‘ধ্যানবিন্দু’ জানুয়ারি, ২০১৫ সংখ্যায় প্রকাশিত একটি কবিতার নাম ‘সমসাময়িক কাব্যভাষা বিষয়ক’। কবিতাটি এইরকম:

অনেক বছর ধরে বাংলা কবিতায়
নাগরিক নগ্নতার ভাষা খোঁজা হল।
অনেক বছর ধরে বাংলা মানে অবান্তর, জোলো।

উবে গেল খেতখামার, অরণ্য, প্রান্তর;
নদীর আঁচড় কাটতে ভুলে গেল তুলি।
দলবদ্ধ ভ্রমণের কেচ্ছায় তারপর
স্থান পেল অরণ্যের দিনরাত্রিগুলি।

উবে গেল বাংলাদেশ বাংলাভাষা থেকে;
আকাশের সাথে ছিঁড়ল বাতাসের যোগ।
কলকাতা-ঢাকায় কবি মরল হেঁকে হেঁকে;
উইনডো-শপিঙেই তার ভেব্লে গেল চোখ।

নক্ষত্রের দিকে আর তাকানো হল না।
ও-ভাষায় লিখতে তাই আমাকে বোলো না।

এখানে কয়েকটি প্রশ্ন সামনে রাখা যাক। এই যে বাংলাভাষা থেকে বাংলাদেশের উবে যাওয়া, এর মানে কী? অভিযোগটা আমাদের অনেকেরই চেনা আর সমসাময়িক কাব্যভাষা বিষয়ে আমার মত অনেকেরই হয়তো এই একই অভিযোগ। কিন্তু ঠিক কী ভাবনা কাজ করছে এই অভিযোগের পেছনে? অনেক বছর ধরে নাগরিক নগ্নতার ভাষা খুঁজতে গিয়ে নদীর আঁচড় কাটতে ভুলে গেছে বাংলা কবিতা, এই যদি হয় অভিযোগ তাহলে প্রশ্ন ওঠে অক্ষম তুলি ফের নদীর আঁচড় কাটতে শুরু করলেই কি বাংলাভাষায় বাংলাদেশের পুনর্বাসন ঘটবে? তাছাড়া এই নদীর আঁচড় কাটতে ভুলে যাওয়া বলতে কী বোঝায়? বাংলাদেশকে বাংলা কবিতার ভাষায় ফিরিয়ে আনবার চেষ্টার সঙ্গে এই মেটাফরটির ঠিক কী সম্পর্ক?

মনে পড়ে আজ থেকে প্রায় এক দশকেরও বেশি সময় আগে অনেকটা এই ধরনেরই একটা প্রশ্ন করেছিলেন দিলীপ চিত্রে। “ভারতীয় কবিতায় মডার্নিজম এবং তারপর” বিষয়ে সাহিত্য আকাদেমি আয়োজিত একটি সেমিনারের শীর্ষ বক্তৃতা দিতে গিয়ে দিলীপ চিত্রে বলেন, “আগামীকাল খুব জরুরী একটা দিন মারাঠী কবিতার গুণগ্রাহীদের জন্য। এই গুণগ্রাহীরা কেউই পেশাদার সাহিত্যিক বা অ্যাকাডেমিক নন। এঁরা তারা যাদের কাছে আজ থেকে তিনশ পঞ্চাশ বছর আগে কবিতাকে বোধগম্য আর উপভোগ্য করে তুলেছিলেন ভক্তকবি তুকারাম…সেই আশ্চর্য সমাপতনের কথা ভেবে আমি চমকে উঠছি যার দরুন এখন আমি দিল্লীতে যদিও আমার মন পড়ে আছে দেহুতে। সেইখানে যেখানে তুকারামের কবিতায় এখনো মুগ্ধ হতে পারে এমন লোকেরা আমাদের কবিতার রাজ্যে হয়ে উঠেছে অপরিচিত বা হয়তো আমাদের মত কবিরাই তাদের কাছে হয় উঠেছি আগাপাশতলা অচেনা। ব্যাপারটা কী? আমাদের মাতৃভাষাগুলো থেকে কবিতা খোয়া গেছে নাকি কবিতাই হারিয়ে ফেলেছে তার মায়ের ভাষা?”
খেয়াল করবার মত বিষয় যে নদীর আঁচড় কাটতে ভুলে যাওয়ার মত কবিতার মাতৃভাষা হারিয়ে ফেলাটাও একটা ইঙ্গিতমাত্র, কেননা ঠিক কী খোয়া গেছে সেটা স্পষ্ট করে বলা যাচ্ছে না। বাংলাভাষা থেকে বাংলাদেশ হারিয়ে গেছে বললে কতটুকুই বা বলা হয়? কিন্তু এইটুকু অন্তত বলা যাচ্ছে যে যা হারিয়েছে তা ভাষা থেকেই হারিয়েছে। ফলে তাকে যদি ফিরিয়ে আনতে হয়, যদি ফিরিয়ে আনা আদৌ সম্ভবপর হয় তাহলে তাকে ভাষার ভেতরে বা আরো সরাসরি বললে কবিতার ভাষার ভেতরেই ফিরিয়ে আনতে হবে। কীরকম হতে পারে সেই ফিরিয়ে আনার স্বরূপ? সৈয়দ শামসুল হকের একটি কবিতার দিকে তাকানো যাক:

