কোনো নিষেধ মানে নি। কারণে অকারণে বাইরে গেছে। কখনো কখনো কারো গায়ের সাথে লেগে গেছে গা। বাসায় এসে হাত ধূয়েছে; তবে বিশ সেকেন্ড না-নষ্ট করার মতো এতো সময় কোথায়! টিভিতে এতো সতর্ক বাণী প্রচার করা সত্ত্বেও অনেকেই গায়ে মাখে নি-কী আর হবে এই মনোভাব নিয়ে চলেছে এবং অবধারিতভাবে করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে চলে যাচ্ছে না ফেরার দেশে।
আবির বাসায় ঢুকার সাথে সাথে মরিয়ম আক্তারি ছুটে এলেন স্যাভলন গোলানো জলের স্প্রে বোতল নিয়ে। আবিরের মুখোমুখি হয়ে বিরক্ত কণ্ঠে বললেন, তোর জন্যই আমাদের করোনা ভাইরাস হবে! পরিবারের কেউ বাইরে যায় না তুই ছাড়া। নিষেধ করা সত্ত্বেও তুই যখন তখন বাইরে যাচ্ছিস! তুই তো মরবি-ই, আমাদেরও মারবি!
ছেলের সারা গায়ে স্প্রে করে মরিয়ম আক্তারি ফের বললেন, এখন সরাসরি বাথরুমে ঢুকবি। সাবধান! পর্দায় গা লাগাবি না! গায়ের কাপড় পানিতে চুবিয়ে রেখে ভালো করে সাবান মেখে গোসল করবি।
শ্রাবনী এসে বললো, তুই বারবার কই যাস রে ভাইয়া?কী কাজ তোর বাইরে এই লকডাউনের সময়ে?
আবির উচ্ছল স্বরে বললো, আমরা মহল্লার যুবকদের নিয়ে একটা রিলিফ ডিস্ট্রিবিউসান কমিটি করেছি। বিত্তবানদের নিকট থেকে টাকা চেয়ে নিয়ে ত্রাণসামগ্রী কিনে অভাবিদের মাঝে বিতরণ করছি।
ড্রয়িংরুমে বসে ট্যাবলেটে দক্ষিণ ভারতের মুভি দেখছিলেন আদিল হায়দার। তিনি ট্যাবলেটের পর্দা থেকে দৃষ্টি না সরিয়ে বললেন, কাজটা ভালো। এসময়ে নিম্ন আয়ের মানুষের কর্মসংস্থান বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ওরা মহাবিপদে আছে। সরকারের পাশাপাশি বিত্তশালীদের উচিত সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয়া। বিশেষ করে যারা ব্যাংক লুট করেছে ওদের সবার আগে এগিয়ে আসা উচিত। কিন্তু পিপিই কোথায়? করোনা ভাইরাসে কোনো প্রতিষেধক আজো আবিস্কৃত হয়নি। নিজকে সুরক্ষিত রাখাই প্রতিষেধক।
আবির বললো, কিন্তু বাবা, ব্যাংকচোররা তো হাইবারনেশানে চলে গেছে! সুযোগ থাকলে কবে চলে যেতো পাতায়া!
বলতে বলতে আবির ঢুকে গেলো ওয়াশরুমে। ওয়াশরুম থেকে বের হয়ে একটু ফিটফাট হয়ে এসে বসলো ডাইনিংরুমে। চায়ে টোস্ট চুবিয়ে খেয়ে চা-টা পান করে একটা ঘুম দেবার জন্য ঢুকলো নিজ কক্ষে।
দুপুরের খাবার তৈরি হবার পরও আবির টেবিলে না আসায় মরিয়ম আক্তারি উচ্চ কণ্ঠে ডাক দিলেন, কি রে আবির, খাবার রেডি। এবার উঠে আয়। আমরা সবাই তোর জন্য বসে আছি।
কিছুক্ষণ বসে থেকেও আবির না আসায় আদিল হায়দার খনিক উষ্ণ কণ্ঠে বললেন, তুমি তোমার ছেলেকে নিয়ে খেও। আমি শুরু করলাম।
মরিয়ম আক্তারি কিছু না বলে আবিরের কক্ষের দিকে যেতে লাগলেন ডাইনিং টেবিল ছেড়ে
সানিয়া মার দিকে তাকিয়ে বললো, আমিও তোমার সাথে খাচ্ছি বাবা।
গুড! আমরা বাপ-মেয়ে নেই। মা-বেটা পরে খাক!
কিন্তু খাওয়া শুরু করতে পারলেন না। তরকারি দিয়ে ভাত মাখিয়ে লোকমা বানিয়ে মুখে দিতে যাবেন, তখন মরিয়ম আক্তারির আর্তচিৎকার শুনে বাপ-মেয়ে ভাত রেখে ছুটলেন আবিরের কক্ষের দিকে।
আবিরের কক্ষের দরজায় যেতেই মরিয়ম আক্তারি আর্তস্বরে বললেন, আবিরের গায়ে যে খুব জ্বর! হঠাৎ এতো জ্বর এলো কেনো?
জুটা হাতটা পকেটে রাখা টিস্যুতে মুছতে মুছতে আদিল হায়দার বললেন, তুমি এদিকে চলে এসো। আমি দেখছি।
মরিয়ম আক্তারি কক্ষ থেকে বের হতেই আদিল হায়দার দরজায় দাঁড়িয়ে বললেন, আমার বিশ্বাস আবিরের করোনা ভাইরাস এটাক করেছে। ও এই রুমে সেপারেশনে থাকবে। আমি থাকবো ওর সাথে এই রুমে। তোমরা কেউ কখনো এই রুমে আসার চেষ্টা করবে না। এই রোগের একমাত্র ঔষধ সেবা ও শুশ্রূষা। আর খাদ্য হবে স্বাভাবিক খাদ্যের সাথে বেশি বেশি করে বিভিন্ন ধরনের ফল। আর একটা কথা। একথা যেনো বাইরের কেউ না জানে। আবিরের মোবাইল ফোনটা অফ করে দাও।
আদিল হায়দার লেগে গেলেন ছেলের চিকিৎসা-সেবায়। পরিস্কার-পরিচ্ছন্নতা, গরম পানির গরগরা ও গরম পানি পানের সাথে খাদ্য হিসেবে স্বাভাবিক সব রকম খাদ্য এবং সব রকমের ফল। পনেরো দিন আদিল হায়দার ও যমে টানাটানি হলো আবিরকে নিয়ে। পনেরো দিন পর আবিরের কমে এলো গলাব্যথার সাথে জ্বরও। আবির সুস্থ হয়ে আইসোলেসন রুম থেকে বের হয়ে প্রথমেই সে বাবার সাথে কথা বলতে চাইলো। কিন্তু ওঁকে বাসার কোথাও খুঁজে পাওয়া গেলো না-সবার অলক্ষ্যে কখন বাসা থেকে বের হয়ে গেছেন আদিল হায়দার।
বাসার সবাই উদ্বিগ্ন। করোনাকালে বাইরে না গিয়ে আত্মীয়-স্বজন ও হাসপাতালে ফোন করে কোথাও তাঁকে পাওয়া গেলো না। অসহায় অবস্থায় সবাই বাসায় বসে থেকে কাঁদতে লাগলো।
তৃতীয় দিন বিকেলে এক হাসপাতাল থেকে ফোন এলো। জানালো যে আদিল হায়দার নামে করোনাভাইরাস আক্রান্ত এক রোগী এই হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে-টেস্টে করোনা ভাইরাস পজেটিভ পাওয়া গেছে। হাসপাতালের নাম বললো না।
এ কী হয়ে গেলো! আবিরকে বাসায় রেখে আদিল হায়দার হাসপাতালে ভর্তি হয়ে গুপ্ত হয়ে গেলেন কেনো? আদিল হায়দার এখনো বাসায় আসেন নি এবং ওঁর যে করোনাভাইরাস আক্রান্ত হয়েছে, একথা বাসার লোকজন কাউকে বলছে না। ছেলেমেয়ে প্রকাশ্যে না কাঁদলেও বিষন্ন থাকে সবসময়; আর মরিয়ম আক্তারি প্রকাশ্যে-আড়ালে কেঁদেই যাচ্ছেন। কিন্তু কোন হাসপাতালে আদিল হায়দার কাতরাচ্ছেন, তা খু্ঁজতেও যেতে পারছে না কেউ করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হবার ভয়ে।
সকল নিষেধ উপেক্ষা করে তৃতীয় দিন আবির এই বলে বাসা থেকে বের হলো যে, ও করোনাভাইরাসের রোগ থেকে আরোগ্য লাভ করেছে; তাই সহসা ওকে দ্বিতীয়বার করোনাভাইরাস আক্রমণ করবে না। ঢাকা শহরে আর কটা হাসপাতালে করোনাভাইরাস আক্রান্তের চিকিৎসা করা হয়! কয়েকটা হাসপাতাল ঘুরে ষষ্ঠ হাসপাতালে ঢুকে পেয়ে গেলো বাবার খোঁজ। আইসোলেসন ওয়ার্ডে ঢুকে বাবার বেডের কাছে এসে আর অশ্রু ধরে রাখতে পারলো না-দুই হাতে মুখ ঢেকে ডুকরে কেঁদে উঠলো আবির।
