলেন এক সামিয়ানা।
সে হলেন ‘ যে জলে আগুন জ্বলে ‘ খ্যাত কবি হেলাল হাফিজ। আজ এ কবির জন্মদিনে জানায় শুভেচ্ছা।