কান্নার সহজ সমীকরণ

কাঁদো তুমি যতো পারো: ঝরনার মতো, বিয়োগ ব্যথায়,কিংবা থমথমে চোখে— জবুথবু স্বপনের ঘোরে।

কান্নায় কোনো দোষ নেই। বৃক্ষরাও কাঁদে: ঝরাপাতার গানে-গানে। বসন্ত এলে নতুন পাতা, ফুলের একী সমারোহে বৃক্ষরা দোলে!
দোলে—ফুলে-ফলে।

কান্নায় কোনো ক্ষয় নেই। আকাশও কাঁদে: বৃষ্টির সুরে-সুরে। নদী, সাগরে মিলিয়ে যায় কান্নার একেকটি ফোঁটা—অবারিত জলে। প্রতিটি কর্ষণে চাই জল আর জল।

অসহ্য বেদনাস্ফীতির দণ্ডে কান্না আসবেই।
তারপর, সেই শূন্যতা বলয়ে পরিপূর্ণ হবে নতুন একটি তত্ত্ব, নতুন একটি দিগন্ত।

তাই, তুমিও কাঁদতে পারো। কান্নার পর দেখে নিতে পারো: কোন সে অবারিত জলে মিলিয়ে গেল প্রতিটি ফোঁটা। নাকি, কেবলই ভারহীন কোনো কোণে উবে গেল বৃথাই।
…………………………………………..

একবিংশ শতকের প্রেমিকার উদ্দ্যেশে একটি কবিতা

প্রিয়তমা,
মনে রেখো—

আগামীর একটি অলস সকালে
পুরোনো বৃক্ষের গর্ত থেকে
ঝাঁকে-ঝাঁকে
উড়ে আসবে কাঠঠোকরা’র ঝাঁক—
তোমার খোলা-স্তনে!

পৃথিবীর পুরোনো নিয়মে
সমূহগীত গেয়ে গর্ত খুঁড়ে নেবে—
তোমার স্তনের একেকটি লোমকূপে;
জন্ম নেবে অজস্র ছানা।

স্বর্গীয় ডিকান্টারে
তোমার বিপনিবিতানে
ঝুলতে থাকবে
একবিংশ শতকের রক্ত আর ক্লেদ।
…………………………………………..

কালোটিপ

‘আয় আয় চাঁদমামা টিপ দিয়ে যা’…
শৈশব থেকে অবছা অন্ধকারের মতো এক কণ্ঠ ভেসে আসে!আমি শৈশবের দিকে ফিরে তাকাই—
উজ্জ্বল চাঁদ,কালো টিপ!

এই পৃথিবীর পথে জীবনের বীজ
আর, চাঁদের জোছনাময় স্বর্গীয় হাতে কালোটিপ!
লাফিয়ে লাফিয়ে উঠছে মানুষ সময়ের বুকে— ক্লেদাক্ত জীবনে ঘামসিক্ত টিপ নিয়ে— সন্ধ্যার আবছায়ায় গাঢ় অন্ধকারের খেয়াপারে; মৃত্যুর শীতল বাতাস চারদিকে।

এই নাতিদীর্ঘ পরিভ্রমণ শেষে— রক্তের ভেতর
বরফ নেমে এলে— শত-সহস্র মিথ্যে টিপের ক্লান্তি
নিয়ে চাঁদটাকে যায় দেখা— অন্ধকারের বুকে গাঢ়
কালো তিল— নতজানু হয়ে আছে পৃথিবীর দিকে।
…………………………………………..

জীবন ও মৃত্যু বিষয়ক

রাত নেমে এলে স্বস্তির ঘুমে দেহ এলিয়ে দেই আমি।
জীবিকার বিষয় ব্যতিরেকে ঘুম ও নারীকে আপন ভাবি। তবুও জীবনের উঠোনে থাকে কিছু কাজের তাড়া। আদতে, এই ঢুলঢুলে চোখে মৃত্যুই নেমে আসে।

