স্বপ্ন সাধক

আমি কান পেতে শুনি
আজো তুমি বেঁচে আছো?

আমি কান পেতে শুনি
তোমার রক্তাক্ত দেহ মুক্তির কথা বলছে
তুমি গভীর অরণ্যে জোনাকির মত জ্বলছো।

তোমার দীপ্ত উচ্চারণের সেই শব্দমালা
ভেসে বেড়ায় হৃদপিন্ডের কোণায় কোণায়
পৃথিবীর প্রান্তরে-প্রান্তরে, অলিতে-গলিতে,
তোমার রক্ত নদী আজও ক্লক্ল বয়ে চলে
সাগর-মহাসাগরের অনন্ত মোহনায়।

আমি কান পেতে শুনি
কে? যেনো গেয়ে যায় মুক্তির জয়গান
একবুক আশা নিয়ে প্রতীক্ষায় নিরণ্ন মানুষ।
তুমি কৃষ্ণচূড়ার ফুলকলিতে লুকিয়ে কথা বলছো
তুমি লাল গোলাপের পাপড়ির ভিতর
লুকোচুরি খেলা খেলছো
তোমার রক্তাক্ত রাজপথে আজো রক্ত বন্যা বয়ে যায়।

আমি কান পেতে শুনি-
তোমার ভালোবাসার নিরণ্ন মানুষের করুন আর্তনাদ
তোমার রক্তাক্ত রশি ধরে কাঁদছে তোমার উত্তরসূরি।
তুমি আমার দেহে লুকিয়ে চির অম্লান হয়ে আছো
তুমিই মুজিব, তুমি স্বাধীনতার স্বপ্ন সাধক।
…………………………………………..

জনম তৃষ্ণা

সন্মুখে সাজানো বিবসন এক দলা কাঁচা মাংস
এবং গেলাসে গেলাসে ভরা জনম তৃষ্ণা
উদ্ভ্রান্ত নেশার ঘোরে লালসার হাতছানি,
কামনার ডাল-পালার সুতীব্র বিবিক্ষা
হারিয়ে যেতে অতল অন্ধকারে।

পাশবিকতার উলঙ্গ সভ্যতায় সখ্যতা গড়ি
আদিম লালসার অশ্লীল উল্লাসে,
আমি হিরন্ময় যুগ পেরিয়ে নিকষ কালো
অন্ধকারের অতলে হারিয়ে যাই।

যাপিত যন্ত্রণার ঘেরাটোপে কাতরায় চিত্রাহরিণী
ক্ষুধার্ত নেকড়ের রক্ত লোলুপ থাবায় ক্ষত-বিক্ষত
এক টুকরো তরতাজা কাঁচা মাংস
প্রাগৈতিহাসিক বিবর্তনের ধারায় কুমারী যোনী
খোঁজে সঙ্গম সুখে মদমত্ত বেহায়া নগর।
…………………………………………..

তোমাদের অবদান

তোমরা সেদিন করে গেছ যা
পারিনি তা আমরা,
আমরা খুঁজেছি বিলাসী জীবন
আরামের খাস কামরা।

তোমরা দিয়েছ সত্যের সন্ধান
আমরা ভেঙ্গে করেছি খান খান
ন্যায়ের পথে তোমরাই ছিলে
চিরকাল অবিচল,
তোমাদের যত গান কবিতা
দ্রোহের আগুনে পুড়িয়ে চিতা
অত্যাচারির গায়ে লাগালে
অগ্নিবীণার কল!

তোমরা এসেছ আঁধার যুগে
আলোর প্রদী জে¦লে,
মুক্ত করেছ স্বদেশ ভূমি
বুকের রক্ত ঢেলে ।

শ্রদ্ধা ভরে স্মরণ করছি
তোমাদের অবদান,
এ বিশ^কে বাসের জন্য
যারা দিয়েছে প্রাণ।
…………………………………………..

একজন কবির জন্য কয়েক পঙ্ক্তি

প্রিয় সহযোদ্ধা এখলাসুর রহমান
বাংলার ৬৮ হাজার গ্রামের এক প্রান্ত থেকে
আমি নাম-দামহীন এক অখ্যাত কবির
শত প্রণতি আর অনন্ত শুভেচ্ছা গ্রহণ করুন।

কেমন আছেন জানতে চাওয়া হয়তো আপনার
জীবনে প্রশান্তির সুবাতাস বয়ে আনবেনা জানি,
তবে এই মফঃস্বলের অসংখ্য কবি হৃদয়ে
এখনো কাল বৈশাখীর ক্ষ্যাপা তান্ডব আর
সমুদ্রের বিক্ষুদ্ধ গর্জন বয়ে চলে
প্রতিকারহীন নীরব অন্ধকারে।

