১৯৯১ সালের শেষের দিকে, একদিন সৈয়দ আলী আশরাফের কবিতা গ্রন্থের প্রকাশনা উৎসবের আমন্ত্রণপত্র পেলাম। সাথে গ্রন্থের একটি কপিও। অনুষ্ঠানটি হয়েছিল জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র মিলনায়তনে, ১৫ ডিসেম্বর ১৯৯১। প্রকাশনা উৎসবে সভাপতি ছিলেন [মুদ্রিত কার্ড অনুযায়ী] আবু রুশদ ও প্রধান অতিথি-কবি আবুল হোসেন। আর আলোচক ছিলেন অধ্যাপক আজহার হোসেন, আবদুস সাত্তার, ড. মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান, মোহাম্মদ মাহফুজউল্লাহ, আল মাহমুদ, ড. রাজিয়া সুলতানা, আল মুজাহিদী, আবদুল হাই শিকদার, মতিউর রহমান মল্লিক, মোশাররফ হোসেন খান, আমীনুর রহমান ও সালাহউদ্দীন আইয়ুব।
যথাসময়ে আমরা জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রে উপস্থিত হয়েছিলাম। আবু রুশদ এবং আবুল হোসেন সেদিন উপস্থিত ছিলেন কিনা এখন আর ঠিক স্মরণ নেই। তবে আল মাহমুদ, সৈয়দ আলী আহসান, আল মুজাহিদীসহ আমরা আলোচনায় অংশগ্রহণ করেছিলাম। এবং স্বতঃস্ফূর্তভাবেই। সেদিন, সেই প্রকাশনা অনুষ্ঠানে সম্যকভাবে প্রত্যক্ষ করলাম একজন কবিকে। হ্যাঁ, কবি বটে, তবে যতটুকু না কবি, সেদিনই আমার মনে হয়েছিল, তার চেয়েও বেশি পন্ডিত এবং আধ্যাত্মিকতার উজ্জ্বলতায় ভাস্বর এক অনন্য ব্যক্তিত্বকেই প্রত্যক্ষ করছি। পোশাকে, আচরণে এবং বক্তব্যের মধ্যদিয়েও তার সেই অন্তস্বচ্ছতাকে স্পষ্ট হতে দেখে কিছুটা হতবাকও হয়েছিলাম। হতবাক হয়েছিলাম এজন্য, যখন সবাই প্রকারান্তরে ছদ্মবেশকেই তাদের নিরাপদ আশ্রয় বলে মেনে নিয়েছেন, ঠিক সেই সময়ে সেই পরিবেশে, একজন ইংরেজি সাহিত্যের পন্ডিত কী দুঃসাহসেই না ছদ্মবেশের জাল ছিন্ন করে কীভাবে স্পষ্ট হয়ে উঠেছেন? এটি দুঃসাহসিক ব্যাপার নয় কি? অন্তত আমার কাছে তাই মনে হয়েছিল।

দুই.
বলছিলাম প্রকাশনা উৎসবের কথা। সৈয়দ আলী আশরাফের কবিতা [১৯৯১] সম্পর্কে সেদিন কেউ কেউ মন্তব্য করেছিলেন, তিনি দীর্ঘকাল বিদেশে অবস্থান করার কারণে বাংলাদেশের আধুনিক সাহিত্য বিশেষ করে সাম্প্রতিক সাহিত্যের সাথে নিবিড়ভাবে সম্পর্ক রাখতে পারেননি। এজন্যে তাঁর কবিতাও হয়ে পড়েছে কিছুটা বিচ্ছিন্ন।
এ কথায় কিছুটা সত্য আছে বটে। কিন্তু এই সত্যের সাথে আর একটি মহাসত্য যোগ করার ছিল, আর সেটি হলো, সৈয়দ আলী আশরাফ কবি হিসাবে আমাদের বয়সীদের কাছে এক রকম আড়ালেই রয়ে গিয়েছিলেন। কারণ, তাঁর কবিতা পাঠের সুযোগ অন্তত আমাদের তেমনভাবে হয়নি।