জামার ভিতর থিকা যাদুমন্ত্রে বারায় ডাহুক,
চুলের ভিতর থিকা আকবর বাদশার মোহর,
মানুষ বেবাক চুপ, হাটবারে সকলে দেখুক
কেমন মোচড় দিয়া টাকা নিয়া যায় বাজিকর।
চক্ষের ভিতর থিকা সোহাগের পাখিরে উড়াও,
বুকের ভিতর থিকা পিরীতের পুন্নিমার চান,
নিজেই তাজ্জব তুমি একদিকে যাইবার চাও
অথচ আরেক দিক থেকে খুব জোরে দেয় কেউ টান।
সে তোমার পাওনার এতটুকু পরোয়া করে না,
খেলা যে দ্যাখায় তার নিজের ইচ্ছায় দ্যাখায়,
ডাহুক উড়াইয়া দিয়া তারপর আর ধরে না,
সোনার মোহর তার পড়ে থাকে পথের ধূলায়।
এ বড় দারুন বাজি, তারে কই দারুন বাজিকর
যে তার রুমাল নাড়ে পরানের গহীন ভিতর।।

সচেতনভাবেই একসময় “আঞ্চলিক ভাষায়” কবিতা লেখার তোড়জোড় শুরু করেছিলেন বাংলাদেশের কিছু কবি। শামসুল হকের “পরানের গহীন ভিতর”-এর আশেপাশের সময়েই বেরোয় রুদ্র মহম্মদ শহীদুল্লার “মানুষের মানচিত্র”। রবীন্দ্রনাথের সংক্রামক ভাষামুদ্রা থেকে দূরত্ব তৈরি করতে গিয়ে তিরিশের বাংলা কবিতায় আধুনিকতার যে ভাষা তৈরি হয়ে উঠল তার কাটান হিসেবে লোকজ ভাষাঅভ্যাসকে কবিতা লেখার কাজে ব্যবহার করতে চাইলেন রুদ্র। আর যেহেতু ঠোঁটকাটা হিসেবে পরিচিত ছিলেন তাই খোলাখুলিই বললেন, “দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তরকালে পশ্চিমে মূল্যবোধের যে অবক্ষয় এবং যা থেকে সৃষ্ট তথাকথিত আধুনিকতার ঠুলি আঁটা অন্ধ অনুকরন কোরে তিরিশের কবিরা রবীন্দ্রনাথকে অস্বীকারের চেষ্টা পেয়েছিলেন, তা এককথায় ‘হনুমানের লাফ’ ছাড়া কিছুই নয়।” মনে পড়তে পারে “পরিচয়” পত্রিকার প্রথম সংখ্যায় প্রকাশিত বিষ্ণু দে-র কবিতা সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথের বক্তব্য ছিল যে বিষ্ণু দে পুকুরের ধারে পাইন গাছ লাগাচ্ছেন। আর তার অনেক অনেক বছর পরে আধুনিক বাংলা কবিতার ভাষা নিয়ে বলতে গিয়ে প্রায় একই কথা বললেন রুদ্র। এমনকি আরো এগিয়ে গিয়ে এও বলতে কসুর করলেন না যে, “এরা কী লেখে?…কোন বাংলা ভাষায় এরা লেখে? যে বাংলা ভাষায় অধিকাংশ মানুষ কথা বলে, বোঝে সেই ভাষায়? নাকি ‘ফোর্ট উইলিয়ম কলেজ ষড়যন্ত্র”-এর শিকার যে বাংলা ভাষা, সেই ভাষায়? এরা প্রধানত দ্বিতীয় পক্ষের ভাষাতেই লেখে। এদেশে সাত শতাংশ লোক ইশকুল, কলেজ আর বিশ্ববিদ্যালয়ে যে ভাষা শেখে, যে অভিব্যক্তি শেখে, যে সুন্দর এবং অসুন্দরের, ন্যায় এবং অন্যায়ের ধারনা গ্রহন করে অর্থাৎ যে মূল্যবোধ অর্জন করে, এই লেখা প্রধানত সেই মূল্যবোধের।” “মানুষের মানচিত্র”-এ এই রপ্ত মূল্যবোধের হাত থেকেই বেরোতে চেষ্টা করলেন রুদ্র। কিন্তু বেরিয়ে কোথায় গেলেন? “মানুষের মানচিত্র”-এর দুটো স্তবকের দিকে নজর দেওয়া যাক:

অল্প বয়সে আমায় দিওয়ানা বানালি বন্ধু, বানালি পাথর।
আগুন উস্কে দিয়ে পরবাসি হলি তুই, থুয়ে গেলি একা,
আকাশের ভরা চাঁদ মাস গেলে ফিরে আসে, মেলে তারও দ্যাখা
বছর গড়ায়ে যায়, আমার বন্ধুর সই মেলে না খবর।

গলায় তাবিজ বাঁধি, কে জানে কোথায় কারে মনবান্ধা দিছে,
আরো কেউ আছে বুঝি, পরান জুড়োয় তার জুড়োয় শরীর।
রঙিলা সুখের নাও লিলুয়া বাতাস পেয়ে ছেড়ে গেল তীর,
ডানা-ভাঙা পাখিটিরে দেখলো না, একবারও তাকালো না পিছে।

বাংলা আধুনিক কবিতার চলতি যে গড়ন তার থেকে কোথায় আলাদা এই উচ্চারণ? সে কি মাঝেমধ্যে দুই একটি যাকে বলে “আঞ্চলিক শব্দ”-এর, দুই একটি মৌখিক ক্রিয়াপদের ব্যবহারে? জনপ্রিয় বানিজ্যিক সিনেমাতেও গর্ধব প্রেমিক দুবাইয়ের রাস্তায় দাঁড়িয়ে চেঁচিয়ে ওঠে “পরান যায় জ্বলিয়া রে” বলে – তার থেকে এই ব্যবহার কোথায় আলাদা? অধিকাংশ মানুষ যে ভাষায় কথা বলে, যে ভাষা বোঝে বলে রুদ্রের দাবী – এই কবিতাটি কী সেই ভাষাতেই লেখা? কেন তাহলে “পরানের গহীন ভিতর”-এর কবিতাগুলিতে মৌখিক ক্রিয়াপদের যে অঢেল ব্যবহার তার সমালোচনায় রুদ্রকে বলতে হয়, “অবিকল আঞ্চলিক ভাষায় কবিতা লিখতে শুরু করলে এক ব্যাপক সাহিত্যিক অরাজকতার সৃষ্টি হবে…দু’একটি আঞ্চলিক ক্রিয়াপদ ব্যবহার এক কথা তবে অবিকল যাবতীয় আঞ্চলিক ক্রিয়াপদ ব্যবহার নিঃসন্দেহ মারাত্মক…”?
একটা কথা তার মানে স্বীকার করে নিয়েই এগোতে হচ্ছে যে রোজকার মুখের ভাষার থেকে কবিতার ভাষা আলাদা। আলাদা হতে বাধ্য। আর “আঞ্চলিক বাংলা” বলেও কোনো একটা ভাষা নেই। বাঁকুড়ার বাংলা ভাষার সঙ্গে জলপাইগুড়ির বাংলা ভাষার, কিংবা ময়মনসিংহের সঙ্গে ফরিদপুরের বাংলা ভাষার যে আকাশপাতাল তফাৎ – তা স্রেফ কান পাতলেই বোঝা যায়। এমনকি কলকাতা কিংবা ঢাকাতেও যে একটাই বাংলা বলা হয় না সেটাও আশা করি অনেকেই মানবেন। তবে যদি বলি “সকাল হতেই রক্তে আমার পিঁপড়ে বাসা বাঁধে/শিরদাঁড়াতে হাকড়ে পড়ে লোভ/রাত্রে ভাল থাকি/সকাল হতেই বেবুঝ হাওয়া শেকড়ে দেয় টান/তবু বৃষ্টিতে বিক্ষোভ, কন্ঠনালী ছিন্ন করে ডাকি” – তাহলে এই কবিতা যে কলকাতার কোনো কবির লেখা নয়, আলিপুরদুয়ারের এক অখ্যাতনামা কবির লেখা তা বলে না দিলে কেউ টের পাবে না। তাহলে প্রশ্ন, রোজকার এই ব্যবহারিক ভাষামানচিত্রের মধ্যে কবিতার জায়গা ঠিক কোথায়? কবিতার ভাষার সঙ্গে এই বিচিত্র ভাষাঅভ্যাসের, ভাষাঅভিজ্ঞতার সম্পর্কই বা কোন্খানে? আরেকটু ঘুরিয়ে প্রশ্ন করলে বলা যায়, এতগুলো ভাষার মধ্যে কোন্ ভাষাটা কবিতার মাতৃভাষা, যা হারিয়ে গেছে বলে দিলীপ চিত্রের আক্ষেপ? কোন্ ভাষাঅভ্যাসের শরিক হলে বাংলা কবিতায় বাংলাদেশের পুনর্বাসন সম্ভব?

