কবিতা হলো শব্দ ও চিন্তার বিচিত্র খেলা। এই খেলায় যে কবি যত কৌশলী চাল দিতে পারবেন তিনি তত শক্তিশালী কবিতা রচনায় সক্ষম হবেন। কিন্তু কবিতায় চালবাজির চেয়ে পবিত্র অনুভূতির স্বতঃস্ফ‚র্ত, স্বচ্ছ ও সুশৃঙ্খল প্রকাশই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কবিতা নিছক শিল্প নয়, জীবনঘনিষ্ঠ শিল্প। কবিতার প্রয়োজনে জীবন নয়, জীবনের প্রয়োজনে কবিতা। প্রত্যের কবির সামাজিক দায়বদ্ধতা রয়েছে। এ দায়বদ্ধতাকে কোনো ক্রোমেই অবহেলা করা যায় না। হোলুব বলেছেন, ‘কবিতা খবরের কাগজ পড়ার মতো কিংবা ফুটবল খেলা দেখতে যাওয়ার মতো অভিজ্ঞতা।’ নিকানোর পাররা বলেছেন, ‘কবিতা আমাদের কাছে এতোটাই জরুরি যে, আমরা কবিতা ছাড়া বাঁচতেই পারি না।’প্রকৃতপক্ষে কবিতা বাঁচার স্বপ্ন দেখায়, বুক টান করে দাঁড়াবার সাহস যোগায়। কবিতা শুধু বুদ্ধিচর্চা নয় কবিতা জীবনের প্রাণ বারিও। এ জন্য বলা হয়, কবিতা শুধু intellect exercise নয়, কবিতা জীবনের বাস্তবতাও। কবিতা দর্শন নয়, কিন্তু philosophy of all writing। দুঃখ-যন্ত্রণা, জরা-খরা ও হতাশা আক্রান্ত মৃত্যুপথযাত্রীর চোখে কবিতা বাঁচার স্বপ্ন দেখায়। সকল স্বৈরাচার, সকল অসত্যের বিরুদ্ধে কবিতা শ্রেষ্ঠ হাতিয়ার। একজন কবি কিংবা কবিতাপ্রেমীর কাছে কবিতার চেয়ে প্রিয় কিছু নেই। এ জন্যই দেখা যায় কবিতার প্রেমে কবি ঘর ছাড়া হয়ে যান। কবিতার জন্য তিনি ত্যাগ করেন সকল সুযোগ, আরাম-আয়েশ।

এতোকিছুর পরও কবিতার সার্বজনীন কোনো সংজ্ঞা নেই। প্রকৃতপক্ষে মানুষ কোনো কিছুকেই সঠিকভাবে সংজ্ঞায়িত করতে পারে না। আবার কোনো কিছুকে পুরোপুরিভাবে সংজ্ঞায়িত করতে গেলেও সে জিনিসটি আর সে জিনিস থাকে না, হয়ে যায় অন্য কিছু। তা ছাড়া মানুষ পঞ্চেন্দ্রিয়ের কাছে সীমাবদ্ধ। এই সীমাবদ্ধতার কারণে মানুষ কোনো বিষয়ের পুরোপুরি জ্ঞান অর্জন করতে পারে না। মানুষ ক্ষুদ্র একটি গৃহের ভেতর ও বাহির একই সাথে দেখতে পায় না। গৃহের ভেতরের অংশ দেখতে গেলে বাইরের অংশ থেকে যায় দেখার বাইরে, আবার বাইরের অংশ দেখতে গেলে ভেতরের অংশ থেকে যায় অগোচরেই। একইভাবে এ মহাবিশ্বের ক্ষুদ্র একটি অংশই মানুষ এক সঙ্গে পায় মাত্র। আবার মহাবিশ্বের এই ক্ষুদ্র অংশই প্রত্যেক মানুষ পৃথক পৃথকভাবে দেখছে। আর মানুষ যা দেখছে তার ভিত্তিতেই সবকিছু মূল্যায়ন করে থাকে। মানুষের এই মূল্যায়ন স্থান-কাল-পাত্রের উপর নির্ভরশীল। স্থান, কাল ও পাত্রের ভিন্নতার কারণে কোনো মূল্যায়নই সার্বজনীন