অভিমান

জমে থাকা পাথুড়ে অভিমান
একদিন ঝরনা হয়ে গড়াবে।
নদী থেকে মহাসমুদ্রের কোলে,
দিগন্তে ভাসা স্বপ্নগুলি জানি সেদিন মেঘ বৃষ্টির খেলা খেলবে।
পিপাসিত হৃদয় তাতে পুর্ন হবে কি?
যে এপিটাফ বুকে একে একদিন তুমি হাত স্পর্শ ধরেছিলে-
কেপে উঠা অস্তিত্বের শিহরনে বসন্ত বাতাস এনেছিলে
আজ সেখানে রক্তাক্ত সময়ের ডালে পলাশ শিমুল ফোটে
জীর্ন বয়সি চামড়ার ভাজে স্মৃতি হাহাকার করে।
শিশির ভেজা ঘাসে,
আগামির সব সকাল হয়ে গেছে বিষন্ন রাতের তারা
কবিতা লেখা ছন্দের আয়ু এখনো মরিয়া হয় হারানো কারো মুখে সেই কথা শোনার প্রতীক্ষায়।
……………………………………………

অনুভব

অনেকদিন হল
আমি পাথুড়ে স্মৃতিমালা গাথিনি –
মাটির কবরে শুয়ে অন্ধকার একাকীত্বের গান গাইনি
সময়ের পাটাতনে চলে গেছে অনেক বছর যুগ
তবু সবুজ পাতায় সজল ঘটনা প্রবাহে
কিছু ছবি এখনো চিরঞ্জিব নিলয়ের রক্তে।
অভিমানি ফেরারি আয়ু,
এখনো ছুরির ফলায় খুচিয়ে খুচিয়ে বৃষ্টি ঝড়ায় এই অবেলাতেও
যেন নিস্তার নেই এই প্রতিবন্ধী ইচ্ছের বাগানে।

তছনছ করে দেয়া শব্দ বাক্যে নিত্য অপমানের ঝুলি নিয়ে,
বিষন্ন দিগন্ত আকুল হয় স্বস্তির বাতাস পাবে বলে সেও
অনেকদিন হল…
নেই সেই মুক্ত চলাচলে তোমায় দেখার আনন্দ
নেই কবিতার সাথে লেখার কিছু
আশ্চর্য যোগাযোগ!
অথচ এখনো মন খারাপ হয় সময়ে অসময়ে
আমার বলা হয়ে উঠে না আর সেই সংলাপগুলি…
বুকের খাচায় রাখা পরিপাটি সেই কথামালার একান্ত অনুভব।
……………………………………………

সংলাপ

এ বড় অবিশ্বাসী সংলাপ
ডানাকাটা সময়ের কাছে এক নারীর আর কি ই বা চাইবার থাকে!
নদী কিংবা ঝরনার জলে সে শুধু সিক্ত করে,
পাথুড়ে ঋজুতা দিতে পারে কি…
সবুজ পাতায় আঁকা ছবি,
এক এক করে মালঞ্চ সাজায় আষাঢ় শ্রাবণে দেখা হবে বলে।
অধিকারহীন পৌষে তবু হৃদয় কাঁপায় ভালবাসার উষ্ণতা মেখে
ভাবলেশহীন জীর্ণ বয়সী বসন্তে তবু কেন রমনীর সঙ্গ লাভের জন্য চারদিকে এত হাহাকার…
জরাগ্রস্ত অবনীতে জীবাণু কবলিত এই জীবন সায়াহ্নে
নরম ছোঁয়া কিছু প্রতিশ্রুতির অবিশ্বস্ততা এসে জানান দেয়
এখানে ফুলপাখি, কাজলদিঘী কিংবা পার্কের বেঞ্চির অন্তরঙ্গ মুহুর্ত
সবই ছিল ভুল…
নেহায়েত স্বপ্নীল অভিমান বৈ তো আর কিছু নয়
ছিঁড়ে যাওয়া পালের নৌকায় জলহীন কিছু উক্তির আনাগোনা মাত্র।
……………………………………………

