ইংরাজি Tradition শব্দের বাংলা প্রতিশব্দ হিসাবে ‘ঐতিহ্য’ শব্দটি ব্যবহৃত হয়। অক্সফোর্ড ডিকশোনারীতে Tradition শব্দের অর্থ করা হয়েছে এভাবে- ‘Belief or custom handed down from one generation to another; long established procedure; handing down of beliefs etc.’ বাংলায় ‘ঐতিহ্য’ শব্দের অর্থও করা হয়েছে প্রায় একইভাবে-‘কিংবদন্তী, বিশ্র“তি, পরম্পরাগত কথা বা প্রথা।’ অর্থ্যাৎ ঐতিহ্য হলো অতীতের ঘটনা, চরিত্র বা কাহিনীর ভিত্তিতে গড়ে ওঠা আবেগতাড়িত এমনসব উজ্জ্বল স্মৃতি- যা ব্যক্তি, ব্যষ্টি বা গোষ্ঠিকে অনুপ্রাণিত-উদ্দীপ্ত করে।
সাহিত্যে ঐতিহ্য এক অতি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এর সাথে ব্যক্তি, গোষ্ঠি বা জাতির মানসিক সাজুয্য সংশ্লিষ্ট। এটাকে অন্য অর্থে শিকড়ের টান বলা যায়। মাতৃগর্ভে সন্তান যেমন পরস্পরের নাভিমূল দ্বারা একান্ত সংশ্লিষ্ট থাকে, সে সংযোগের মাধ্যমে সন্তান তার খাদ্য-গ্রহণ ও শ্বাস-প্রশ্বাস গ্রহণ করে নিজের অস্তিত্ব বজায় রাখে, ঐতিহ্যের সাথে প্রত্যেক মানুষেরও তেমনি একটা নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে। তবে মায়ের সাথে গর্ভস্থ সন্তানের সম্পর্ক শারীরিক কিন্তু ঐতিহ্যের সাথে মানুষের সম্পর্ক শারীরিক নয়, মানসিক। ঐতিহ্য থেকে আমরা রস সংগ্রহ করে আমাদের জীবনকে সমৃদ্ধ করি ও নানাভাবে মার্জিত, সুষমামন্ডিত ও সুশোভন করে তুলি। তাই জীবন-বিকাশে ও জীবনের নানাবিধ উন্নতি ও উৎকর্ষ সাধনে ঐতিহ্যের অপরিহার্যতা সর্বদা উপলব্ধি করে থাকি। এ ক্ষেত্রে ঐতিহ্য আমাদের নিকট এক অতি প্রয়োজনীয় অনুপ্রেরণার উৎস। বিশেষত সৃজনশীল মানুষের কাছে, যারা রং-তুলি নিয়ে কাজ করেন, কল্পনা ও হৃদয়ানুভূতির চর্চায় নিয়োজিত, তাদের নিকট ঐতিহ্য এক গভীর অনুপ্রেরণা ও তাৎপর্যপূর্ণ বিষয়।
ঐতিহ্য মূলত ব্যক্তিগত ও সমষ্টিগত শ্রম ও অভিজ্ঞতার দ্বারা অর্জিত হয়। বংশ-গোষ্ঠি-জাতি পরম্পরায় এবং যুগ-বিবর্তনের মধ্য দিয়ে ঐতিহ্যের অদৃশ্য ধারা পরিক্রমিত হয়। মানসিক সাজুয্যের কারণে ঐতিহ্য কেবলমাত্র উপলব্ধির বিষয়, জোর করে তা কখনও কারো উপর আরোপ করা যায় না। এটাকে ধারণ করতে হয় এবং ধারণ করার সময় তা বহুলাংশে নিজের ইচ্ছা, আকাক্সক্ষা, অভিজ্ঞতা ও চাহিদা অনুযায়ী পরিমার্জিত, পরিশীলিত ও সংশোধন-পরিবর্ধন করা যায়। তাই ঐতিহ্য কখনও একস্থানে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকে না। সৃজনশীল প্রতিভা তাতে নিত্য রূপান্তর ঘটিয়ে তার সমৃদ্ধি সাধন করেন।