হয় না। সা¤প্রতিক কবিতার দিকে তাকালেও এ বাস্তবতা লক্ষ করা যায়। কবির কবিতাতেও একটি বিষয়ের খণ্ডাংশই প্রস্ফুটিত হয়, সেখানে সামগ্রিক দিক ফুটে ওঠে না। দার্শনিক ও বৈজ্ঞানিক বিচার-বিশ্লেষণও আপেক্ষিক; আমরা সেখানেও দেখতে পাই অপূর্ণতা, পরিপূর্ণতা থেকে যায় নাগালের বাইরে। একটি পরিপূর্ণ কবিতা রচনা যেমন দুঃসাধ্য তেমনি কোনো কবিতার মূল্যায়নও পরিপূর্ণভাবে করা সম্ভব নয়। কবির চিন্তা তার নিজস্ব। কবিতার ভিতরেও থাকে কবিতা। কবিতার বাইরের দিকটি দৃশ্যমান হলেও তার ভিতর থাকে অগোচরে। তা ছাড়া সবচেয়ে অব্যাখ্যাত বিষয়ও কবিতা। এ জন্যই বলা হয়ে থাকে, কবিতা ব্যাখ্যার বিষয় নয়, অনুভবের বিষয়।

কবিতা ও মানবসভ্যতার বয়স সমান। যতদিন সভ্যতা টিকে থাকবে ততদিন কবিতাও থাকবে। কবিতা সভ্যতা-সংস্কৃতির অপরিহার্য উপাদান এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না। অন্যভাবে বলা যায়, মানবসভ্যতার অস্তিত্ব রক্ষার ক্ষেত্রে কবিতার আবশ্যকতা অনস্বীকার্য। যেদিন আর কোনো নতুন কবির জন্ম হবে না, আর কোনো নতুন কবিতা রচিত হবে না, সেদিন মনে করতে হবে পৃথিবীর আয়ুষ্কাল শেষ হয়ে গেছে। প্রকৃতপক্ষে সভ্যতা যখনই আক্রান্ত হয়েছে কবিতা তখনই মুক্তির রসদ নিয়ে হাজির হয়েছে। মানবজাতির জন্য কবিতা খোদার শ্রেষ্ঠ উপহার। মানবজাতিকে পথ দেখানোর জন্য আল্লাহ তাআলা যুগে যুগে নবী ও রাসূল প্রেরণ করেছেন। তাঁরাই পথভ্রষ্ট জাতিকে মুক্তির পথ দেখিয়েছেন। নবী-রাসূলের আবির্ভাব বন্ধ হয়ে গেছে কিন্তু কবির জন্ম হবে পৃথিবীর শেষ দিন পর্যন্ত। অবশ্য নবী-রাসূলগণ মানবজাতির জন্য যা শুধু কল্যাণকর তাই বলেছেন। তাঁরা শুধু বলেই দায়িত্ব শেষ করেননি, যা বলেছেন তা করেও দেখিয়েছেন। তাঁদের দৃষ্টিতে স্রষ্টার অস্তিত্বকে অস্বীকার করে মানবজাতির কল্যাণ সাধন করা যায় না। কিন্তু এসব দিক বিবেচনায় কবিরা ভিন্ন; তাঁরা যেমন স্রষ্টার অস্তিত্বের পক্ষে কবিতা লিখেছেন তেমনি লিখেছেন তাঁর অস্তিত্বের বিরুদ্ধেও। আবার দেখা যায়, কবিরা শুধু কল্যাণের কথা বলেই দায়িত্ব শেষ করেন কিন্তু তা কার্জকর করার বাস্তব উদ্যোগ গ্রহণে খুব একটা প্রয়াসী নন। এর ব্যতিক্রমও লক্ষ করা যায় অনেক কবির কর্মনিষ্ঠার মধ্যে। তবে কবিতার সর্বসম্মত উপযোগ হলো, কবিরা যা লেখেন তা চিন্তু-ভাবনা করেই লেখেন। কবিতা লিখতে হলে চিন্তা করতে হয়, ভাবতে হয়, গভীরে যেতে হয়। কবিতা বুদ্ধিচর্চা ও চিন্তা-ভাবনার দুয়ার খুলে দেয়। আর নিষ্কলুষ ও মোহমুক্ত বুদ্ধিচর্চা কবিকে সত্যের কাছাকাছি নিয়ে যায়। সত্য উন্মোচনের ক্ষেত্রে কবিতার অবদানকে ছোট করে দেখার উপায় নেই। মুক্তবুদ্ধিচর্চা ও প্রকাশের অনন্য মাধ্যম হিসেবেও কবিতার গুরুত্ব অপরিসীম।

