দোকানদার মাসুদ আমাকে একটা আধা পাকা পেঁপে হাতে ধরিয়ে বলল, মাস্টার! তোমার জন্য রাখছি।
আমি অবাক হইনি। তবে লজ্জিত। কারণ এই মুহূর্তে পকেট ফাঁকা। মানিব্যাগ সাথে আনিনি। ১০০টাকার একটা নোট লুঙ্গির ভাজেঁ নিয়ে এসেছিলাম। তিন বন্ধুর চা সিগ্রেট খাওয়া শুরু ইফতারের পর থেকেই। সারাদিন রোজা থাকার প্রতিশোধ। যেন সব খেয়ে ফেলি। কিন্তু না। সব খেতে পারিনা। রুচির পতন ঘটে ইফতারের পরপরই। কেন জানি করোনা কাল বলেই কিনা?

অবশেষে যার দোকানে সম্বল শেষ করেছি । তার কাছে পাঁচ টাকা ধার করলাম। দোকানদার বাদশা মিয়া অবাক।
কি কও, মাস্টর? পাঁচ টেহা! একশ লও!
না, না, আমি মাথা নেড়ে দীর্ঘশ্বাস ফেললাম।
আরো এক কাপ চা। আহ্! এক কাপ চা! কারণ বাদশা মিয়ার দোকানের চায়ের কেটলি পরিষ্কারের জন্য পুকুর দর্শনে গেছে। তারাবি নামাযের জন্য এতো তাড়াহুড়ো। এখন অন্য দোকানে চা খাওয়া ছাড়া উপায় নেই।

ভাবলাম পাশের দোকান থেকে শেষ চা খেয়ে বাড়ির দিকে পা বাড়াব। সাথের দুই বন্ধুকে বললাম, তোরা তো আর চা খাবি না! চল, আমি শুধু এক কাপ চা খাব। তার পর একসাথে চলে যাব। দুজনের কেউ কথা বলেনি। চুপচাপ। কারণ ৫ টাকার ইতিবৃত্ত তাদের জানা। তাদের পেট ভর্তি চা। আর কত খাবে! অনেক্ষণ একটার পর একটা চা আর সিগ্রেট চলছে। ইফতারের পর এখনও রাতের খাবার খাওয়া হয়নি কারো।
দোকানে ঢুকে আমরা তিনজনেই অবাক। দোকানের এককোনে বসে আছে রিপন সাধু। আমাদের তোতার মোড়ের শেষ রাতের প্রহরী। ছোট থেকে বড় সবাই সাধু বলে ডাকে। কেউ কেউ বলে রিপন সাধু। তিনি খুব খুশি হন।চোখ মুখ উজ্জ্বল হয়ে ওঠে।আঙুল তুলে আকাশ কে ইঙ্গিত করে বলে ওঠেন।
সব দয়ালের ইচ্ছা! সব দয়ালের ইচ্ছা!
মানুষের কাছে নিজের মর্যাদা, ভক্তি, শ্রদ্ধা অর্জনের জন্য সারাক্ষণ নানান ধরনের অদ্ভুত কথা বলেন। তার পরও রিপন সাধুকে দেখে সাধারণ মানুষের ভক্তি, শ্রদ্ধা কোনটাই হয়না। রোগা, বেঁটে লিকলিকে কালো চেহারা। প্রতিদিন তার পড়নে থাকে সাদা শার্ট ও সাদা ধুতি। মাথায় লম্বা চুল। গলায় ও হাতে সুতার মালা। এরপরও সাধারণ মানুষ তাকে তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করে।
আমি আংকেল বলে ডাকতাম।এজন্য তিনি একদিন খুব বিরক্ত হন। বললেন, মাস্টর! আমার নামডারে সম্মান দিলা না!
আমি বলি, কেমনে?
গুনী মানুষের নাম উপাধি সহ বলতে হয়। রিপন সাধু বইলা ডাকবা! আমি বলি, আপনি আমার বয়সে বড়। তাই আংকেল বলে ডাকি। আচ্ছা, এখন থাইক্যা রিপন আংকেল বলব। তিনি বললেন, শিক্ষিত মানুষরে বুঝানো খুব ঝামেলা! সবাই আমারে সম্মান দিয়ে সাধু বলে। আমি বলি, আচ্ছা, আপনারে আংকেল রিপন সাধু বলে ডাকব! এই যে মাস্টর! ফাইজলামি করলা! অশুভ আত্মার নজরে পরবা কিন্তু কইলাম। বললাম না শিক্ষত মানুষ গুলো খুব ঝামেলার। বদ হয়। শুধু রিপন সাধু ডাকবা! নাম লম্বা হলে লোকের কদর কমে। শিক্ষত মানুষ ভুল করলে মূর্খরা এ নিয়ে তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করে। আমি বলি, আচ্ছা, এখন থাইক্যা আমি আপনাকে রিপন সাধু বলে ডাকব, তাই তো! তিনি আনন্দে যেন ভাসলেন। আকাশের দিকে দুবার আঙুল নেড়ে বললেন, সব দয়ালের ইচ্ছা! সব দয়ালের ইচ্ছা! এই তো বুঝলা এহন। চায়ের দাওয়াত রইল।আচ্ছা, রিপন সাধু! আজ না অন্য দিন। আচ্ছা। বিকাল কইরা আইসা চা খায়া যাইবা।