ঐতিহ্য আর ইতিহাসের সাথে অনেকেই মিল খোঁজার চেষ্টা করেন। এ দু’’য়ের মধ্যে যেমন মিল আছে, তেমনি অমিলও রয়েছে। ইতিহাস ও ঐতিহ্য দু’টোই অতীতের বিষয়। ইতিহাসের অন্তরালেই ঐতিহ্যের ভিৎ গড়ে ওঠে। তা সত্ত্বেও দুয়ের মধ্যে বিস্তর পার্থক্য রয়েছে। আক্সফোর্ড ডিকশোনারীতে History শব্দের অর্থ করা হয়েছে এভাবে- ‘Past events; methodical record of these; study of past events; story.’ ইংরাজি History শব্দের প্রতিশব্দ রূপে ‘ইতিহাস’ শব্দটি প্রচলিত আছে। বাংলা অভিধানে ‘ইতিহাস’ শব্দের অর্থ করতে গিয়ে বলা হয়েছে- ‘অতীত বৃত্তান্ত, প্রাচীন কাহিনী, পুরাবৃত্ত।’ এখানে ইংরাজি ও বাংলায় অর্থের দিক থেকে কোনো পার্থক্য নেই। প্রকৃতপক্ষে, ইতিহাস হলো অতীতের হুবহু বিবরণ। এতে অতিরঞ্জনের অবকাশ নেই। কিন্তু ঐতিহ্য অতীতের হুবহু বিবরণ নয়, অতীতের ভিত্তিমূলে গড়ে ওঠা কোন ঘটনা, চরিত্র বা কাহিনীর অবলম্বনে সৃষ্ট আবেগতাড়িত কোন স্মৃতি-যা কোন বিশেষ ব্যক্তি-ব্যষ্টি বা গোষ্ঠিকে অনুপ্রাণিত করে। ইতিহাসে অতিরঞ্জন, বিকৃতি সাধন অমার্জনীয় অপরাধ। কিন্তু ঐতিহ্য যেহেতু উপলব্ধি ও অনুপ্রেরণার বিষয়, তাই সৃজনী কল্পনার মাধ্যমে এটাকে নিজের ধ্যান-ধারণা ও আশা-আকাক্সক্ষা অনুযায়ী পুর্ননির্মাণ-পুনর্গঠন করা সম্ভব। এটাকে বিকৃতি নয়, ঐতিহ্যের সমৃদ্ধি সাধন মনে করা হয়। এ সমৃদ্ধি সাধনের প্রয়াস সব দেশে সব কালে এবং সকল মানুষ বা জাতি-গোষ্ঠির মধ্যেই প্রচলিত রয়েছে। ফলে ব্যক্তি ও ব্যষ্টির সমবেত শ্রম ও প্রয়াসের দ্বারা ঐতিহ্য সৃষ্টি হয়। এ প্রসঙ্গে প্রখ্যাত ইংরাজ কবি টি.এস. এলিয়ট তাঁর ‘Tradition and the Individual Talent’ প্রবন্ধে বলেন ঃ
‘Tradition is a matter of much wider significance. It cannot be inherits, and if you want it you must obtain it by great labor. It involves, in the first place, the historical sense, which we may call nearly indispensable to anyone who would continue to be a poet… and the historical sense involves a perception, not only of the pastiness of the past, but of its presence…’
বৈশিষ্টগতভাবে পার্থক্য থাকা সত্ত্বেও ঐতিহ্যের সাথে ইতিহাসের পারম্পর্য বা সম্পর্ক অবিচ্ছেদ্য, যা সৃজনশীল প্রতিভার কল্পনাশক্তিকে উদ্বুদ্ধ করে ও অনুপ্রাণিত করে তার সৃষ্টিকর্মে। এখানে ইতিহাসের পারম্পর্য বলতে কেবল অতীতের প্রতিই ইঙ্গিত করা হয় নি, বর্তমানের সাথেও তার রয়েছে এক গভীর ও নিবিড় সম্পর্ক। কেননা অতীতের ঘটনা পরম্পরায় বর্তমান অবস্থান সৃষ্টি হয় এবং অতীতের শিক্ষা থেকে আমরা আমাদের বর্তমানকে অনেকটা নিজেদের মত করে গড়ে তোলার প্রয়াস পাই। ফলে ইতিহাসের কোন একটি পর্যায়ে আমাদের প্রত্যেকেরই কোন না কোন ভূমিকা থাকে। আমাদের পূর্বপুরুষরা যেমন আমাদের অতীত ইতিহাসের বিভিন্ন ঘটনার নিয়ামক, বর্তমান ইতিহাস রচনায় আমাদের ভূমিকাও অনেকটা তেমনি এবং আমাদের ভবিষ্যত প্রজন্মও তেমনি আগামী দিনের ইতিহাস রচনায় ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা অবান্তর নয়। টি.এস. এলিয়ট তাঁর উপরোক্ত নিবন্ধে বিষয়টিকে এভাবে আরো স্পষ্ট করে বলেছেন ঃ “…the difference between the present and the past is that the conscious present is an awareness of the past in a way and to an extent which the past’s awareness of itself cannot show.”
