রাতের এখন কোন পহর বোঝাযাচ্ছে না। ঝুম বৃষ্টি। ম্যাক্সিম গোর্কিতে মুখ লুকিয়ে আছি। ছাব্বিশ জন পুরুষের হৃদয়ের পুষ্পিতা একজন নারী। তানিয়া। তারা তাকে রোজ অভ্যর্থনা জানায়। হাসে। যেদিন আবিষ্কার করলো তানিয়া অন্য এক সৈনিকের সাথে সম্পর্কিত সেদিন সব পুরুষ তাকে আক্রমণ করলো। দাঁতালো ভাষায় গালি থেকে মারপিটে উদ্যত হল। তানিয়া সেদিন দুঃখ পেয়ে চলে গেলো। আর ফিরলো না। সেই পুরুষদের দরজায় আর কোন দিন সূর্যের আলো আসেনি। এক ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়লো চোখের কোণ থেকে। কিছুক্ষণ স্তব্ধো হয়ে রইলাম। প্রকৃত সত্যকে এড়িয়ে যাওয়া যায় না। খুব মনে পড়ছে তোমাকে। কেমন আছো তুমি? কেমন আছে নীলকণ্ঠ পাখিটি! কোন সাড়া নেই!
আমি আর সাগর। কেউ কাউকে খুব চিনি না। মাঝে মাঝে কথা হয়। দেশ আর দেশ। কোথায় কে কী অনিয়ম করছে তাকেই যেন খুঁজে বের করতে হবে! নিউজ করতে হবে। এ এক কঠিন উন্মাদনা! আমিও যেন রঙিন এক ঘোরে পড়ে গেলাম! এদেশ কী লুটের মাল! যেমন ইচ্ছে লুট করবে? আজ বাংলাদেশ ব্যাংক,কাল সোনালী ব্যাংক. পরশু বেসিক ব্যাংক! ব্যাংক পাড়া লুট, শেয়ার বাজার লুট এ! এ সব নিয়ে সাগরের যেন উন্মাাদনার শেষ নেই। এই তো আজকের রিপোর্ট পেয়ে রমনা থানার ওসি সাসপেন্ড। এ দুর্নীতির যুগে সাগরের সাহসী পদক্ষেপে মুগ্ধ না হয়ে পারা যায়? কথায় কথায় দেখার ইচ্ছে প্রবল হয়ে উঠলো। কিন্তু সময় কোথায়? উড়ন্ত আগুনে পুড়তে পুড়তে দৌড়াচ্ছে তো দৌড়াচ্ছেই! হঠাৎ একদিন মালিবাগেই দেখা হয়ে গেলো। সাফেনা ডেন্টাল হাসপাতালের সামনে কথা বলছিলাম দারোয়ানের সাথে। পেছন থেকে কে একজন বলে উঠলো আমি সাগর। কিছুক্ষণ অবাক তাকিয়ে থাকলাম। ঠিক যেন সাগরই। তেমনই চঞ্চল, প্রবল, উত্তাল, দুর্বার। এই সাগরে অনায়াসেই ঝাঁপ দেয়া যায় ! তারপর কথা থেকে দেখা। দেখা থেকে আলাপ। এক সাথে লাঞ্চ করা, দেশ উদ্ধারের তুমুল তর্ক। রাজনীতিতেও বিপরীত ঘরানার মানুষ। ফলে তর্কেও টেবিল জমে ভালো। তর্ক করতে করতে কখন যে কী হয়ে গেলো, বোঝা গেলো না। শুধু অনুভব করলাম, কিছু হয়েছে! একদিন দেখি তর্কের টেবিলে উপচানো কফির পেয়ালায় দুটো হাত যুখবদ্ধ! পরস্পর এক পলকের চাওয়াই যেন টেনে নিয়ে গেলো হৃদয়ের খুব কাছে। অচেনার মাঝে চেনার আভরণ। প্রলেপ পেয়ে পেয়ে দারুণ চকচক করে উঠলো। আমার তো আর দিন কাটে না। কাজ কর্ম নেই। খাই দাই ঘুরে বেড়াই। মনে হঠাৎ এমন রঙধনু উঠলো যে খেই হারিয়ে ফেলার দশা! সাগরভাবনায় যখন আমি কাতর তখন সে হয়তো কোন দুর্নীতিবাজকে ইন্টারভিউ করছে, হয়তো চোরাকারবারিদের সংবাদ সংগ্রহে কোন চ্যালেঞ্জ মুকাবিলা করছে। কেমন যেন নেশাচ্ছন্ন সময়!