মৃত্যু,— তারে দেখি আমি যাপিত জীবনের ভেতর
খোলামাঠে কুয়াশার মতো কোমল বিভ্রান্তি লাগে!
হিম ধরে আসে চোখের দৃষ্টিতে,অস্থিতে, জীবনের গ্রন্থিতে-গ্রন্থিতে,— কনকনে বেজে ওঠে রক্তের শিরায়।
মৃত্যুর তাড়ায় অলক্ষ্যে রাত বেড়ে যায়, ডানার শব্দে উড়ে যায় কিছু নিশাচর পাখি। অন্ধকারে আমি ক্ষয়ে যাওয়া একটুকরো মোমের মতো জীবনকে খুঁজি। হৃদয় নিংড়ে ফেঁপে ওঠে— বিগত দিনের শোক,অনুচিত প্রার্থনার নির্ঘণ্ট। এইসব অন্ধকার হাতড়ে, আমি খুঁজে পাই— ঘামে ভেঁজা জামার পকেটে— জীবন: যেনো ভুলে ভরা দৈনন্দিন সাংসারিক ফর্দ। তারপর,ক’টা প্রহরের অন্ধকার দুহাতে তাড়িয়ে ধাবমান অন্ধকারে পা বাড়াই…
…………………………………………..

মুখচ্ছবি

ক’বার হাতে কবিতার বই রেখে ঘুমিয়ে পড়ি;
হঠাৎ জেগে উঠি কোনো দুঃস্বপ্নে তাড়িত হয়ে
যেনো,কোনো বিষণ্ণ রাতে শিয়রে জ্বলা প্রদীপ
শিখার মতো মিটমিটে জ্বলে আমার হৃদয় প্রবল জীর্ণতায়!বোধের গভীরে খুঁজি কিছু বাণী,—
আছে কি তেমন কিছু?

নেই, নেই তেমন কোন সত্য বুকের গহীনে
শুধু একখানা মুখচ্ছবি ভেসে ওঠে—
উদাসীন নির্বাক! এইতো

কতযুগ পেরিয়ে গেছে,তবুও কি সজীব
নির্মল সেই পুষ্পাদলের সৌরভ!মুহুর্মুহু
আমার চৌদিক গন্ধময় করে তোলে; আমি খুঁজি—
অন্ধের মত!ডানে-বামে হাতড়ে

পাইনা,পাইনা কিছুই। তবুও কি দারুণ আশায়
বুক বেঁধে থাকি। একদিন, একদিন নিশ্চয়
আমার কাননের সমস্ত সবুজ ম্লান করে
ফুটবে রক্তিম অবয়বে;

আর আমি কাঁটার আঘাত উপেক্ষা করে
তুলতে চাইব— তার সমস্ত সৌন্দর্য, বিভা;
আমার কম্পিত হাতে।
…………………………………………..

সুন্দরের সমীকরণ

ভাষ্কর্যের প্রিয়দর্শণে আমি আবিষ্ট হই!
নীরবে হাততালি মেরে আনন্দচিত্তে বলতে থাকি- বাহ,
এইতো সুন্দর!এইতো সুন্দর!
কল্পনার মত প্রীতিঘন সুন্দর!

দিনশেষে গৃহে ফিরে চিরুনি হাতে আয়নার সামনে দাঁড়াতেই,নিজেকে কুৎসিত মনে হয়!
হৃদয় ছিঁড়ে আসা কয়েকটা বিমূর্ত কোপ
পরম বিশ্বাসের উপর পতিত হয়। হায়,হায়-
এই বুঝি আমি!

কেউ একজন প্রিয়দর্শিনী,পেছন থেকে জড়িয়ে ধরে বলে—হে,স্বর্গসূত প্রেমী,তুমি শাশ্বত সুন্দর। আমি চোখবুঁজে সুন্দরের সমীকরণ মিলাতে থাকি…
‘ভাষ্কর্য’ সে-তো সামান্য প্রস্তরখণ্ড!
…………………………………………..

স্ফূর্তিহীনতা

পড়ার টেবিল জুড়ে শুনশান নিরবতা; হৃদয়ের উঠোন জুড়ে শুধু শূন্যতা। ধূধূ এই চরাচরে হয়তবা জেগে আছে আরো একজোড়া চোখ, একটি আহত হৃদয়;স্ফূর্তিহীন জীবনের পথে!মনের কল্পনায় হয়ত সে দেখে: আমি ও জেগে থাকি বিপুল আকাশের মতন—পুরনো গল্পের বই হাতে নিয়ে।

রাতের নৈশব্দতায় দোঁহে কাঁদে আড়ালে—মুছে গেছে প্রেম—শিশিরের শব্দের মত; অনেক বছর আগে রাতের অন্ধকারে,একটি পাখির ডানার শব্দ— চমকে ওঠা ক্ষণ—ওড়ে গেছে সে,মৃতম্লান স্মৃতির ভেতর।
…………………………………………..

