কবিতার আত্মা হলো কবির মনের ভাব ও বিষয়। অন্যদিকে, শব্দকে বলা হয় কবিতার শরীর। শব্দের নিপুণ বিন্যাসে ও আভরণে কবিতা বিচিত্র বৈভবে চিত্তাকর্ষক হয়ে ওঠে। কবিতা যথার্থ কবিতা হবার পিছনে আরো কয়েকটি উপাদান বা অনুষঙ্গ বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। এর মধ্যে বিশেষ উল্লেখযোগ্য হলো ছন্দ, শব্দালংকার, রূপক-উপমা-প্রতীক-রূপকল্প ইত্যাদি। এ সবের সমন্বিত, সুসঙ্গত ও কুশলী ব্যবহারে কবিতা যথার্থ শিল্প হয়ে ওঠে।
মনের ভাব একান্ত ব্যক্তিগত বিষয়। এর সাথে কবির ব্যক্তি-জীবন, পারিপার্শ্বিক অবস্থা, অভিজ্ঞতা-অভিজ্ঞান ও অনুভূতির অবিভাজ্য সম্পর্ক বিদ্যমান। সর্বোপরি, মনের ভাব শরতের আকাশের মতোই ক্ষণে ক্ষণে রং বদলায়। তাই কবিতায় কবির মনের যে ভাবের প্রকাশ ঘটে, তা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বিশেষ মুহূর্তের অনুভূতির প্রকাশ। রোমান্টিক কবিদের ক্ষেত্রে এটা বিশেষভাবে প্রযোজ্য। অবশ্য কখনো কখনো এর ব্যতিক্রমও পরিলক্ষিত হয়। তবে তা একান্তই দুর্লভ। ক্লাসিক অর্থাৎ ধ্র“পদ কবিদের প্রকাশ-বেদনার মধ্যে ব্যক্তি-অনুভূতির সাথে সামষ্ঠিক বা জাতিগত অনুভব-অনুভূতির প্রকাশ অনেকটা অনিবার্য।
কবিতার বিষয় সীমাহীন। ব্যক্তিগত, সামাজিক, ধর্মীয়, জাতিগত, অতীত-বর্তমান-ভবিষ্যৎ, দেশীয়-আন্তর্জাতিক, রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক ইত্যাদি যেকোন বিষয়ই কবিতার উপজীব্য হতে পারে। অবশ্য তা শিল্পের বিচারে যথার্থ কবিতা হতে হবে এবং মনে রাখতে হবে যে, কবিতায় বিষয়ের চেয়ে ভাবের গুরুত্ব অধিক। কবিতার মত প্রবন্ধের বিষয়বস্তুও বিচিত্র। তবে দু’টির মধ্যে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য রয়েছে। প্রবন্ধের বিষয়বস্তু মানুষের মন-বিচার-বুদ্ধি ও বিবেককে নাড়া দেয়, অন্যদিকে কবিতা মানুষের হৃদয় ও চিত্তবৃত্তিকে আলোড়িত-উদ্বোধিত করে।
শব্দকে কবিতার শরীর বলা হয়। সুনির্বাচিত শব্দের সুপ্রযুক্ত বিন্যাসেই সার্থক কবিতার সৃষ্টি। এখানে কবির যেমন স্বাধীনতা আছে, আবার তেমনি যথার্থ মুন্সিয়ানার পরিচয় বিধৃত হবার পর্যাপ্ত অবকাশও রয়েছে এখানে। প্রত্যেক ভাষারই একটি নিজস্ব শব্দ-ভান্ডার রয়েছে। যে ভাষা শব্দ-সম্পদের দিক দিয়ে যত সমৃদ্ধ সে ভাষা তত উন্নত। সৌভাগ্যক্রমে বাংলা ভাষা শব্দ-সম্পদে অতিশয় সমৃদ্ধ। তাই পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ ভাষাসমূহের মধ্যে বাংলা অন্যতম।
