জুননু রাইন-এর শব্দ-নির্বাচন, প্রয়োগ-কৌশল এবং চিত্রকল্প নির্মাণশৈলী আনন্দদায়ক। এয়া-সিরিজের কবিতায়ও সে-সব বিষয় বর্তমান। জুননু জানেন, পৃথিবীর অবিরাম কোলাহলে মানুষ নিজের নির্মিত অন্ধকারে নিজেকে কেবলই হারায়; সময়ের ও দাবির স্রোতের ভেতরে মিশে যায় আমাদের সমস্ত সংগ্রাম ও অর্জন- যদিও কারো কারো পায়ের শব্দ, গায়ের গন্ধ, শব্দের আওয়াজ ধরে রাখে এই ব্যস্ত-সমস্ত বসুন্ধরা। জুননু পরিশ্রমী ও নিষ্ঠাবান সাহিত্য-সাধক। অনুসন্ধানী সাহিত্য-সম্পাদক। কবিতাচর্চায় পরিণত-বোধের ও পরিচ্ছন্ন চিন্তার ছাপ রাখতে সক্ষম হয়ে উঠেছেন তিনি অল্পকালেই। তাঁর বর্তমান কাব্যের কবিতাগুলোর বর্ণনা-কৌশল আর চিত্রকল্পের প্রয়োগ অসাধারণ। কবিতা-পাঠকের জন্য এক সরল-ভাষ্যের শিল্পযাত্রার পথ-নির্মাণ করে চলেছেন তিনি। জুননুর ‘এয়া’ সিরিজে আমরা একই সাথে আনন্দ এবং অভিজ্ঞতাকে মিলিয়ে অনুভব করতে পারি যার যার অবস্থান থেকে।
কবি হওয়ার জন্য পৃথিবীর কোনো কবিকেই খুব বেশি কবিতা লিখতে হয়নি। আবার কেউ কেউ অনেক কবিতা লিখেও শেষপর্যন্ত কবি হতে পারেননি। হ্যাঁ, একটি বই থাকলেই কিংবা একটির বেশি কবিতার বই না থাকলেও কবিকে চেনা যায়। হেলাল হাফিজ একটি কবিতা লিখেই কিংবা একটি বই বের করেই কবি হয়ে আত্মগোপনে চলে গিয়েছিলেন। নজরুলের ‘বিদ্রোহী’ কিংবা জীবনানন্দেও ‘বনলতা’র পর আর কোনো কবিতা না লিখলেও তাঁদের কবি পরিচিতি লাভ করতে কিংবা খ্যাতি টিকিয়ে রাখতে বেগ পেতে হতো না। কম কথায় অনেক কথা বলার প্রয়াস বিশ্ব সাহিত্যে একেবারে বিরল নয়। কবিতার কথাকে কাঠামোয় বাঁধতে ফারসি রুবাই, জাপানি হাইকু, কোরিয়ার সিজোর মতো প্রচেষ্টা আছে। অনুভূতি ও অভিজ্ঞতা, দৃষ্টিভঙ্গি ও জিজ্ঞাসা, মতামত ও উপদেশ-প্রত্যাশা যদি এক সাথে স্বল্প-বয়ানে হাজির করা যায়, তা কবির জন্য মঙ্গলজনক। তরুণ কবি জুননু সে-পথেই হাঁটতে চান সম্ভবত। কাঠামোবদ্ধ কবিতাচর্চা করলে জুননু ভালো করবেন বলে আমার ধারণা। যেমন ৩ পঙক্তির জাপানি কবিতা ‘হাইকু’ বা ৩০০ পঙক্তির সিরিজ ‘তানকা’ অথবা কোরিয়ান সাহিত্যের ৬ পঙক্তির ‘কবিতা’ সিজো। জুননুর কবিতাগুলোর পঙক্তি সংখ্যা ১০ হতে পারে। অন্তত তাঁর সিরিজে সাজিয়ে-তোলা কবিতাগুলো পড়ে আমার তা-ই মনে হয়েছে।
