আব্দুর রহিমের ভাতের খিদে পায়নি। তবু তার ভাত খেতে মন চাইলো। আউশের লাল চালের গরম ভাতের সাথে শুটকি ভর্তা, টেংরা মাছ আর ডাল।
“বুঝছেন চাচি, বিদেশে ভাত খাইছি। কিন্তু এই আউশের চাউলের ভাত, চ্যাপা শুটকি আর এই ডাইল কই পামু। বুক ভইরা কান্দন আইতো পত্তম পত্তম। পরে ঠিক অয়া গেছে গা।“
আব্দুর রহিম অনর্গল কথা বলে যায়। হারিকেনের মৃদু আলোয় তার চোখ চিকমিক করে। যেন ব্রহ্মপুত্রের বুকে হ্যাজাক বাতি। সাত বছর সৌদি আরব থেকে আব্দুর রহিম বাড়ি ফিরেছে গত সোমবার।
“এতোদিন আইতে পারিনাই তোমাগো বাড়িত। হ মনতো চায়। কিন্তু মন চাইলেই কি আওন যায়। কিন্তু তোমরার কথা সবসময় মনে পড়তো। সবসময়। মনে অইতো সব ছাইড়া ছুইড়া দেশে যাইগা। দেশে গিয়ে কামলা খাটুম। তবু বিদেশে না। কিন্তু পরক্ষণে মনে অইতো, দেশে আমার কেডা আছে। কেউ নাই।“
“কেন্ বাবা আমরাতো আছি। আমরা কি তোমার কেউ না?” আম্বিয়া বেগম নিছকই বলতে হবে বলে কথাটা বলে। কিন্তু সত্যিটা হলো আব্দুর রহিম আম্বিয়া বেগমের কেউ না। কোনো একসময় হয়তো ভাবী সম্পর্কের ছিলো। এখন সমাজ নির্ধারিত বন্ধনের জাল ছিঁড়ে গেছে। বলা যেতে পারে জালটাই এখন নাই। আব্দুর রহিম শুটকি ভর্তার একটু দলা ভাত ভর্তি হাতের ভিতর ঢুকিয়ে মুখে চালান করে দেয়। তার মুখ পাকা ধান ক্ষেতের মতো উজ্জ্বল দেখায়।
“হ ভাবী! তোমরাই তো আমার সব। আমার বাপ-মা সবই তো তোমরাই!” বাইরের আকাশ থেকে ঝরো ঝরো বৃষ্টি পড়ে। সাথে শীতল বাতাস। আব্দুর রহিম হাত ধুতে বারান্দায় বের হয়ে আসে। আম্বিয়া বেগম বলে, “হারিকেনটা নিয়ে যাও। বারান্দায় মাটিতে পিছলা খাইবা।“
“আসমানে বিজলী চমকায়। আলো আছে। পড়ুম না ভাবী।“ জগভর্তি পানি হাতে ঢালতে ঢালতে আব্দুর রহিমের দশবছর আগের কথা মনে পড়ে।
তখন খই ফোটা গরম। চৈত্র-বৈশাখ দুমাসের প্রচন্ড দাবদাহে পাড়ার কুকুরগুলো জিহ্বা ঝুলিয়ে একটু ছায়া খোঁজে ঘুরে বেড়াতো। পায়ের তলার ধুলো যেন কড়াইয়ে উত্তপ্ত করা। আব্দুর রহিম এই গরমে হাদি বেপারীর ধান কাটতো। প্রচন্ড তেষ্টায় বুকের ছাতি ফেটে যেতো তার। একটু পর পর জগভর্তি পানি ঢক ঢক করে চর পড়া গলা দিয়ে নামিয়ে দিতো। গলা ভিজতো, বুক ভিজতো না। তারপর রৌদ্রের মধ্যে আবার ধান কাটা। হাদি বেপারীও ছিলো খবিশ ধরনের লোক। সারাদিন এক প্যাকেট বিড়িও কিইনা দিতো না। দুপুর বেলা দিতো পাঙ্গাশ মাছ আর ডাল। পাঙ্গাশ মাছ আব্দুর রহিম খেতে পারেনা। তার কাছে গন্ধ লাগে। তবু মাছতো মাছেই। সাথে মোটা চাউলের ভাত। এক গামলা ভাত সে একাই সাবাড় করে দিতো। সে বৈশাখ শেষে আব্দুর রহিমের যেদিন বিয়ে হয় সেদিন আসমানটা যেন জায়গায় জায়গায় ছিদ্র হয়ে গেছিলো। কোথাও ঠাস ঠাস করে আরো ফেটে যাচ্ছিলো যেন। মেঘের গর্জন আর তুমুল বৃষ্টিতে তৃষিত ধরণীর প্রাণ জুড়িয়ে দিছিলো আসমানের সমস্ত জল। বাসর ঘরে আদুরীকে আব্দুর রহিম বলেছিলো,
“আমগো বিয়ের জন্যই এই বৃষ্টি আইছে। কী কও?”