ইংরাজ কবি টি.এস. এলিয়ট ঐতিহ্যকে গাছের সাথে তুলনা করেছেন। একটি গাছের দু’টি অংশ। একটি অংশ মাটির উপরে, অন্যটি মাটির গভীরে প্রোথিত থাকে। মাটির উপরের অংশটি অর্থ্যাৎ গাছের পত্র-পল্লব, শাখা-প্রশাখা, ফল-ফুল ইত্যাদি সব দৃশ্যমান। কিন্তু মাটির নিচের অংশটি দৃশ্যমান নয়। তাই বলে সেটাকে অস্বীকার করা চলে না। মাটির গভীরে প্রোথিত মূল ও শিকড়ের মাধ্যমে রস সংগ্রহ করে বৃক্ষ প্রাণ ধারণ করে, তার ডাল-পালা, পত্র-পল্লব সজীব রাখে। মাটির উপরের অংশটি দৃশ্যমান। তাই বৃক্ষ বলতে সচরাচর আমরা ঐ দৃশ্যমান অংশটিই বুঝে থাকি। কিন্তু নিচের অংশটি দৃশ্যমান না হলেও তাকে বাদ দিয়ে বৃক্ষের অস্তিত্ব কল্পনা করা যায় না। এর অর্থ, গাছের মূল বা শিকড়কে বাদ দিয়ে তরতাজা সবুজ সৌন্দর্যময় গাছের কল্পনা করাও অসম্ভব। ঐতিহ্যও তেমনি ব্যক্তি ও সমাজের জন্য গাছের মূল বা শিকড়ের মতো। শিকড়হীন বৃক্ষ যেমন অকল্পনীয়, ঐতিহ্যহীন ব্যক্তি বা সমাজ-জীবনও তেমনি প্রাণহীন, সৌন্দর্যহীন অনুর্বর। গাছ যেমন তার শিকড়ের মাধ্যমে রস সংগ্রহ করে জীবনধারণ করে, প্রাণবন্ত ও সৌন্দর্যশালী হয়ে ওঠে, ব্যক্তি বা সমাজের উন্নতির জন্যও তেমনি ঐতিহ্য থেকে অনুপ্রেরণা সংগ্রহ করা অপরিহার্য।
ইতিহাস ও ঐতিহ্যের পারস্পরিক সম্পর্কও অনেকটা গাছের শিকড় ও কাণ্ডের মত। ইতিহাস থেকে রস সংগ্রহ করে ব্যক্তি ও সমষ্ঠিগত জীবন বাস্তবতার সঙ্গে সঙ্গতি রেখে আত্মবিকাশের পথ খুঁজে পায়। ইতিহাসের শিক্ষা ও ঐতিহ্যিক অনুপ্রেরণা জীবন-বাস্তবতার সাথে অবিমিশ্র হয়ে সজীব ও বর্ণাঢ্য রূপ লাভ করে। অর্থাৎ ঐতিহ্য ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি যেমন নয়, তেমনি ইতিহাসের সাথে সম্পর্কহীনও নয়। ইতিহাসের ভিত্তিভূমিতে কল্পনা ও ভাবের সংমিশ্রণে ঐতিহ্যের সৃষ্টি। অতএব, ঐতিহ্যকে যারা অস্বীকার করে তারা মূলত অবাস্তব কল্পনা-বিলাসী মাত্র, যথার্থ জীবনধর্মী সাহিত্য বা শিল্প সৃষ্টি তাদের দ্বারা প্রায় অসম্ভব। এ সম্পর্কে প্রখ্যাত ইংরাজ সমালোচক Sampson যে কথাটি বলেছেন, এখানে প্রসঙ্গত তা উল্লেখ করা যায় ঃ
“An artist of the first rank accepts tradition and enriches it; an artist of the lower rank accepts tradition and repeats it; an artist of the lowest rank rejects tradition and strives for originality.” অর্থাৎ-বড় মাপের শিল্পী বা সাহিত্যিক ঐতিহ্যকে গ্রহণ করে তাকে নানাভাবে সমৃদ্ধ করে তোলেন, মাঝারি মাপের শিল্পী বা সাহিত্যিক ঐতিহ্যকে গ্রহণ করেন ও তার পুনরাবৃত্তি করেন আর নিম্নমানের শিল্পী বা সাহিত্যিক ঐতিহ্যকে অস্বীকার করে স্বকীয়তা প্রকাশে তৎপর হন।