আমার কিছু ছিল

আমার কিছু দিন ছিল
সবুজ পাতার শিশির ভেজা কুয়াশার অন্তরালে।
আমি দিনভর হেটেছি পিচ ঢালা রাস্তায়,
আরক্ত আবীরে ঘামে ভেজা হৃদয় চিড়ে।
আমার কিছু অভিমান ছিল
ফোলা ঠোটে অধিকারি ভালবাসার
অন্তরঙ্গ বাধনে কবিতার ছন্দে
উষ্ণতায় গলে পড়বার ।
আমার কিছু দ্বিপ্রহর ছিল
সোনালী রোদে চড়ুই এর পুচ্ছ নাচা উচ্ছ্বাসে
পলাশ শিমুলের ডালে গোয়েন্দা চোখের আড়ালে।
আমার কিছু প্রতীক্ষা ছিল
হাত ধরে অশ্রুসজল হাসির
অপেক্ষার বেঞ্চিতে বসে কথায় কথা বলবার!
আমার কিছু বিকেল ছিল
পাশাপাশি বসবার
গোধুলির আলপনা আকা প্রচ্ছদে আকুল আর্তির
বিদায়ী বিহাগে অবগুন্ঠনে মিশে যাবার।
আমার কিছু রাত ছিল
একাকি জেগে থেকে মুঠোফোনে এস এম এস দেখার
কথার বুকে অভিসারি আচলে কান্নার সুরে…
এখন আমার আর কিছু নেই
পাথুরে এপিটাফে বরফ গলা নদীর মত

অসময়ে নীল আকাশ ঢাকা কালো মেঘের বিষন্নতায়।
এখানে এখন আর ফাগুন হাসে না
অবিরাম বৃষ্টিতে কেউ বলে না আরেকটু থাকলেই পারতে
চোখের জানালায় শার্সিতে নিরন্তর জলধারায়।
কেউ আর বলে না আচ্ছা তুমি অমন করলে কেন আমার সাথে?
পৃথিবী এখন আমার কাছে শবাধার
অনির্বান জ্বলে পুড়ে যাওয়া ক্ষত বিক্ষত ফুসফুসে
অম্লজানহীন এক একটি অনুভুতির নীরব মৃত্যুর মিছিল৷
……………………………………………

জমাট ভাবনা

সময় জমাট বেধেছে পাথুড়ে অভিমানে
উড়ে যাওয়া পাখির ঠোটে স্মৃতিগুলি নিয়ে
দিগন্তের কালো মেঘ ঢাকা অশ্রু নিনাদ
ভিজিয়ে দেয় অকাল আবহাওয়ার সব পুর্বাভাষ।
তবু মধ্য দুপুরে নিম্নচাপ বাড়ে উচ্ছ্বসিত আমুদে কথার ফাঁকে,
নীলাঞ্জনা নাকি অলকান্দা কেউ একজন ভালবাসা দিয়েছিল মৃত্যুঞ্জয়কে…
তেতুলিয়ার জিরোপয়েন্টে দাঁড়িয়ে নীলাচলের বুকে
এখনো ব্যস্ত ঢাকার যানজটে খুনসুটি করে মনের কবিতারা।
কাওরানবাজারে মাছ আর শব্জি তরকারি কেনার উঠানামা দরে,
হাপিয়ে উঠে জীবানুর কাছে সমর্পিত সব রোজনামাচায়।
উঠতি শব্দ বাক্য বুক পকেটে নিয়ে রাতের অভিসারি হয়,
এক দঙ্গল তরুন তরুণী
ফ্যান্টাসীর অলীক স্বপ্নে সর্বনাশী আয়ু তখন জামার বোতাম খুলে
নদীর বুকে এগিয়ে চলে দক্ষ মাঝির মত।
তোলপাড় করা ছবিগুলি নিয়ে কাদাপানি এক করে ফেলে নিষিদ্ধ ইচ্ছেরা

সেখানে গ্রেফতার নাটক পরিহাসের হাসি বৈ আর কিছুই নয়।
আমি তাই লক্ষ বছরের ফাসির আসামি হয়ে ঠাই দাঁড়িয়ে থাকি,
ব্যালকনির অপারে ঝুলে থাকা বোগেনভেলিয়ার স্কন্ধে
যদি তুমি একবার এসে দাঁড়াও
বুভুক্ষ কথামালায় এই অন্তরের দরজা ঠেলে।
……………………………………………