জুননু রাইন সাম্প্রতিক কবি। কিছু কবিতা লিখে তিনি সমকালীন পাঠকসমাজ এবং সাহিত্য-সমালোচকদের মনোযোগ আকর্ষণ করেছেন। এবং বলা চলে প্রথম গ্রন্থ প্রকাশের মাধ্যমে তিনি বাংলাদেশের কবিতা-অঙ্গনে প্রবেশ করেছেন বেশ খানিকটা জানান দিয়েই। তাঁর এয়া গ্রন্থটির বিষয়-ভাবনা এবং কাঠামো-সজ্জা ভিন্নতর। সৃষ্টিতত্ত্ব এবং মানব-রহস্য কবির বর্তমান কল্পনার বিষয়। আর ‘এয়া’-সিরিজের পরিশিষ্টে (গ্রন্থের প্রথম দিকে; পরিশিষ্ট বলতে আমরা যেমন শেষের দিকের কোনো সংযোজনকে বুঝি, তেমনটা নয়- এখানে সাজানোর কিংবা পরিবেশনের ভঙ্গিটা আলাদা) তিনি যুক্ত করেছেন জীবন-ভাবনার নিজস্ব জিজ্ঞাসা ও অভিজ্ঞানের প্রতিফলন। ‘এয়া’-সিরিজ শুরুর আগেই যুক্ত হয়েছে কতগুলো খণ্ড-কবিতা। পরে যুক্ত হলে না-হয় বলা যেত পরিশিষ্ট। এখন!- একে কী বলা যায়- ‘প্রাক-ক্রোড়পত্র’? এটুকু ভিন্নতা তেমন বড় কিছু না হলেও কবির ব্যতিক্রমি উচ্চারণ ও আবির্ভাবকে স্মরণ করতে পাঠকের আটকায় না।

এয়া গ্রন্থের প্রথম কবিতা ‘রাজা’। ‘এক দেশে ছিল এক রাজা’- এই রূপকথার ভেতর থেকে তুলে আনতে চেয়েছেন কবি সমকালীনতা এবং বহমান সময়ের চরিত্র। এখানে অনুচ্ছেদ ৩টি। প্রথম অনুচ্ছেদে পংক্তি সংখ্যা ৪। পরেরটিতে ৫। তার পরেরটি ৬। সময় গড়ায় ক্রমাগত। বাড়তে থাকে সংখ্যার হিসেব। কিন্তু থেমে থাকে রাজা ও রাষ্ট্র। ‘গণতন্ত্র গণতন্ত্র’ বলে আমরা প্রতিনিয়ত ঢোক গিলি বটে; কিন্তু রয়ে গেছি রাজার রাজ্যে। সময় বর্ধিত হলেও যেন স্থির থাকছে স্যোশিও-পোলিটিক্যাল অবস্থা ও অবস্থান। আর এই অমিত সময়ের প্রবাহে কবি দেখেন তাঁর ব্যর্থতার প্রহরগুলো। কর্পোরেট হাউজের সীমাবদ্ধ-পরিসরে নিজের শৈশব-কৈশোরের পরিচিত স্রোতবাহী নদীকে হারিয়ে, ‘অশ্রুর মতো জীবনের অর্থ’কে খুঁজতে থাকেন কেবল। ভাবেন- ‘নদীটিকে মানুষ মুহূর্তের মধ্যেই লুকিয়ে ফেলে প্রতারণার নিজস্ব পালকে।’ মানুষের বন্দিত্ব, ইনডিভিজ্যুয়াল সংকোচন, শ্রেণি-অধিকার জুননুর কবিতার উপাদান হিশেবে ধরা পড়ে। ‘অ্যাকুরিয়াম’, ‘সংখ্যালঘু’, ‘আদিবাসী’ শব্দসমূহ তিনি সাজিয়ে তোলেন ব্যর্থতার সফল-কাহিনিতে।