“হ কইছে আপনেরে।“ আদুরীর লাজুক জবাব।
“বেপারীর ক্ষেতে কাইলকাই হাল নামায়ে দিমু। এই বৃষ্টি আর পাওন যাইবো না।”
আদুরী অবাক হয়ে আব্দুর রহিমের দিকে তাকায়া ছিলো। বাসর ঘরে বইসাও লোকটা কাজের কথা কয়।
আম্বিয়া বেগমের ডাকে আব্দুর রহিম সৎবিৎ ফিরে তাকায়। “খাড়ায়ে বৃষ্টিতে ভিইজা যাইতাছো তো রহিম মিয়া। ঘরে আও।“ রহিম ঘরের ভিতরে ঢুকে।
“যা বৃষ্টি শুরু হইলো ভাবী। রাইতে আর থামবো না মনে হইতেছে। আমি বরং যাইগা। রাইত হয়া যাইতেছে।“
“আরেকটু দেহো। বেশি ডলকের বৃষ্টি বেশিক্ষণ থাহে না। থাইমা যাইবো একটু পর।“
কিন্তু বৃষ্টি আর থামে না। “ভাইজানরে কইছিলা ভাবী?” হঠাৎ করেই কথাটা আম্বিয়া বেগমের দিকে ছুঁড়ে দিলো আব্দুর রহিম।
“কইছিলাম তো।“
“কী কয় উনি?”
“কী কমু কও! হেয়তো রাইগা যায়”
“ক্যা? রাগে ক্যা? রাগের কিছু কি কইছি? আদুরীতো রাজি”
“তোমার ভাইয়ে আর তোমার শ্বশুড় এরা হইলো রাগী বংশ। এরা শুধু রাগ দেহাইতেই জানে। আর কিছু না।“
“তাইলে অহন কী অইবো?”
“কি আর অইবো? তুমি তোমার কাজ কইরা ফেলাইবা। এদিকে আর কিছু করার নাই।”
“ও“
আব্দুর রহিম চুপ করে থাকে। অনেকক্ষণ। যেন সে ভাবুক ঋষি! অনেকক্ষণ পর বৃষ্টি ধরে আসে। সে শশব্যস্ত হয়ে উঠে দাঁড়ায়। “তাইলে আমি গেলাম ভাবী। তুমি ভাইজানরে আরেকটু বুঝায়ো। আব্বারে যাতে বুঝায়। আমি গেলাম।“ গেলাম বলেও আব্দুর রহিম ভয়ানক ধীরগতিতে উঠে। আম্বিয়া বেগমের বিরক্ত লাগে। আব্দুর রহিমের উপর বিরক্ত লাগে, বৃষ্টির ওপর বিরক্তি লাগে, আদুরীর উপর বিরক্তি লাগে। পুরো সংসারের উপর বিরক্ত লাগে। “আচ্ছা যাও রহিম মিয়া। আমি বুঝাইবো তোমার ভাইজানরে।“
প্যাঁচপ্যাচে কাদায় সাইকেল নামিয়ে আব্দুর রহিম বলে, “আমি আগামী শুক্কুরবারে আরেকবার আসবো নে। তুমি বিষয়ডা দেইখো।“ নরোম কাদার বুকে সাইকেলের চাকা পিষ্ট করতে করতে সে চলে যায়। আদুরী জানলার খিড়কি দিয়ে একটু উকি দিয়ে দেখে। “মানুষটার চেহেরা মাশাল্লাহ সুন্দর হইয়া গেছে।“ তার বুক চিড়ে একটা স্পষ্ট দীর্ঘশ্বাস জানলার বাইরের শীতল বাতাসের সাথে মিশে যায়।

রাতে আর ভাত পেলো না আদুরী। তার ভাগের ভাত আব্দুর রহিম খেয়ে গেছে। আম্বিয়া বেগম আদুরীকে আবার ভাত চড়াতে বলেছিলো। কিন্তু আদুরী জানে এ শুধু মুখের বলা। ভাত চড়াতে গেলে অমাবশ্যার আঁধার নামবে আম্বিয়া বেগমের মুখে। তাছাড়া, আদুরীরও ইচ্ছে করছেনা আর খেতে। মানুষটা খেয়ে গেছে এতেই তার ভালো লাগছে। এরকম আউশের ভাত, ভর্তা ও ডাল হলে আব্দুর রহিম কতোটুকু তৃপ্তি নিয়ে খেতো আদুরী তা জানে।