উৎপত্তিগত দিক থেকে বাংলা ভাষার শব্দসমূহকে সাধারণত চার ভাগে ভাগ করা হয়- তদ্ভব, তৎসম, দেশী ও বিদেশী। ‘তৎ’ শব্দের দ্বারা এখানে স্বতঃসিদ্ধভাবে সংস্কৃত শব্দকে বোঝানো হয়েছে। এজন্য সংস্কৃত পণ্ডিতেরা বাংলাকে ‘সংস্কৃতের দুহিতা’ বলেও আখ্যায়িত করে থাকেন। কিন্তু বর্তমানে অধিকাংশ গবেষক এ ব্যাপারে দ্বিমত পোষণ করেন। সংস্কৃত ভাষায় ‘রামায়ণ’ ও ‘মহাভারত’ নামে দু’টি প্রাচীন বিশ্ববিখ্যাত মহাকাব্য রচিত হয়। সংস্কৃত ভাষার আদি পীঠস্থান উত্তর ও মধ্যভারত অঞ্চল। সংস্কৃত এক সময় ‘দেব ভাষা’ নামে পরিচিত ছিল এবং একটি বিশেষ শ্রেণী অর্থাৎ আর্য ব্রাহ্মণ বা উচ্চবর্ণীয় হিন্দু শ্রেণীর ভাষা হিসাবে গণ্য হতো। এটা কখনো সাধারণ শ্রেণীর মানুষের ভাষা ছিল না এবং কখনো পূর্বভারতীয় অনার্য জনগোষ্ঠী বা বাংলাদেশের ভাষা ছিল না।
অবশ্য সেন আমলে গৌড়ের রাজ-দরবারের ভাষা ছিল সংস্কৃত। দাক্ষিণাত্যের কর্নাটক থেকে আগত ব্রাহ্মণ সেন রাজাদের পারিবারিক ভাষাও ছিল সংস্কৃত। তখন রাজ-দরবারের ভাষা ছিল সংস্কৃত। রাজ-পরিবারের সদস্যগণ ছিলেন উচ্চবর্ণের ব্রাহ্মণ। তারা কর্নাটক থেকে পাঁচশত ব্রাহ্মণ পুরহিতদের নিয়ে এসেছিলেন বাংলাদেশে যথাযথভাবে আর্য হিন্দুদের ধর্মীয় বিধান পরিচালনার জন্য। রাজ-পরিবার ও পুরহিত সম্প্রদায়ের ভাষা ও তাদের ধর্মীয় কর্মকাণ্ড ও সাহিত্য চর্চার মাধ্যম ছিল সংস্কৃত। দেশী ভাষা বাংলার চর্চার প্রতি তখন নিষেধাজ্ঞা ছিল। তাই সংস্কৃতের সাথে বাংলার সংশ্লিষ্টতা নিতান্ত কষ্ট-কল্পনা ছাড়া আর কিছুই নয়।
পরবর্তীতে বিশেষত ইংরাজ আমলে ফোর্ট উইলিয়ম কলেজের (১৮০০ সনে স্থাপতি) সংস্কৃত পণ্ডিতগণ বাংলাকে সংস্কৃতের দুহিতা বলে চালাবার অপপ্রয়াসে লিপ্ত হন। এটা একদিকে যেমন আধিপত্যবাদী প্রতিক্রিয়াশীল মানসিকতার প্রকাশ অন্যদিকে, তেমনি তৎকালীন আরবি-ফারসি শব্দ-সংবলিত তথাকথিত ‘মুসলমানী’ বা ‘ফারসি বাংলা’ থেকে বাংলা ভাষাকে সম্পর্কহীন করে অপ্রচলিত ও দুর্বোধ্য সংস্কৃত শব্দাবলীতে ভারাক্রান্ত