সাত সকালে রহিমা বুড়ির ঘরখানা নেমে গেলো। স্বামী-সন্তান কেউ থাকলে হয়তো ঘরের চালাখানা বাঁচানো যেতো। কিন্তু গেলো না। গাঁ-ঘর পাড়া পড়শি যে নেই, তা নয়। তবে সবাই আপন ঘর সামলাতে ব্যস্ত। সংসারের মাল.. থালাবাসন, হাঁড়িকুড়ি, তৈজসপত্র,খাট-চৌকি, ঘরের চালা, গরু-ছাগল, হাঁস-মুরগি, এমনকি ছাগল বাঁধা দড়ি কোনটাই তো ফেলনা নয়। সবকিছুই তো খেটে খাওয়া মানুষগুলোর শ্রম আর ঘামের ফসল।
ধাঁ-ধাঁ করে ধেয়ে আসছে প্রমত্তপদ্মা। পাড় ভাঙছে। তার সাথে নেমে যাচ্ছে জমিজিরাত গাছ এবং দু’একটি
গরু-ছাগলও। মানুষ যে মরে না তা নয় পাড় ধ্বসে নয়, পদ্মাজঠরে ভেসে যাওয়া মালামাল টানতে গিয়ে।
নেংটিপরা মানুষগুলো সারাদিন সর্বনাশা পদ্মার সর্বগ্রাসী ক্ষুধার সাথে পাল্লা দিয়ে মাল সামলায়। দৌড় ঝাঁপ চিৎকার আর ভিটে হারানো বিলাপে বাতাস ভারী হয়ে ওঠে।
সমস্ত কোলাহল আর বিষন্ন ভারী বাতাসকে চিরে ফালি ফালি করে দেয় রহিমাবুড়ির আঁতের সুতীব্র আর্তনাদ। উলঙ্গ-অর্ধোলঙ্গ শিশুরা তার পাশে ভিড় জমায়। বোবা দৃষ্টিতে দেখে। বড়োরা ‘ আহা’ করে,কিন্তু ব্যস্ততা কমে না।
দেখতে দেখতেই হাটখোলার পুরনো তেঁতুল গাছটা নদীর বুকে আছড়ে পড়ে। কেবল একটা ‘ ঝপ’ শব্দ অতঃপর একরাশি পানির ছলকানি। বিশাল বৃক্ষটা কয়েকবার ঘুরপাক খায় — এক সময় দৃষ্টির অদৃশ্যদিগন্তে মিলিয়ে যায়। এবার তরকারিপট্টির পালা। তারপর সরকারি খাদ্যবিভাগের বহু প্রাচীন গুদামঘরটা। তারপর…
মসজিদের মৌলবি আসতেই বৌঝিরা মাথায় কাপড় টানে তবে অন্যান্য দিনের মতো দেড়হাতি ঘোমটায় নিজেদের ঢাকে না, সরেও যায় না। পুরুষগুলো ব্যস্ততা না কমিয়ে তাকায় একবার।
কৌতূহলী শিশুদের ভিড় সরিয়ে রহিমাবুড়ির কাছে দাঁড়ায় মৌলবি। বলে, মারে ! কান্দিস না। আল্লাহকে ডাক।
বুড়ি বুক চাপড়ায়। আল্লাহ, আল্লাহরে…
বিমূঢ় স্তব্ধতায় দাঁড়িয়ে থাকে মৌলবি। কি বলবে ঠিক বুঝতে পারে না। বুড়ির মাথায় হাতখানা বাড়িয়েও কি যেন ভেবে, টেনে নেয়। পাঞ্জাবির হাতায় ঘাম মোছে।
উত্তরপাড়ার মজনু মাঝি এসে মৃদুস্বরে সালাম দেয়।
হুজুর । অ হুজুর…
মৌলবি যেনো শোনে না, ঠাঁই দাঁড়িয়ে থাকে।
হু-জু-র.. ডুকরে কাঁদে মজনু মাঝি। মৌলবি তাকায় তার দিকে।
হুুজুর, ভাতিজ্যাটার লাশ পাওয়া গেছে… জানাজা দিতে হৈবে।
কোন্ঠে পায়্যাছ ?