তাদের মাত্র ছয় মাসের সংসার ছিলো। ছ’মাস তখন খুব দীর্ঘ সময় মনে হয়েছিলো আদুরীর। মনে হয়েছিলো, এই ছ’মাসে যেন অনন্ত যুগ। আব্দুর রহিমের সংসারের অভাব, অনটন আর অনাহার আদুরীকে অসহায় করে তুলেছিলো। সাথে আব্দুর রহিমের মায়ের অত্যাচার। ভাইজান এসব সহ্য করেনি, আদুরীও পারেনি। শেষতক ডিভোর্স। তাদের ছ’মাসের সংসার। এক দশক আগের ছ’মাসের পরিচিত মানুষটার জন্য আদুরী এখন কোন টান অনুভব করে কিনা সে জানে না। তবে তাঁর নিজের একটা চুলা, নিজের কিছু হাঁড়িপাতিল, নিজের জন্য একটা বাসন, নিজের মতো ক্ষুধা নিবারণ করার স্বাধীনতাটুকুর জন্য চৈত্রের ঝড়ো বৃষ্টির রাতে আদুরীর দু’চোখ বেয়ে পানি পড়তে থাকে। মামুন অবাক হয়ে তাকায় থাকে,
“ফুফু, কান্দোস কেন্? এই ফুফু, কান্দোস কেন?”

ভাইজান রাজি হয় না। আদুরীর ভাইজান। সে বলে, “আব্দুর রহিমের মতো পুলার সাহস হয় কেমনে এই বাড়িতে ঢুকার? ফের যদি এই দিকে তারে দেখি তাইলে তার পায়ের গন্ডা ভাইঙ্গা দিমু কইলাম। আর হেয় যদি আমরার বাড়িত ঢুহে তাইলে মাগী তর ঠ্যাং ভাংবাম“ সে চেঁচায়। “আদুরীরে কয়া দিছ, হের কি ভাত-কাপড়ের অভাব আছেনি আমার বাড়িত? হেই কুনদিক দিয়া খারাপ আছে এইহানে?” আদুরী কানে আঙ্গুল দেয়।
বাইরের আকাশে ফকফকা চাঁদ। চাঁদের আলোয় ধুলার ধরণীর বুকে এঁকে দেওয়া সাইকেলের চাকার দাগে পা ফেলে ফেলে আদুরী এগোয়। আব্দুর রহিম আবার এসেছিল। চিহ্ন এঁকে চলে গেছে। ভাবী তাঁকে আসতে নিষেধ করে দিয়েছে। আব্দুর রহিম বলে গিয়েছে, প্রতি শুক্রবারেই সে আসবে। যত মানাই করা হোক না কেন। তারপর আব্দুর রহিম আবার আসে। তারপর আবার আসে। তারপর আবার আসে।
তারপর একদিন… আব্দুর রহিম আর আসেনা। অতঃপর কাদির কাকার মুখে একদিন শোনা যায় গঞ্জের দোকানদার মজিদ মিয়ার ছোট মেয়ে আকলিমাকে আব্দুর রহিম বিয়ে করেছে।
আদুরী শুনে। কিছু বলেনা। তারপর আমরা আর জানিনা এরপরেও আব্দুর রহিমের আদুরীর জন্য খারাপ লেগেছিলো কিনা। কোনো এক বৃষ্টির রাতে তার কথা মনে পড়েছিলো কিনা। আর ভাইপো মামুনের সেই অবুঝ প্রশ্ন আদুরীকে তাড়িত করেছিল কিনা, “ফুফু, কান্দোস কেন্? এই ফুফু, কান্দোস কেন? “