করে বাংলা ভাষার ‘সাধু সংস্করণ’ প্রচলনের দুরভিসন্ধি থেকে সঞ্জাত। তাই সংস্কৃত পণ্ডিত ও আলংকারিকদের প্রদত্ত সংজ্ঞা ও প্রণীত ব্যাকরণের নিয়ম ও রীতি-পদ্ধতি এখন সঙ্গতভাবেই অচল হয়ে পড়েছে। সে হিসাবে প্রকৃত ইতিহাসের চর্চা ও বাস্তবসম্মত বাংলা ব্যাকরণ ও অভিধান রচনার প্রয়োজন বর্তমানে অপরিহার্য হয়ে পড়েছে।
কোন ভাষায়ই প্রতিদিন নতুন নতুন শব্দ সৃষ্টি হয় না। ক্ষেত্র বিশেষে কালেভদ্রে দু’একটি নতুন শব্দের সৃষ্টি হয়। ব্যতিক্রমী প্রতিভার অধিকারী সৃজনশীল কোন কোন ব্যক্তি সজ্ঞানে দু’একটি নতুন শব্দ সৃষ্টি করেন। কিন্তু তা স্বীকৃতি পায় বা অভিধানে স্থান লাভ করে তখন যখন সাধারণভাবে তা ব্যাপকভাবে গৃহীত বা ব্যবহৃত হয়। তবে সচরাচর নতুন শব্দের সৃষ্টি না হলেও প্রচলিত শব্দের ব্যবহারে বৈচিত্র্য ও তার অর্থ ও ব্যঞ্জনায় অনেক সময় পরিবর্তন ঘটে। তাছাড়া, প্রতিদিনকার ব্যবহৃত, অর্থবহ, পরিচিত শব্দমালা প্রতিভাবান কবির হাতে তাঁর নিপুণ কারুহস্তের জাদুস্পর্শে প্রায়শই পরিবর্তিত অর্থ ও অভিব্যঞ্জনা লাভ করে।
কবিরা প্রয়োজন, নিজস্ব রুচি ও পছন্দ অনুযায়ী প্রচলিত-অপ্রচলিত, নতুন-পুরাতন, সাধু-চলতি ইত্যাদি সবধরনের শব্দই ব্যবহার করে থাকেন। শব্দ-নির্বাচন ও ব্যবহারে প্রত্যেকের নিজস্বতার ছাপ থাকে। প্রকৃতপক্ষে, শব্দ-ব্যবহারে যে কবি অধিক স্বাতন্ত্র্য ও নিজস্বতার পরিচয় দিতে সক্ষম সে কবিকে ততটাই মৌলিকত্বের অধিকারী বলে মনে করা হয়। তাই যথার্থ কবিরা শব্দ নির্বাচনে যেমন সচেতন হন, শব্দ-ব্যবহারেও তেমনি নৈপুণ্য প্রদর্শনে সচেষ্ট হন।
ইতিহাসের বিবর্তনে ভাষা রূপ বদলায়। ভাষার রূপ পরিবর্তিত হয় নতুন শব্দ গ্রহণ, পুরাতন শব্দ বর্জন অথবা অন্য ভাষার সংস্পর্শে সে ভাষার শব্দ স্বীকরণের মাধ্যমে। শব্দের সমষ্টিই ভাষা। তাই ভাষার পরিবর্তন মূলত শব্দেরই পরিবর্তন। বাংলা ভাষার আদি নিদর্শন চর্যাপদের ভাষার সাথে বর্তমান বাংলা ভাষার বিস্তর পার্থক্য। চর্যাপদের ভাষা বাংলা ভাষার সৃজ্যমান কালের ভাষা এবং সে ভাষা মূলত দেশী শব্দের সমন্বয়ে সৃষ্ট। পরবর্তীকালে বাংলা ভাষায় প্রচলিত দেশী শব্দের সাথে আরবি, ফারসি, তুর্কি, সংস্কৃত, ইংরাজি, ফরাসি, ওলন্দাজ ইত্যাদি বিভিন্ন ভাষার অসংখ্য