কিছু প্রিয়মুখ

মাঝে মাঝে স্বচ্ছ পানিতে
নিজের আদলের মতো কিছু প্রিয়মুখ, হৃদয়ের আরশিতে ভেসে উঠে। আমি দিগ্বিদিক খুঁজি! মনে হয়— মৃতের মতো পড়ে আছে:স্থবির, যুগ-যুগ ধরে;
অথচ, এইতো সেদিন—একসঙ্গে কত কথা…

নিজেকে খুব একলা মনে হয়!
মনে হয়—মরানদীর মতো পড়ে আছি;বর্ষার অপেক্ষায়!অথবা,গ্রীষ্মের মতো—শীতের প্রতিক্ষায় কিম্বা দীর্ঘ জলাশয়ের মতো পরিযায়ী পাখির আশায়,—কখন যেনো আসে আবার…

ভাবি—হয়ত কোনো সন্ধ্যায় কিম্বা ভরা জোছনার রাতে আবার কথা হবে, কথা… আর কিছু নির্মল হাসি বসে পাশাপাশি। হৃদয়ে রক্তক্ষরণ হয়, চোখে আসে জল
ফোঁটায়-ফোঁটায় ঝরে পড়ে কিছু স্মৃতি,আর,বিগত ভালবাসা। কখনো কপটতা শিখিনি, তাই নির্লজ্জের মতো ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসি নিয়ে ঘুমোতে পারি না।
প্রিয়তমার উষ্ণ আলিঙ্গনেও আমি যেনো নির্বিকার রই!কেবলই ভেসে ওঠে, চোখের দৃষ্টি জুড়ে—কিছু প্রিয়মুখ।
…………………………………………..

জিজ্ঞাসা

এ আমার অশান্ত আত্মা বহুদিন ধরে
যে দেখেছে সিক্ত কাতর চোখে
নিরব হত্যা,হন্তারকের দুর্ধর্ষ তরবারি।
অসহ যন্ত্রণার ভারে ডুবজলে হাতড়ে
মৌন চিৎকারে আকণ্ঠ পুরে গেছে যার
বিবর্ণ জলে—
ঈশ্বর!ঈশ্বর!একটু ভাল লাগা দাও,
ভোরের ঘাসের উপর রৌদ্রের মতন
একটু ভালবাসা এনে দাও
না-হয় মুক্তি দাও, মৃত্যু দাও

তাও ভাল; কভু দেখবোনা আমার হৃৎপিণ্ড
যেনো ঝুলানো আছে কোনো কসাইখানায়
রক্তিম সমারোহে সারি-সারি মাংসপিণ্ডের ভীড়ে
লুব্ধ ছোরার আঘাতে টুকরো টুকরো ক্ষতবিক্ষত।

আমি কিভাবে তা সয়ে যাব, কোন দৈব নিয়মে?
তবুও তা-ই হয় বার-বার, লুণ্ঠিত হয় বিক্ষত-আত্মা
লোলুপ পদাঘাতে; শৃঙ্গলায়িত সমাজে দাপটে সত্তায়।
ঈশ্বর, তবে আমি কি আদিম জারিত রসে পরিপূর্ণ নয়?
…………………………………………..

প্রেম

যা জেনেছি,
আর, যা পেয়েছি,
ব্যবধান—আকাশকুসুম!

কখনো মাঝরাতে ঘুম ভেঙে গেলে নক্ষত্রের আলো দেখি— পৃথিবীরে দেয় রঙিন যৌবন!
কখনো মাঝ দুপুরে ক্লান্তির শেষে মানুষের হৃদয়
দেখি— আকাঙ্ক্ষার তীব্র বিষবাষ্প ভরা!

আসলে, প্রেম কি?
কালো-কালো অক্ষরে মলাটবন্দি, নিছক কোনো ধারনা? লোভী হাসি?নাকি, নক্ষত্রের আলো?
শুনেছি,মানুষের হৃদয় প্রেমের আবাস। কিন্তু, কই? আমি অন্ধকার হাতরিয়ে খুঁজি গোলাপীশির হাঁসের দুটি চোখ,
যা হারিয়ে গেছে কুৎসিত অন্ধকারে।খুঁজে-খুঁজে ফের ক্লান্ত হৃদয়ে ঘুমিয়ে পড়ি…