ঠেক, জানুয়ারি, ২০১০ সংখ্যায় মৃদুল দাশগুপ্তর স্বীকারোক্তি, “…যদি নিজের কথা বলতে হয়, তবে বলতে হয় ভাষা নিয়ে নতুন কিছু আমি অন্তত করিনি। বাংলার যে সর্বজনস্বীকৃত ধরণ, তা কিন্তু ইংরেজি শিক্ষায় শিক্ষিত এলিটদের তৈরি করা ভাষা। বাংলা কবিতার ভাষায় তার দেশজ অনুষঙ্গ আসা তাই মুশকিল। এই সময়ে দাঁড়িয়ে মাহাতোরাও কবিতা লিখছেন, তাঁদের কবিতায় দেশজ উপকরণও আনছেন। কিন্তু তাঁদের বাংলাও ওই এলিট বাংলাই। এই প্রাতিষ্ঠানিকতা আমার রক্তে আছে, আমার শ্রেণীপরিচয়ে আছে।” শ্রেণীপরিচয়ের এই সীমাবদ্ধতা মাথায় রেখেও বা বলা ভাল মাথায় রেখেই যদি “মানুষের মানচিত্র”, “পরানের গহীন ভিতর” কিংবা ফারহাদ মাজহারের “এবাদতনামা”-র কবিতাগুলো পড়ি তাহলে আলাদা কিছু কানে বাজে কি? “এবাদতনামা”-র একটি কবিতা দেখা যাক:

সব ইমামের পিছে সততই হয়েছে আদায়
তোমার নামাজ। বেঁধে এহতেরাম আকিদা মাফিক
ফাতেহা মুখস্থ পাঠ, নিয়ত সবাই পয়বন্দ
সহিসালামতে আছে মনুষ্যের নামাজি তৌফিক।

তবুও মা’বুদ দেখো কেউ কিন্তু কিছু বোঝে নাই
কে কার হিশাব নেবে? মসজিদে বিশুষ্ক খিলানে
তোমার আয়াতগুলো ভিনদেশি স্বরে প্রতিধ্বনি
তুলে স্রেফ ঝরে যায়-বালি জমে শূন্য আসমানে।

একি শুধু ভাষা প্রভু? একি শুধু জবানের দোষ?
যে ভাষা সবার নয় সে ভাষায় কেন তুমি নিজে
প্রকাশিত হয়েছিলে? তুমি প্রভু আসলে ভাষায়
কখনো কি ছিলে? ছিলে নিঃশব্দ কামে ও এশেকে
বোধে আর অনুভবে- রূহের ভেতরে পিপাসায়।

