শাওন, শিবু ও রাতুল একই স্কুলে পড়ে। তিনজনেই এবার সপ্তম শ্রেণিতে। পড়ালেখায়ও মোটামুটি ভালো। ওরা একসাথে খেলে আর একসাথে স্কুলে যায়।

স্কুল থেকে এসেই তিনজনে ছুটে যায় খেলার মাঠে। সারাদিন মাঠে মাঠে ঘুড়ি ওড়ায়। রাতুল খুব সুন্দর ঘুড়ি বানাতে পারে। সে সবাইকে ঘুড়ি বানিয়ে দেয়। আর সবার থেকে ঘুড়ি বানানোর একেকটা জিনিস চেয়ে নেয়। সেইগুলো একসাথে করেই রাতুল ঘুড়ি বানায়। রাতুলের বাবা দিনমজুর।নুন আনতে পান্তা ফুরায় ওদের। দু’বেলা ঠিকমত খেতেও পারে না। ঘুড়ি কেনার কথা কেমনে বলবে! তবুও একদিন ওর মাকে বলেছিল একটা ঘুড়ি কিনে দিতে। ওর মা কোনো সাড়া দিয়েছিল না, শুধু অঝোরে অশ্রু ঝরিয়েছিল। রাতুলও সেদিন ওর মাকে জড়িয়ে ধরে খুব কেঁদেছিল। তারপর থেকে রাতুল আর কোনোদিন ঘুড়ি কিনে চায় না। সবার থেকে জিনিস নিয়ে যে ঘুড়ি বানায় ওটা নিয়েই ও খেলে।মাঝে মাঝে শাওন, শিবুর ঘুড়িও ওড়ায়। একদিন শাওন ঘুড়ি ওড়াতে দিলে অন্যদিন শিবু দেয়। শাওন,শিবু রাতুলের খুব ভালো বন্ধু। ওদের বাড়িও একই গ্রামে তবে সবার বাড়ি এক জায়গায় নয়। শাওন আর শিবু রাতুলকে খুব ভালোবাসে। তাই রাতুলের মন খারাপ হয় না। ওদের সাথে হেসে খেলেই দিন কাটিয়ে দেয়।

দেখতে দেখতে বর্ষাকাল চলে আসে। প্রায় প্রতিদিন বৃষ্টি হয়। রাতুল শাওন ও শিবুর সাথে বৃষ্টি ভিজে একটু আধটু খেলতে এলেও স্কুলে আর যায় না। দু’দিন হলো রাতুল স্কুলে যায় না। শাওন, শিবু রাতুলকে নিয়ে খুব চিন্তায় পড়ে যায়। তারপর দুজন মিলে রাতুলের বাড়িতে যায়। রাতুলের বাড়ি গিয়ে শোনে রাতুলের ছাতা নেই তাই স্কুলে যায় না। তাছাড়া বই নেওয়ার ব্যাগও নেই। বৃষ্টি ভিজে স্কুলে গেলেও বইগুলো ভিজে ছিঁড়ে যাবে। শাওন আর শিবু খুব দুশ্চিন্তায় পড়ে গেল রাতুলের জন্য। যেভাবে হোক রাতুলকে স্কুলে নিতেই হবে। অবশেষে দুজন মিলে একটা উপায় পেল। রাতুলকে তাদের ছাতার তলেই স্কুলে নিয়ে যাবে। যে কথা সেই কাজ। পরের দিন সকালে শাওন, শিবু রাতুলের বাড়ি গিয়ে রাতুলকে সাথে নিয়েই স্কুলে যায়। কিন্তু তাদের ছাতা ছোট হওয়ায় দুইটা ছাতায় তিনজনকে ধরে না। তাই রাতুল বই ওদের কাছে দিয়ে ভিজে ভিজেই স্কুলে গেল। এভাবেই তিনজন মজা করেই স্কুলে যেতে লাগল। কিন্তু তিনদিন যেতে না যেতেই রাতুলের খুব জ্বর আসে। আবারও রাতুল স্কুলে যাওয়া বন্ধ করে দেয়।

শাওন ও শিবু আবারও চিন্তায় পড়ে যায়। তাদের ভাবনা শুধু রাতুলকে নিয়ে। রাতুলকে তারা বন্ধবেশে চিরদিনই পাশে পেতে চায়।

