ঐশ্বর্য শব্দটি শুনলেই কেমন যেন সম্ভ্রান্ত সম্ভ্রান্ত মনে হয়।কবির কন্ঠে এ উচ্চারণ আরো দ্যোতনা ছড়ায়।কবিরা দেখেন জলের ঐশ্বর্য, উপলব্ধি করেন ঐশ্বর্যের ঘ্রাণ। “একজন ( কবি) জেলে জলে জাল ফেলে জলের ঐশ্বর্যে ছেকে নিতে চায় সব শীতল অসুখ”। কবিগণই অনায়াসে বলতে পারেন “একটি জানালা খুল্লেই যেন এই বুক নদী হয়ে যায়” (জলের ঐশ্বর্য)। বলছিলাম কবি সৈয়দ সাইফুল্লাহ শিহাব’র কথা।তার কবিতার বই “ঐশ্বর্যের ঘ্রাণ”র কথা।কবির বই “ঐশ্বর্যের ঘ্রাণ”।
এর একটি পৃষ্ঠা যেন এক একটি দরোজা। আমরা তাই
“একটি দরোজা খুল্লেই
ঐশ্বর্যের ঘ্রাণ পাই
…একটি দরোজা খুল্লেই
নামহীন, গোত্রহীন সাদা নীল নক্ষত্রের খেলা
শুরু হয় স্টেডিয়াম চোখে।
একটি দরোজা খুল্লেই
মৃত বৃক্ষে দেখি সবুজের মেলা
নতুন শিশু মত স্বপ্নের চিত্রল মুখরতা
(একটি দরোজা খুল্লেই)।”

সৈয়দ সাইফুল্লাহ শিহাব’র কবিতার চরণ পাঠে পাঠক চমকিত হন। অভিভূত হন। তার কবিতার শরীরে ঝলমলে উপমায় পাঠকের চোখ বিস্ময়াবিভুত হয় পাঠ করে
“আমার স্বপ্নেরা যেন কৃষাণীর নগ্নপীঠ
রৌদ্র বিগলিত মাঠে তাই
ভালোবাসা শুকাতে শুকাতে
পুড়ে যায় নিদারুণ বিষণ্নতার উৎসবে
(ছয় জুনের স্বপ্ন)।”

সমকালকে উপেক্ষা করে চলা কবির জন্য অসম্ভব। তার দৃষ্টির সীমানায় থাকে বিশ্ব। বিশ্বের আলোচিত সমালোচিত ঘঠনা প্রবাহ দাগ কাটে কবির মনে। কবিতায় কবি ধারণ করেন সচেতনতা। বসনিয়ার যুদ্ধ সভ্য পৃথিবীর ইতিহাসে উল্লেখযোগ্য ঘঠনা। কবি তার কবিতায় সে চিত্র অংকন করেছেন সুন্দর ভাবে। একজন কবি কালের সাক্ষী, ভবিষ্যৎ দ্রষ্টা। বিশ্লেষণে পারঙ্গম, একজন শৈয়দ সাইফুল্লাহ শিহাব তাই বসনিয়ার ঘঠনা বিচারে তার কবিতায় উল্লেখ করেছিলেন “আগুনের খোরাক ঐ মিলোসোভিচ। ইতিহাস পরবর্তীতে থাকে চিহ্নিত করেছে বসনিয়ার কসাই বলে।এ নামেই তার কুখ্যাতি।
তার নেতৃত্বে, তার নির্দেশে চলে ইতিহাসের ঘৃণ্য গণহত্যা। তাদের ধিক্কার দিয়ে কবি বর্ণনা করেন
“পৃথিবীর যাবতীয় পাপ
একটি কাঁথার মত আজ
জড়িয়ে রেখেছে সার্ব বাহিনীকে।
ওদের হিংস্র থাবার আঘাতে
রক্তসাগরে ভাসে আজ কসোভো- হরিণ
লক্ষ লক্ষ বনিআদমের আর্তচিৎকারে
কমলার সবুজ কণ্ঠের মত ভেঙ্গে পড়ে আকাশের থাম
(তোমরা লড়াই করো)।”

মাহযাবীন হয়তো কবির প্রেমিকা নতুবা প্রেমের প্রতিক। তাকে নিবেদন করে প্রেমিক কবি তার বিরহী মনের কথা। সে কথা বলতে গিয়ে আশ্রয় নিয়েছেন নানা রূপকের। আশ্রয় নিয়েছেন উপমার। তাই কখনো বলেছেন দুপুরের রোদ তার বুকের যন্ত্রণার তাপ, বাতাসের মর্মর ধ্বনি অন্তরের ব্যথার্ত রোদন। তার কষ্টের কথা শুনে ভোরের পাখিরা বন্ধ করে দেয় সঙ্গীত, ফলবান বৃক্ষ হয়ে পড়ে বন্ধ্যা নারী। প্রেমিক কবির এত কষ্ট, অপরিসীম হাহাকারেও মাহযাবীনের পাথর হৃদয়ের বন্ধ কপাট খুলেনি। তখন নারী নিয়ে তার উপলব্ধি
“নারী, অতলান্ত সমুদ্রের মায়ামুগ্ধ প্রতিচ্ছবি
যার সাড়ে তিন হাত রহস্যের ভেতর সাঁতরায়
তেত্রিশ হাজার সোনার কাছিম।
(নারী)”
নারীর এই রহস্য ভেদ করতে না পেরে তার ভালোবাসা এখন হাবিয়ার আগুন। তিনি দ্ব্যর্থহীন ভাবে উচ্চারণ করেন
“ভালোবাসা হাবিয়ার আগুন, প্রেমার্দ্র বুকে
আমি লক্ষ- কোটি সে হাবিয়া নিয়ে
পুড়ে পুড়ে ছাই হই প্রতিদিন।
(ভালোবাসা হাবিয়ার আগুন)।”