শব্দের সংমিশ্রণ ঘটেছে। এ সবগুলোই বিদেশী বা ভিন্ন ভাষার শব্দ। কিন্তু সেসব শব্দ বাংলা ভাষার সাথে এমনভাবে মিশে গেছে এবং সাধারণভাবে তা এত ব্যাপকভাবে প্রচলিত ও ব্যবহৃত যে এখন আর সেগুলোকে বিদেশী বা ভিন্ন ভাষার শব্দ বলে বরখাস্ত করার উপায় নেই। এসব শব্দে বাংলা ভাষা সমৃদ্ধ হয়েছে। ‘বিদেশী’ বা ভিন্ন ভাষার শব্দ বলে এগুলোকে বিতাড়িত করলে বাংলা ভাষার অস্তিত্বই বিপন্ন হবে। কালের যাত্রা-পথে বিভিন্নভাবে বিভিন্ন প্রয়োজনে ও প্রেক্ষাপটে সেসব শব্দ বাংলা ভাষায় অবিমিশ্র হয়ে পড়েছে। সেগুলো এখন বাংলা ভাষারই অপরিহার্য সম্পদ হিসাবে গণ্য। তবে জোর-জবরদস্তি করে কোন ভিন্ন ভাষার শব্দকে ব্যবহার ও প্রচলন করা যায় না। জনগণের গ্রহণযোগ্যতাই এক্ষেত্রে শেষ কথা। ইতঃপূর্বে দেখা গেছে ভাবাবেগ প্রসূত হয়ে ফোর্ট উইলিয়ম কলেজের ব্রাহ্মণ পণ্ডিত এবং কোন কোন মুসলিম যথাক্রমে দুর্বোধ্য ও কঠিন সব সংস্কৃত ও আরবি শব্দ বাংলা ভাষায় প্রচলনের চেষ্টা করলেও শেষ পর্যন্ত তা সর্বজনগ্রাহ্য হয়নি। ভাষার চলমান ধারার সাথে তা স্বভাবতই খাপ খেয়ে চলতে পারেনি। এটাকে সর্বজন শ্রদ্ধেয় পণ্ডিত ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ বলেছেন ভাষার গণতন্ত্রায়ন। পানির গতি যেমন নিম্নমুখী, ভাষার গ্রহণ-বর্জনও তেমনি গণমানুষের গ্রাহ্যতার উপর নির্ভরশীল। আর একথা সর্ববাদীসম্মত যে, সহজ-সরল ভাষা বা শব্দই গণমানুষের নিকট গ্রাহ্য। কবিরা সাধারণত ব্যক্তি-মনের অভিব্যক্তি ঘটাতে গিয়ে সাধারণের মনের কথাই প্রকাশ করে থাকেন। এক্ষেত্রে যে কবি যত বেশি সাধারণের কথা নিজের মত করে প্রকাশ করতে সমর্থ সে কবি তত বেশি জনপ্রিয়।
যথার্থ কবিরা মানব জীবনের সার্থকতা-ব্যর্থতা, দুঃখ-ব্যথা, প্রেম-বিরহ ইত্যাদি মানবিক অনুভূতি ও সংবেদনাকে সহজ-সরল ভাষায় শৈল্পিক আদলে অসাধারণ করে তুলে ধরার প্রয়াস পান। তাই এটা স্বতঃসিদ্ধ যে, অধিকাংশ কবিই কবিতায় সহজ-সরল ও বোধ্যগম্য শব্দ নির্বাচনে সচেষ্ট হন। তবে এখানেও ব্যতিক্রম রয়েছে। অনেক কবিই কবিতায় কঠিন, দুর্জ্ঞেয় ও অপ্রচলিত শব্দ ব্যবহার করে থাকেন। এটা তাঁরা সজ্ঞানে ও সযত্নেই করে থাকেন এবং অনেকেই বিশেষত অসাধারণ প্রতিভাধর কবিরা এতে সফল হন। দৃষ্টান্তস্বরূপ মাইকেল মধুসূদন দত্ত, কাজী নজরুল ইসলাম, সুধীন্দ্রনাথ দত্ত, ফররুখ আহমদের নাম উল্লেখ করা যায়। তাঁরা একাধারে কঠিন, দুর্বোধ্য ও অপ্রচলিত এমনকি ভিন্ন ভাষা অর্থাৎ সংস্কৃত, আরবি, ফারসি, উর্দু ইত্যাদি ভাষার অসংখ্য শব্দ অবলীলায় তাঁদের কাব্য-কবিতায় ব্যবহার করেছেন এবং প্রত্যেকেই ঈর্ষণীয় ও অনন্য সাফল্য অর্জন করেছেন। বলাবাহুল্য, উপরোক্তদের পদাঙ্ক অনুসরণ করে অনেকেই ব্যর্থ হয়েছেন বা উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জনে সক্ষম হন নি। তাই বলা যায়, সরল-সহজ অথবা কঠিন-জটিল-অপ্রচলিত বা ভিন্ন ভাষার শব্দ ব্যবহার একমাত্র ও প্রধান বিচার্য্য বিষয় নয়, শব্দ ব্যবহারে নৈপুণ্য, সুসঙ্গতি ও কাব্যিক ব্যঞ্জনা সৃষ্টির ক্ষমতাই বড় কথা।
কবিতায় শব্দের ব্যবহার ও গুরুত্ব যেমন অপরিহার্য ও অবশ্যম্ভাবী তেমনি ছন্দ, শব্দালংকার, সমাসোক্তি, উপমা-প্রতীক-রূপক-রূপকল্প ইত্যাদির ব্যবহারও পরিলক্ষিত হয়। মজার কথা হলো এই যে, শব্দকে ভেঙ্গে-চূরে, তার কারুময় কুশলী বিন্যাসেই এসবের সৃষ্টি। এক্ষেত্রে প্রত্যেক কবিই তাঁর স্বকীয় দৃষ্টিভঙ্গী, রুচি ও দক্ষতার পরিচয় দিয়ে থাকেন। এ দক্ষতা প্রদর্শনের উপরই কবির স্বীকৃতি ও কবি-কর্মের সাফল্য নির্ভরশীল। এ দক্ষতা প্রদর্শনের উপরই কবির স্বাতন্ত্র্য ও বৈশিষ্ট্যও নিরূপিত হয়। একজন আরেকজন থেকে আলাদা, একজনের উপর অন্যজনের শ্রেষ্ঠত্ব বিচার করা হয় এ স্বাতন্ত্র্য ও বৈশিষ্ট্যের মানদন্ডেই। তাই শব্দ-চয়নে ও শব্দের সুপ্রযুক্ত ব্যবহারে যেমন, তেমনি ছন্দ, শব্দালংকার, সমাসোক্তি, উপমা-প্রতীক-রূপক-রূপকল্পের কুশলী ব্যবহারে প্রত্যেক কবির সযত্ন প্রয়াস ও স্বাতন্ত্র্য সৃষ্টির প্রয়াস পরিলক্ষিত হয়। এজন্য যথার্থ কবিরা ছন্দ নিয়ে নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেন, পুরাতন ছন্দের অভিনব ব্যবহার, কখনো কখনো নতুন ছন্দের উদ্ভাবন করেন। আধুনিক অনেক কবি কবিতায় ছন্দ ব্যবহারে উদাসীন বলে অনেকের অভিযোগ। কথাটা হয়ত এভাবে বলা সঙ্গত যে, অনেক কবিতায় প্রচলিত বা নির্দিষ্ট কোন ছন্দের উপস্থিতি লক্ষ্যযোগ্য নয়। এ প্রসঙ্গে গুরুত্বসহকারে বলা যায় যে, কবিতায় ছন্দের উপস্থিতি অপরিহার্য। তবে তা সর্বদা প্রচলিত বা সুনির্দিষ্ট ছন্দ-রীতি মেনে নাও চলতে পারে। কবিতায় ছন্দের অনুপস্থিতি কবিতার মাধুর্য ও গ্রহণযোগ্যতাকেই ম্লান করে দেয়।