মূলকথা, কোন ব্যক্তিই বিচ্ছিন্ন দ্বীপ হিসাবে বাঁচতে পারে না। জীবনধারণের জন্য মানুষকে সমাজবদ্ধ হয়ে পরস্পর পরস্পরের সাহায্য-সহযোগিতা নিয়ে চলতে হয়। সমাজের সাথে ইতিহাস-ঐতিহ্য-সংস্কৃতি, জীবনবোধ-জীবনাচার ইত্যাদির অবিমিশ্র সম্পর্ক বিদ্যমান। মানুষের সৃষ্টিকর্মে বা সকল কৃতিতে এ সম্পর্কের পরিচয় কোন না কোনভাবে প্রতিফলিত হয়। স্বকৃীয়তা প্রকাশের অর্থ যদি এ সবকিছুকে অস্বীকার করে নিজেকে প্রকাশের প্রয়াস হয়, তাহলে সেটা হবে সম্পূর্ণ বাস্তবতা-বিবর্জিত। এরূপ বাস্তবতা-বিবর্জিত জীবনকে কখনও স্বাভাবিক বলা যায় না। তাই সাধারণ মানুষের নিকট তার কোন আকর্ষণ নেই। ফলে কবি-সাহিত্যিক-শিল্পী কম-বেশি ঐতিহ্য ধারণ বা অনুসরণ করে থাকেন। নিজ নিজ ঐতিহ্যের চর্চায় যিনি যতবেশি আন্তরিক ও স্বচ্ছন্দ, তিনি ততবেশি জন-নন্দিত ও অমরত্ব লাভে সক্ষম হন। তাই ঐতিহ্যকে বাদ দিয়ে সার্থক অমর সৃষ্টির কথা কল্পনা করা যেমন দুঃসাধ্য, তেমনি বড় মাপের কবি-শিল্পী-সাহিত্যিক সকলেই স্ব স্ব ঐতিহ্য ধারণ করে এবং তার নব নব উজ্জীবনে সচেষ্ট হয়ে নিজ নিজ ভুবনে অবদান রাখার প্রয়াসী হন।
পাশ্চাত্য সাহিত্যে মহাকবি হোমার, ভার্জিল, উইলিয়ম শেক্সপীয়র, জন মিল্টন, বার্নাড শ’, আর্নেস্ট হেমিংওয়ে, টি.এস. এলিয়ট প্রমুখ সকলেই ছিলেন ঐতিহ্যবাদী। তাঁরা তাঁদের স্ব স্ব ধর্ম, ইতিহাস ও ঐতিহ্যের আলোয় স্নাত হয়ে তাঁদের সৃষ্টিকর্মে ব্রতী হয়েছেন বলে তাঁরা ইতিহাসে অমর হয়ে আছেন। প্রাচ্যের অমর কবি বাল্মিকী, ব্যাস, কালিদাস, ফেরদৌসী, শেখ সাদী, হাফিজ, রুমী, জামী, ফেরদৌসী, ইকবাল প্রমুখ সকলেই ছিলেন নিজ নিজ ঐতিহ্যের নিষ্ঠাবান অনুসারী। বাংলা সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ কবি কৃত্তিবাস, চণ্ডীদাস, বিদ্যাপতি, শাহ্ মোহাম্মদ সগীর, আলাওল, মধুসূদন দত্ত, কায়কোবাদ, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম, জীবনানন্দ দাশ, জসীমউদ্দীন, ফররুখ আহমদ প্রমুখ সকলেই নিজ নিজ ঐতিহ্য-তরুর সাথে সংলগ্ন থেকে সাহিত্য-সাধনা করেছেন। তাই তাঁরা মহৎ ও অমর সৃষ্টি জগৎবাসীকে উপহার দিতে সক্ষম হয়েছেন।
প্রত্যেক ব্যক্তি, সমাজ ও জাতির স্বতন্ত্র ঐতিহ্য রয়েছে। স্বকীয় ঐতিহ্য নিজেকে উদ্দীপ্ত-অনুপ্রাণিত করার ক্ষেত্রে যেমন অপরিহার্য, ভিন্ন ঐতিহ্য তেমনভাবে মানুষকে উদ্দীপ্ত-অনুপ্রাণিত করে না। সেজন্য ব্যক্তিগত ও সমষ্টিগতভাবে সকলকেই স্বকীয় ঐতিহ্য ধারণ ও পরিচর্যা করা আবশ্যক। পৃথিবীতে এ কারণে অসংখ্য ভিন্ন ঐতিহ্যের অস্তিত্ব বিদ্যমান। তবে ভিন্নতা সত্ত্বেও ঐতিহ্য কখনো পরস্পর সাংঘর্ষিক নয়, বরং এ ভিন্নতা ব্যক্তি-সমাজ ও জাতিগত পরিচয়কে