এতেকাফ অর্থ অবস্থান করা, কোনো স্থানে থেমে যাওয়া। ইসলামী শরিয়াতের পরিভাষায় এতেকাফের অর্থ হল, জাগতিক সকল কর্ম থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পরিবার-পরিজন থেকে আল্লাহর উদ্দেশ্যে একান্তভাবে ইবাদত করার জন্য মসজিদে অবস্থান করা। একজন মুসলিম তার যাবতীয় কার্যক্রম, চিন্তা-চেতনা, কামনা-বাসনা, মেধা ও শ্রমের ব্যবহার এবং নিজ যোগ্যতাকে কিছু দিনের জন্য মহান প্রভুর স্মরণে নিয়োজিত করে ঈমান ও আমলকে বৃদ্ধি করবে। এভাবে সে আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভে ধন্য হবে বিশুদ্ধ নিয়তে যথাযথ আমলের মাধ্যমে। এতেকাফের উদ্দেশ্য সম্পর্কে আল্লামা ইবনুল কায়্যিম (রহ) বলেন, “গায়রুল্লাহর মোহময় বেড়াজাল থেকে মুক্তি লাভ করে আল্লাহর সাথে গভীর ও প্রেমময় সম্পর্ক স্থান করে।”

এতেকাফের প্রকারভেদ:
এতেকাফ কয়েক ধরনের। যথা ওয়াজিব (মানতের এতেকাফ), সুন্নাত (রমজানের এতেকাফ) এবং মুস্তাহাব।

এতেকাফের শর্তসমূহ:
মুসলমান হওয়া, নিয়ত করা, বালেগ হওয়া, পবিত্র থাকা এবং পুরো সময় মসজিদে অবস্থান করা।

মহিলাদের এতেকাফ:
স্বামীর অনুমতি নিয়ে এতেকাফ করতে হবে। ঘরের এককোণে পর্দাসহকারে করতে হবে। সন্তান প্রসব বা গর্ভপাত হলে বা হায়েয হলে এতেকাফ ছেড়ে দিতে হবে। যদি মসজিদ পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ও পর্দার ব্যবস্থা থাকে তাহলে মসজিদেও করা যাবে, তবে মহিলাদের জন্য ঘরই উত্তম বলে জ্ঞানীগণ বলেছেন।

এতেকাফের সময় করণীয়:
এতেকাফ অবস্থায় চুপচাপ বসে থাকা, বাজে ও বেহুদা কথা বলা মাকরূহ। নফল সালাত, যিকির-আযকার, তাসবিহ-তাহলিল, কুরআন ও হাদিস অধ্যয়ন এবং জ্ঞানচর্চা করা উচিত।

এতেকাফ ভঙ্গ হওয়ার কারণ:
যিনি এতেকাফ করেন তাকে মুতাফিক বলে। প্রাকৃতিক ক্রিয়া-কর্ম তথা প্রস্রাব, পায়খানা, ফরয গোসল এবং যদি কেউ খাদ্য এনে দেয়ার মত না থাকেন তবে বাইরে যেতে পারবেন। এছাড়া আর অন্য কোনো কারণে গেলে এতেকাফ ভঙ্গ হয়ে যাবে। এছাড়া ইসলাম ত্যাগ করলে, হায়েজ ও সন্তান ভুমিষ্ঠ হলে (মেয়েদের), স্ত্রী সহবাস করলে, বীর্যপাত ঘটালে, মুতাফিককে কেউ জোর করে বের করে দিলে এতেকাফ ভঙ্গ হয়ে যাবে।

এতেকাফের গুরূত্ব:
মাহে রমজানের শেষ দশক খুবই গুরুত্বপূর্ণ সিয়াম পালনকারীদের জন্য। আল্লাহর রাসূল (সা) শেষ দশককে খুবই গুরুত্ব দিতেন। মাহে রমজানের শেষ দশকে এতেকাফ করা সুন্নতে মুয়াক্কাদা কেফায়া (সুন্নাত)। একটি মসজিদ এলাকার মুসল্লিদের মধ্য থেকে কাউকে না কাউকে এতেকাফ করতেই হবে, নয়তো সবাইকে গুনাহগার হতে হবে। এতেকাফ ১০ দিন বা ৯ দিন নয়, ইচ্ছে এক বা একাধিক দিনও করা যায়।
হযরত আয়েশা রা. বলেছেন, রাসূলে পাক সা. রমজানের শেষ দশকে এতেকাফ করতেন। ইন্তেকালের আগ পর্যন্ত এ নিয়ম তিনি পালন করেছিলেন। তাঁর ইন্তেকালের পর তাঁর পবিত্র স্ত্রীগণ এতেকাফের এ সিলসিলা জারও রাখেন। (বুখারি)

