আফসার আহমেদ বাংলা সাহিত্যের বিশিষ্ট লেখক। প্রশ্ন জাগে, তিনি কি সত্যিই কি নিঁখোজ মানুষ? জবাব হল-না, তিনি নিখোঁজ মানুষ নন। তিনি তাঁর মেধা- মনন, চিন্তা – চেতনা অভিজ্ঞতার আলোকে অনবদ্য গল্প ও উপন্যাস রচনা করে বাংলা সাহিত্যকে ঋদ্ধ করেছেন। তাই ভারতীয় সাহিত্য একাডেমী পুরস্কার প্রাপ্ত আফসার আহমেদ কখনোই নিখোঁজ মানুষ হতে পারে না। তিনি অকালে মৃত্যুবরণ করলেও তাঁর সাহিত্যকর্ম তাঁকে নিঁখোজ মানুষ হতে বাদ সেঁধেছে। তাঁর ব্যতিক্রমধমী উপন্যাস ‘সত্যিই কি নিঁখোজ মানুষ’ তাঁকে ২০১৭ সালে ভারতীয় সাহিত্য একাডেমী পুরস্কার এনে দেয়। প্রখ্যাত সিনেমা পরিচালক মৃণাল সেন আফসার আহমেদের ‘ধান জ্যোৎস্না’ উপন্যাস নিয়ে ‘আমার ভুবন’ সিনেমা তৈরি করেছেন। তিনি অসংখ্য গল্প ও উপন্যাস রচনা করে পাঠক প্রিয়তা লাভ করেন।

আফসার আহমেদের জন্ম ১৯৫৯ সালে হাওড়ার বাগনানে। মধ্যবিত্ত পরিবার থেকে উঠে আসা মানুষটি ২৭টি উপন্যাস রচনা করেন। আফসার আহমেদ উপন্যাসের বাইরেও ছোটগল্প ও প্রবন্ধ মিলিয়ে আরও ১৪টি মূল্যবান গ্রন্থ রচনা করেছেন। তার উপন্যাসগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল ‘খণ্ডবিখণ্ড, স্বপ্নসম্ভাস, দ্বিতীয় বিবি, মেটিয়াবুরুজের কিসসা, রমণীর কিস্সা ইত্যাদি বাংলা সাহিত্যের মূল্যবান আলেখ্য।

আফসার আহমেদ বাস্তববাদী লেখক। তিনি অভিজ্ঞতার আলোকে সমাজের বাস্তব চিত্র উপস্থাপন করেছেন তাঁর গল্প উপন্যাসে। তাঁর লেখায় বাংলার মাটির গন্ধ লেগে আছে। তাঁর উপন্যাসগুলোর চরিত্রেরা গ্রাম ও শহরের প্রান্তিক মানুষজন। সেই সব মানুষের জীবন চিত্র অঙ্কন করেছেন তিনি চরম ঋদ্ধতায়। আমরা তাঁর লেখায় মানবিক মূল্যবোধের প্রতিফলন লক্ষ করি। সংখ্যালঘু জীবন তাঁর হাতে মূর্ত হয়েছে মুগ্ধতায় ও চরম ঋদ্ধতায়। তাঁর গল্পের মধ্যে বিশেষ উল্লেখযোগ্য সঙ্গে ‘সানু আলির নিজের জমি’, ‘প্রেমে অপ্রেমে একটি বছর’, ‘আমার সময় আমার গল্প’, ‘খুনের অন্দরমহল’ ইত্যাদি।এই সব গল্পে তিনি মানব মানবীর প্রেম ভালবাসা, দু:খ বেদনা, প্রেম অপ্রেমের, সংকট, খুনোখুনী, পরিবার তথা সমাজের কুসংস্কারের চিত্র বিশেষ আঙ্গিকে উপস্থাপন করেছেন। মানুষে মানুষে বিভেদের চিত্র উঠে এসেছে তার গল্পগুলোতে।

সাহিত্যে অবদানের জন্য তিনি বহু পুরস্কার লাভ করেছেন। ভারতীয় সাহিত্য একাডেমী পুরস্কার ছাড়াও ‘কথা পুরস্কার’, ‘শরৎ সাহিত্য পুরস্কার’ লাভ করেন।

আফসার আহমেদের লেখনিতে উঠে এসেছে মানুষের বিচিত্র সব মানবিক সম্পর্র্কেও কথা। একদল মানুষ বিভেদ সৃষ্টি করলেও আর এক শ্রেণির মধ্যে সম্পৃতি ও মানবিকতাও আছে তা উপস্থাপন করতে তিনি পিছপা হননি। তিনি তাঁর কিসসা কথনরীতিকে উপন্যাসে তুলে এনেছিলেন। নি:সন্দেহে তাঁর লেখায় এই রীতি ব্যতিক্রমের দাবী রাখে। তিনিই লিখেছেন ‘সঙ্গ নিঃসঙ্গ’, ‘হত্যার প্রমোদ জানি’! তাঁর লেখাতেই পাই ওপেন এন্ডেড ভাবনার প্রকাশ বিষয়ে, আঙ্গিকে, বাক্যগঠনে! কী আশ্চর্য! তাঁর লেখায় এই ব্যতিক্রমী প্রয়াসের জন্য তাঁকে ধন্যবাদ দিতে হয়।