বিধৃত করে। ফলে ভিন্নতা সত্ত্বেও সামগ্রিকভাবে সকল ঐতিহ্যই মানব জাতির সাধারণ সম্পদ। অতএব, নিজের ঐতিহ্যের প্রতি আমরা যেমন শ্রদ্ধাশীল থাকবো, অন্যের ঐতিহ্যেকেও তেমনি কখনও অশ্রদ্ধা করবো না। কেননা, ঐতিহ্য মানুষেরই সৃষ্টি। জাতি-ধর্ম-বর্ণ-ভাষা-সংস্কৃতি ও আঞ্চলিক পার্থক্য সত্ত্বেও বিশ্বের সকল মানুষের মধ্যে যেমন একটি সাধারণ মানবিক গুণ-বোধ, সৌভ্রাতৃত্ব ও সহমর্মিতার ভাব বিদ্যমান, তেমনি ভিন্ন ঐতিহ্য সত্ত্বেও সমগ্র মানবজাতির মধ্যেও এক অভিন্ন সাধারণ মানবিক ঐতিহ্যের চিরন্তন উপাখ্যান বিরচিত হয়েছে। সামগ্রিকতার দৃষ্টিতে তার গুরুত্ব অপরিসীম।
ঐতিহ্যের সাথে ইতিহাস, ধর্ম, সংস্কৃতি ও জীবনাচারের সম্পর্ক অতিশয় ঘনিষ্ঠ। ইতিহাস এক ধারাবাহিকতার নাম। ধর্ম-সংস্কৃতি ও জীবনাচারও অনেকটা তাই। তবে কালের বিবর্তনে ধর্ম-সংস্কৃতি ও জীবনাচারে অনেক সময় পরিবর্তন ঘটে। কিন্তু পরিবর্তন ঘটুক বা নাই ঘটুক, মূলত ধর্ম-সংস্কৃতি ও জীবনাচারের মধ্যেই মানুষের সামাজিক অস্তিত্ব বিদ্যমান। প্রাচীন ও মধ্যযুগে তা যেমন সত্য ছিলো, আধুনিক যুগেও তার কোন ব্যত্যয় ঘটে নি। বর্তমানে জ্ঞান-বিজ্ঞান, শিক্ষা-সভ্যতায় অগ্রসর হওয়ার কারণে অনেকে ধর্মের গুরুত্বকে খাট করে দেখার প্রয়াস পেলেও মূলত ধর্মীয় মূল শিক্ষা থেকে মানবজাতি এখনও সম্পূর্ণ বিচ্যূত হয় নি। ধর্ম সম্পর্কে সাধারণ ধারণা এবং প্রত্যয়ে কিছুটা পরিবর্তন ঘটলেও ধর্মকে সম্পূর্ণ বর্জন করা কারো পক্ষে কখনো সম্ভব নয়। ধর্ম মূলত জীবন-দর্শন। প্রত্যেক ধর্মেই একটি জীবন-দর্শন রয়েছে, জীবন পরিচালনায় দিক-নির্দেশনা ও জীবনের লক্ষ্য এবং পরিণতি সম্পর্কে ধারণা দেয়া হয়েছে। সে অর্থে প্রত্যেক মানুষের জীবনাচরণেই কোন না কোন দর্শনের অনুসৃতি পরিলক্ষিত হয়। তাই ধর্মকে অস্বীকার করলে জীবনের এ অমোঘ বাস্তবতাকেই অস্বীকার করা হয়। অতএব, ঐতিহ্য বিনির্মাণে ধর্মের প্রভাব অনিবার্য।
সংক্ষেপে বলতে গেলে, ঐতিহ্য মূলত ইতিহাস, ধর্ম, সংস্কৃতি ও জীবনাচারের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা এক জীবন্ত অনুপ্রেরণা। জীবনোপলব্ধি, জীবনের অভিজ্ঞতা ও চিন্তা-কল্পনার সাথে ঐতিহ্যের এক নিবিড় সম্পর্ক। এ প্রসঙ্গে প্রখ্যাত ইংরাজ মনীষী Stanley Maron তাঁর রচিত The Importance of Tradition প্রবন্ধে বলেন ঃ “The importance of tradition lies in providing a tested and workable set of beliefs, attitude and values capable of sustaining the individual in the complexities of life. A tradition can expect to survive only as long as it continues to fulfill this function adequately.”