দরগাপাড়ার ঘাটে। দুদিনের ডোবা লাশ ফুয়ল্যা ঢোল চিন্হ্যায় দায়। বেটিটার মুখের দিকে তাকাইতে পারি না। ফিট হোয়্যা যায়ছে বার বার। আয়সেন…
গত পরশুদিন রাতে মজনু মাঝির এতিম ভাস্তেটা ডোবে। ঘরনামার সময় বাপের আমলের একখানা আমকাঠের বাক্স ভেসে যায়। মুরুব্বিদের মানা না মেনে জলে নেমেছিল সে। বাক্সটার মধ্যে তার বিয়ের খরচ ছিল। মজনু মাঝির মেয়ের সাথে তার বিয়ের কথা পাকা হয়েছিল।
হাতের তালুয় মাঝি চোখ মোছে। বলে, লাশে গন্ধ ধৈর্যাছে, স্যাঁকালে যায়তে হৈবে।
মজনু মাঝির সাথে হাঁটতে থাকে মৌলবি। দক্ষিণ টোলার ঝাঁকড়া ফজলি গাছের কাছে যেতেই একটা আলগা লোক সালাম দেয় তাকে। উত্তর দিয়ে মৌলবি চলে যাচ্ছিল।
হুজুর…
পেছনে ফিরে তাকায় মৌলবি। লোকটি এগিয়ে এসে হাত ধরে তার। বলে, হুজুর, হামাকে চিনতে পারলেন না ? হামি তবারক আলি।
মুখভর্তি কাঁচাপাকা দাড়ি, সাদা চুল, উঁচু চোয়াল, কোটরাগত চোখ — হুজুর আলগা লোকটাকে ভালো করে দেখে। নাহ্ কোনদিন দেখেনি বলেই মনে হচ্ছে। ভাবে, মৌলবি মানুষ… কোথায় কখন জালসা মিলাদে জানাজায় গেছে, তখন আলাপ টালাপ হয়ে থাকতে পারে। ওরকম দু’চারটে কতো লোকের সাথে তো বাত্বিচাত হয়ে থাকে; সবইকে তোর আর চিনে রাখা যায় না। সংরক্ষিত স্মৃতির অতীত হাতড়ে ব্যর্থ হয়ে বলে, না। চিনতে পারনু না আপনাকে।
তবারক, হামি তবারক। খেই ধরিয়ে দেয়ার চেষ্টা করে লোকটি। ঐ যে, চিথলমারির চরে জোড়া খুন হৈল। সোহরাব আর আজু লাইঠেল মরল।
সহসা বুঝতে পারে মৌলবি। কথা কেড়ে নিয়ে বলে, পাতু মেম্বারের ভাতিজা তো ? তা কখন ছ্ড়াা পায়ল্যা ?