সময়ের প্রবাহে ইনডিভিজ্যুয়ালিটির প্রসঙ্গ বাড়ার সাথে সাথে মানুষের নিঃসঙ্গতাগুলো স্পষ্ট হয়ে উঠছে। সারা পৃথিবীতে বাড়ছে হতাশাগ্রস্থ মানুষের সংখ্যা। প্রয়োজন পড়ছে মোটিভেশন ও অ্যাডভোকেসির মতো সামাজিক দায়বোধের। সম্প্রতি ইংল্যান্ডে হতাশা ও আত্মহত্যা প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণের জন্য মন্ত্রী নিয়োগের খবর সেই ইঙ্গিতই দেয়। কবি জুননু রাইন মানুষের এই দৈন্যদশা বিষয়ে দেখি বেশ ওয়াকিবহাল। একটা ছোট্ট কবিতার শেষ-অংশ তুলে দিচ্ছি- ‘একা থাকতে থাকতে দেখে ফেলল কোনো একা রাতে/ দাঁড়িয়ে আছে সে একারই সাথে।’ জীবন, শান্তি, নীরবে সহা বুকের ভেতরে বিষের বালি এইসব অনুভব লুকিয়ে রাখতে পারেন না কবি। মুখ বুজে মুক্তা ফলানোর প্রচেষ্টায় নিয়োজিত রাখেন নিজেকে। খুঁজে ফেরেন স্বদেশের পরিচয়। মাতৃভূমিকে মাত্র ৪ লাইনে (প্রকৃতপক্ষে ৩ পঙক্তি; কেননা প্রথম ও শেষ পঙক্তি অভিন্ন) প্রকাশ করেন এভাবে-
আমি আমার পায়ের কাছে বসেছি
বসেছি হাঁটুমুড়ে
কোথাও বটবৃক্ষ নেই, তাতে কী!
আমি আমার পায়ের কাছে বসেছি
(‘বাংলাদেশ’)

তাহলে জুননুর বাংলাদেশ কি এগোয়নি একটুও। স্থির বরফের মতো জমে আছে। এখানে কি বরফ গলে না কখনো? এখানে কি ‘তনুর ওড়নায়’ ভাসে হজরত আলীর ও আয়েশার প্রশান্ত প্রহর? ‘অপরাধীকে খুঁজে না পেয়ে’ কি শান্তির জীবন নির্মাণ করতে পেরেছে এই জাতি? আমরা কি সাংবাদিক না হয়েও ভুলতে পেরেছি রানা প্লাজায় ‘… মৃত্যুর অদৃশ্য আঁচড়ে/ জড়িয়ে রাখা পোশাকশ্রমিককে’? কিংবা যদি ধরি বিডিআর হত্যাকা-ের কথা? ‘সীমানার চৌকিদার আর প্রবল প্রতাপশালী মহোদয়কে/ গাঢ় পানির সোঁদা গন্ধে সাঁতরাতে দেখব’ আর কতকাল? ‘ক্রসফায়ার’ কি প্রশ্নমুক্ত হতে পেরেছে? বিশ^জিৎ-এর রক্তের দাগ কীভাবে মুছে ফেললাম আমরা?- এসব জিজ্ঞাসা জুননুর। তবে কী পেলাম আমরা স্বাধীন দেশে? মহান মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে কবি শামসুর রাহমান লিখেছিলেন- ‘তোমাকে পাওয়ার জন্যে, হে স্বাধীনতা,/ তোমাকে পাওয়ার জন্যে/ আর কতবার ভাসতে হবে রক্তগঙ্গায়?/ আর কতবার দেখতে হবে খা-বদাহন?’ আর তাঁর প্রথম কাব্য প্রথম গান দ্বিতীয় মৃত্যুর আগে (১৯৬০) গ্রন্থের প্রথম কবিতায় লিখেছিলেন-