আমি এখন রিপন সাধুকে দেখেই মুখ ফিরিয়ে নিলাম। না দেখার ভান আরকি! আমি দোকানদার মাসুদের দিকে ৫ টাকার কয়েন বাড়িয়ে বললাম,
এক কাপ চা দাও, মাসুদ।
আমরা তিনজন বসলাম। রিপন সাধু থেকে কিছুটা দূরে। অন্য বেন্ঞে। দেখলেই কি! সাধু মানুষের রাগ নেই। রাগ রাখলে সাধু হওয়া যায় না। মাসুদ বলল, এইডা কী ব্যাপার? লোক চার জন। চা এক কাপ। টেহা না থাকলে মাস্টর, ধার নেও। মাসুদ টাকা গোনায় ব্যস্ত। একশ, দুইশ…
আমি আর্তনাদ করে ওঠলাম। না, না, অলরেডি ৫ টাকা কর্জ করেছি। আর না। ঘরে টাকা আছে। রিপন সাধু মুমূর্ষ রোগীর মত বলল, আপনে আমারে লজ্জা দিছুন। মাসুদ পাচঁ টাকা ফেরত দে। আর চারটা চা দে। আমি আজ অনেক লজ্জা পাইছি। আপনে অপমান করছুন । কি আর করা! সব দয়ালের ইচ্ছা! আমি বললাম, না রিপন সাধু! অপমান না! আমরা কিছুক্ষণ হল চা খাইছি। প্রায় দশ বারো কাপ চা তিনজনের পেটে গেছে। ওরা দুজন খাবে না। রিপন সাধু আবার বলল, আইজ আপনে আমারে লজ্জা দিছুন। অনেক লজ্জা পাইছি। দিল রে কষ্ট দেওন ঠিক না। অন্য বন্ধু বলল, রিপন সাধু এই তোতার মোড়ে আমাদের শেষ ভরসা। আমাদের রাতের সঙ্গি। মৃদু হেসে আরেক বন্ধু বলল, মাস্টর! তুমি ওনারে দেখার পরও একটা চায়ের অডার দিতে না পারা! এটা তোমার চরম ব্যর্থতা! আর রিপন সাধু একা লজ্জিত না, আমরা ও লজ্জিত! কাজ টা তুমি ঠিক করো নাই।

আমি কথা বললাম না। সাধু লোকের সাথে হিসেব করে কথা বলতে হবে। রিপন সাধুর পক্ষ থেকে অবশেষে চায়ের দাওয়াত দেয়া হল। আনন্দের সহিত আমরা তিন বন্ধু সে দাওয়াত গ্রহন করলাম। প্রায়ই দিনই দেখা হলে চায়ের দাওয়াত দেন। আমরা সে দাওয়াত আগ্রায্য করতে পারি না। সাধু মানুষের দাওয়াত বলে কথা। আমার পক্ষ থেকে রিপন সাধুকে পানের দাওয়াত দিলাম। তিনি কথা বললেন না। বুঝতে পারছি তিনি বেশ মর্মাহত। আমার দাওয়াত গ্রহন করলেন কিনা বুঝা গেল না।

তখনই দোকানদার মাসুদ আধাপাকা পেঁপে আমার হাতে দিয়ে এ কথা বলল। আমি বলি, আমার সাথে তো টাকা নেই? দোকানদার মাসুদ বলল, আমি কি কইছি, এহন টাকা দিতে? পরে দিয়ো। কত দিতে হবে? তোমার যা মন চায়। তবুও তো!
কোন তবু নাই। তোমার যা মন চায়।