এ কী! এক দন্ড না দেখলে অস্থির লাগে । কিন্তু এ আশ্চর্য রূপম তো আঁচলে বাধা পড়ার মানুষ নই। এ যে ক্ষুদিরাম। দেশই তার একমাত্র স্বপ্ন। কোথায় কোথায় যে পড়ে থাকে কে জানে!
এ দিকে অনেক দিন দেখা নেই। অপেক্ষার পহর আর কাটে না। এই তুমি কোথায়? ফোন করবো? —না, তা হয় না। সময় হলে নিজেই ফোন করবে। বাইরে বৃষ্টির প্রকোপ আরো বাড়ছে। শরতে এমন বৃষ্টি অবাক করার মতো। চোখ বুজে দেখছি, আজ কোন তরঙ্গে দোল খাচ্ছে কে জানে! ঠিক তখনই কলিং বেলের শব্দে চমকে উঠলাম। কে ? কে?
হাতে ক্যাপ খোলা কলম নিয়ে দরজায় বিস্ময় দাঁড়িয়ে- তুমি?
-ভূত দেখলে নাকি?
-এতো রাতে?
-আরে তুমি কিছুই জানো না! পুরো ঢাকা শহর তো ক্যাসিনো শহর হয়ে গেছে! হীরক রাজার দেশের মতো আমরা হা করে বসে আছি, গোপী গায়েন বাঘা গায়েনেরা কখন গান ধরে সব শয়তানদের মূর্তি বানিয়ে দেবে। হবে না! হবে না! এ দেশে কিছুই হবে না! মন্ত্রীর ছেলে- ভাগনে ক্যাসিনোর খেলোয়াড়, জনগনের ট্যাক্সের টাকা তো কারো বাপের টাকা নয়! পাবলিক ভার্সিটিতে যারা পড়ে তারা কাদের টাকায় পড়ে? সেখানে কী পড়ে যে একএকটি বালিশের দাম সাত হাজার টাকা পড়ে? পর্দার দাম লাখ টাকা পড়ে! চেয়ারের দাম কোটি টাকা পড়ে? কথার খই ফোটাচ্ছে অবিরত। এতো টাকা কী ভাবে পাচার করে! সারা শরীর ভিজে একাকার। দ্রুত তোয়ালে এগিয়ে দিলাম্। হাত বাড়িয়ে নিতে গিয়েও থমকে গেল। বুঝলাম দেশ উদ্ধার করলেও এখনো একটি মন আছে। নিজেই এগিয়ে গেলাম। এক এক করে খুলে নিলাম শার্ট, গেঞ্জি মুছে দিলাম চুলের গোড়ায় গোড়ায় জমানো বৃষ্টির কণা। পরতে দেবো কী? অগত্যা আমারই ওড়না পেছিয়ে বসতে দিলাম। নিজেদের বাড়িতে সাগরের সাথে এটা আমার দ্বিতীয়বারের দেখা। অথচ মনে হচ্ছে কতো কালের সহঅবস্থান। মুখের দিকে তাকিয়ে মনে হলো, হয়তো দুপুরেও কিছুই পেটে পড়েনি। রান্না ঘরের দিকে এগুলাম। কিছু পেলেও পেতে পারি। ঠিকই পেয়ে গেলাম। ভাত, মাছ, ডাল। সেও আমার পিছু পিছু রান্না ঘরে হাজির। বললাম, তুমি বসো, আমি দিচ্ছি। কী দ্রুততার সাথে আমার হাত থেকে প্লেট কেড়ে নিয়ে নিজেই বেড়ে নিল। মুখে চলছেই কোন শামীমের কাছে কত কোটি টাকা পাওয়া গেলো, কত টাকা এফডি আর পাওয়া গেল আমিও অবাক হচ্ছি। মসজিদের শহর ঢাকা কী ভাবে আমাদের রাজনীতি আর ক্ষমতা প্রীতির কাছে ক্যাসিনোর শহর হয়ে গেলো! রাত্রি