যা প্রতিনিয়ত আপনাকে সক্ষুদ্ধ প্রতিবাদে আলোড়িত করে
কালের কসম খেয়ে বলছি, শ্বপদে শৃঙ্খলিত
এ ধূসর স্বপ্ন, একদিন ঠিকই
প্রভাতের আলোকিত সূর্যকে ছিনিয়ে আনবেই।

প্রিয় সহযোদ্ধা এখলাসুর রহমান
আপনি কী জানেন? এই মরাকটালের দেশে
অনাগত সুন্দরের প্রত্যাশায়
প্রতিদিনই অগনিত স্বপ্নের জন্ম হয়,
এই শহরের খ্যাতিমান কেষ্টু বিষ্টুদের
সামান্য সহযোগিতা পেলে যারা হতে পারতো
হেলেন, হোমার, দার্ন্তে, অডিসির যোগ্য উত্তরসূরি।
অথচ কি নির্মম নিদারুণ অবহেলায় শিউলি ফুলের মতো
ভোরের সূর্য উঠার আগেই ওরা ঝরে পড়ে!

প্রিয় সহযোদ্ধা এখলাসুর রহমান
ভোগবাদেপুষ্ট উত্তর আধুনিক চতুর শিয়ালের
কবিতার পাঠশালায়, মান্যবর সভাপতির পদ ও পদবি
যারা অলংকৃত করেন তারা কেউই এ মাটি
আর মানুষের কবি নয়।

তারা হাছন আর লালনের কবি নয়
কৃষকের লাঙ্গলের ফলার মতো বুকের পাঁজর ভেঙ্গে
যাওয়া বিরহী গ্রাম্য বঁধুয়ার কবি নয়
হাওর-বাওর, গাঁ-গেরামের বঞ্চিত মানুষের কথা
ঐ সব কবিদের কলমে বিলাসী ব্যঞ্জনায়
সরাবের জলসায় চমৎকার রসনা উপকরণ।

প্রিয় সহযোদ্ধা এখলাসুর রহমান
আপনি কি জানেন?
একজন কবির নামে মর্যাদার আসনটুকু
এই সমাজে চিরকালই নড়বড়ে
শহরের কাক আর কবি একই অভিধায় অভিযুক্ত
কতটা অবহেলিত হলে এ অপবাদের তকমা জোটে
কবি আর কবিতার ললাটে!
আপনি নিশ্চয় তা অবগত আছেন?

আমি সভ্যতার কসম খেয়ে বলছি-
একদিন ঠিকই এই অন্ধকার কেটে যাবে;
এদেশ, এই সমাজ, আমাদের হাজার বছরের লালিত
ইতিহাস-ঐতিহ্য, কৃষ্টি কালচার সম্ভানার
নতুন আলোয়ে উদ্ভাসিত হবেই হবে।

মানবতার এই উঠোন জুড়ে অজানিত অন্ধকারের
প্রেতাত্মারা যতোই উদ্ভট উলঙ্গ নৃত্য করুক
প্রভাতের নতুন সূর্য এই নবীনেরা চিনিয়ে আনবেই
সেই সুদূরের সীমাহীন প্রতীক্ষায়, তৃষ্ণাত্ব পাখির মত
আমরণ চেয়ে থাকে-
একজন প্রতিবাদী কবির স্বপ্নদ্রষ্টা একজোড়া চোখ।
…………………………………………..

পাগল সমাচার

কেউবা রূপের মোহে পাগল কেউবা টাকার নেশায়,
টাকার লোভে কেউবা আবার পাগল মন্দ পেশায়।
কেউবা খোদার প্রেমে পাগল কেউবা ভবের মায়ায়,
কেউবা ঘুমায় এসি রুমে কেউবা বটের ছায়ায়।
কেউবা পাগল বউয়ের জ্বালায় ঘুম হয়ে যায় হারাম,
ভিন পুরুষের গলায় ধরে কেউ খুঁজে পায় আরাম।
কেউবা পাগল মায়ের সেবায় বাপকে মানে পীর,
কেউবা দেশের জন্য মরে ঊর্ধ্বে তোলে শির।
কেউবা পাগল সাজ পোষাকে কেউবা দামী খাবারে,
প্রজা হলে চালের গুটি রাজায় খেলে দাবারে!
কেউবা পাগল অসৎ কাজে বন্ধ ঘরের আন্ধারে
আল্লাহ তুমি রক্ষা করো ঐ পাপিষ্ঠ বান্দারে।
জগৎ জুড়ে চলছে শুধু পাগল পাগল খেলা,
পথের ধারে পাগল বলে কেউ কইরোনা হেলা।
…………………………………………..