ফিরে আসুক

বিরুদ্ধ বাতাসেও অক্ষত থাকে কিছু অভিমান,
অন্তর্গত রক্ত সঞ্চালনে কিছু সংলাপের বুকে
নিস্তব্ধ মনে ফিসফিস করে।
কবিতার অবাধ্য কিছু ছন্দিত বাক্যাবশেষ
অনন্ত নদীর স্নিগ্ধ জলে আড়িপাতা অবয়বে
আমি কেবলি ঘুরপাক খাই তোমাকেই ঘিরে।
আরন্যক ছায়ার বিস্তারে মহীরুহ স্মৃতির পাহাড়,
খুজে টলটলে জলে আদ্যিখেতার আলিঙ্গন টের পায়।
শেওলা ভরা এপিটাফে লেখা তোমার আমার যত প্রতিশ্রুতি
ফিরে আসুক ভোরের শিশির হয়ে এই পলেস্তরা খসা বহুযুগের পরিত্যক্ত চিলেকোঠায়।
……………………………………………

ক্ষমা

রক্তমাংসের অস্তিত্বের ছবিরা খবুলে খায় স্মৃতি
জানি নিয়তির মাটি চাপা দিয়েছে তোমায় করেছে সব ইতি!
মনে খারাপের বিকেলে তবু কেন
এত রক্ত ঝরে
বুকের প্রাসাদে নিলয়ের গভীরে এমন করে?

যতটুকু ভালবাসা আর মমতা দিয়েছিলে দুহাতে
সবটুকুই নিয়েছি জীবন ভরে সময়ের দিনরাতে।
একদিন কত কথা হয়েছে বিনিময়
আজ যখন হয়েছি উত্তাল মনে তুমি তখন হয়েছ নিস্তব্ধ শবময়।
ভাল থেকো অন্ধকার প্রাচীর ঘেরা আড়ালে,
নিরন্তর সুখে জান্নাতের মাঝে নির্ভাবনার অন্তরালে।
অবিভক্ত সম্পর্কের বাগানে আজ তছনছ হয়েছে ফুল
যদি পার দিও মাফ করে দিও আমার করা যত ভুল।
……………………………………………

বঙ্গবন্ধু তোমার জন্যে

ঘুটঘুটে আধার
সময়ের রাতে বসে ভাবছিলে একাকি
বাংলার মানুষ তোমরা কোথায়!
কাদের এসে মধ্যরাতে জানান দিল
পিতা থাকবেন সাবধানে ট্যাংক দেখেছি শাহবাগে,
ধুর পাগল বঙ্গবন্ধুকে কি কেউ মারতে পারে
অসুর পাকিস্তানি হানাদারেরাও কেপেছিল ভয়ে
সবার আগে।
ঘুম ভেঙ্গে গোলাগুলি! কি হচ্ছে ওখানে?
বুঝে উঠবার ফাঁকে
কামালের নিথর দেহ থেকে রক্তের ধারায় ভিজে
গেল পিতার পা দুখানি
কে মারলে ওকে ফোন তুলে তিনি বললেন আমি মুজিব
বলছি তোমাদের মহান জাতির পিতা
শফিউল্লাহ তোমার ফোর্স সামলাও স্থপতির ছেলে ধুলায় লুটায়…

কর্নেল জামিল আসছে বললো এসে পড়ল বলে
কিন্তু সেও বুলেটবিদ্ধ মৃত অসহায়
পিতাকে বাচাতে আসা বীর বাঙালীর প্রথম আত্মাহুতি ।
সেরনিয়াবত শেখ মনি সবাই কি রক্তের বন্যায় গেল
ভেসে?
অন্তঃস্বত্বা রমনী অথবা শিশুও পায়নি রক্ষা
এ কেমন হত্যার নারকীয় উল্লাস থমথমে ত্রাসে
তোমরা কি চাও বলেছিলে উদ্ধত তর্জনী উচিয়ে…
সিড়ির কোলে ঘুমিয়ে গেলে লাল রক্তমাখা মানচিত্র জড়িয়ে।
৭ ই মার্চের তর্জনি সহ দেহ হল বুলেটে ঝাঝড়া
বঙ্গমাতা তখনো বলছেন আমাকে স্বামির কাছে যেতে দাও,
আমি এখান থেকে এক পাও নড়ব না বঙ্গবন্ধুর রক্ত
মারিয়ে।
হতবাক স্তব্ধতা নিয়ে হরিণ চোখের মায়াবি নব বধুদ্বয় এর
কিংবা শিশু রাসেল কি দোষ ছিল তাদের বলে যাও পাষণ্ড খুনীর দল
জ্বলে উঠা জিপে নিভু আধারে কিসের এত সাহস!
বত্রিশ নম্বরে নেমেছিল এক জেনোসাইডের দানবীয় অস্থিরতা,
আমাকে মার কাছে যেতে দাও মহিতুর ভাই
রক্তাক্ত গার্ড আর কেয়ারটেকারের রক্তাক্ত শরীরের
বাকে মুখ গুজে বলেছিল ,
বাংলাদেশ কাদে খামচে ধরা অসুরদের উতপাতে…
ঠিকরে বের হওয়া চোখ গলে নিহত রাসেল আর যেতে
পারেনি বঙ্গমাতার কোলে।
সিড়ির বুকে পড়ে থাকা বঙ্গবন্ধু যেন এক বাংলার সবুজ বুকে ছোপ ছোপ রক্তের নিনাদ
গর্জে উঠেছে টুঙ্গীপাড়া থেকে সারা বাংলাদেশে
ফাসি হয়ে যাওয়া সব দস্যু আর একাত্তরের ঘাতক আজ নরকে পুড়ে ছাই
তবু পনেরই আগস্ট আসলেই শোকের বিষন্ন মেঘ ঢাকে বঙ্গবন্ধু তোমার জন্য তাই

এই উত্তর পঞ্চাশে এসেও বৃষ্টি পড়ে চোখে বাধভাঙ্গা অশ্রুজলে।
……………………………………………

অপারগতা

স্তব্ধ স্থাপত্যের আড়ালে
কত নির্ভাবনা জ্বাল বিছিয়ে দেয়!
ঋজু গম্ভির মুখে তাকিয়ে
একের পর এক ছিড়েছি সম্পর্কের ফুল
নিস্তরঙ্গ সলিলের প্রতিসরনে
ঝলসে উঠা অনুশোচনার অগ্নিকুন্ড,
ধোয়ায় ঢেকে দেয় স্মৃতির যত ছবি
তবু জানি শব্দ বাক্য লিখে হতে হবে কবি।
জীবনের রঙীন উচ্ছ্বাসে
পিছুটানে এগিয়ে আসা ব্যর্থ অলিগলি!
বিভ্রান্ত স্বপ্নের মত বিস্মিত করে,
অকারন অপারগতার রাস্তা মেপে এত আকুল করে।
……………………………………………

শুভেচ্ছার নীড়ে


স্থবিরতায় আটকে থাকা জীবনে
দিনে দুপুরে স্মৃতির জট ভীড় করে!
রোমান্থনের দুষ্টচক্রে বুদ হয়ে থাকি ভালবাসার নেশায়,
শিশির ভেজা সবুজ ঘাস থেকে গোলাপের সজীব পাপড়ি ভরে।
একদিন নিয়মিত হেটে গেছি
উদ্বিগ্ন অস্থির টানে
এস এম এস আর ফোনের সংলাপের আবেগে আকুল করে

অশ্রু ফোটার অপেক্ষার হাসি দিয়ে
ঠিকই পৌছে যেতাম কাঙখিত স্বপ্নের বর্নালি জলসায়।
কিছু সময় কবিতার ছন্দে ঝরণার পানিতে
উছলে উঠত সময়ের বাকে গোধুলীর আল্পনায়।
আজ এখানে চলমান তীব্রতায়
অপসৃত আমার সব লেখা
উত্তাপ মাখা রোদে কাদাপানির অভিমানে
ভেঙ্গে যাওয়া হৃদয়ে রক্তাক্ত কান্নায় যন্ত্রনার নতুন মানে শেখা।
ক্লান্তিহীন স্পর্শের অনুরাগে লজ্জার আবীর ঘেষা দুপুরে,
উড়ন্ত ফাগুন এসে পলাশ শিমুলের ডালে লাল ছোপ একে দেয়
স্ফীত ঠোটে বিদায়ী বিহাগের কান্নাভেজা এক শুভেচ্ছার নীড়ে।