গতকায়ল হুজুর।
মনে পড়ে ঊনিশ বছর আগে খুন হয় সোহরাব মৃধা আর আজু লেঠেল। তবারকদের লিজ নেয়া চর দখল করতে চেয়েছিল সোহরাব। পঁয়ত্রিশ বছরের সুঠামদেহী যুবা তবারক। লাঠিও চালাতে পারে চরকির মতো। সুদক্ষ হাতের নৈপুন্যে পাকা বাঁশের তেল খাওয়া লাঠির শৈল্পিক ঝড় সাঁই সাঁই করে বাতাসের বুকে শিস কাটে।
চোরাকারবারি আর জালিয়াতি করে খুব টাকা করেছিল সোহরাব মৃধা। লোকে ভয় করতো তাকে। দুর্বলদের জমি দখলে খুব একটা বাধা পায়নি সে অনেকেই নীরবে সরে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু সরেনি তরাবক। সোহরাব ভেবেছিল, টাকা আছে ভাড়া লেঠেলেই কাজ হবে। থানা পুলিশ তো কেনা আছে। কিন্তু তবারকরা মাত্র তিন ভাইয়েই জবর খেল দেখায়। কুড়ি-বাইশ জনের একটা দল সেদিন পালিয়ে বাঁচে — বাঁচেনি শুধু সোহরাব আর আজু লেঠেল। ফলে সতের বছরের জেল হয়ে যায় তবারকের।
এ সব কইর্যা কি পাইল্যা ? তোমার কাগজদলিল তো ঠিক ছিল আদালত কইর্যাই তো জমি তোমার থাকতো।
কিচ্ছু না হুজুর। জীবন যৈবন সব মাটি হৈল। যে চরের লাইগ্যা খুন করনু, জেল খাটনু পদ্মার চর তো পদ্মায় খাইলো হুজুর। হু হু করে কাঁদে তরাবক।
তেবে ?
কষ্টের আবাদ করা কালাই আর সরিষা হুজুর বাতাসে লাছন তুলতো। দেয়খ্যা জান ভয়র্যা যায়তোক। জ্বলজ্বয়ল্যা চোখের সামনে অন্য লোক লাঠির জোরে হামার ফসল কাটবে, সহ্য করতে পারিনি হুজুর। এখন হৈলে সহ্য কৈর্যা লিতুন তখন রক্তের গরম ছিল হুজুর ! তবারকের চোখের জল মৌলবির হাতের উপর পড়ে এক ফোটা।
শুয়ন্যাছি জেল খাইট্যা পাপ মাফ হয় হামার হৈবেনা হুজুর।
সব আল্লাহর ইচ্ছা।
তবু তওবা করবো হুজুর। হামাকে তওবা করান
ভাটিব্যালা মসজিদে আয়সো। বলে হাঁটতে থাকে মৌলবি।
নদীর ভাঙ্গন থেকে বাঁচার জন্য দু মাইল দূরে মজনু মাঝির ভাস্তের লাশ দাফন করা হলো। কাছাকাছি মসজিদ নেই বলে গোরস্থানের আমবাগানে জামায়াত করে জোহরের নামাজ আদায় করে মৌলবি।
গোরস্তানের আম বাগান থেকে পথে নেমে বেলা দেখে মৌলবি। সূর্য মাঝআসমান থেকে হেলে গেছে। তাতারোদের ভেতর বাতাসে নাচে ধান-কাউনের শিষ। এ ক্ষেতের যেখানে শেষ সেখানে দিগন্ত ছুঁয়েছে ধুলোর জমিন। ক্ষেতের ভিতরে বাবলা গাছের মাথায় বসে একটা কাক ডাকে কর্কশ।