প্রজ্জ্বলিত বাসনা

এখন আর বাগানে হাঁটতে হাঁটতে
অবচেতনের তাগিদ পেয়ে
নিমেষেই কাঁটার বেদনাকে তুচ্ছ করে
তুলে আনি না-
শিশিরসিক্ত সদ্য ফোটা কোনো গোলাপ;
যেমনটা আগে হতো আমার।

তোমাকে ভালোবাসার পর
(জগতে এত ফুল থাকতে)
গোলাপকে নিয়ে আমি রীতিমতো
লিখেছি বেশ কিছু কবিতা
আর, প্রতিটি পঙ্ক্তি রক্তিম আভা ছড়িয়ে
চেয়ে থাকে আমার দিকে
একেকটি পাপড়ির মতো
অর্ধনমিত হয়ে
প্রাণের কেন্দ্রবিন্দু থেকে কিছুটা দূরে সরে গিয়ে।

আগে আচমকা হাত বাড়িয়ে
দিতেই যেন
প্রকম্পিত হয়ে ওঠতো ওই গোলাপের পাপড়ি দল।
এখন তারা কেন জানি অবলার মতো
নুয়ে পড়ে আমার দিকে,
দৃষ্টি কেড়ে নেয় মুহূর্তেই
মনে হয় এতদিন ছিল প্রতীক্ষায় আমার।
সমস্ত দ্বিধা-সঙ্কোচের চাদর অনবগুণ্ঠিত করে
লুণ্ঠিত হবার বাসনামত্ত হয়ে থাকে অনিবার।
কিন্তু, এ আমার হয় না,
তাই, আলতো করে এঁকে দিই একটি মৃদু চুম্বন
ঠিক অব্যবহিত পরেই বুঝতে পারি
চমকে দেহে শিহরণ খেলে যায় তাদের।
ফুলেরাও কি তবে চুম্বনের চৌম্বত্ব টের পায়?
ইতিমধ্যে মিটে যায় আমার দাহ্য প্রাণের
অনন্ত প্রজ্জ্বলিত বাসনা।
আর সে শুধু একবার তোমায় দেখার
ছুঁয়ে যাবার
অন্তর-বাহির তোমার।
…………………………………………..

এই কেমন স্বাধীনতা

এই কেমন স্বাধীনতা-?
তোমার জন্যে সধ্বা নারী তার পতিকে হারালো
কূলবধুর সিঁথির সিঁদুর গেল মুছে
কুমারী শঙ্খবালার ঘর বাঁধা হয়নি আজো
হিংস্র হায়েনাদের এঁকে দেয়া কলঙ্ক তিলক
আজ তার ললাট লিখন ।

এই কেমন স্বাধীনতা-?
তোমার কারণে যুদ্ধাহত ছমির আলী আজ
ভিক্ষার ঝুলি কাঁধে করে কষ্টের নদীতে সাতরায়
যে বীরযোদ্ধা এ দেশের নিভূত কোনো গ্রামে
ছোট্ট একটি ঘর বাঁধার স্বপ্ন দেখেছিল,
যার দু’চোখ জুড়ে ছিল অবারিত স্বপ্নের আনাগোনা
সেই দু’চোখ আজ হতাশার কালো চাদরে আবৃত ।

এই কেমন স্বাধীনতা-?
যাকে পাওয়ার জন্যে আজো মিছিলে শ্লোগানে
মুখরিত হয় রাজপথ,
ঘাতকের নির্দয় বুলেটে এখনো রক্তাক্ত হয়
অসংখ্য প্রতিবাদী প্রাণ
এখনো রক্ত ঝরে আমার ভাইয়ের-বোনের বুক ছিঁড়ে
সন্তান হারা জননীর করুণ আর্তনাদে
কেঁপে ওঠে বিপন্ন স্বদেশ।

এই কেমন স্বাধীনতা-?
তোমার জন্যে নুর হোসেন জীবন্ত পোষ্টার হল
শ্বৈরাচারের বুলেটে দিল নির্মম আত্মাহুতি,

স্বাধীনতা তুমি কি বলতে পারো-?
আর কত পথ পেরিয়ে, রক্তগঙ্গা পাড়ি দিয়ে;
এবং কতটি প্রাণের বিনিময়ে-
সত্যিকারে তোমাকে পাবো
স্বাধীনতা তোমাকে পাবো ।
…………………………………………..

সঙ্গী যে নাই কেউ

গাছের ডালে মৌমাছিরা
আজ যে বাসা বাঁধেনা,
মন ভ্রমরা মধুর লোভে
বিয়োগ ব্যথায় কাঁদেনা।

প্রেম সাগরে রসের জোয়ার
উথলে কেনো ওঠে না,
মন বাগানে গোলাপ কলি
আগের মত ফোটে না।

ভাটির টানে হারিয়ে গেছে
স্বপ্ন রাঙা দিনগুলি,
অচিন পথের উজান বাঁকে
কাঁদে বসে বুলবুলি।

নদী ছুটে সাগর পানে
সাগর খেলে ঢেউ,
জীবন নদীর শেষ মোহনায়
সঙ্গী যে নাই কেউ।
…………………………………………..

