এমাজউদ্দীন আহমদ রাষ্ট্রবিজ্ঞানের শিক্ষক হিশেবে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে সমীহ আদায় করতে পেরেছিলেন। এটাই তার কর্ম ও কৃতির মেট্রিক্স ছিল। এই শিক্ষকতা সূত্রেই তিনি বেশ কিছু উপকারী রাষ্ট্রবিজ্ঞানের পাঠ্যবই লিখেছিলেন। এর বেশ কয়েকটি বেশ নির্ভরযোগ্য হয়ে উঠেছিল। এর পাশাপাশি তিনি একজন দক্ষ ও গ্রহণযোগ্য শিক্ষা প্রশাসক হতে পেরেছিলেন। ক্যারিয়ারের প্রথম পর্যায়ে কলেজ অধ্যক্ষ ছিলেন; পরে দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অব্দি পৌঁছেছিলেন। এসব ক্ষেত্রে তিনি যথেষ্ট দলমতের উর্ধ্বে উঠতে পেরেছিলেন বলে তার সঙ্গে যারা ভিন্নমত পোষণ করতেন তারাও সাক্ষ্য দিচ্ছেন বলে লক্ষ করছি। এটা এদেশের প্রেক্ষাপটে একটা উল্লেখযোগ্য অর্জন, নিঃসন্দেহে।

এরপরে তিনি বিএনপিপন্থী একজন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক হিশেবে ক্রমাগত বিএনপির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হয়েছেন। বিএনপি, বাংলাদেশ, দক্ষিণ এশিয়া ও আন্তর্জাতিক রাজনীতির একজন বিশ্লেষক ও পরামর্শক হিশেবে তার রচনাবলী ও কর্মকান্ড তাকে একজন জাতীয় বুদ্ধিজীবির মর্যাদা এনে দিয়েছে। এক্ষেত্রে তার মেধা, জ্ঞান, বিশ্লেষণী ধীশক্তির সঙ্গে সঙ্গে তার বিনম্র ও সজ্জন বাচন ও উপস্থাপনা এবং প্রশান্ত ও সুস্থির ব্যক্তিত্ব তাকে এই আসনে আসীন হতে দারুণভাবে সহায়তা করেছিল। এসব গুণাবলীর সমাহারে তিনি বিএনপি সমর্থক বুদ্ধিজীবিদের মধ্যে বিরল সম্মান ও খ্যাতি লাভ করেছিলেন।

বিএনপি রাজনীতির বুদ্ধিবৃত্তিক ভিত্তি হল বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ। জিয়াউর রহমানের সামরিক ও রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও ভূমিকা থেকে এই আদর্শের সূচনা হয়েছিল। যা পরবর্তীকালে সাংবাদিক খন্দকার আবদুল হামিদ প্রমুখের মাধ্যমে একটি সংহত রাজনৈতিক আদর্শের রূপ পরিগ্রহ করেছিল। এক্ষেত্রে খন্দকার আবদুল হামিদ তার গুরু আবুল মনসুর আহমদের পূর্ব বাংলা/ “পাক-বাংলা” ও পরবর্তীকালে বাংলাদেশের স্বতন্ত্র কালচার ভিত্তিক যে চিন্তাধারা সেটি দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিলেন বলা যায়। অর্থাৎ বাংলাদেশ রাষ্ট্র ও ভৌগোলিক সীমাকে আশ্রয় করে এর নাগরিকদের পরিচয়ভিত্তিক একটি জাতীয়তাবাদ হিশেবে বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের তত্ত্বায়ন করা হয়েছিল। এই তত্ত্বায়নে একাধারে ভারত প্রশ্ন ও ইসলাম প্রশ্নেরও একটা ফয়সালা করার প্রচেষ্টা ভালভাবেই ছিল। এই বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের জীবন্ত প্রতীক পুরুষ হয়ে উঠেছিলেন জিয়াউর রহমান। এ কারণে তাকে দেশী-বিদেশী ষড়যন্ত্র করে হত্যা করা হয়েছিল।