আর্থিক সঙ্কট থাকায়ও তাঁর পক্ষে পুরো সময়ের লেখক হওয়া কঠিন হয়ে উঠেনি। কাজ নিয়েছিলেন পশ্চিমবঙ্গ বাংলা অ্যাকাডেমিতে। সেখানেও ১৩ বছরে অনেক ভাল ভাল বই সম্পাদনা করেছেন। ‘কবি ও লেখকরা তো সৌন্দর্যতত্ত্বের কাজ করেন, তাঁরা স্বাধীনতা চান।’ এটাই ছিল তার বক্তব্য। তাঁরা সাধারণত মানুষকে মানুষ হিসাবে দেখতে ভালোবাসেন। সমাজ, রাষ্ট্রযন্ত্র হয়তো তাঁকে স্বাধীনতা দিতে পারে না। তখন লেখক-সাহিত্যিকরা জীবনদর্শন তৈরি করে নেন। সেই কাজে আপামর মানুষের হয়ে কথা বলবার জন্য সব শিল্পমাধ্যমে তাঁরা তার প্রতিফলন ঘটিয়ে থাকেন। সাহিত্যশিল্পের কাজ সমাজজীবনে অন্তঃসলিলা স্রোতের মতো তাঁর সৃষ্টিকে প্রবাহিত করা। সবসময় মানুষের হয়ে কাজ করাটা তাঁদের জীবনদর্শন। তাঁদের চিন্তা চেতনায় মিশে যায় জীবন দর্শনে।। তাই এক সাক্ষাৎকারে তিনি দৃঢ়তার সঙ্গে বলেছিলেন,‘আমার জীবনদর্শন মানবিক ও আশাবাদী।’ আফসার আহমেদের এই আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে কখনো আপস করেনি।

অবাক করা ব্যাপার তাঁর অভাব অনটন তাঁকে ছুঁতে পারেনি। অর্থনৈতিক সংকটের কথা তিনি তাঁর অন্তরঙ্গদের কাছেও ব্যক্ত করেনি কখনো। অথচ পত্রপত্রিকায় লিখে তিনি যা উপার্জন করতেন তা দিয়ে তাঁর সংসার চালানো কষ্টেরই ছিল। স্ত্রী-কন্যা-পুত্র নিয়ে সে-লড়াই ছিল কঠিন অবশ্যই।। মনে করলে অসম্ভব মনে হয়। অথচ কখনো কোথাও আফসার আহমেদ অর্থ উপার্জনের জন্য লেখাকে বিকিয়ে দেননি।

তাঁর অনুরক্ত লেখকদের তাঁকে নিয়ে অনেক পরিকল্পনা থাকলেও তিনি চলে গেল ত্রিশটির ওপর উপন্যাস, তিনশোর কাছাকাছি ছোটগল্প রেখে। আর ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা নানা প্রবন্ধ, সমালোচনা, ফিচার, সাক্ষাৎকার, কবিতা। শুধু আক্ষেপ, তাঁর শেষ ভাবনারা ভাবনাই থেকে গেল । তিনি এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ‘আমার শৈশবের সময়গুলি নিয়ে আমি একটি উপন্যাস লিখতে চাই। আর একটি উপন্যাস নিজেকে নিয়েও লিখতে চাই। আমাকে তাড়া করে এই উপন্যাস। জানি না সে-উপন্যাসদুটি কেমন হবে। কীভাবে লিখব এখনও ঠিক করে উঠতে পারিনি।’ অথচ কখনো কোথাও আফসার আহমেদ অর্থ উপার্জনের জন্য লেখাকে বিকিয়ে দিয়েছেন, এ-কথা চরম নিন্দুকও বলবেন না। প্রকৃতপক্ষে, আফসার আহমেদের নিন্দুক কেউ ছিলই না বলতে হয়। বরং তাঁর ছিল এবং এখনো আছে সুনির্দিষ্ট এক পাঠকগোষ্ঠী। আছে বাংলাদেশে, দিল্লিতে, কোচবিহারে, মালদহে।

তাঁর জীবনটা ছিল টানাপোড়েনের মাঝে। একসময় পশ্চিমবঙ্গ বাংলা অকাডেদমির চাকরি জোটে। কিন্তু অনিয়মিত কর্মী হিসেবে। মাইনে বলার মতো কিছু নয়। চাকরিও অনিশ্চিত। রিটায়ারমেন্ট আসন্ন। পেনশন নেই। দুশ্চিন্তা তাঁকে তাড়িয়ে বেড়াত।

বেশ কিছুদিন ধরেই লিভারের সংক্রমণে ভুগছিলেন। সাম্প্রতিক বছরগুলিতে তাঁর কর্মকা-ে বারবার থাবা বসিয়েছে তাঁর শরীর। লিভারের সমস্যায় জর্জরিত ছিলেন লেখক।৪ আগস্ট ২০১৮ শনিবার বিকেল ৫টায় কলকাতার এসএসকেএম হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। অকালে প্রয়াত হলেন সাহিত্যিক আফসার আহমেদ। মৃত্যুকালে বয়স হয়েছিল ৫৯ বছর। ‘সত্যিই কি নিঁখোজ মানুষ’ উপন্যাসের স্রষ্টা আফসার আহমেদ অকালে প্রয়াত হলেও তিনি সাহিত্যজগতে তাঁর সৃষ্টিশীল সাহিত্যকর্মের মাঝে অমর হয়ে থাকবেন। তিনি কখনো নিখোঁজ মানুষ হিসাবে জগত সংসার থেকে হারিয়ে যাবেন না এ কথা নির্দ্ধিধায় বলা যায়। মনোজিৎকুমার দাস, মাগুরা।