এই তিনদিনেই আদিল হায়দারের শরীর বিছানার সাথে মিশে গেছে। আবিরকে দেখে ওর দুই চোখের কোল বেয়ে ঝরতে থাকলো অশ্রু। অক্সিজেনের মাস্ক লাগানো আছে মুখে। আবির পায়ে পায়ে এগিয়ে গেলো বাবার দিকে।
বাবার মাথার পাশে বসে কানের কাছে মুখ নিয়ে আবির ভগ্নকণ্ঠে বললো, এ কাজটা কেনো করলেন বাবা। আমাকে আপনি বাসায় রেখে সুস্থ করলেন। আপনাকে বাসায় রেখে আমরাও সুস্থ করতে পারতাম।
আদিল হায়দার মুখ থেকে অক্সিজেন মাস্ক সরিয়ে ফিসফিস করে যা বললেন তা এরূপ: আমি বাসায় থাকলে তোমার মা আমার সেবায় থাকতেন। হয়তোবা আমি সুস্থ হতাম তোমার মতো; কিন্তু আমার মতো তোমার মাও অসুস্থ হয়ে যেতো।
কর্তব্যরত নার্স আবিরকে আর কথা বলতে দিলো না বাবার সাথে। অক্সিজেন মাস্কটা আদিল হায়দারের মুখে লাগিয়ে আবিরকে বাইরে চলে যেতে বললো। আবির বাইরে এসে মাকে বাবাকে পাবার সংবাদ জানিয়ে রয়ে গেলো হাসপাতালে।
দুই দিন পর লাশবাহি ফৃজিং ভ্যানে বাবার লাশ নিয়ে গ্রামের বাড়ির দিকে রওয়ানা দিলো ওরা। লাশের সাথে ক্রন্দনরত পরিবারের সবাই।
মরিয়ম আক্তারি অশ্রু মুছতে মুছতে বারবার আবিরকে একটাই প্রশ্ন করছেন, তোর বাবা এটা করলো কেনো?
হাসপাতালে বাবা যা বলেছেন, আবির তা বাসার কাউকে বলে নি।
আবির মা ও বোনের সাথে সারাপথ কেঁদে গ্রাম পর্যন্ত এলো। বাড়ির সীমানায় আসতেই গ্রামের লোকদের বাঁধার সম্মুখীন হলো। আবির এ্যাম্বুলেন্স থেকে নেমে জিজ্ঞেস করলো, কী ব্যাপার, তোমরা এ্যাম্বুলেন্স আটক করছো কেনো?
জিতু নামের যুবক বললো, চাচা করোনায় মারা গেছে। চাচার কবর তোমাদের বাড়ির কবরস্থান বা গ্রামের গোরস্তানে হবে না! এইখানে চাচার পাক গোসলও হইবো না।
আবির বিস্মিত হয়ে বললো, কী বলছো তুমি জিতু ভাই! বাবার কবর গোরস্তানে দিবো না-আমাদের পারিবারিক গোরস্তানে দিবো।
আরেক যুবক সাইফুল বললো, তা হইতো না আবির ভাই। আমরা জানছি করোনায় কেউ মারা গেলে গ্রামে কবর দেওন যাইতো না।
আবির বললো, তোমরা ভুল শুনেছো। মরা মানুষের গায়ে করোনাভাইরাস থাকে না।
অতো সব বুঝি না। চাচার কবর এই গ্রামে হবে না। বাস!
তখন মসজিদের মুয়াজ্জিন হায়াতউল্লাহ বললো, আমি করোনায় মরা লাশের পাক-গোসল দিতাম না। ইমাম সাবও করোনায় মরা লাশের জানাজা পড়ায় না।
আবির অশ্রুসিক্ত মুচকি হেসে বললো, কোনো সমস্যা নাই মুয়াজ্জিন সাহেব। বাবার শেষ পাক গোসল আমিই করাবো। আর জানাজার ইমামতি আমিই করবো। গ্রামের কেউ না আসলে আমি একাই জানাজ পড়াবো। ছেলে হয়ে বাবাকে জানাজা ছাড়া কবর দিতে পারি না। তোমাদের সাহস থাকলে ঠেকাতে আসো! ড্রাইভার, ভ্যান বাড়িতে নিয়ে চলো।
আবির পকেট থেকে মোবাইল ফোন বের করে উপজেলা নির্বাহি অফিসার ও থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে ফোন করলো।