মৌলবির পৈত্রিক নিবাস ফরিদপুর। শুধুই জীবিকার সন্ধানে যখন সে এখানে আসে তখন তার বয়স বত্রিশ। পদ্মাতীরের গাঁয়ে টিনের চালা দেয়া কাঁচামাটির মসজিদটিকে তার বড়ো পছন্দ হয় এত্তো বড়ো মসজিদ! এত্তো মানুষ! মানুষগুলোকে একটু রুক্ষ মনে হয়। ভাষাটা বোঝা গেলেও কেমন যেনো কাঠখোট্টা ঠেকে। তবে ধীরে ধীরে সয়ে যায়। এখানে জমি নিয়ে বিরোধ বাধে, চরদখলের ডংকা বাজে, মানুষেরা চোরাকারবার করে সীমান্ত রক্ষীদের তাড়া খায় গুলি খায়। তবু সবাইতো নয়,ওরা অল্প ক’জন। সব মিলিয়ে মানুষগুলো ভালোই। ফলে একদিনের রুক্ষ মনে হওয়া মানুষগুলোই একসময় নিকট থেকে স্বজন হয়ে যায়। বড়োরা সালাম দেয় সমীহ করে, ছেলেছোকরারা বিড়ি লুকায়,হল্লা থামায়,বৌঝিরা ঘোমটার আড়ালে জড়োসড়ো হয়। ঈদ-বিয়ে আর রোজা- মিলাদে দাওয়াত পায়। বিচার-শালিসেও ডাক পড়ে।
একটা পাকা মসজিদের স্বপ্নে বিভোর হয় মৌলবি। মেলা টাকা দরকার তবু দমে না সে। মসজিদের বাইরে বাঁশের খুঁটির সঙ্গে ঝোলানো দানবাক্সটার পয়সায় লন্ঠনের তেল কেনার পর অবশিষ্ট থাকে না কিছুই। জুমাবারের কৌটার পয়সা থেকে কিছু জমা হয়। মিলাদে-মাহফিলে দরজা গলায় ওয়াজ করে মৌলবি। মহিলাদের পাশাপাশি পাপি মানুসগুলো গুনাহ্খাতা থেকে পানাহ্ পাবার প্রত্যাশায় পাঁচ দশটাকা দান করে। মোনাজাতের সময় হুজুরের কন্ঠের সাথে কন্ঠ মিলিয়ে কাঁদার চেষ্টা করে কাঁদেও কেউ কেউ।
বাবা অনেক বছর আগেই বিগত। মাসে দুমাসে মার কাছে যায় দু’একদিনের জন্যে। মাকে আনতে চেয়েছিল, কিন্তু স্বামীর বসতভিটে কবর ছেড়ে আসতে কিছুতেই রাজি হয় নি। মায়মুরুব্বিদের কথায় বিয়েও করে মৌলবি নূরবানুকে। মৌলবি এবার আপনকে পায়। কি জানি কি রোগে ভোগে নূরবানু ; মা হতে পারেনা। তবু সে বড়ো ভালোমেয়ে তাকে ভালোবাসতে গিয়েই ধীরে ধীরে তার ভেতরে নিজেকে হারায় মৌলবি নিজের আঞ্চলিক ভাষাটাও হারায়। এ গ্রামের মানুষগুলোর মতো একদিন এখানকার ভাষাটাও তার আপন হয়ে ওঠে।
উত্তরপঞ্চাশে বাপ হয় মৌলবি। পাশের গ্রাম পলাশপুরের এক সখের হোমিও ডাক্তারের এক শিশি ঝাঁঝালো তরলেই চিররোগা বৌটার গা-গতরে বান ডেকে যায়। পদ্মাতীরের গৌড়বঙ্গীয় রমণীর যৌবনে জোয়ার আসে। বছর না ঘুরতেই বাপ হয়ে যায় সে। কিন্তু মা হতে গিয়ে মারা যায় নূরবানু। শিশুপুত্র আব্দুল্লাহর কচি মুখের মাঝে নিজেকে দেখে নূরবানুকে খোঁজে।লোকে আবার বিয়ে করতে বলে। কিন্তু মৌলবি আর সংসারে জড়ায় না। বলে, আর লয়। এবারে মসজিদটা গড়ি। আব্দুল্লাহর দেখভাল করে স্বজনবিহীন রহিমাবুড়ি।
মৌসুমি ফসল পাকে। মানুষ ফসল কাটে। শীতের মেলায় দেখা গম্ভীরার সুর তোলে, আলকাপের গান গায়।