প্রায় শেষ দিকে পৌঁছে গেছে। ঝড়ের মাত্রা উত্তোরাত্তর বাড়ছে। যেন উত্তাল সাগরের মাঝে ছুটে চলা একনদী যৌথ প্রয়াসে সভ্যতার পত্তনে বীজ বপন করে যাচ্ছে। সাগরের চোখ থেকে ঠিকরে বেরিয়ে আসছে দুর্দমনীয় আগুনের ফুলকি। আমি যেন পুড়ে যাচ্ছি। এই তুমি পারো না আমার সাথে এক সাথে কাজ করতে! পড়া শোনা শেষ করে বেকার কেন বসে আছো? তুমি দেশের শত্রু। আমিও ছেড়ে দিলাম নিজেকে। হ্যাঁ। পারি। তুমি সাথে নাও। ক্রমাগত শারদীয় দেবীকে আহবান জানায়, এসো এসো অসুর বদ করি। আম্মা উঁকি দিলেন। এতো রাতে ঘুম ভাঙলো কেন! আম্মা বললেন, মনে হয় প্রেসার বেড়ে গেছে। বললাম ঘুমিয়ে পড়ুন। প্রেসার বাড়িয়ে লাভ নেই। সাগর এখানেই আজ থাকবে। নিঃশব্দে চলে গেলেন। একটু পরে আমিই আম্মার ঘরের লাইট অফ করে দিয়ে আসি। সাগরের মাথা ব্যথা নেই। কে এলো, কী বললো! নেশাগ্রস্ত মানুষের মতো ক্যাসিনোর গল্প করেই যাচ্ছে। জানো, ক্যাসিনো ঢাকায় কিন্তু নতুন নয়। সবাই জানে। প্রশাসন, পুলিশ, নেতা, সাংবাদিক। কারো অজানা ছিলো না। এখন কেনো এতো ধরা পড়ছে জানো? বললাম, না। উদাস চোখে যেন দেখতে পাচ্ছে নীলকরদের অত্যাচার! ভুখা -নাঙা চাষী নিজভূমে ধান উৎপাদন করতে পারে না! নীল খেয়ে তো পেট ভরানো যায় না! মুখে বলে যাচ্ছে জানো আমরা একদম পচে গেছি। আমাদো সব সেক্টরে কঠিন পচন ধরেছে। মস্তিষ্কের প্রতিটি কোষেই যেন দুষিত পদার্থ আমাদেরকে গিলে ফেলেছে। একটি গণজাগরণ দরকার! একটা মোরাল রেভ্যুলেশন দরকার!কে হবে সেই নেতা এক কথায় পিলপিল বেরিয়ে আসবে জনতা! শেখ মুজিবুর রহমান ক্ষণজন্মা। তিনি পেরেছেন। আমরা পারবো না! সায় দিলাম পারতেই হবে। আগে আমাদের ঠিক করতে হবে মোরালিটি কী? তোমরা তাদের পেছনে সময় ব্যয় করো যারা আসলে প্রেমিক মাত্র! যারা ভালোবাসে তাদের পেছনে দৌড়াও কিন্তু যারা সত্যিকার ক্রিমিনাল তাদের থেকে টাকা খেয়ে ক্রিমিনালি আরো চলতে দাও।
-কী বলতে চাও? আজ রমনার যে পুলিশকে তোমার রিপোর্টেই, যে অপরাধের জন্য সাসপেন্ড করেছে তার জন্য সে সাসপেন্ড কেন হবে? এটা তার একান্তই পারর্সোনাল ব্যাপার। সে একজন নারীকে ভালোবেসেছে, নারীও তাকে ভালোবেসেছে। তারা কিছু সময় একান্তে কেটেছে মাত্র। এ সময় তারা খুব আনন্দে ছিলো। হয়তো এ কারণেই পুলিশ অফিসার তার অন্যন্য কাজ সুষ্ঠু ভাবে করতে পেরেছে। এটা কেন অপরাধ হবে? সে ঘুষ খেয়েছে? অন্যায় ভাবে কাউকে ধরে নিয়ে টরচার করেছে? এ সব করলে তোমরা ভাগের অংশ নিয়ে চুপ থাকতে, তাই না? মানুষের মনের নার্সিং খুব দাকার। মন ভালো না থাকলে তার পক্ষে সামাজিক দৃষ্টিতে যে কোন খারাপ কাজ করা সম্ভব! প্রেম বা ভালোবাসার সাথে বাচ্চা উৎপাদনের কোন সম্পর্ক নেই। বর্ধিত জনগোষ্ঠিকে সুসংহত রাখার জন্যই পরিবার নামক সংগঠনটি মানুষই গঠন করেছে। কিন্তু মানুষের মনকে কোন দেয়ালে তোমরা আটকাতে চাও? মনকে কী দিয়ে সীমায়িত করবে! ভাগে মিলেনি তাই বুঝি ঝাল তুললে! সাগর আমার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকলো, এতো কথা কবে শিখলে? এসব কথা আর বলবে না, অন্ধ মানুষেরা তোমায় দেশ ছাড়া করবে না হয় মেরে ফেলবে। — মৃত্যু অবধারিত, এড়ানো যায় কী? তারপর নীরবতায় ছেয়ে যায় পুরো বসার ঘর। একটা বিতিকিচ্ছিরি স্বাদ গলা পযন্ত উঠে এলো। স্বগোতোক্তি করলো সাগর, সব কিছুই মানুষেরই বানানো নিয়ম জানি, সমাজের প্রয়োজনেই মেনে চলতে হয়। আস্তে করে বললাম, বদলানো উচিত। যা কিছু অন্যের ক্ষতি করে না, তা কেন অন্যায় হবে। বরং তোমাদের ক্যাসিনো সম্রাটদের খুঁজে বের করো। শেয়ারবাজারে ধ্বসের কারণ বের করো। ঋণখেলাপীদের ধরো। শায়েস্তা করো।ঠিক এই সময়ে বিদ্যুৎ চলে গেলো। অন্ধকারে বসে আছি। কারো মুখে কোন কথা নেই।অন্ধকারের নিজস্ব ভাষা আছে। সে ভাষা যে পড়তে পারে সে খুঁজে পায় সাপের মণি! মানুষের ভেতর লুকিয়ে থাকা অজানা মানুষটি হাঁটি হাঁটি পা পা করে বেরিয়ে আসে। সেখানে প্রশাসন,পুলিশ, বাহিনী ,সিভিল, সাংবাদিক, চিত্রকর, মাওলানা কোন নাম থাকে না। একটিই নাম- দেহ! জীবন্ত দেহ! টালমাটাল সমুদ্র! একে অস্বীকার করার কোন উপায় নেই! যে অস্বীকার করে সেই কেবল শিশু থেকে বৃদ্ধ সবাইকে ধর্ষণ করে! ইদানিং ধর্ষণ মহামারি আকার ধারণ করেছে। এ আমাদের জন্য লজ্জাজনক অধ্যায়। সাগর চুপচাপ। হাতদুটো কখন অজান্তেই আমার হাতের মুঠোয় খেলে যাচ্ছে শারদীয় মেঘের খেলা! খুব আদুরে গলায় বললো,ভাবছি ওই রেভ্যুলেশন শুরু করবো। দারুণ প্ল্যান করেছি। তা এক্সিকিউট করতে পারলেই এ দেশ দাঁড়ি যাবে। গাঢ় হয়ে এলা তার শ্বাস। ক্রমগত দ্রিম দ্রিম শব্দ। অন্ধকারেও স্পষ্ট দেখতে পেলাম তার বুকের ওঠানামা। বাইরের কীটপতঙ্গের অবিশ্রান্ত গান। কবুতরের হুমহুম ডাক। সেই যে