আমি কথা বলিনা। চা শেষ করে ওঠে পড়ি। আগেই বলেছি রিপন সাধু এই মোড়ের শেষ মানুষ । এখন তার ওঠা, প্রশ্নই আসে না। সবেমাত্র রাত সাড়ে আটটা । মাসুদের দোকান বন্ধ হলে মন খারাপ করে বেরিয়ে পড়বে। খুঁজে বেড়াবে কোথায় চায়ের দোকান খোলা আছে। থাকলে আনন্দে রাস্তার কুকুর কে বিস্কুট খাওয়াবে।বার বার বলতে থাকবে, সব দয়ালের ইচ্ছা! সব দয়ালের ইচ্ছা! সব বন্ধ থাকলে ও বলবে, সব দয়ালের ইচ্ছা! তারপর বাড়ির দিকে হাঠঁতে শুরু করবে।

তবুও আমি বলি, রিপন সাধু, যাবেন না? বললেন শীর্ণ গলায়, না, তোমরা যাও। আচ্ছা। আমরা বেড়িয়ে নিঃশব্দে হাঠঁতে থাকি তিনজন। আমার হাতে আধাপাকা মাঝারি সাইজের একটি পেঁপে।

রাত সাড়ে দশটা। খাবারের পর তাড়াতাড়ি শুয়ে পড়লাম। আমার বিছানা প্রস্তুত থাকে। সব সময়ের জন্য। মশারীর ভেতর শুধু ঢুকে পড়লেই হল। ইদানিং ঘুমের আগে ঘুমানোর সূরা পাঠ করে শুই। বিছানা থেকে মোবাইল সরিয়ে রাখি।কারণ মোবাইল ঘুমের ব্যাঘাত সৃষ্টি করে। হঠাৎ করে মনে হল, যদি মরে যাই। নামে বেনামে কতজনেই টাকা পয়সা পায় আমার কাছে। লিখিত ও অলিখিত। নতুন করে আজ আবার পাঁচ টাকা ধার করেছি। পেঁপের তো দামই নির্ধারণ করা হয়নি। চিন্তার বিষয়। তাইলে উপায়? মরে গেলে আমার ভাইবোনেরা কি এসব দেনা পরিশোধ করবে? অন্যসব ধার দেনা ছাড়াও তো, বাদশা মিয়ার কাছে পাঁচ টাকা। মাসুদ মিয়ার একটি আধাপাকা মাঝারি সাইজের পেঁপে। মরে গেলে যদিও চাইবে না হয়তো। কিন্তু হাশরের মাঠে জবাবদিহি করতে হবে তো! বন্ধুরা সাক্ষী দিবে। ভাই বোনদের হয়তো বলবে? ঋণ পরিশোধের জন্য? নাকি এরা তুচ্ছ ভেবে চেপে যাবে? না মরব না! বয়সই বা কত? না! তবু বিশ্বাস নেই। করোনা ভাইরাসে এমনিতেই আধা মরা হয়ে আছি।রাতে ভালো ঘুম হয়না। অস্তির অস্তির লাগে। মাঝে মাঝে বুক কেঁপে ওঠে। গলা শুকিয়ে আসে।কখনো শুকনো কাশি। কিংবা হঠাৎ গলা ব্যাথা।কখনো হালকা জ্বর অনুভব করি। মনে মনে বলি করোনা এলো নাকি? এই ভয়ে বৃদ্ধা মায়ের একশ হাত দূরে থাকি।ভুলেও সেদিকে যাইনা। মাস্ক ছাড়া বাইরে বেরুই না কখনো। তবুও সারাদিন মনে হয় মাথায় দুই মণের মাটির বস্তা নিয়ে ঘুরছি। হাজার চেষ্টা করেও মাথা থেকে এ বস্তা নামাতে পারছি না। ঘুমের মধ্যেও একই অবস্থা।

করোনা কোটি কোটি সুস্থ মানুষ কে এক মুহূর্তে অসুস্থ বানিয়ে দিল। আমি ও তা থেকে বাদ পড়ি নি। এই অসুস্থতা আগে সারানো প্রয়োজন। তারপর করোনা। এখন ঘুম আসলেই হলো। সেহরি খাওয়ার খুব ইচ্ছে। পরদিন ইফতারের সাথে পেঁপে থাকবে। যার দাম এখনও দেয়া হয়নি। আগামী কাল দোকানদার মাসুদের ওখানে চা খেতে গিয়ে রিপন সাধু কে চায়ের দাওয়াত দেব। তিনি সহসায় বলে ওঠবেন, সবই দয়ালের ইচ্ছা! আমার ও এক কাপ চায়ের খুব ইচ্ছে।