মৌলবি মসজিদের চাঁদা নিতে মাঠে যায়। হুজুরকে দেখে তারা মুখ বুজে। তবু হাওয়ায় ভাসতে থাকা সুরের ব্যঞ্জনা মৌলবির কানে যায়
হে নানা, পান্তা খায়্যা কালাই কাটি ধার নাই হাঁর কাইদ্যাতে
পদ্মায় খায়ছে ডিহিডাবর দ্যাশ খায়ছে নেতাতে । নানা হে…
ও হে নানা, বড়োব্যাটা গরুবকরি কুলাকাঠা
ভাগ কোয়র্যা জুদা হৈলো শান্তি নাই হামার মনে । নানা হে…
সালাম হুজুর।
অয়াআলাইকুমুস সালাম। বিশুদ্ধ উত্তর দেয় মৌলবি। বলে, গান গায়হো না। পাপকাম খোদা ব্যাজার হৈবে। আল্লাহর নামে আল্লাহর মসজিদে দানধ্যান কর, গরীবগুরুয়াকে দান কর, ধর্মকর্ম কর। আচ্ছা আইনুদ্দিকে দেখছি ন্যা ক্যানে ? সে তো তোমাদের সোথে কালাই কাটে। গত ওয়াক্তেও মসজিদে যায়নি।
অর মাইজকোল ব্যাটা হুজুর তিন দিন থায়ক্যা বাড়ি আসেনি। ইন্ডিয়া গেছিল বেলাকের মাল লিয়্যা। গত সাঞ্ঝে বিডিআরে গুলি ছায়ড়্যাছিলো। দুজন বেলাকি মৈর্যাছে। আইনুদ্দিন দেখতে গেছে ওর ব্যাটা ঐখ্যানে আছে কি না ?
ইন্নালিল্লালে ওয়া ইন্না ল্লিলাহে রজেউন।
ধামা ভর্ত্তি করে মৌসুমিশস্য আল্লাহর ঘরে দান করে মানুষ। মসজিদের বারান্দায় ফসলের রাশ উঁচু হতে থাকে। একটা পাকা মসজিদের স্বপ্নে ঝলকায় মৌলবির দুচোখ গোলভাটায় পোড়া, লাল ইটে গাঁথা মসজিদের জানালা দিয়ে আসা নদীর হাওয়ায় স্বস্তি অনুভব করে মৌলবি কাতারবন্দি মানুষ নামাজে দাঁড়ায়, নতজানু হয়, সেজদা করে বাচ্চারা সুর করে সিপারা পড়ে মৌলভি স্বপ্নে বিভোর।
সত্যি সত্যি একদিন স্বপ্নটা সত্য হয়। খুশিতে শুকরিয়া নামাজ আদায় করে। সারারাত নফলনামাজ পড়ে বিগলিত কান্নায় দাড়ি ভেজে, জামা ভেজে। সকালে বৌ-র কবর জিয়ারত করে।
সালাম হুজুর ও হুজুর, শুনতে পায়ছেন ? মৌলবির সম্বিত আসে। সামনে আলতু মাছুয়া। মৌলবি তাকায় তার দিকে। বলে, কিছু কহিল্যা?
সালাম দিয়্যাছি হুজুর।
অয়াআলাইকুমুস সালাম।
এই রোয়দের ভিতির খাড়ো হৈয়্যা কী করছেন হুজুর? ঘায়ম্যাতো গোছল
গামছায় মুখ মোছে মৌলবি। একটু লজ্জা পায়। বলে, কিছু লয়। মাছের বাজার ক্যামন?
লদ্দি যতো ভাঙছে মাছও ততো ক্ষেপছে। তেবে ব্যাবাক মাছ ইন্ডিয়্যা চয়ল্যা যায়ছে। মাছের দরে আগুন লায়গ্যাছে। জলদি বাড়ি চলেন। হাট খোলার গুদাম তরকারি পট্টি আর মুন্সির চাইলের আড়ত নায়ম্যা গেছে। বাড়ির মাল সাঁটতে হৈবে।
মাগরেবের ফরজ নামাজের সেজদার সময় একটা নারীকন্ঠের চাপা গোঙানি শুনতে পায় মৌলবি কান্নার কষ্টের। সালাম ফিরিয়ে জিজ্ঞেস করে, কেটা কান্দে?
হাসমত শেখের বউ কুলসুম।
ক্যানে ? আবার পিট্যাছে ?