সত্য প্রকাশের দুরন্ত সাহস থেকে প্রতিমুহূর্তেই জন্ম নিচ্ছে কবিতা। হয়তো এই মুহূর্তেও পৃথিবীর কোথাও না কোথাও কোনো এক নাম না জানা কবি রচনা করে চলেছেন সত্য-সুন্দরের পক্ষে কোন এক মহান কাবিতা। এই মুহূর্তে পৃথিবীর কনিষ্ঠ কোনো কবি জন্ম দিল যে কবিতা তাঁর প্রতি সালাম। সত্য প্রকাশের প্রচেষ্টায় বাংলা সাহিত্যে যোগ হলো আরো একটি নতুন প্রয়াস ‘নীল জোছনার মায়া’, লেখক- নব্বই দশকের অন্যতম সেরা কবি ওমর বিশ্বাস। কবিতা সমালোচনার ক্ষেত্রে যোগ্যতা ও সাহস খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এ দিক থেকে আমার দুর্বলতা অনেক। তাই আমার এ আলোচনাকে যথাবিহীত গ্রন্থালোচনা না বলে পাঠপ্রতিক্রিয়া বলাই শ্রেয়।

ওমর বিশ্বাস নব্বই দশকের কবি। কিন্তু দশকের গণ্ডি ছাড়িয়ে যায় তার কবিতা। বিষয় নির্বাচন, রচনা শৈলী ও ছন্দের ব্যবহারসহ নানা ক্ষেত্রেই স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য লক্ষ্য করা যায় ওমর বিশ্বাসের কবিতায়। আমাদের চিরন্তন ও পরিশীলিত মূল্যবোধ এবং গৌরবময় অতীত ঐতিহ্য তাঁকে টানে গভীরভাবে। এই টান লক্ষ করা যায় তার ‘কাজী নজরুল ইসলাম’ শিরোনামের কবিতায়। কাজী নজরুল ইসলামকে নিয়ে অনেকেই কবিতা লিখেছেন। কিন্তু কবি ওমর বিশ্বাস এক্ষেত্রে নতুন মাত্রা দিয়েছেন। তাঁর কবিতাগ্রন্থ ‘নীল জোছনার মায়া’র প্রথম কবিতা ‘কাজী নজরুল ইসলাম’। নজরুল প্রেমের এমন উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত খুব একটা নেই বলেই আমার মনে হয়। কাজী নজরুল ইসলাম আমাদের জাতীয় কবি, ঐতিহ্যের কবি, ন্যায় ও সুন্দরের কবি। প্রেম ও বিদ্রোহের কবিও কাজী নজরুল। সাধারণত তিনটি জিনিসকে চিরন্তন হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এগুলো হলো ধর্ম, প্রেম ও যুদ্ধ। এ তিনটি বিষয়েই কাজী নজরুল লিখেছেন কালজয়ী কবিতা। এ কারণে যতদিন মানুষ ও মনুষ্যত্ব থাকবে ততদিন নজরুলের কবিতা থাকবে। নজরুল শুধু কবি নন, তিনি একটি প্রতিষ্ঠান। তিনি বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের প্রাণপ্রদীপ। তিনি হতাশায় আশার আলো, বিপদে নিরাপদ ভিত্তিভূমি আর চেতনার বাতিঘর। কবি কাজী নজরুল ইসলামের বিশালত্ব বর্ণনায় ওমর বিশ্বাস লিখেছেন—