হয়তো কখনো আমার ঠাণ্ডা মৃতদেহ ফের খুঁজে পাবে কেউ
শহরের কোনো নর্দমাতেই;- সেখানে নোংরা পিছল জলের
অগুনতি ঢেউ
খাবো কিছুকাল। যদিও আমার দরোজার কোণে অনেক বেনামি
প্রেত ঠোঁট চাটে সন্ধ্যায়, তবু শান্ত রূপালি স্বর্গ-শিশিরে স্নান করি আমি।
(‘রূপালি স্নান’)

তবে হ্যাঁ, আশা ছাড়েননি কবি জুননু। প্রবল হতাশার ভেতরেও, গরম-কাটার বৃদ্ধির সম্ভাবনা দেখেন তিনি। শতাব্দীর জমে-ওঠা সকল আর্তনাদ একদিন দূর হবে। তিনি ভাবেন- ‘… একদিন বৃষ্টি হবে।’ সকল অপরাধ, সকল প্রতারণা ধুয়ে মুছে এই বাংলাদেশে- এই পৃথিবীতে একদিন স্নিগ্ধতা ফিরবে বলে তিনি আশাবাদী।

গ্রন্থে সন্নিবেশিত হয়েছে সর্বমোট ৫৩টি কবিতা। প্রথম ভাগে ১৭টি। পরের- মূল অংশে আছে ৩৬টি। প্রথম পর্বের কবিতাগুলো আপাত বিচ্ছিন্ন হলেও, ধারাবাহিক না হয়েও জাতীয় চেতনা অর্থে ওগুলো পরস্পর সম্পর্কযুক্ত। আর পরেরগুলো একেবারেই ধারাবাহিক। বাংলা কবিতার হাজার বছরের যে ঐতিহ্য, যে ধারা ও রূপান্তর, তাতে আমাদের যে প্রাপ্তি ও অর্জন- তার একটা ধারণা-ছায়া আমরা পেতে পারি জুননুর কবিতা-পল্লবে।

প্রসঙ্গত, ‘এয়া’ হলো- আলো, জল ও প্রজ্ঞার দেবতা। মেসোপটেমিয়া সভ্যতায় ‘এয়া’ একটি প্রস্ফুটিত ফুল। মানবজাতি রক্ষায় দেবতা ‘এয়া’ যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করার জন্য আজও প্রাচীন মিথলজিতে বিশিষ্ট নাম। মানব-সভ্যতার গোড়াপত্তনকারী ইউনাপাসথিম নামের এক শান্তিপ্রিয় মানুষকে স্বপ্নযোগে নৌকা বানিয়ে মহাপ্লাবন থেকে নিজে ও অন্যকে বাঁচবার কৌশল বলে দিয়েছিলেন এই এয়া। তা-না হলে পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যেত। সৃষ্টি হতো না মানব-সমাজ-সভ্যতা। কাজেই এয়া হলেন মানুষের টিকে থাকার পক্ষের প্রবল শক্তি ও প্রেরণা। সম্ভবত কবি জুননু রাইন বর্তমানে লাভ ও লোভের প্রবল স্রোতে ভেসে-চলা সমাজকে বাঁচাবার জন্য কোনো এক ‘এয়া’র প্রতীক্ষায় সময়-যাপন করছেন। হয়তো তিনি অনাগত কোনো দেব-প্রভাবেরও অপেক্ষা-প্রহর গুণছেন। টিকে-থাকার সংগ্রামে এ-ও এক ভরসা! প্রোফেটের অবর্তমানে পোয়েটদের সমাজ-রূপান্তর চিন্তা-সংগ্রাম আমাদের শিল্পযাত্রায় নতুন নতুন মাত্রা যোগ করে চলেছে নীরবে। আর বিপন্ন মানুষ লাভ করছে বেঁচে-বর্তে থাকার সাহস। জুননু রাইন এই চিরন্তন কবিতা-ধারায় একটি নবাগত অধ্যায়।