না হুজুর। পঁহাত থাইক্যা ব্যথা উঠ্যাছে। খালাস হৈছেনা।
বিড়-বিড় করে মৌলবি। আল্লাহ,খালাস কর। মাবুদ
মসজিদের বারান্দায় দাঁড়িয়ে হুজুরের অপেক্ষা করে হাসমত শেখ। নামাজ শেষ করে মৌলবি। হাতের তসবিতে ক্ষীণশব্দ।
পানিটা পয়্ড়্যা দেন হুজুর। হাতের বাটিটা সামনে এগিয়ে দেয়। সকাল থায়ক্যা
শুয়ন্যাছি মৌলবি পানি পড়ে। বলে, আল্লাহকে ডাক।
হাসমত শেখের চোখ থেকে পানি ঝরে। ভাঙ্গা স্বরে বলে, আল্লাহ, আল্লাহ
নামাজ পড়ছিত ?
পড়বো হুজুর
পড়বো লয়, এখন থায়ক্যা পড়েক।
হাতের বাটি আগলে দৌড়ে বাড়ি যায় হাসমত শেখ। একটু পরে ফিরে এসে মসজিদের কলতলায় দাঁড়ায়।
ফের কিছু হৈল নাকি?
না হুজুর। নামাজ পড়বো।
নামাজ পড়ে হাসমত শেখ। পশ্চিম আকাশে লাল আভা তখন আর নেই।
এশার আযান দেয় মৌলবি। আল্লাহ আকবর, আল্লাহ আকবর
এ সুরের সাথে বাতাসে আরেকটা সুর ভাসে কান্নার জন্মের আনন্দের। খালাস হয়েছে কুলসুম।
এশার নামাজের মুসল্লি অন্যান্য দিনের তুলনায় আজ প্রায় অর্ধেক। কারণটা ভয়।
বাসার আলি মাষ্টার বলে, হুজুর এখানে নামাজ পড়বেন ? খুব ধ্বসছে। মসজিদ থেকে মাত্র হাত চল্লিশেক দূরে।
যদি
ইনশাল্লাহ পড়বো।
মৌলবির সাথে সাথে মসজিদে ঢোকে হাসমত শেখ। অন্যান্যরাও দুরুদুরু বুকে ভেতরে যায়। নামাজের মধ্যে পদ্মার ভাঙন শোনা যায়। শেষ রাকাতের সময় কলতলা ভাঙার শব্দ আসে। নামাজ শেষ করে মেহরাবের তাক থেকে কুরআনখানা বুকে ধরে বেরিয়ে আসে মৌলবি।
মসজিটা নামছে। পাশে দাঁড়িয়ে মৌলবি। কথা বলে না। ভয় করে না। একটা অব্যাক্ত বেদনায় বোবাদৃষ্টি, যেন ফ্যাল ফ্যাল করে তাকায় তার স্বপ্নের দিকে। স্বপ্নের শিকড় ছিঁড়ছে, ছিঁড়ে যায়। মানুষ হাত ধরে দূরে সরায়। সকলের বোবাদৃষ্টি, যেন পাথরের মুখ।
মাত্র আধঘন্টার মধ্যে মসজিদটা নেমে যায়। ওখানে রাজ্যের পানি শোঁ শোঁ শব্দ তুলে ঘুরপাক খায়। বোঝা যায় না যে ওখানে একটা পাকা মসজিদ ছিল। মৌলবি তাকিয়ে ওদিকে। চাঁদের আলোয় ঝকমকে পানির উপরে ওজুর বদনাটা চোরকির মতো ঘোরে। এতক্ষনে হু হু করে কেঁদে ওঠে মৌলবি। শব্দ করে কাঁদে। অথচ নূরবানূর মৃত্যুর সময়ও শব্দ করে কাঁদেনি মৌলবি।