সব কিছু পিছু ফেলে যে ভূমে দাঁড়ানো যায়, তুমি
ছুঁয়ে গেছো তার চেয়ে বেশি আকাশের আবিরতা
তুমি ছুঁয়ে গেছো আরো শিকড়ের গভীর গাঢ়তা
অনুভবে উচ্চকিত করেছ আপন দেশভূমি।
[কাজী নজরুল ইসলাম]

কবিতার ক্ষেত্রে যুগ বা কালচেতনা একটা বড় ব্যাপার। এ কাল সচেতনতা ছাড়াও কবিতা হতে পারে কিন্তু তা হবে কবির ব্যক্তিগত। কেননা, বর্তমানকে বাদ দিয়ে রচিত কবিতার অধিকাংশই পাঠকপ্রিয়তা হারায়। কবির মানসগত কবিতা থেকে কবি নিজে উপকৃত হলেও অন্যরা থেকে যায় বঞ্চিত। কবি ওমর বিশ্বাসের কবিতায় এ ধরনের মানসগত বিষয় থাকলেও পাঠক প্রবেশের দরোজাও উন্মুক্ত সর্বক্ষণ। পাঠকগণ সহজেই রস আস্বাদন করে নিতে পারে ওমরের কবিতা থেকে। দুর্বোধ্য শব্দ ও ভাবের অতিরঞ্জন তাঁর কবিতাকে দুরূহ করে তোলেনি। আমাদের নদীমাতৃক বাংলাদেশের প্রবাহমান নদীর মতোই ওমর বিশ্বাসের কবিতা ভাসিয়ে নিয়ে যায় দুর্বোধ্যতার জগদ্দল পাথর। তাঁর কবিতা মুয়াজ্জিনের আজানের মতোই পাঠকের হৃদয়ে পৌঁছে দেয় মর্ম সুর। সোনাঝরা ভোরের মতো হৃদয় হৃদয়ে ভরে দেয় আলো ঝলমল দিনের পরশ। শিশুর প্রথম চিৎকারের মতো ওমর বিশ্বাস কবিতায় চির সত্যকে উচ্চকিত করে তোলেন পরম মমতায়। বন্ধনমুক্তির মাধ্যমে দৃঢ় করেন আত্মার বন্ধন। হাড়কাঁপা শীতেও জ্বালেন অনুভবের তীব্র হুতাশন।
আর আমার প্রথম চিৎকার ছিল আমার ভাষার স্বরলিপি
গভীর মমতা-উচ্চারণের আবেগ প্রাণের স্পন্দন
আমার সে শব্দ ভাষা নিয়ে চলার প্রথম স্নেহ
মা ও আমার প্রথম মুখোমুখি আত্মার বন্ধন।
[আমার সে শব্দ ভাষা ছিল]

কবিতায় অবিন্যস্ত ও আপাতঃবিশৃঙ্খল ধারণারাজিকে সমন্বিত করা হয়। এখানে কবিতার গঠন সৌন্দর্য ও নান্দনিকতা যেমন গুরুত্বপূর্ণ তেমনি বক্তব্যের বিষয়ও সমান গুরুত্বপূর্ণ। এ দুয়ের শৈল্পিক রূপই কবিতা। এ ধরনের সৃষ্টির প্রয়াস দুরূহ। দুরূহ বলেই প্রকৃত কবির সংখ্যা হাতে গোনা। পারিপার্শি¦কতা ও যুগচেতনাকে এড়িয়ে রচিত কবিতা আত্মগত। অথচ কবিতায় রহঃৎড়াবৎঃ ও বীঃৎড়াবৎঃ সমান গুরুত্বপূর্ণ। কবিতায় অন্তরঙ্গতা ও বহিরঙ্গতাকে সমান গুরুত্ব দিয়ে রচিত কবিতাই সফলতার বিচারে শ্রেষ্ঠ। ভাব, বিষয় ও সৌন্দর্যের সম্মিলনে রচিত হয় সৃষ্টিশীল কবিতা। এ ধরনের কবিতা শুধু কবিদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না। কবিদের সীমা অতিক্রম করে মানুষের মুখে মুখে থাকে এ কবিতার মধু। আর এ ধরনের কবিতা যেমন মৃত্যুঞ্জয়ী তেমনি এ কবিতার কবিও থাকেন অমর হয়ে। কবিতার গঠন ও সৌন্দর্য শৈলীর বিচারে ওমর বিশ্বাসের একটি অনন্য কবিতা ‘মেঘলা’। এই কবিতায় কবি মানুষের চিরন্তন আবেগ, অনুভূতি, নস্টালজিয়া, প্রেম, সভ্যতা-সংস্কৃতি ইত্যাদিকে অপূর্ব রূপময়তার মধ্য দিয়ে ব্যক্ত করেন এভাবে-