শিহাব কবি হলেও কৃষকের পবিত্র ভূমিতে গ্রোথিত তার শেকড়। তিনি কৃষিজীবি ভাটি বাংলার যুবক।কবিতায় তাই চাষ করেন সোনাবাস সরিষা খামার, পরিচিত তিনি জালাধানের সাথে। “অন্ধ চোখে ধান পাতা পথ’র পরই দেখতে পান
“সোনার যৌবন নাচে আজ বাংলার ঘাসে ঘাসে
সন্ধাতারায় ফুটে আছে অসংখ চুমোচুমি
গাছে গাছে অম্লান দুধভোতের পাতা পাতা হাসে
চারদিকে মধু মৌ মৌ সোনাবাস সরিষা খামার
ফসলের পাঠ বলে, ঢাকা,ভাষা আর মাতৃভূমি
দুইমিলে রাজধানী, চোখে ঝুলে বাংলা আমার
(মধু মৌ মৌ সোনাবাস)”।

কবি সৈয়দ সাইফুল্লাহ শিহাব কবিতায় উপমা তৈরী করেন নিজের মত করে। স্বভাবতই তিনি আবিস্কার করেন
“আকাশের স্তন কাল সারারাত বৃষ্টি হল “
রৌদ্র মুছে দিগন্তের চুলখোলা পাপ “
তিনি দেখেন
“রৌদ্র প্রতিদিন সোনার আস্তর পরে শুয়ে থাকে”
তার দৃষ্টিতে সহজেই ধরা পড়ে
“কুমারী চোখের মত রোদ”
“ফুটবলের মত ক্রমাগত রাত্রি জনারণ্য- মাঠে পড়ছে লাফিয়ে লাফিয়ে” এভাবে একের পর এক উপমার জগতকে প্রশস্ত করতে করতেই রচনা করেন চিত্রকল্পের আবহ।তখন বলতে পারেন “স্বৈরাচার স্বপ্ন / চেঙ্গিস চোখের মত হয়” তিনি ইতিহাসের পাতায় লক্ষ করেন সুলেমানি গৃহে বিলকিসের হাসি” “লুতের ধ্বংসের মত সরে যায় বাতাসের নৌকায় ভাষা যত পাপ অবশেষে” রাত্রিতো নূহের সেই মহাপ্রলয়ের নতুন প্রতিক ” আর পরিব্রাজকের বিজ্ঞতায় বয়ন করেন “বিনম্র কাশ্মিরী চোখে / সে আমায় ডাকে মুয়ূরী লজ্জায় ” শিহাবের কবিতার চরণ যেন উপমা, উৎপ্রেক্ষা, চিত্রকল্প,ইতিহাস, ঐতিহ্য, মিথের অসাধারণ সংমিশ্রণের কাব্যিক সমাহার।যা পাঠে কাব্য পাঠকের মন ও মননে আনে তৃপ্তিদায়ক প্রশান্তি।

শিহাব তার কবিতায় শিল্পের শর্তসমুহ পূরণে সদা সচেষ্ট। কবিতার জমিনে তার ভাষায় “আমি যে নিমগ্ন চাষী”। সফলতার জন্য কাব্য পঙক্তিতে সন্নিবেশ ঘঠান অনুপ্রাসের।সচেতন ভাবে রক্ষা করেন ছন্দের অনুশাসন। কবি সৈয়দ শিহাব ছন্দ সচেতন কবি। ইতিহাস ঐতিহ্য বিশ্বাসকে কবিতায় তুলে আনেন নিজস্ব দক্ষতায়। প্রেম আর প্রকৃতি তার কবিতায়
একাকার।
“সোনার যৌবন নাচে আজ বাংলার ঘাসে ঘাসে
সন্ধাতারায় ফুটে আছে অসংখ্য চুমোচুমি
(মধু মৌ মৌ সোনাবাস)”।

সৈয়দ সাইফুল্লাহ শিহাব গত শতাব্দীর নব্বই দশকের উজ্জল থেকে উজ্জলতর শব্দ সৈনিকদের অন্যতমদের একজন।কবিতা তার বিচরণ ক্ষেত্র।”ঐশ্বর্যের ঘ্রাণ ” সৈয়দ সাইফুল্লাহ শিহাব রচিত কবিতাগ্রন্হ । “ঐশ্বর্যের ঘ্রাণ” গ্রকাশ করেছিল বিপরীত উচ্চারণ নামের একটি সংগঠন। প্রকাশকাল একুশের বইমেলা ২০০১ । আল কামিত এই গ্রন্হের প্রচ্ছদ শিল্পী। তিন ফর্মার এ বইটির মূল্য ধার্য ছিল ৫০ টাকা। স্বভাবতই বইটি বাজারে নেই। আমার কপিটিও ভঙ্গুর। কবি প্রতিভাবান।অবস্থা দৃষ্টে মনে হচ্ছে অলস। তিনি সচল হলে সাহিত্যে তার অবস্হানকে আরো দৃঢ় করতে পারবেন বলেই আমাদের বিশ্বাস। পাঠকের দরবারে তিনি হাজির হবেন তার নতুন নতুন সৃষ্টি সম্ভার নিয়ে এটি সুহৃদ পাঠকের চাওয়া।