‘এয়া’-সিরিজের প্রথম কবিতায় কবি লিখছেন ‘আলোর কসম’ নিয়ে- ‘সে রাতের সংঘর্ষে থিয়া রক্তাক্ত হয়েছিল, রক্তগুলো কয়েকশো আলোকবর্ষে বৃষ্টি,/ বৃষ্টিরা হাসছিল জোছনা, অথবা কাঁদছিল- ফ্যাকাসে বোবা কান্না।’- এই হলো আমাদের অবস্থান- মানুষের কান্না-ক্লান্ত বিচরণ ও বিবর্তনধারা। মূলত হাজার বছরের পরিক্রমায় ‘মানুষের সঙ্গে সবুজের দূরত্বের ইতিহাস’ রচিত হয়ে চলেছে এখানে। মাটির মমতায় ভাষা-সংস্কৃতি-ঐতিহ্য মানব-সভ্যতায় যে ইতিহাস নির্মাণ করেছে, তার পেছনেই গেঁছে আছে আমাদের শেকড়ের সন্ধানসূত্র। কিন্তু তাঁর আগে! পরিবেশবাদ- বৃক্ষরোপন, জলবায়ু পরিবর্তন- এগুলো? জুননু বলছেন আমাদের সম্পর্কের কথা- কার সাথে সম্পর্ক- মানুষের সাথে না-কি প্রকৃতির সাথে? পৃথিবীর সাথেও আছে না-কি কোনো সম্পর্ক আমাদের? ‘এয়া’-৫-এ লিখছেন কবি- ‘রেখে দাও যত্নে ধুয়ে মুছে/ ব্যবহার্য সকল সম্পর্ক,/ … মানুষের আঘাতে বৃক্ষের শরীরের রক্ত/ এখনও নদীর ঢেউয়ে ঢেউয়ে জীবনের অভিমান।’

অতঃপর কবিতার শরীর বেয়ে, পৃথিবীর সভ্যতার ইতিহাস থেকে, কবি নেমে আসেন ‘এই বাংলার হারানো গ্রামের’ ঐতিহ্য আর অপ-রাজনীতির প্রকোপের ছায়ায়। সংস্কারচিন্তা, মাইনাস-ফর্মুলা, পরিবারতন্ত্র ও রাষ্ট্র-ক্ষমতা কেন্দ্রীকরণ তাঁকে ক্লান্ত করে। তাঁর পিপাসা ‘পানি চায় চোখের দূর আঙিনায়’। কবি আবুল হাসানের মতো, যিনি বলেছিলেন- ‘ঝিনুক নীরবে সহো/ ঝিনুক নীরবে সহো, ঝিনুক নীরবে সহে যাও/ ভিতরে বিষের বালি, মুখ বুজে মুক্তা ফলাও!, ক্লান্তকিশোরের দুপুর-যাপনকে চিন্তায় ধারণ করলেন জুননু। বললেন- ‘হৃদয়ে তোমার নিঃসঙ্গ দুপুরের অর্থ গাঁথো।’

তারপর আমরা কী করে বেঁচে থাকি এই নর্মদাময় পৃথিবীতে? একটু স্পেস খুঁজি আমরা। ঘরের সাথে যেমন বারান্দা। শোবার ঘরের সাথে লাগোয়া। বারান্দায় আমরা ঘুমাই না। কিন্তু বারান্দা বাদ দিয়ে ঘর বা বাড়ি কল্পনা করাও যায় না। দাঁড়াবার, শ্বাস নেবার, প্রাণ ভরে স্বপ্ন দেখার জায়গা এই বারান্দা। আর সবকিছুর ভেতরে ও বাইরে নিজেকে জানার যে ব্যাকুলতা, তার থেকে কোনো নিস্তার পাই না আমরা কিছুতেই। নজরুল তাঁর ‘বিদ্রোহী’ কবিতায় বলেছিলেন- ‘আমি সহসা আমারে চিনেছি, আমার খুলিয়া গিয়াছে সব বাঁধ!’ একটু পরে রিপিট করেছেন- ‘আমি চিনিছে আমারে, আজিকে আমার খুলিয়া গিয়াছে সব বাঁধ।’ এই রিপিটেশান কি বিষয়ের কিংবা বক্তব্যের গুরুত্ব বুঝাতে? তার তাৎপর্য কবিতা-বোদ্ধারা বের করতে পারবেন। প্রসঙ্গত, আমার মনে হয়েছে নবীন কবি জুননুর ভেতরেও ওই উপলব্ধির প্রখরতা আছে। একবার ইরানের কবি ফখরুদ্দিন ইরাকি বলেছিলেন- ‘অনুভবজ্ঞানে পরিশুদ্ধ হও’। জুননু লিখলেন- ‘আমি একবার আমাকে ছুঁই।’- নিজেকে আবিষ্কার করতে গিয়ে তিনি অনুভব করেছেন মানবিক দূরত্ব, সম্পর্কের হালচাল ও প্রাচীনতা। পৃথিবীর এই যে টিকে-থাকা ও পরিবর্তন-রূপান্তর, তার একটা কল্প-বাস্তব চেহারা তুলে ধরেন কবি-
ভেবেছিলাম একদিন কোনো এক রাস্তার চায়ের দোকানে
তোমার পাশে বসব। আমাদের একপাশে বসবে নীরবতা
অন্যপাশে সবুজ-প্রকৃতি, তোমার চোখ দু’টোতে নদী থাকবে
ভালোবাসার জল থাকবে, ঢেউ থাকবে-
আমার জোয়ার-ভাটায় তোমাকে ডানে বাঁয়ে টানব
কিন্তু তুমি তখনও আমার পাশেই থাকবে
পায়ের বুড়ো আঙুলের নখে নরম মাটি খুঁড়বে,
সামনের শূন্য পথের দিকে তাকিয়ে আরও বহু দূরে
তোমাকে রেখে দিয়ে, আমার পাশেই বসে থাকবে।
(এয়া-১৭)

যে-স্বপ্নবারতা দিয়ে মানব-সভ্যতা রক্ষার নির্দেশনা দিয়েছিলেন এয়া, তার ফলাফল কি এ-ই? কী লাভ হলো পৃথিবী টিকিয়ে রেখে? মানুষে মানুষে সম্পর্ক কি আজও মানবিক হতে পেরেছে? আজও কি প্রেমময়তার ছোঁয়া পেয়েছি আমরা? শেষপর্যন্ত কবিদেরকেও তো আপাত স্বপ্নের ওপরই ভর করতে দেখা যায়। মাইকেল মধুসূদনের ‘স্বপ্নে তব কূললক্ষী ক’য়ে দিলা প’রে’ কি তারই প্রতিফলন নয়? শেষতক কি তবে আমরা কেবলই ‘আশার ছলনে ভুলি’? কী এক অজানা কারণে যে, ‘দীর্ঘ হয় শহরের ইতিহাস/ মানুষের বিশ্বাসের ইমারত ভেঙে পড়ে’, তা কিছুতেই বুঝা যায় না। আর এমনই এক ঘোরের মধ্যে সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্কে লিখতে হয় কাঁদে নদী কাঁদো, হুমায়ূন আজাদ লেখেন সবকিছু ভেঙে পড়ে। জুননু দেখেন দিনের অবসান আর রাত্রির অবগাহনের ছায়া ও ছবি। জীবনের আলো-ছায়ায় আবিষ্কার করেন প্রবল