প্রলম্বিত সীমানা ছেড়ে লুণ্ঠিত হয়ে আছে প্রকৃতির সৃজন
তোমার তৃষ্ণার নীড় তুর পাহাড়ের টান স্পর্শ করে জেগে থাকে প্রকৃতির ঠোঁট চুরি করে
পাহাড়, পাহাড়ের দেহ জেগে থাকে অনন্ত প্রেমের সুধা বিলিয়ে দিতে।
বন্ধু যুগিয়েছিলাম রাতে-
মেঘলার ত্রিমোহনীতে খাজা গরিব নেওয়াজ হোটেলের তেল চিটচিটে
টেবিলগুলো আর বন্ধুর গায়ে ঘামের চিটচিটে ভাব-কোনো পার্থক্য ছিল না
আসবাবগুলো প্রকৃতির শুকনো রূপান্তর
তুমি প্রকৃতির জ্যান্ত উদাহরণ শাহাবুদ্দীন! বন্ধু আমার
আজকের বাংলাদেশে মফস্বল প্রতীক
পৃথিবী স্থান ছেড়ে উঠে এসেছে রৌদ্রলা ঘাটে।
[মেঘলা]

ওমর বিশ্বাস ছন্দ সচেতন কবি। ছন্দ নিয়ে তিনি কাজ করেছেন অনেক। ‘নীল জোছনার মায়া’ কাব্যের অধিকাংশ কবিতা অন্তমিলহীন গদ্যছন্দের হলেও অক্ষরবৃত্ত ও স্বরবৃত্ত ছন্দের অপূর্ব কাজ লক্ষ করা যায় অনেক কবিতাতেই। অক্ষরবৃত্ত ছন্দে লেখা উত্তীর্ণ একটি কবিতা হলো ‘বদলায়নি তবুও’। কবিতাটিতে অক্ষরবৃত্তের চার মাত্রার চালের হেরফের হয়নি কোথাও। অসাধারণভাবে ছন্দের বন্ধনের মুক্তিও ঘটেছে ছন্দের নান্দনিকতায়। ভাবের ব্যঞ্জনায়ও রয়েছে নতুনত্ব ও বৈপরীত্বের অপূর্ব সমন্বয়। পাতাঝরা ঋতু বদলের নশ্বরতার মাঝেও কবিতাটিতে বেজে চলেছে অবিনশ্বরতার সুর। সকল ক্ষয়িষ্ণুতা ও পরিবর্তনের মাঝেও থেকে যায় অক্ষয় সেই প্রেম। সম্ভবত কবি প্রেমের গোপন চোখেই এঁকে চলেছেন সেই অকৃত্রিম মুখাবয়ব ও চির সুন্দর নয়নযুগল। স্মৃতির আয়োজনে হেমন্তের সকালে কবি হাঁটছেন আর ফিরে ফিরে দেখছেন সেই চোখের সৌন্দর্য। কবি যেন কিছুতেই দৃষ্টি ফেরাতে পারছেন না সেই চোখ থেকে। আবেগঘন বর্ণনা দিয়ে লিখেছেন কবি ‘বদলায়নি তবুও’ শিরোনামের কবিতাটি।
সব পাতা ঝরে পড়ে বদলের হাত ধরে
আমি দেখি ওই চোখ বদলায়নি তবুও
আকাশের কাশবনে তুমি রৌদ্র বলে ঘুম
ডেকে আনো কুয়াশার দৃষ্টি তীক্ষ্ণ তাড়নায়।
[বদলায়নি তবুও]