মানুষের সকল সৃষ্টিকর্মে ঐতিহ্য গভীর প্রেরণা হিসাবে কাজ করে। ঐতিহ্য-চেতনাহীন মানুষের পক্ষে মহৎ সৃষ্টিকর্ম সাধন সম্ভব নয়। যেহেতু ঐতিহ্য-চেতনা প্রত্যেক মানুষের অস্তিত্ব ও জীবন-স্পন্দনের সাথে অবিমিশ্র, তাই ঐতিহ্য-চেতনাসমৃদ্ধ সৃষ্টিকর্ম সকলেই আবেগ-উদ্দীপনার সাথে গ্রহণ করে থাকে। ঐতিহ্য ব্যক্তিকে যেমন অনুপ্রাণিত করে, ব্যষ্টি তথা সমাজ ও জাতিকেও তেমনি অনুপ্রাণিত করে। যে কোন সমাজ ও জাতির উন্নতি-অগ্রগতির মূলেও ঐতিহ্যিক প্রেরণা অতিশয় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। যে জাতির ঐতিহ্য যত সমৃদ্ধ, সে জাতির মর্যাদা তত অধিক এবং উন্নতির সোপান বেয়ে সে জাতি তত দ্রুত উন্নতির পথে অগ্রসর হয়। ঐতিহ্য সূর্যালোকের মত পথ দেখায় এবং কল্যাণ ও উন্নতির পথে অগ্রসর হতে উদ্বুদ্ধ করে। ব্যক্তি-সমাজ-জাতি ঐতিহ্যের উষর আলোয় আত্ম-বিকাশে সচেষ্ট হয় এবং নব নব ঐতিহ্যের উজ্জ্বল আলোক-স্তম্ভ নির্মাণ করে।
সাহিত্যের সাথে ঐতিহ্যের নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে। সৃজনশীল শিল্প হিসাবে সাহিত্য সৃষ্টিতে ঐতিহ্যিক অনুপ্রেরণা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সাহিত্যের মূল উপাদান তিনটি। ১. ভাব, ২. ভাষা ও ৩. আবেদন। এ তিনিটি ক্ষেত্রেই ঐতিহ্যের গুরুত্ব অপরিসীম। সাহিত্যে প্রতিফলিত ভাব ও বিষয় কী ধরনের, তা থেকে লেখকের ঐতিহ্যিক অনুপ্রেরণা সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা করা চলে। বিষয় নির্বাচন, উপস্থাপনা এগুলোর মধ্যে প্রত্যেক লেখকের একটা নিজস্ব অনুপ্রেরণা কাজ করে। মহাকবি হোমার, দান্তে, জন মিল্টন যেমন খৃস্টধর্ম ও বাইবেল থেকে উপকরণ সংগ্রহ করে তাঁদের অমর সাহিত্য সৃষ্টি করেছেন, মহাকবি ফেরদৌসি, ইকবাল, মধুসূদন, রবীন্দ্রনাথ, নজরুল ইসলাম, জসীমউদ্দীন, ফররুখ আহমদ প্রমুখ কবিও তাঁদের নিজ নিজ ইতিহাস, ঐতিহ্য ও পুরাকাহিনী থেকে উপকরণ সংগ্রহ করে সাহিত্য চর্চা করে যশস্বী হয়েছেন। ঐতিহ্যের দীপ্ত আলোয় উদ্দীপ্ত না হলে এঁরা তাঁদের অমর সৃষ্টি-কর্মে কতটা সফল হতেন, তা বলা কঠিন।