কিন্তু তার এই কাব্যসমগ্রটি [অন্তত তাই বলা উচিত] পাঠ করে বুঝলাম তার কবিতা না পড়ে আমাদের কিছুটা ক্ষতিই হয়েছে। কারণ তার কবিতায় আছে আধুনিকতার পাশাপাশি আলোকিত আর একটি দিক-যাকে আধ্যাত্মিকতাও বলা যেতে পারে। হৃদয়কে আলোকিত করার জন্য এ ধরনের কবিতাও আমাদের দরকার।
সৈয়দ আলী আশরাফের প্রথম কাব্যগ্রন্থ চৈত্র যখন প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৫৮ সালে। এর অন্তর্ভুক্ত কবিতাগুচ্ছ আমরা আলী আশরাফের আধুনিকতা এবং তার মানসের সাথে পরিচিত হয়ে উঠছি। দেখছি, তিনি এই গ্রন্থে তার অন্যান্য সতীর্থদের মত সমান আধুনিক, কিন্তু ব্যতিক্রম যেটুকু তা হলো, এখানেও তিনি স্বভাবগত ঋজু, স্পষ্ট এবং অনায়াস ঐতিহ্যবদ্ধ।
এ গ্রন্থের জন্মদিন, বসন্ত, পূর্ণিমা স্বদেশ, কিংবা আলোছায়া সনেটগুচ্ছে তার যে শিল্পী অভিব্যক্তি প্রকাশ পেয়েছে, প্রকৃত অর্থে আধুনিকতাকে স্পর্শ করেই তা আমাদের হৃদয়কেও আকৃষ্ট করে। যেমন:
তাই তো তোমার প্রেম মনে প্রাণে কাঁপন জাগায়
ছন্দোময় তরঙ্গ উচ্ছ্বাস, হৃদয়ের তলদেশে
অলক্ষিতে গেড়েছে শিকড়, তাই সেতারা শোভায়
ভাষার ফুলেরা ফোটে প্রণয়ের স্বাপ্নিক আবেশে।
সংশয় রয়েছে তবু? তবে এই চুম্বন বিভায়
প্রেমসত্য দীপ্ত হোক দ্বিধা-অন্ধ রুদ্ধ চেতনায়
[আলোছায়া : সনেট এক]

কিংবা
স্বচ্ছ সরল চোখ দিয়ে কবে দেখব
মানুষের মনে রং বেরং চলচ্চিত্র, শুন্ব
সংহত ঘন প্রশান্ত সংগীত
প্রতি পদার্থে উদ্গত যত জীবনের ইংগিত?
সেদিন, ১৯৯১ সালের সেই প্রকাশনা উৎসবে, সৈয়দ আলী আশরাফের কবিতার সপক্ষে আমি এরকমই কিছুটা আলোচনা করেছিলাম, মনে পড়ে।

তিন.
১৯৯১ থেকে ১৯৯৮। এই ক’বছরের মধ্যে, আরও কয়েকবার তার সাথে আমার সাক্ষাৎ ঘটেছে। ধানমন্ডিস্থ ইসলামিক একাডেমীতে বেশ ক’বার গিয়েছি কবিতা পড়তে, তার আমন্ত্রণে। যতোবারই গিয়েছি ততোবারই লক্ষ্য করেছি কীভাবে একজন কবিকে আড়াল করে আছে আর এক উজ্জ্বল ব্যক্তিত্ব। কবি স্বভাবের চেয়ে তার ধর্মীয় ও পান্ডিত্য প্রজ্ঞাই প্রকাশ পেতো অনেক বেশি। আর কে না জানে, বেশভূষা, পোশাক-পরিচ্ছদে কিংবা আচরণগত দিক দিয়েও তিনি ছিলেন সার্বক্ষণিক ইসলামী আদর্শের একজন অনন্য ব্যক্তিত্ব। সত্যি বলতে ইসলামের প্রতি তার এই অকৃত্রিম আনুগত্য এবং নিষ্ঠা আমাকে বরাবর মুগ্ধ করেছে।
সৈয়দ আলী আশরাফের সাথে আমার শেষ সাক্ষাৎ হয় গত ১১ জুন ৯৮। ফররুখ স্মরণ সভায় আমরা একত্রিত হয়েছিলাম। তিনি ছিলেন অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি। আমি ছিলাম একজন আলোচক। শাহাবুদ্দীন আহমদ, ড. সদরুদ্দীন আহমদ, মুহম্মদ মতিউর রহমান, মতিউর রহমান মল্লিক, মুকুল চৌধুরীসহ আরও বেশ ক’জন অনুষ্ঠানে আলোচক, বিশেষ অতিথি এবং সভাপতি হিসাবে উপস্থিত ছিলেন।