রাতুলের জ্বর খুব বেশি হয়। জলপট্টি দিলেও কমে না। অতিরিক্ত বৃষ্টির কারণে তার দিনমজুর বাবাও কোনো কাজ করতে পারে না। ফলে রাতুলের ঔষধও কিনে দিতে পারে না। কিন্তু শাওন, শিবু বসে নেই। দুজন চারদিনের টিফিনের টাকা জমিয়ে রাতুলকে ঔষধ কিনে দেয়। রাতুল সুস্থ হয়ে যায়। কিন্তু ওরা রাতুলকে আর স্কুলে নিয়ে যায় না।

রাতুল মনমরা হয়ে সারাদিন বাড়ি বসে থাকে।মায়ের নিষেধ থাকায় বৃষ্টিতে আর কোথাও বের হতেও পারে না। শাওন, শিবুকে স্কুলে যেতে দেখে রাতুলের খুব খারাপ লাগে, কান্নাও পায়। মাঝে মাঝে চুপিচুপি কান্নাও করে সে। কিন্তু মাকে বুঝতে দেয় না। কারণ সেদিনের ঘুড়ি চাওয়ার কথা আজও তার মনে পড়ে। চোখে ভেসে ওঠে অশ্রু ছলছল মায়ের চোখ।

ওদিকে শাওন, শিবু প্রতিদিনের টিফিনের টাকা জমাতে থাকে। স্কুলে গিয়ে তারা কোনো খাবাব খায় না। টিফিন টাইমে দুজন ক্লাসে বসে খেলে আর গল্প করে। রাতুলকে ছাড়া ওদের খুব কষ্ট হয়। বৃষ্টির জন্য খেলাধুলা কম হয়, দেখাও কম হয়।আর রাতুল ভাবে শাওন, শিবু হয়তো তাকে ভুলে গেছে। কিন্তু কিছু করার নেই। সে যে গরীবঘরের সন্তান। একটা ছাতাও তার বাবা কিনে দিতে পারে না। সে আর কেমনে স্কুলে যাবে?
সে ভাবে তার বুঝি আর কোনোদিন স্কুলে যাওয়া হবে না। শাওন, শিবুর সাথে এক বেঞ্চে বসে আর কখনও গল্পও করা হবে না। এসব চিন্তা ভাবনা নিয়েই রাতুলের দিন কাটতে থাকে। আর শাওন,শিবু?ওরাও কিন্তু বসে নেই। টিফিনের টাকা একটিও খরচ করে না। আবার মাবাবার চোখে ফাঁকি দিয়ে বিলে গিয়ে মাছ ধরেও টাকা যোগাড় করে। শুধুমাত্র রাতুলকে একটা ছাতা কিনে দেবে তাই।

এভাবে প্রায় ১০-১৫ দিন কেটে যায়। শাওন, শিবুর ছাতা কেনার টাকাও জমা হয়ে যায়। দুজনে আজ খুবই খুশি। মনে হচ্ছে আজ ওদের ঈদ। দুজন মিলে বাজারে গিয়ে হরিদাদুর দোকান থেকে একটা লাল ছাতা কেনে। লালরং রাতুলের খুব প্রিয়। লাল ছাতা পেলে রাতুল অনেক খুশি হবে।

দুজন দৌড়াতে দৌড়াতে রাতুলের বাড়ি গেল। চিৎকার করে রাতুলকে ডাকলো। রাতুল ঘুমাচ্ছিল। চোখ মুছতে মুছতে বাইরে আসে। শাওন, শিবুকে দেখে রাতুলের আর খুশি ধরে না। ওদের দেখেই খুশিতে কান্না করে দেয়। শাওন বলে ওঠে, “কীরে বোকা কাঁদছিস কেন? আজতো তোর খুশির দিন। আমরা তিনজনে আবার একসাথে স্কুলে যাবো।”
রাতুল উত্তরে বলে, বৃষ্টি না কমলে আমি আর স্কুলে যেতে পারবো না।
শিবু বলে, “এই দেখ আমরা তোর জন্য ছাতা কিনে এনেছি। তুই ব্যস্ত রেডি হয়ে আয়। আমরা তিনজনে আবার একসাথে স্কুলে যাবো।”

লাল ছাতা দেখে নিমিষেই রাতুলের কান্না থেমে যায়। সে খুশিমনে ঘরে গিয়ে রেডি হয় আসে। শিবু রাতুলের হাতে লাল ছাতাটা দেয়। রাতুল ছাতা মেলে মাথায় উপর ধরে। তারপর তিনবন্ধু স্কুলের দিকে হাঁটতে থাকে।