কবিতায় শব্দালংকার ও সমাসোক্তির ব্যবহার অপরিহার্য নয়, তবে তা রূপসী রমণীর সাধারণ গাত্রাবরণের উপর চাকচিক্যময় অলংকারের মতোই উজ্জ্বল ও চিত্তাকর্ষক। অবশ্য মনে রাখতে হবে যে, অনাবশ্যক ও বাহুল্য অলংকার ব্যবহারে নারীর স্বাভাবিক রূপ-সৌন্দর্য শুধু ঢাকাই পড়ে না, অনেক সময় তা উৎকট বা বিষদৃশ্যও দেখায়। অনুরূপভাবে কবিতায় স্বাভাবিক ও স্বতঃস্ফূর্ত শব্দালংকার ও সমাসোক্তির ব্যবহারই অভিপ্রেত। তবে পুনরুল্লেখ করা প্রয়োজন যে, শব্দালংকার ও সমাসোক্তি ছাড়াও দক্ষ কবির হাতে সফল কবিতা রচনা সম্ভব। অক্ষম কবিরা অনেক সময় এসবের অনাবশ্যক ও মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহারে কবিতার সাধারণ সৌন্দর্য ও আকর্ষণ বিনষ্ট করে ফেলেন। এটাকে একধরনের ঙনংবংংরড়হ বলা যায়, যে সম্পর্কে সচেতন থাকা আবশ্যক।
কবিতায় প্রতীক-উপমা-রূপক-রূপকল্প ব্যবহারও অপরিহার্য নয়। এগুলোর ব্যবহার ছাড়াই উৎকৃষ্ট কবিতা রচনা সম্ভব তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হলো রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নোবেল পুরস্কার-বিজয়ী অমর কাব্য ‘গীতাঞ্জলী’। তাসত্ত্বেও আদিকাল থেকে পৃথিবীর তাবৎ সাহিত্যে এগুলোর ব্যবহার চলে আসছে। বাংলা সাহিত্যের আদি নিদর্শন চর্যাপদেও এর ব্যবহার পরিদৃষ্ট হয়। মধ্যযুগে এবং আধুনিক যুগেও এর ব্যবহার পরিলক্ষিত হয়। আধুনিক যুগে বরং এর ব্যবহার অনেক তাৎপর্যময় হয়ে উঠেছে। মধুসূদন ব্যাপকভাবে এর ব্যবহার করেছেন। দু’একটি ব্যতিক্রম ছায়া রবীন্দ্রনাথও তাঁর অন্যসব কাব্যে এর অজস্র ব্যবহার করেছেন। আধুনিক যুগের প্রায় সব কবিই এর ব্যবহারে অধিকতর যত্নবান ও অভিনবত্ব প্রদর্শনে সচেষ্ট। তিরিশোত্তর যুগের কবিরা বিশেষত জীবনানন্দ দাশ প্রতীক-উপমা-রূপক-রূপকল্পের ব্যবহারে সর্বাধিক কৃতিত্ব প্রদর্শন করেন। আধুনিক ইংরাজ কবিদের আদর্শে তাঁরা এক্ষেত্রে ভিন্ন ও অভিনব মাত্রা সংযোজন করেন। তিরিশের ভিন্নধারার কবি জসীমউদ্দীন ও চল্লিশ দশকের কবি ফররুখ আহমদও উপমা-প্রতীক-রূপক-রূপকল্পের ব্যবহারে অভিনবত্ব ও