হারিয়ে গেলাম আর খুঁজে পেলাম না। কোথায়, কোথায় আমি? যে সাগরকে চিনতাম ধাতব পদার্থের মতো, আজ মনে হলো শরতের তুলতুলে মেঘ। দেখা যায় ধরা যায় না। অনুভব করা যায় বাঁধা যায় না। অপূর্ব এক আবেশে কাছে টানে ধরে রাখে না। কী এক মায়ার জাল বিস্তার করে চলে গেলো। কী নিয়ে গেলো, দিয়ে গেলো কী? হিসেবের খাতা খোলা যায় না।
কাল নৌবিহারে যাবো। যাবে? উত্তরের অপেক্ষা না করেই বললো, তৈরি থেকো। নিয়ে যাবো।
এতো বিশাল লঞ্চ যাত্রী কেবল দুজন। সোহানা-সাগর। গন্তব্য অজানা। মাথার উপর পূর্ণ চাঁদের জোছনাবিকিরণ মহড়া চলছে, সাগরের শীতল বাতাসের কামড় যেন উড়িয়ে নিচ্ছে স্বপ্নের কোন শহরে। যেখানে চোর মার্কা আমলা নেই, ক্যাসিনো মার্কা রাজনীতি নেই, ব্যাংকলুট মার্কা ক্ষমতানীস নেই, শিশু-কিশোরের শৈশব কেড়ে নেয়া উঁচু উঁচু দালান নেই, যেখানকার মানুষ শোষন নয় ভালোবাসার শেকলে জড়াজড়ি করে বাস করছে। যেখানে যুদ্ধ নেই, ধর্মের ছায়া নেই, যেখানে সবার একই পরিচয় কেবল মানুষ। সাগর সাগরের দিকে মাথা দিয়েই শুয়ে আছে। তার চোখে মুখে অপূর্ব এক দ্যুতি, হাওয়ায় উড়ছে মাথাভর্তি কালো চুল। একটি হাত আমার হাতের উপর আলতো করে রাখা। নরম স্পর্শ যেন বহুকালের হারানো গ্যালাক্সির মৃদুগুঞ্জরণ! সাগরের গর্জনে তোলপাড় হৃদয় সূর্যের চারপাশে ঘুরে বেড়ানো অজানা গ্রহের জালিকার মতো লেপ্টে থাকা সৌরভ। আমাদের মুখে কোন কথা নেই। অথচ বলে যাচ্ছি অনন্ত স্বপ্নের কথা। যে স্বপ্নে জেগে আছে এ দেশের দুঃখি মানুষের বদলে দেয়ার ভাবনা।
পরস্পরের ইলেকট্রন, প্রোটন এভাবেই কাছে টেনে নিচ্ছে..
-এই চলো আমরা বিয়ে করি।
-বিয়ে? কেন? আমাকে একলা রেখে কোথায় চলে যাবে তার ঠিক নেই..
-উহু! যাবো না। গেলেও ফিরবোই ।তুমিই আমার নিয়তি। জয়েন করছো কবে?
-যে দিন তুমি বলবে? কোথায়?
-আজই করো। আমার অফিসে।
বলো কী! এই বিয়ে! এই চাকুরি! কোনটা করবো!
-দুটোই কর
হাসলাম। নিজেকে আর পারবে না আটকে রাখতে! এ রাত, এ নৌবিহার, এ শ্যামল সময় আশ্বিনের বন্যার মতো টেনে নিচ্ছে। এ তোমাকে আমি চিনি না। আমি তারেই জানি যার ভেতর ছিলো খড়খড়ে। হঠাৎ দেখি দারুণ এক ভোর। তুলতুলে তার স্পর্শ, মানস সরোবর, যেখানে অনায়াসে সাঁতার কাটা যায়। যে চপল.চঞ্চল, যে উর্বর,তাপিত, যে খঞ্জর,যুদ্ধ, যে উপল, সুন্দর,অদ্ভূত মায়াময়।
এই কী হচ্ছে!