মাঝরাতে সবাই ঘুমোতে যায় মৌলবিও। মেম্বারের বৈঠকখানায় একটা কাঠের চৌকিতে বাপ-ছেলে শুয়ে। ঘুম আসে না মৌলবির। নূরবানুর মৃত্যুর রাতেও এমন হয়েছিলো। এক সময় ঘুম আসে তার একটা সবুজ সুন্দর মাঠে মখমলের মতো নরম ঘাসের উপর লকলকে যৌবনা গৌড়বঙ্গীয় রমণী নূরবানু হেঁটে যায়। বাতাসে আঁচল ওড়ে। ঘাসের উপরে তার পদছাপ
কাকনিদের স্বপ্নটা ভেঙ্গে যায়। বিড় বিড় করে বলে, আল্লাহ ! তাকে সুখে থুয়ো।
আবারো তন্দ্রা আসে ঘুম আসে। একটা সুন্দর মাঠ মখমলের মতো নরম ঘাস। একটা খুব শান্ত নদী। নদীর পাশে অবিকল সেই মসজিদটা। নদীতে অজু করে মৌলবি। সিঁড়ি ভেঙ্গে মিনারে ওঠে। মিষ্টিকন্ঠে আযান দেয় আল্লাহু আকবার, আল্লাহ আকবার আসসালাতু খায়য়রুম মিনাননাউম।
পুত্রের ধাক্কায় তার ঘুম ভাঙে। কি রে ধাক্কা দিছিস ক্যানে?
বাপু, তুমি নিন্দের ভিতিরে আযান দিছো ক্যানে ? পুত্রের ভয়ার্ত কন্ঠসর। পুত্রের কথায় মনে মনে একটু লজ্জা পায়। ঘুম আর আসে না। ভাবে, দেশে ফিরে যাবে নাকি। বাপের বসতে অন্তত দু’খানা ঘর সে পাবে। বিঘা দেড়েক জমিও পাবে। কিন্তু মত পাল্টায়। এতোগুলো মানুষ ফেলে একা যাবে না কোথাও। এরা ভালো মানুষ। এখানে জমি নিয়ে বিরোধ হয়, চর দখলের ডংকা বাজে, মানুষেরা চোরাকারবার করে সীমান্তরক্ষীদের তাড়া খায়, গুলি খায়। তবু এরা ভালো মানুষ। এরা বড়ো সহজ সরল।
বাইরে বেরিয়ে এসে আকাশ দেখে মৌলবি। আযানের সময় হয়েছে। নদীর পাড়ে আযান দেয়। ঘুমকাতর মানুষেরা ঘুম ফেলে ছুটে আসে। নামাজ পড়ে কাতারবন্দি মানুষ। মৌলবি মোনাজাত করে। মোনাজাতের শেষ উচ্চারণ আল্লাহ, হাঁরাকে আশ্রয় দ্যাও এই দুনিয়ায় এবং ঐ দুনিয়ায়। আমিন। চোখের পানি মোছে। তারপর বলে, তোমাদের গোছগাছ সাঁটাসুঁটি হোয়্যাছে
জ্বী হুজুর। হোয়্যাছে।
তবে চলো, সকাল সকাল বাহির হই।
অতঃপর বাষট্টি বছরের বৃদ্ধ মৌলবি এসান উদ্দিন বাম হাতে নাবালোক পুত্র আব্দুল্লাহর হাত ধরে। অন্য হাতে বুকে ধরে পবিত্র কুরআন।
পেছনে রহিমা বুড়ি, হাসতম শেখ, সদ্যজাত শিশু কোলে কুলসুম,মজনু মাঝি, তার অপয়া মেয়ে, আবালবৃদ্ধবনিতা , নদী গর্ভে বিলীন হয়ে যাওয়া গ্রাম, চরসুন্দরপুরের সমস্ত মানুষ গৃহপালিত পশুগুলোও
আধা-অন্ধকারের ভেতর নিরাশ্রয়ী মানুষেরা পথ ভাঙে পদ্মাবিহীন আশ্রয়ের সন্ধানে। দূরে অস্পষ্ট দিগন্ত। ওরা হাঁটতে থাকে।