সাহিত্যে ভাষা এক অপরিহার্য বিষয়। সাহিত্যের ভাব ও বিষয় প্রকাশের মাধ্যম হলো ভাষা। এ ভাব ও বিষয় প্রকাশের ক্ষেত্রে কী ধরনের শব্দ বা ভাষা ব্যবহার করা হয় ও তার প্রয়োগে কী ধরনের কৌশল অবলম্বিত হয়, তার উপর নির্ভর করে লেখকের ঐতিহ্যবোধ সম্পর্কে ধারণা করা চলে। কবিতা সৃষ্টির ক্ষেত্রে এর গুরুত্ব আরো বেশি। উৎকৃষ্ট কবিতা রচনার জন্য ছন্দ-অলংকার, উপমা-রূপক, প্রতীক-রূপকল্প ইত্যাদির গুরুত্ব অপরিসীম। শব্দের মাধ্যমেই এসবের সৃষ্টি। অতএব, এক্ষেত্রেও কবির নিজস্ব ঐতিহ্যবোধ কাজ করে। মৌলিক প্রতিভার অধিকারী কবি সাধারণত কবিতায় উপমা-রূপক, প্রতীক-রূপকল্প ব্যবহারে নিজস্ব ঐতিহ্যের রূপায়ণ ঘটান। এক্ষেত্রে গতানুগতিকতা পরিহার করে নিজস্ব ঐতিহ্য-নির্ভর শব্দ, উপমা-রূপক-রূপকল্প ব্যবহারেই প্রকৃত কবির সক্ষমতা ও স্বকীয়তা প্রকাশ পায়।
অনুপ্রেরণা সৃষ্টির ক্ষেত্রেও একই কথা। প্রত্যেকের লেখার মধ্যে একটি ম্যাসেস বা আবেদন থাকে। লেখকের নিজস্ব ঐতিহ্যিকবোধ এ আবেদন সৃষ্টিতে কার্যকর ভূমিকা রাখে। সাহিত্যের আবেদন সৃষ্টির ক্ষেত্রেও প্রত্যেক কবির নিজস্ব ঐতিহ্যবোধ, ধর্মানুভূতি ও জীবন-চেতনার প্রভাব অনস্বীকার্য। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর বিশ্বে ইউরোপ-আমেরিকার সাধারণ মানুষ যখন শান্তির জন্য উন্মুখ হয়ে ওঠে, ইংরাজ কবি টি.এস. এলিয়ট তখন বাইবেলের মর্মবাণীর ভিত্তিতে শান্তির লোলিত শ্লোক শুনিয়ে বিশ্ববাসীকে আশ্বস্ত করার প্রয়াস পান। ভারতীয় উপমহাদেশে যখন স্বাধীনতা আন্দোলন ও অধঃপতিত মুসলিম জাতির নবজাগরণের প্রত্যাশা দানা বেঁধে ওঠে, তখন মহাকবি ইকবাল, কাজী নজরুল ইসলাম প্রমুখ কবি তাঁদের নিজস্ব আদর্শ ও ঐতিহ্যবোধে তাড়িত হয়ে সাহিত্য সৃষ্টি করে জাতীয় আশা-আকাক্সক্ষা ও প্রত্যাশা পূরণের প্রয়াস পান। বিংশ শতাব্দির চল্লিশের দশকে বৃটিশ-বিরোধী স্বাধীনতা আন্দোলন যখন তুঙ্গে, তখন কবি গোলাম মোস্তফা, বে-নজীর আহমদ, সুফিয়া কামাল, ফররুখ আহমদ, তালিম হোসেন প্রমুখও জাতির একই প্রত্যাশা পূরণে সচেষ্ট হন। এভাবে দেখা যায়, কাংক্ষিত আবেদন সৃষ্টির ক্ষেত্রে কবি-লেখক-সাংবাদিক তথা সকল সৃজনশীল প্রতিভাই নিজস্ব ঐতিহ্যবোধের সুস্পষ্ট পরিচয় তুলে ধরে তাঁদের সৃষ্টিকর্মকে সাধারণ মানুষের নিকট গ্রহণযোগ্য করে তোলেন।