সে পিপাসা আজ কই? শুধু আছে ভান ও ভণিতা
শোকরগুজার কর সহিসালামতে থাক সবার ভণ্ডামি।

এই কবিতাটিতে কিংবা এর আগে যে দুটি কবিতা পড়েছি সেখানে এমন কিছু শব্দের ব্যবহার হচ্ছে সচরাচর “আধুনিক” বাংলা কবিতার ভাষায় যাদেরকে দেখতে আমরা খুব একটা অভ্যস্ত না। কিন্তু তাই বলে এদেরকে “আঞ্চলিক কবিতা” কিংবা “লোকসাহিত্য” বলে নিশ্চয়ই কেউ দাবী করবেন না। এই প্রত্যেকটি কবিতাই শিক্ষিত মধ্যবিত্তেরই লেখা এবং এদের পাঠকও শিক্ষিত মধ্যবিত্তই। তাহলে এই কবিতাগুলিতে আলাদা কী ঘটছে? এই কবিতাগুলিকে পড়বার অভিজ্ঞতা আর চারটে এলিয়েনেশন-সর্বস্ব বাংলা কবিতা পড়বার চাইতে কী করে আলাদা?

এই প্রশ্নের উত্তর হয়তো ওই শব্দগুলোর মধ্যেই আছে যার আশেপাশে অভিজ্ঞতা আর অনুভূতির একটা বিশেষ এলাকা তৈরি হয়ে উঠছে কবিতাগুলোর ভেতর। সেই এলাকাটাকে ধরে দাঁড়িয়ে আছে কবিতাগুলোর বিশিষ্ট, আলাদা করে কানে লাগা ধ্বনিকাঠামো। এই বিশিষ্টতার একটা কারণ এই হতে পারে যে কবিতাগুলোয়, অন্তত প্রথম দুটি কবিতায়, যে “আমি”-র উচ্চারণ শোনা যাচ্ছে তাকে খুব স্পষ্টভাবেই নাগরিক অভিজ্ঞতার বাইরের মানুষ বলে চেনা যায়। রুদ্র তো বলেকয়েই এমন সব মানুষদের মুখে কথা বসাচ্ছেন যারা তাঁর ভাষায় “গ্রামবাংলার নিপীড়িত মানুষদের প্রতীক”। ফলত তাদের উচ্চারণ ও স্বরগ্রাম এবং যে অভিজ্ঞতা থেকে উঠে আসছে কথা বলবার এই বিশেষ ধরতাই তা অধিকাংশ বাংলা কবিতার এলিয়েনেশনে ভোগা নাগরিক কবিনায়ক বা নায়িকার উচ্চারণ ও অভিজ্ঞতার চাইতে আলাদা। কিন্তু যদি ততটুকুই হত তাহলে সেটাকে মধ্যবিত্ত কবির আদাজল খেয়ে তেলেনাপোতা আবিষ্কার করতে যাওয়ার মরিয়া চেষ্টা বলে খারিজ করে দেওয়া যেত। কেননা যাদের মুখে তিনি কথা বসাচ্ছেন তাঁরা তো তাঁর শ্রেণীপরিচয়ের বাইরের মানুষ, তাঁদের হয়ে কথা বলে দেবার রেয়াজটাও তো রুদ্র যাদেরকে “ফোর্ট উইলিয়ম কলেজ ষড়যন্ত্রে”-র শিকার বলছেন তাদেরই একটা বহুদিনের বদভ্যেস। কিন্তু যদি এইভাবে না পড়ি, যদি না ভাবি যে কোনো বাস্তব পরিস্থিতিতে কোনো বাস্তব চরিত্রের কথা বলবার কায়দাকে অনুকরণ করে তৈরি হচ্ছে কবিতাগুলো তাহলে হয়তো উচ্চারণের এই বিশিষ্টতাকে অন্যভাবে দেখা যেতে পারে।