নিঃসঙ্গতাকে- ‘সন্ধ্যা যতদূর একা একা হেঁটে যেতে পারে/ দূরের আধমরা নদীতে রাত্রিটার শুয়ে পড়া শেষে/ এখানে-ওখানে তোমার মৃত্যুতে ভেসে ওঠা দেশে/ আমি খুব একা’। (এয়া-১৯) ‘প্রচ- দুপুর’, ‘মেঘাচ্ছন্ন কিশোরের ছেঁড়া ঘুড়ি’, ‘মহারোমান্টিক উভয় সংকটের চিত্রকলা’ অতিক্রম করে কবি বুঝতে পারেন- ‘এখানে কোনো পথ নেই তোমাকে পেরুবার’; হুমায়ূন আজাদও যেমন টের পেয়েছিলেন- পেরোনোর কিছু নেই। আশাবাদ ও অবসাদ-ক্লান্তির ভেতরে যাপন করতে করতে কবিকে একসময় চ্যালেঞ্জিং প্রহর পার করার জন্য প্রস্তুতি নিতে হয়। জুননুও নিয়েছেন। পরিণত-ভাবুকের মতো লিখেছেন- ‘দেখব মানুষের গর্ভে কী করে ঈশ^রের জায়গা হয়।’

রাত্রি ও পৃথিবীর ক্রমাগত ওজন বাড়ার কালে, চারিদিকে মরা ফুলের সংখ্যা বৃদ্ধির সময়ে, ‘বহুজাতিক সৌন্দর্যে আক্রান্ত’ হওয়ার প্রবল প্রহরে ‘নির্মিত নিয়তি’র ওপর আস্থা রেখে জুননু জানান দিতে চান- এক মাঘে যেমন শীত যায় না, তেমনই ইটটি মারলে পাটকেলটি খেতে হয়। মাল্টিন্যাশনাল সভ্যতার বাতাসে আমরা এই সত্য যেন ভুলে না যাই যে, ‘ঠা-া সাপের গতিতে/ বাতাস ঢুকবে হৃদয়ে। জীবনাননন্দ যেমন বলেছিলেন- ‘এইসব শীতের রাতে আমার হৃদয়ে মৃত্যু আসে;’ (‘শীতের রাত’) হারানোর মিছিলে যোগ হচ্ছে আমাদের নতুন নতুন প্রসঙ্গ। বস্তু ও অবস্তু হারিয়ে আমরা নিঃস্ব থেকে নিঃস্বতর হচ্ছি। যে মানবজাতি একদিন নৌকায় ভর করে টিকে গিয়েছিল, তা আবার কোন শিঙ্গার ফু-এ বিলীন হবে- কখন কে জানে?

চারিদিকে যখন মৃত ঘর আর মৃত বাড়ি দাঁড়িয়ে থাকবে সারি সারি, তখন নটে গাছটি মুড়োবে- মানুষের গল্প ফুরোবে। হাসি হারানোর দীর্ঘ গল্পের ভেতর দিয়ে প্রাক-সভ্যতার আদিপর্ব থেকে আধুনিকতায় এসে নিমজ্জিত হয়েছি আমরা। কবি জুননু রাইনের অনুভব- ‘তারপর হাসতে হাসতে হাসি আমাকে ফেলে রেখে/ হাসতে হাসতে সময়ের হাত ধরে হারিয়ে যায়।’ (এয়া-৩৬) ছোট্ট এই বইটিতে কবি থরে থরে সাজিয়েছেন যে-কথামালা, তার ভেতরের শাঁস ও সত্যটুকুকে মেনে নিয়ে করে বলতে ইচ্ছে করছে- লোক-কল্পনার মোড়কে নবতর শিল্পব্যঞ্জনা সৃষ্টি করেছেন তরুণ কবি জুননু; জাগিয়ে দিয়েছেন আমাদের ঘুমিয়ে-পড়া এবং খানিকটা ‘চোখে নাগরিক ধুলা’ জমা চেতনাকে।