প্রায় এক দশক ব্যাপী ছাত্র-জনতার আন্দোলন-সংগ্রামের ফলে যে নব্বইয়ের গণঅভ্যূত্থান গড়ে উঠেছিল তা গণতন্ত্রের এক নবযাত্রা সূচিত করেছিল। এই নবযাত্রা জিয়াউর রহমানের এই বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদকেই নতুন বাংলাদেশের পথপরিক্রমার আদর্শ হিশেবে বেছে নিয়েছিল। এইসময়ে খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে জিয়াউর রহমানের বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের উত্তরসূরিরা শুরুটা ভালই করেছিলেন বলা যায়। কিন্তু নানা কারণে তাদের শেষটা ভাল হয়নি। বিশেষ করে দ্বিতীয় বিএনপি শাসনকালে বিভিন্ন বিতর্কিত ব্যক্তিকে ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুর খুব কাছাকাছি দেখা যাচ্ছিল যাদের সেখানে থাকার কোন যোগ্যতাই ছিল না। এসব হতে পেরেছিল ক্ষমতার মূলকেন্দ্রের চাইতেও ক্ষমতাশালী একটি সমান্তরাল কেন্দ্র তৈরি হবার ফলে। এসবের পরিণতিতে জিয়াউর রহমানের বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদী রাজনীতি প্রশ্নবিদ্ধ হতে থাকে। বিএনপির অবক্ষয়, বিচ্যুতি ও স্খলনের সূত্রপাত তখন থেকেই শুরু হয়েছিল। এই পতনশীল ধারার ছিদ্রপথেই ১/১১-এর আগমন হয়েছিল। এরপরের গল্প বিএনপির ক্রমাগত বিপর্যয়ের গল্প। সঙ্গে সঙ্গে বাংলাদেশের নবউপনিবেশায়নের যাত্রাপথের সূত্রপাত। ভারতীয় নব হিন্দুত্ববাদ ও মার্কিন ইসলামোফোবিয়া দুয়ে মিলে বাংলাদেশের আত্মসম্মান ও মর্যাদার ক্রম অবসানের ধারা।

উপরে এত লম্বা ফিরিস্তি দিলাম কারণ বাংলাদেশের এই নেতিগমনের সময়েই এমাজউদ্দীন আহমদ বিএনপির প্রধান বুদ্ধিজীবি হয়ে উঠেছিলেন। তিনি বিএনপি ও বাংলাদেশের এই নেতিগমন প্রক্রিয়াকে যেভাবে বুঝেছেন, ব্যাখ্যা করেছেন ও সর্বোপরি মোকাবেলা করেছেন তা সর্বক্ষেত্রে এদেশের মানুষের প্রত্যাশা পূরণ করতে পেরেছে বলে মনে হয়নি। বিএনপি একসময়ে ক্ষমতা ধরে রাখতে এবং এখন পুনরুদ্ধারে জিয়াউর রহমানের বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ থেকে সরে এসেছে বলে প্রতীয়মান হচ্ছে। ভারত ও ইসলাম প্রশ্নে বিএনপি যে আপোষ করেছে তা ক্রমাগত আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মর্মগত পার্থক্য ঘুচিয়ে দিয়েছে বলে মনে হচ্ছে। বিএনপিকে অনেকসময় যতটা না মনে হয়েছে যে তার লক্ষ্য দেশরক্ষা করা তার চাইতে বেশি মনে হয়েছে তার লক্ষ্য যেন একটি পরিবারের নতুন উত্তরাধিকারকে ক্ষমতায়িত করা। এরকম একটি অন্যায্য প্রবণতায় আমরা এমাজউদ্দীন আহমদকেও দুঃখজনকভাবে শরীক হতে দেখেছি। তারেক রহমানকে ভবিষ্যত বাংলাদেশের কান্ডারী হিশেবে তুলে ধরে বই লেখাটা তার মত ব্যক্তিত্বের জন্য মোটেই মানানসই হয়নি।

মোটের উপরে উপসংহারে বলতে চাই যে বিএনপি যে বিগত দুই দশকে জিয়াউর রহমানের আদর্শ ও নৈতিকতা থেকে অনেকটা সরে গেছে ও এর ফলে দুর্বল হয়ে গেছে এর বেশ খানিকটা দায় এর প্রধান বুদ্ধিজীবিদের উপরেও বর্তায় বৈকি।