আলী আশরাফ সেদিন ফররুখের কবিতায় ঐতিহ্য, আধ্যাত্মিকতা, স্বপ্ন, শিল্প প্রভৃতি বিষয় নিয়ে আলোচনা করেছিলেন। ফররুখের কবিতার পাশাপাশি ইংরেজি সাহিত্যের বিশ্বখ্যাত কবিদেরকেও তিনি উপস্থিত করছিলেন। অসাধারণ ছিলো সেদিনকার সেই আলোচনা। শেষের দিকে তিনি প্রসঙ্গক্রমে আফসোস করে বলেছিলেন, ‘‘আমরা এখন সবাই ছদ্মবেশকেই বেশি পছন্দ করি। দেখুন না, আমার মুসলমান ভায়েরাই আমাকে প্রশ্ন করেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম কেন দারুল ইহসান রাখলাম। অন্য কোন নাম দিলেইতো হতো। ঐ আরবী নামেরই বা দরকার ছিল কি! আমি তাদেরকে বলি, আমি মুসলমান। আমার সকল কাজে আমি তার স্বাক্ষর রেখে যেতে চাই। এ ব্যাপারে আমার কোনো হীনমন্যতা নেই।’

চার.
প্রকৃত অর্থে এটাই ছিলো সৈয়দ আলী আশরাফের জীবনের সারাৎসার। আমরা জানি, তিনি ছিলেন একজন উচ্চশিক্ষিত, খ্যাতিমান, তাও আবার ইংরেজি সাহিত্যের অধ্যাপক। দেশের বাইরেই যিনি অনেক বেশি পন্ডিত হিসাবে ছিলেন স্বীকৃত। এমনি একজন আধুনিক শিক্ষিত মানুষ-ইসলামের ব্যাপারে, আদর্শ ও ঐতিহ্যের ব্যাপারে ছিলেন আপোসহীন। ভাবতে অবাক লাগে বৈকি!
কবি ও কবিতার স্বভাবের চেয়ে, সৈয়দ আলী আশরাফের পান্ডিত্য এবং ঐতিহ্যপ্রিয়তা অনেক বেশি চোখে পড়ে। বরং এসব উজ্জ্বলতার কাছে হয়তো বা কিছুটা ম্রিয়মান তার কবিতা। সেটাই স্বাভাবিক, কারণ আমরা একজন কবিতামনস্ক আলী আশরাফের চেয়ে আদর্শবাদী, পন্ডিত, শিক্ষাবিদ সৈয়দ আলী আশরাফকেই বেশি করে অনুভব করি।
সৈয়দ আলী আশরাফ সম্পর্কে এবং তার সাহিত্য কর্ম সম্পর্কে আমার নিজের ভেতর একটি বোধ ইতিমধ্যেই তৈরি হয়ে গেছে। আমি সশ্রদ্ধ দৃষ্টিতে তার দিকে সেদিন তাকিয়েছিলাম। সেই ধীর কণ্ঠ, শুদ্ধ উচ্চারণ এবং অসম্ভব পান্ডিত্যপূর্ণ আলোচনার গভীরে তলিয়ে যাবার মুহূর্তেও কামনা করছিলাম, এই কণ্ঠস্বর দীর্ঘ থেকে আরও দীর্ঘতর হোক।
আফসোস! সেই শেষ দেখা। সেই শেষ সাক্ষাৎ। তিনি তার আলোচনাকে অসমাপ্ত রেখেই একরকম তড়িঘড়ি করে চলে গেলেন সেদিন।
কিন্তু হায়! সেই যাওয়াই যে তার শেষ যাওয়া হবে তা আমরা কেউ বুঝতে পারিনি। তিনি চলে গেছেন ৬ আগস্ট ১৯৯৮। সৈয়দ আলী আশরাফ চলে গেছেন, কিন্তু তার কণ্ঠস্বর এখনও আমার হৃদয়ে জেগে আছে। বোধ করি এই অনুভূতির আরও দীর্ঘ প্রতিক্রিয়া ঘটতে থাকবে। কারণ, যে কোনো বিবেচনায় একজন সৈয়দ আলী আশরাফের গুরুত্ব অনেক বেশি-অন্তত আমাদের জন্য, আমাদের দেশ ও জাতির জন্য।