হাসতে হাসতে বললাম, আর শুনবে?
যার ভেতর রয়েছে শব্দের কোলাহল, ছন্দের জাদু, সুরের দোলা। পাবলো পিকাশোর তুলিতে যে নিজেকে উত্থিত করেই ফিরে আসে আপন বলয়ে। একান্তই নিজস্ব স্বরে গেয়ে ওঠে-
না গো না। আমারে তুমি ছেড়ে যেও না…
-না না, এভাবে বলো না। আমি যে তোমার কাছে কবি হতে চাই না। কবি কবিতার ঘোরে থাকে। যেখানে হৃদয় নিয়ে মিছে মিছি খেলা চলে। এ আমি চাই না। আমি তোমকে চাই। দেহ-মনে।
মনের কোন অস্তিত্ব নেই। দেহই সত্য। এ মাটিই জীবনের ঘাঁটি । এ মাটিই সত্য! দেহকে অস্বীকার করলে যে জীবনকেই অস্বীকার করা হয়! প্রাত্যহিক জীবনের যাবতীয় আনন্দ যে এক জায়গাতেই সন্নিহিত। এ ধ্রুব সত্যের মাঝে যে ধুম্রজাল পাতানো তা যে আমাদের মাঝে উন্মাদনা তৈরি করছে এর থেকে মুক্তির উপায় নেই। ভেবো কিছুই। মানি না অনেক কিছুই। এ আমি কেবল তোমার। এ দেহ তোমার। তবুও কবিতা থাকবে। শব্দ থাকবে। আরাধনা থাকবে। আর থাকবে নিবিড় প্রেম। আমি লাবন্য নই, লতা। রাজহংসী নই মাছরাঙা ভালোবাসাই জীবনের একমাত্র দাবী। এ দাবী অগ্রাহ্য করতে পারে না কেউই। শুধু মাত্র ভালোবাসার অভাবেই আমাদের শিশু- কিশোর যুবা বৃদ্ধ অসহায় এবং দুর্নীতিগ্রস্ত।
রাত ক্রমাগত গভীর থেকে গভীর। দুপাশে জলে দাগ কেটে ছুটে চলছে ‘এমভি- ৭’। রাত্রির নীরবতা ভেঙে দিচ্ছে জলযানের শব্দ। আমরা দুজন আরো গাঢ় হতে হতে মিলে গেলাম দিগন্তে। হাজারো কৌশলে নাবিকের নৌবিহার ক্রমাগত আরাধ্য হয়ে উঠলো পীড়িত মানুষের বুকে। দুলে উঠলাম, বিস্ফোরণের অভিজাত মরণে সমাহিত হলাম। তুমি পাশে থাকলে পারবো সব দুর্গমগিরি জয় করতে। থাকবে তো? উত্তর দেয়ার আগেই নির্লজ্জ সূর্য উঁকি দিলো নাবিকের করতলে।
সে দিন ভোর হলো বিস্ময় নিয়ে। সাগরের ডাক পড়লো রাজদরবার। আমার হাতে অফিসের চাবী দিয়ে দ্রুততার সাথে চলে গেলো যাবার আগে একবার ঘুরে দাঁড়ালো। আমাদের সন্তানকে স্বপ্নগুলো উপহার দিও্। একটুকরো স্নিগ্ধ হাসি ঠোঁটের কোণে লেগে আছে। তারপরই হনহন করে এগিয়ে গেলো। লাট সাহেবকে রিপোর্ট করতে গিয়ে নাকি মেম সাহেবকে করেছে। ‘ক্ষুদিরাম’ চলছে ফাঁসির মঞ্চে। আমি মুঠেভর্তি সাগরকণা হাতে নির্বাক দাঁড়িয়ে…