মনে পড়ে শঙ্খ ঘোষ ঢের দিন আগেই বলেছিলেন যে ছন্দে সমর্পিত শব্দই কবিতা আর প্রতিদিনকার বাক্স্পন্দের সঙ্গে কবিতার ভাষার বিচিত্র দেয়ানেয়ার ইতিহাসই আধুনিক বাংলা কবিতার ইতিহাস। এই দেয়ানেয়া কথাটি তাৎপর্যবাহী। মুখের ভাষার ছন্দই কবিতার ছন্দ একথা বলছেন না শঙ্খ ঘোষ। কিন্তু এই দেয়ানেয়া কথাটির মধ্য দিয়ে এটাও পরিষ্কার যে মুখের ভাষার সঙ্গে সম্পর্কহীন হয়ে আর যাই হোক কবিতা লেখা সম্ভব না, অন্তত আধুনিক বাংলা কবিতা, যার উৎসই নিহিত আছে গেয় কবিতার ছন্দ থেকে পাঠ্য কবিতার ছন্দের আলাদা হয়ে যাবার মুহুর্তে। কবিতাটা আসলে কানে শোনারই জিনিস, এই কথা কবুল করে নিয়ে তাই শামসুল হক মন্তব্য করেন যে “কবিতার আসল বাস জিহ্বায় আর তার গন্তব্য আমাদেরই শ্রুতিতে”। আর এই কথাটা কবুল করে নেবার একটা অর্থ এও যে মুখের ভাষার থেকে কবিতার ভাষা আলাদা হলেও দুয়ের মধ্যে দূরত্ব যখন অনেকখানি বেড়ে যায় তখন দরকার পড়ে কবিতার ভাষাকে মুখের ভাষার উচ্চারণের কাছে ফিরিয়ে আনবার। হয়তো বোঝা দরকার যে শঙ্খ ঘোষ এখানে একটা প্রক্রিয়ার কথা বলছেন, একটা রাজনীতির কথা বলছেন যার মধ্যে কবি এবং পাঠক দুজনেই সমান অংশীদার। কবি এবং পাঠক দুজনকে মিলিয়ে এই যে রাজনীতি তার এক পক্ষে আছে তারা যারা বাক্স্পন্দ থেকে দূরত্বকেই কবিতা বলে ঠাওরায়, আরেক পক্ষে তারা যারা কবিতার ভাষার স্বাতন্ত্র্য স্বীকার করেও তার মধ্যে আত্মস্থ করে নিতে চায় বাচনের বিচিত্র কৌশল। আর এটা তো এখন বেশ পুরোনো কথাই হয়ে গেছে যে বাচনের সাথে জীবনযাপনের সম্পর্কটা শুধু ওতপ্রোত নয়, অনিবার্য। সেই ক্ষেত্রে প্রশ্ন ওঠে এই আত্মস্থ করে নেবার প্রক্রিয়াটা আদৌ কীরকম বিশেষ করে যদি মেনেই নেওয়া হয় যে বাক্স্পন্দের অবিকল পুনরাবৃত্তি মানেই কবিতা নয়? “পরানের গহীন ভিতর”-এর পরিকল্পনার কথা বলতে গিয়ে শামসুল হক মন্তব্য করেন যে আঞ্চলিক ভাষায় কথা বলবার যা ঝোঁক তার মধ্যে ছড়ার চাল স্পষ্ট কিন্তু “পরানের গহীন ভিতর”-এর কবিতাগুলি আঠারো মাত্রার পয়ারে লেখা। অর্থাৎ বাক্রীতিকে আত্মস্থ করে নিয়েও যে ধ্বনিকাঠামো এই কবিতাগুলোর মধ্যে তৈরি হয়েছে তা এই কবিতাগুলোরই ধ্বনিকাঠামো। কবিতার “আমি”, তা সে যেই হোক না কেন, কবিতার বাইরে সে যে চালে কথা বলে এই ধ্বনিকাঠামো তাকে ছুঁয়ে থেকেও তার থেকে আলাদা। তবে মনে রাখবার মত বিষয় এই যে কবিতায় ধ্বনিকাঠামোর প্রধান এবং একমাত্র উপকরণ হল শব্দ। কবিতার গন্তব্য অনির্বচনীয়তা হলেও সেখানে পৌঁছনোর জন্য কবিতার একমাত্র সম্বল হল বচন। আর প্রতিটি বচন, প্রতিটি অর্থসম্বলিত ধ্বনিই অভিজ্ঞতার একটা বিশেষ দায়রার ভেতর থেকে উঠে আসে। কবিতার রসনিষ্পত্তি নির্ভরই করে সেই অভিজ্ঞতার সাধারণীকরণের ওপর, বিশেষকে নির্বিশেষের দিকে ঠেলে দেওয়ার ক্ষমতার ওপর। কবিতার এই ক্ষমতাটিকেই আডোর্নো কবিতার ভাষার “collective undercurrent” বা সামূহিকতার চোরাস্রোত হিসেবে চিহ্নিত করেন। এই চোরাস্রোত আছে বলেই কবিতার “আমি”-র উচ্চারিত শব্দগুলি পাঠকের অভিজ্ঞতা আর অনুভূতির দায়রায় ঢুকে যায়, তাকে প্রসারিত করে। কেননা সব পাঠকই কবিতা পড়তে পড়তে কবিতার “আমি”-র সঙ্গে গলা মেলায়, তার উচ্চারিত শব্দগুলোকে নিজে উচ্চারণ করে। এই উচ্চারণেই তাৎপর্য পায় কবিতা। কবিতার “আমি”টি কে সেটা জানাটাই পাঠকের একমাত্র দায়িত্ব নয়। কবিতারও দায়িত্ব নয় সেটা জাহির করা। কিন্তু এই “আমি”-র যা উচ্চারণ, যা বাচন অর্থাৎ ভাষার মধ্য দিয়ে জীবনকে দেখার যে কৌশল তা যদি পাঠককে নাড়া দেয় তাহলে সেও সামিল হয়ে পড়ে দেখার সেই কৌশলে, জীবনের সেই অভিজ্ঞতায়। এককথায় কবিতার “আমি”-র সঙ্গে গলা মেলাবার জন্য, তার অভিজ্ঞতার শরিক হবার জন্য পাঠককে খানিকটা হলেও বেরিয়ে আসতে হয় নিজের “আমি”-র বাইরে। পাঠককে এইভাবে স্থানচ্যুত করতে পারার ক্ষমতাটাই কবিতার ক্ষমতা। তাই রুদ্র যখন প্রশ্ন করেন যে আধুনিকতা ব্যাপারটি কি আপেক্ষিক নয় তখন তিনি কবিতার এই ক্ষমতাটিকে কে কীভাবে ব্যবহার করে সেই দিকেই ইঙ্গিত করতে চান। হয়তো বলতে চান যে এই ব্যবহারই বুঝিয়ে দেয় আধুনিক বাংলা কবিতায় ভাষাঅভ্যাসের যে রাজনীতি তার মধ্যে কবি এবং পাঠক হিসেবে আমরা কোন পক্ষে। আর পক্ষ নেবার বা না নেবার, মনে রাখা দরকার পক্ষ না নেওয়াটাও একধরনের পক্ষ নেওয়াই, এই গোটা রাজনীতিটা ঘটে ভাষার মধ্যে দিয়েই। আরেকটু খোলসা করে বলতে হলে কবিতার কাছেই ফিরে যেতে হয়। “পরানের গহীন ভিতরে”-র ২৩ নম্বর সনেটটি এতক্ষন ধরে আমি যা বলার চেষ্টা করছি সেই কথাটাই অনেক বেশি স্পষ্ট করে ধরিয়ে দেয়:

আমারে যেদিন তুমি ডাক দিলা নিজের ভাষায়
মনে হইল এ কোন পাখির দ্যাশে গিয়া পড়লাম,
এ কোন নদীর বুকে এতগুলা নায়ের বাদাম,
এত যে অচিন বৃক্ষ এতদিন আছিল কোথায়?
আমার সর্বাঙ্গে দেখি পাখিদের রাতির পালক,
নায়ের ভিতর থিকা ডাক দেয় আমারে ভুবন,
আমার শরীলে যেন শুরু হয় বৃক্ষের রোপণ,
আসলে ভাষাই হইল একমাত্র ভাবের পালক।
তাই আমি অন্যখানে ছিলাম যদিও,
যেদিন আমারে তুমি ডাক দিলা নিরালা দুফর,
চক্ষের পলকে গেল পালটায়া পুরানা সে ঘর,
তার সাথে এতকাল যে আছিল ভাবের সাথীও।
এখন আমার ঠোঁটে শুনি আমি অন্য এক স্বর,
ভাষাই আপন করে আর সেই ভাষা করে পর।

আর যদি এইটা বুঝি যে আপন এবং পর করবার ক্ষমতাটা ভাষারই ক্ষমতা তাহলে বাংলা কবিতাকে বাংলাভাষায় লেখা কবিতা হিসেবেই পড়ব, বাংলাদেশের কিংবা পশ্চিমবঙ্গের কবিতা হিসেবে নয়।