‘নীল জোছনার মায়া’ কাব্যের শেষ কবিতা ‘তোমার ক্ষমতা তোমার ভালোবাসা’। বিশ্বাসের ইতিহাসে জমা হলো আরো একটি নতুন কবিতা। মানবসভ্যতার প্রথম ও প্রধান যুক্তিগ্রাহ্য দর্শনই হলো বিশ্বাস। স্রষ্টার প্রতি পরিপূর্ণ বিশ্বাস ছাড়া জীবন ও জগতের সঠিক কোনো ব্যাখ্যা দেওয়া সম্ভব নয়। বিশ্বাসই বিজ্ঞানের মূল। বিশ্বাস ছাড়া বিজ্ঞান খোঁড়া। বিশ্বাসের ভিতের উপরই রচিত হয়েছে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির প্রাসাদ। কিন্তু আজ সেই বিশ্বাসকে নিয়েই কৌত‚ক করা হচ্ছে। বিশ্বাসীদেরকে দেখা হচ্ছে সেকেলে হিসেবে। কবি ওমর বিশ্বাস সকল চোখ রাঙানিকে উপেক্ষা করে বিজ্ঞানের আয়নায় বিশ্বাসকে বিম্বিত করেছেন সুনিপুণভাবে। জগতের সকল সৃষ্টির সঙ্গে তিনিও গেয়ে উঠলেন স্রষ্টার গান। এ মহাবিশ্বের স্রষ্টা আল্লাহ। মহান আল্লাহর যথার্থ প্রশংসা জ্ঞাপন করতে পারে এমন কোনো সৃষ্টি নেই। তবুও সৃষ্টিরাজি সর্বক্ষণ তাঁরই প্রশংসা জ্ঞাপনে ব্যস্ত। প্রতিটি অণু ও পরমাণু নিজের ভাষায় পাঠ করছে তাঁরই তসবিহ, তাঁরই গুণগান।
তাহলে প্রশংসা তো তোমারই হবে
তাবৎ বিশ্বের জড় অজড়ের সমস্ত প্রশংসাই
পরমাণু পরিমাণও বাদ যাবে না
তারাও জড়ো হয় তোমার প্রশংসায়
তুমি মহান প্রশংসাময়
আপন সত্তায় আপনি প্রশংসিত।
[তোমার ক্ষমতা তোমার ভালোবাসা]

একটি পরিপূর্ণ ও সার্থক কবিতা রচনা করাই একজন কবির চির সাধনা। তিলে তিলে পূর্ণতার দিকে অগ্রসর হয় একজন বিদগ্ধ কবি। কিন্তু পূর্ণতার সংজ্ঞা জানেন না কবি। তবুও এই না জানা, অচেনা পূর্ণতার দিকেই ছুটতে থাকেন সর্বস্ব নিয়োগ করে। এই যাত্রাকালে যত কবিতাই তিনি রচনা করেন না কেন কোনো কবিতায় তাঁকে তৃপ্ত করতে পারে না। অতৃপ্ততাই তাঁকে নতুন কবিতা সৃষ্টির প্রেরণা দেয়। এই অতৃপ্ততা থেকে কবির অজ্ঞাতসারেই জন্ম নেয় সৃষ্টিশীল, অনিন্দ্য সুন্দর ও কালজয়ী কবিতা। কবি হয়ত নিজেও জানেন না তাঁর মহান সৃষ্টি সম্পর্কে। কিন্তু সময়ই সঠিক মূল্যায়ন করে তাঁর মহৎ সৃষ্টিকর্মের। ‘নীল জোছনার মায়া’ কাব্যের প্রকৃত মূল্যায়ন করবে সময়। তবে এতদূর বলা যায়, ওমর বিশ্বাস জীবনকে সৃষ্টিশীলতার ক্যানভাসে পারঙ্গমতার সাথেই চিত্রায়িত করতে সক্ষম হয়েছেন। জীবনের অনন্দ-বেদনা, বিষণ্নতা-প্রসন্নতা, আবেগ-উচ্ছ্বাসের মহাসমুদ্রকে মাত্র কয়েকটি পৃষ্ঠার মাঝে ভরে দেওয়ার ক্ষেত্রে নিপুণতার প্রমাণ রেখেছেন তিনি। তাঁর সৃষ্টিশীল কাব্যের অতলে কুড়িয়ে ডুবুরিরা নিশ্চয় পেয়ে যাবেন অমূল্য কিছু। তবে সহজ চিন্তার সরল বুননের কিছু কবিতা অনেকের কাছে ভালো নাও লাগতে পারে। কারো কারো মনে প্রশ্ন জাগতেই পারে, এমন একটি সৃজনশীল কাব্যে এ ধরনের কবিতার জায়গা হলো কী করে? এ প্রশ্নের উত্তরে বলা যায়, কবিতাকে আকর্ষণীয় ও সমালোচনার উপযুক্ত করে তোলার ক্ষেত্রে কবি যখন শুধু নতুন ফর্ম ও কাব্যশৈলী নির্মাণের প্রতি গুরুত্ব দেন তখন তার সৃজনশীলতা হারিয়ে যায়। তাই সহজ কথনের মধ্যে সৃজনশীলতাকে প্রকাশ করার দৃষ্টিভঙ্গিতে ওমর বিশ্বাস হয়তো ঐসব সহজ ফর্মের কবিতাগুলো রচনা করেছেন।