হযরত আবু হোরায়রা রা. বলেছেন, রাসূল সা. প্রতি রমজানে শেষ দশদিন এতেকাফ করতেন। কিন্তু যে বছর তিনি ইন্তেকাল করেন, সে বছর বিশ দিন এতেকাফ করেন। (মুত্তাফাকুন আলাইহি)

ইসলাম বৈরাগ্যবাদকে কখনো সমর্থন করে না। সমাজ-সংসার, লোকালয় ছেড়ে নির্জনে ধ্যানমগ্ন হয়ে সন্ন্যাসব্রত গ্রহণ করাকে বাতিল করেছে। রমজান মাসের এই এতেকাফ বা মসজিদে অবস্থান আল্লাহ প্রাপ্তির অপূর্ব সুযোগ। এটি অত্যন্ত ফজিলত ও গুরূত্ববহ। এতেকাফের কারণে ব্যক্তির লাইলাতুল কদর প্রাপ্তিও ঘটে যায়। কে হতে পারেন এত বড় সৌভাগ্যবান-যার লাইলাতুল কদর প্রাপ্তি হয় এতেকাফের বদৌলতে। রাসূল সা. বলেছেন, যে ব্যক্তি একদিন এতেকাফ অবস্থায় মসজিদে অতিবাহিত করে জাহান্নাম তার কাছ থেকে আসমান-জমিনের দূরত্ব তিনগুণ দূরে সরে যায়।
এতেকাফ গুণাহসমূহ মুছে দেয় এবং নেক আমলের পাল্লাভারী করে। রাসূল সা. এরশাদ করেছেন, “এতেকাফকারী নিজেকে গুনাহ হতে বিরত রাখে এবং নেককারদের সকল নেকি তার জন্য লিখা হয়।” (ইবনে মাযা)
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. থেকে বর্ণিত, রাসূল সা. বলেছেন, যে ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে একদিন এতেকাফ করে, আল্লাহতায়ালা কিয়ামতের দিন তার মধ্যে এবং জাহান্নামের মধ্যে তিন খন্দকের ব্যবধান করবেন। এক খন্দক সমান পাঁচশত বছরের পথ। রাসূল সা. আরো বলেছেন, যে ব্যক্তি রমজানের শেষ ১০ দিন এতেকাফ করে, তা দু’হজ্ব এবং দু’উমরার সওয়াবের সমান। (বায়হাক্বী)

যদিও বছরের অন্যান্য সময়ও নেয়া যায় এতেকাফ, কিন্তু এর অনুশীলন সমাজে খুব একটা নেই। তাই এতেকাফের মত বড় নেয়ামত আল্লাহ আমাদের জন্য রমজানে দিয়েছেন তার জন্য শোকরিয়া আদায় করা দরকার। সুযোগ থাকলে পৃথিবীর যে কোনো মসজিদে এতেকাফ করা যাবে। বায়তুল্লাহ এবং মসজিদে নববিতে সবচেয়ে বেশি ফজিলত। আবার মুসল্লি যেখানে নিয়মিত সালাত আদায় করেন সেখানেও এতেকাফ করার হক বেশি এবং উত্তম। তাই আধ্যাত্মিক উৎকর্ষ সাধনের জন্য লোকালয় ছেড়ে, জনবিচ্ছিন্ন হয়ে, বন-বাদাড়ে যাওয়ার অনুমতি ইসলামে নেই। আত্মার পরিশুদ্ধি এবং নৈকট্য অর্জনের জন্য এতেকাফ একটি শ্রেষ্ঠ পদ্ধতি। যেদিন অন্ধকার কবরে কোনো সাহায্যকারী ও অভিভাবক থাকবে না, সেদিনের জন্য এ মহামূল্যবান সময়গুলো পাথেয়রূপে দিশা দেবে। মহান আল্লাহ আমাদের সবাইকে তাঁর দ্বীনকে সঠিকভাবে বুঝার এবং মেনে চলার তৌফিক দিন। আমিন।