আগুন খেকো রোদ নাচে

আগুন খেকো রোদ নাচে সবুজ দূপরে
নটীর মুদ্রার পালে লাগেনা ধৃর্ত হাওয়া
হাওয়া লাগে ধূর্ত ধান্ধা বাজের পায়ে।

পশ্চিম আকাশে অবিশ্বাসের কালো মেঘ
হৃদয় প্রচ্ছদ ভেঙ্গে টুকরো টুকরো হয়
রমনীর নাচ থেকে অক্সিজেন ফুসফুসে ভরে
শরীরের বিষ বিশুদ্ধ আকাশে উড়ায়।

অমাবস্যার অন্ধকারে খিল ভেঙ্গে ঢুকে পড়ে
অভিশপ্ত ক্ষুধার্ত রক্ত লোলুপ নেকড়ে
আদালতের রায় খায় ক্লীবলিঙ্গ সমাজ।

রোদের অস্তিত্বহীন ছায়া পড়ে থাকে
অস্পরার উদম বারান্দায়
কবি’র উঠোনে থামেনা নক্ষত্রের ছায়া
নক্ষত্র ব্যঙ্গ করে নপূংস জানালা ধরে।

নটীপড়ে থাকে নর্দমায় সংক্রমণের যাতনায়
পূর্ণিমার চাঁদ তারে খোঁজেনা
মৃত্যু আসে পায়ে পায়ে নীল ছোবল
মারে নটীর পালে।
…………………………………………..

জীবনের শেষ সংগ্রাম

আশার প্রদীপগুলো নিভে গেলেও, একদিন ঠিকই তুমি
জোনাকির আলো হয়ে জ্বলে উঠবে বিশ্বাজিৎ,
চাপাতির কোপে বিশ্বজিৎ মরে না, মরে বাংলাদেশ
ক্ষত বিক্ষত হয় রক্তাক্ত মানচিত্র।

শ্রাবণের খরস্রোতা নদী ভাসে রক্তের বন্যায়
শামুকের ডিম বেড়ে উঠে অন্ধকারে অত্যাচারে
টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া শাসনের ক্ষোভে উত্তাল
সোনালি রোদ্দুর প্রতিক্রিয়া প্রতিবাদে মুখর।

সুন্দর সকালটাকে ধূসর করে দেয় বিশ্বজিতের মৃত্যু
নিন্দার ঝড় উঠে চায়ের কাপে গরম লিকারে
আশংকায় লাজুক লতা গুটিয়ে যায় নিজের ভিতর নিজে
গ্রহণ দোষে চাঁদ হয়ে যায় কলংকিত।

ধারাপাত উল্টো সাঁতার কাটে সমাজের শিরা উপশিরায়
সাগর সীমান্তে সিডরের তান্ডব চলে সারা রাত
মুঠো মুঠো স্বপ্ন হারায় সর্বগ্রাসী সুনামীর আঘাতে
দুর্বোধ্য দুঃশাসনে সভ্যতা হাসে বিকৃত হাসি।

কখন আসবে প্রতিক্ষীত আলোর প্রভাত?
ফিনকি দিয়ে রক্ত ঝরে পৃথিবীর সবুজ চত্বরে
তবুও প্রতিঘাতে এগিয়ে চলে জীবনের শেষ সংগ্রাম।
…………………………………………..

প্রতিবাদের আগুন

আমি বাঙালি
আমার বাংলা ভাষা আছে
আমার একটি শহীদ মিনার আছে
আমার প্রতিবাদ করার দলিল আছে
অত্যাচারীর মসনদ ভাঙার ইতিহাস আছে
আমার সেই দলিল হাতে বহন করে
আমি প্রতিবাদের শক্তি ও সাহস পাই।

আমার ত্রিশ লক্ষ প্রতিবাদী ভাই আছে
আমার তিন লক্ষ বীরাঙ্গনা মা-বোন আছে
আমার এক নদী রক্ত দানের নজির আছে
আমার লাল সবুজের পতাকা আছে
আমার বজ্রকণ্ঠের ভাষণ আছে
আমার জাতির জনক আছে
তাই আমি আজ প্রতিবাদী।

আমার পিছনে নিরন্ন মানুষের স্রোত আছে
ক্রোধে উন্মাতাল প্রতিবাদী একটা মিছিল আছে
ফাঁসির মঞ্চে দাঁড়ানোর মতো সাহস আছে
আমার দেহে প্রতিবাদের আগুন আছে
আমার প্রেরণায় ছোট্ট একটি কবিতা আছে
“এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম
এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম”