টিনা, রিনা ও সাধু তিন ভাই-বোন মিলে অংক খেলা খেলছে। চার বছরের সাধু মানসাঙ্কে খুব পাকা। মমতা বেগম বসে বসে তাদের খেলা উপভোগ করছেন। পুলকিত হচ্ছেন এই ভেবে, এতোটুকু ছেলে তার ছোট বোনদের কী পরমস্নেহে অংকের নানা মারপ্যাচ শেখাচ্ছে। এমন সময় হন্তদন্ত হয়ে আমির আলী ঘরে ঢুকলেন। মমতা বেগম অবাক হয়ে প্রশ্ন করলেন, কী হয়েছে?
আর বলো না!
তোমাদের বাড়ীঘর ফাঁকিস্থানি মেলেটারীরা জ্বালিয়ে দিয়েছে। তোমার বোন মুক্তাকে রইস মোড়ল আর হাসমত মোড়ল মেলেটারী ক্যাম্পে নিয়ে গেছে। সারাগ্রাম পুড়ে ছারখার।
মমতা বেগম হাউমাউ না করে স্বামীকে বলে দিলেন, আমি গর্বিত আমার বাবা ও ভাই দুজনই মুক্তিযুদ্ধা।আমি গর্বিত মুক্তিযুদ্ধে যাওয়ার অপরাধে আমার বাদেশ্বড়ী গ্রাম পুড়ে ছারখার। আমি গর্বিত,এই মুক্তিযুদ্ধের কারণেই আমার ছোটবোন মুক্তাকে ইজ্জত দিতে হচ্ছে। আমি আরো গর্বিত হতে চাই আমার প্রিয়তম স্বামীকে মুক্তিযুদ্ধা হিসাবে দেখে। কারণ আমাদের প্রিয়তম নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন, “দেশপ্রেম ঈমানের অঙ্গ।যার দেশপ্রেম নাই তার ঈমান নাই “। বলছি আপনি পুরুষ হয়ে থাকলে এখনই মুক্তিফৌজে যোগদিন।আমার জন্য, আমার সন্তানদের জন্য কোনো চিন্তা করবেন না।আল্লাহ আমাদের রক্ষা করবেন।
আমির আলী বউকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেললেন। মমতা!তোমাকে পেয়ে আমি ধন্য। তোমার মতো জীবনসঙ্গী পাওয়া যেকোনো পুরুষের জন্য ভাগ্যের।আজ থেকে দশদিন পূর্বে কালা আর আফিল ভাইয়ের সাথে যাওয়ার কথা ছিলো।পারিনি। এক টুকরো জমি নেই, ঘরে বাড়তি কোনো খাবারও নেই। তার উপর আমাদের সাধুর বয়স মাত্র চার।মেয়েগুলো আরও কচি। আমি চলে গেলে তোমরা খাবে কি?একারনে যেতে চাইলেও তারা নেয়নি। আজ তুমি আমার মরুভূমিতে বৃষ্টির ছোঁয়া দিলে।মনোবল বাড়িয়ে দিলে। আমি আর ঘরে বসে থাকবো না। আজই যুদ্ধে যাবো। আমাদের দেশকে আমরা রক্ষা করবোই।
মমতা বেগম প্রতিদিন বাড়ি বাড়ি গিয়ে কাজ করেন। যার বাড়িতে গিয়ে কাজ করেন তার বাড়ীর ভাসি খাবার খেয়েই চলছে তার আত্মতৃপ্তির সংসার। রাতে বাড়িতে এসে স্বামীর রেখে যাওয়া দাড়ালো কুড়াল শিয়রে রেখে তিন বাচ্চাদের যুদ্ধের গল্প বলে বলে রাত পার করেন। একদিন গভীর রাতে হাসমত মোড়ল দরজায় এসে ডাক দেয়, মমতা দরজা খুলো।মমতা পটাপট কুড়ালটা হাতে নিয়ে দরজা খুলতেই হাসমত মোড়ল আর মেলেটারী অফিসার হুরমুড় করে ঘরে ঢুকে। মেলেটারী কোনোকিছু বুঝবার আগেই মমতার কুড়াল তার মাথা ভেদ করে গলা পর্যন্ত পৌঁছে যায়।হাসমত মোড়ল দৌড়িয়ে প্রাণ বাঁচাতে চাইলে সেও রক্ষা পায়নি। মমতা চিৎকার করে বলে মুক্তিযুদ্ধাদের কাছে রাজাকারদের জাহান্নামের টিকেট খুবই সস্তা!
দীর্ঘ সাড়ে আট মাস যুদ্ধ করে আমির আলী বিজয়ীর বেশে গ্রামে ফিরলে তাঁকে প্রথম দেখেই তাঁর এক ফুফু আলেকজান বিবি ভয়ে হাতে থাকা গরম তেলের হাড়িতে মুখ পুড়িয়ে ফেলেন। এ যেন আমির আলী নয়;সাক্ষাৎ এক দত্য।মহিলার মতো ইয়া লম্বা চুল।উম্মাদের মতো জটা লাগানো। সন্যাসির মতো কিম্ভুত কিমাকার দাড়ি গোঁফ। নাওয়া খাওয়া ঠিকমতো না হওয়ায় জন্তুর মতো চেহারা।
তাঁর কাছেই আমির আলী জানলেন, মমতা বেঁচে নেই। মেলেটারীরা ধরে নিয়ে অমানবিক নির্যাতন করে তিনদিন পর মেরে উলঙ্গ করে আম গাছের ডালে লটকিয়ে রেখে যায়।সারাগ্রাম পুড়িয়ে দেয়।মুক্তিযুদ্ধে যাওয়ার অপরাধে গ্রামের কাউকে ওরা বাঁচতে দেয়নি।
আমির আলীর বন্ধু কুদরত খাঁ’র কাছ থেকে সন্তানদের এনে নতুন জীবন শুরু করলেন। সারাদিন কামলা খেটে রাতে মাছ-ভাত নিজেই রান্না করে বাচ্চাদের নিয়ে খেয়ে -দেয়ে মুক্তিযুদ্ধের রোমাঞ্চকর গল্প শুনিয়ে ঘুম পাড়ান।এভাবে চলতে চলতে একদিন বন্ধুবান্ধবদের পরামর্শে দিনমজুর এক মহিলাকে বিয়ে করে সুখ খুঁজেন।
কিছুদিন যেতে না যেতেই নেমে আসে বীরাঙ্গনা মমতার সন্তানদের কপালে দুঃখ। তারা হয় বাড়ি ছাড়া। অসহায় আমির উদ্দিন চোখের পানি লুকিয়ে আদরের তিন সন্তানদের দিয়ে আসেন তাদের যুদ্ধাহত মামা আকবর আলীর কাছে। সেখানেও টিনাদের কপালে সুখ নেই। মামির রোজগারে চলা পরিবারে যুদ্ধাহত আকবর আলী আগথেকেই অপাংক্তেয়! তাই দশবছরের সাধু বেছে নিলো রুজির পথ।সারাদিন মাছবাজারে পলিথিনের ব্যাগ বিক্রি করে যা আয় হয় বিকালে মামির জন্য চাল ডাল নিয়ে আসে।
আজ সাধুও বাবার মতো তিন সন্তানের জনক।নিজে কামলা খাটে। ছেলেরাও কামলা খাটে।নিজস্ব কোনো বাড়ি নেই। তবুও সাধুর গর্ব; আমি মুক্তিযুদ্ধা মা-বাবার সন্তান। বাড়ি নেই-তো কী হলো? টোটাল দেশটাই-তো আমাদের বাড়ি।