একুশ শতকের শহরমুখো মানুষ জোছনা দেখতে ভুলে গেছে। শিশিরভেজা জোছনারাতে মৃদুমন্দ বাতাসে পুকুরঘাটে দাঁড়িয়ে থাকা কিংবা মখমল সবুজ ঘাসের উপর দিয়ে হেঁটে যাওয়ার আনন্দ থেকে নগর সভ্যতার অধিবাসীরা আজ বঞ্চিত প্রায়। যান্ত্রিক সভ্যতা গিলে খাচ্ছে আমাদের দীঘল সবুজ মাঠ, চিরহরিৎ অরণ্য, পাখিডাকা ভোর, শান্ত নদী ইত্যাদি প্রাকৃতিক ঐশ্বর্য। মানুষ হারাতে বসেছে সরলতা, স্নেহ-মমতাসহ মানবীয় গুণাবলি। পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ, সহিষ্ণুতা, সহমর্মিতার বড়ই অভাব লক্ষ করা যাচ্ছে আজ। রাজনৈতিক সংঘাত মানুষকে নামিয়ে দিচ্ছে পঙ্কিলতার অতলে। একইভাবে আমাদের সাহিত্য-সংস্কৃতিও রাহুর কবলে। গুষ্টিচর্চা, ইজমচর্চা সাহিত্যাঙ্গনকে কলুষিত করে তুলেছে প্রকটভাবে। এক সময় কবিকে শান্তির দূত মনে করা হতো। একজন কবির কথা আলোচনায় এলেই ভেসে উঠতো এমন একজন মহান ব্যক্তির মুখ, যার হৃদয় আকাশের মতো বিশাল, মেঠোপথের মতো যার সরলতা, জোছনার মতো যার হাসি, প্রবাহমান নদীর মতো যার পবিত্রতা। কিন্তু আজ কবিরা যেনো হয়ে উঠেছে রোদেপোড়া পিচঢালা পথের মতো। হোটেল চুলার উপর উত্তপ্ত গরম কড়াই যেন তারা আজ। এইসব যান্ত্রিক সময়ে ওমর বিশ্বাস আমাদের উপহার দিলেন ‘নীল জোছনার মায়া’। যেন বহু কাল পরে আবার সেই শিশির ঝরা জোছনা রাত আমাদের ছুঁয়ে ছুঁয়ে যাচ্ছে পরম আকুলতা দিয়ে। শিরি ফরহাদের পুরনো প্রেমের উপাখ্যানের শুনতে শুনতেই কেটে যাবে আধো আধো জোছনা রাত। আধো আধো জোছনা রাতের মায়া কবি ছড়িয়ে দেন এভাবে :
এই রাত স্ফূর্তির সবটুকু শরাবের মতো ঢেলে দিয়েছিল আধো জোছনা দিয়ে
সবটুকু বিলিয়েছিল শিরি ফরহাদের মতো। দেখেছি
ঈর্ষার চোখ ঘুরে ঘুরে আসে
সে চোখ চায় ঈর্ষান্বিত সৌন্দর্য
সুন্দরীর চোখ চেখে নেয় আরেক সুন্দরীর লজ্জাহীন ঈর্ষা
মেঘলা, কে কার সৌন্দর্যের তারিফ করতে তসবীহ হাতে বসে আছে
নীলাচল, চিম্বুকের উচ্চশৃঙ্গ আর শৈলপ্রপাতের বান্দরবান।
[মেঘলা]

ছন্দবিচার, রচনাশৈলী, চিত্রকল্প নির্মাণ, বিষয় নির্বাচন, সৃজনশীলতা ইত্যাদির বিচার-বিশ্লেষণে ‘নীল জোছনার মায়া’ একটি চমৎকার কবিতার বই। এটি কবি ওমর বিশ্বাসের দ্বিতীয় কাব্য। এটি পাঠকপ্রিয়তা পাবে বলে আমার বিশ্বাস। আমরা তাঁর নতুন কাব্যের অপেক্ষায় থাকলাম।