স্বকীয় বৈশিষ্ট্যের ছাপ রেখেছেন। পঞ্চাশ দশকের কবি আল মাহমুদও এক্ষেত্রে এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। ষাটের দশকে ইউরোপে বিশেষত ফ্রান্সে কবিতা ও শিল্পকর্মের অন্যান্য ক্ষেত্রে পরাবাস্তবতার উদ্ভব ঘটে। বাংলা কবিতায়ও তার প্রভাব পড়ে। এক্ষেত্রে এ সময়কার উল্লেখযোগ্য কবি আবদুল মান্নান সৈয়দ বিশেষভাবে সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।
প্রতীক-উপমা-রূপক-রূপকল্প কবিতার ভাষাকে শানিত করে, ভাব ও বিষয়কে সুস্পষ্ট করে ও অতিরিক্ত ব্যঞ্জনা সৃষ্টির মাধ্যমে পাঠকের মনে প্রগাঢ় অনুরণন সৃষ্টি করে। তাই আধুনিক কবিতায় এসবের ব্যবহার বিশেষ তাৎপর্যে উদ্ভাসিত। যে কবি এসবের ব্যবহারে যত বেশি অভিনবত্ব ও পারদর্শিতা প্রদর্শন করেন, সে কবি ততবেশি উজ্জ্বলভাবে পাঠকের দৃষ্টিতে ধরা দেন। এটা কবি হিসাবে তার বৈশিষ্ট্য ও সাফল্যেরও মাপকাঠি রূপে গণ্য হয়ে থাকে।
প্রতীক-উপমা-রূপক-রূপকল্প নানা ধরনের হতে পারে। এরমধ্যে নিসর্গ বা প্রকৃতিসঞ্জাত, ইতিহাস-ঐতিহ্য সম্পৃক্ত এবং বুদ্ধিজাতই প্রধান। কোন কবি হয়ত নিসর্গ বা প্রকৃতিসঞ্জাত, কোন কবি হয়ত ইতিহাস-ঐতিহ্যাশ্রয়ী, আবার কোন কবি হয়ত বুদ্ধিজাত উপমা-রূপক-রূপকল্প ব্যবহারে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। আবার কোন কবি হয়ত একসঙ্গে একাধিক ধরনের উপমা-রূপক-রূপকল্প ব্যবহারে পারঙ্গমতা প্রদর্শন করেন। তবে যে কবি যেভাবেই এর ব্যবহার করুন না কেন, এসবের ব্যবহারে যিনি যত বেশি অভিনবত্ব ও স্বকীয়তার স্বাক্ষর রাখতে সক্ষম হন, সে কবি তত বেশি কৃতিত্বের অধিকারী।
উপরে আলোচিত কবিতার বিভিন্ন উপাদান বা অনুষঙ্গের সুসঞ্জস ও সসংগত ব্যবহারে যথার্থ কবিতার সৃষ্টি। অবশ্য এ কথা ঠিক যে, বাধাধরা কোন নিয়ম মেনে কবিতা রচনা হয় না। কবিতা মূলত কবির স্বাধীন ও স্বতঃস্ফূর্ত মনের অভিব্যক্তি। সর্বোপরি, কবির মনের উদ্দীপ্ত ভাব ও কল্পনার প্রকাশই কবিতা। স্বপ্ন ও বাস্তবতার অনুভূতিগ্রাহ্য, হৃদয়-সংবেদী শিল্পিত বর্ণ-বিন্যাসই কবিতা। পাঠকের মনকে আবিষ্ট করা, স্বপ্ন-কল্পনার অতীন্দ্রিয় জগতের সিংহদ্বারে পৌঁছে দেয়াই কবির লক্ষ্য। সে লক্ষ্য পূরণে কবি কতটা সফল সেটাই আসল বিচার্য বিষয়।