মানব সভ্যতার রূপায়ণে কবি ও কবিতা এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। কবি ও কবিতা কালের মহান এক সাক্ষী। মানব মনন, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের ধারক ও বাহক।

ইসলামের দৃষ্টিতে কবিতা দু’ধরনের- একটি সত্য ও সুন্দরের পথপ্রদর্শক, অপরটি মানব সভ্যতার জন্য ধ্বংসাত্মক, অকল্যাণকর, কুরুচিপূর্ণ বিভ্রান্ত চিন্তার ধারক। ইসলাম একদিকে যেমন কল্যাণকর সাহিত্যের সৃষ্টিতে উৎসাহ ও প্রেরণা দিয়েছে তেমনি সভ্যতার জন্য ক্ষতিকারক ও অশ্লীল সাহিত্য তৈরিতে কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করেছে। পবিত্র কোরআনুল কারিমে কবিদের নামে সুনিপুণ বর্ণনাসমৃদ্ধ ‘আশ-শুয়ারা’ নামক পূর্ণাঙ্গ একটি সূরা রয়েছে। সূরায় আল্লাহ বলেন- এবং কবিদের যারা অনুসরণ করে তারা বিভ্রান্ত। আপনি কি দেখেন না যে তারা প্রতি ময়দানেই উদভ্রান্ত হয়ে ঘুরে বেড়ায় এবং এমন কথা বলে যা তারা করে না। তবে তাদের কথা ভিন্ন যারা ঈমান আনে ও সৎকাজ করে এবং অত্যাচারিত হলে প্রতিশোধ গ্রহণ করে। অত্যাচারীরা অচিরেই জানবে কোন স্থানে তারা ফিরে আসবে। (সূরা-আশ-শুয়ারা, আয়াত ২২৪-২২৭)।

এ আয়াত নাজিল হওয়ার পর হজরত আবদুল্লাহ বিন রাওয়াহা, হাসসান বিন সাবিত, কা’ব ইবনে মালিক প্রমুখ সাহাবি কবি কাঁদতে কাঁদতে রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর খেদমতে হাজির হয়ে আরজ করেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমরাও তো কবিতা রচনা করি, এখন আমাদের উপায় কী? রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন, আয়াতের শেষাংশ পাঠ কর। এ আয়াতের উদ্দেশ্য এই যে, তোমাদের কবিতা যেন অনর্থক ও ভ্রান্ত উদ্দেশ্যে রচিত না হয়। কাজেই তোমরা আয়াতের শেষাংশে উল্লিখিত কবিদের শামিল, (ফতহুল বারী)।

আয়াতের একদিকে বিপথগামী মুশরিক কবিদের চিহ্নিত করা হয়েছে অন্যদিকে তুলনামূলক পর্যালোচনার মাধ্যমে সত্য ও সুন্দরের পতাকাবাহী ঈমানদার কবিদের শ্রেষ্ঠত্ব নির্বাচন করে তাদের উৎসাহিত করা হয়েছে। যারা কবি তারা প্রাকৃতিকভাবেই কিছুটা ভাবুক, কল্পনাপ্রবণ ও আবেগী। এটা তাদের স্বভাব ধর্ম। কল্পনাপ্রবণ ও আবেগী না হলে কাব্য সৃষ্টি করা যায় না। এটা আল্লাহর পক্ষ থেকে কবিদের প্রতি বিশেষ এক নেয়ামত। যে কারণে সাধারণ মানুষ যা পারে না তারা তা’ পারেন, আর পারেন বলেই তারা কবি।

কবিদের এ ভাবের জগৎ ও কল্পনাপ্রবণতা থেকে দূরে রাখা আল্লাহর ইচ্ছা নয়। তবে তারা যেন এ ভাবের জগতে বিচরণ করতে গিয়ে বিপথগামী না হন এ জন্য আল্লাহতায়ালা কয়েকটি শর্ত জুড়ে দিয়েছেন: * একজন কবিকে ঈমানদার হতে হবে। * ঈমান আনার সঙ্গে সঙ্গে অসৎ কর্ম বর্জন করে সত্য ও সুন্দরের অনুসারী হতে হবে। * ভাব প্রবণতা ও আবেগী বিচরণ যাতে তাকে সৎ পথ থেকে বিচ্যুত করতে না পারে সে জন্য আল্লাহকে বেশি বেশি স্মরণ করে সদা সর্বদা তাঁর সাহায্য চাইতে হবে। * আর যখনই মানবতা বিপন্ন হবে- নিপীড়িত, নির্যাতিত মানুষের জন্য কবি তার সর্ব মেধায় প্রতিশোধ গ্রহণের চেষ্টা করবেন। মানুষকে তার প্রাপ্য অধিকার সচেতন করে তোলার জন্য নিপীড়ন ও নির্যাতনের ব্যাপারে জনগণকে একত্র করার জন্য, কিসে এবং কীভাবে মানবতা বিপন্ন হচ্ছে তা স্পষ্ট করার জন্য সভ্যতার পক্ষে বিপ্লবের বাণী উচ্চারণ করার প্রথম ও প্রধান দায়িত্ব কবিদের।

কবি ও কবিতার এক উর্বর জনপদে জন্মগ্রহণ করেছিলেন রাসূলে আরাবি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)। নবুয়াতপ্রাপ্তির আগেই রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর মধ্যে আরবি ভাষা ও সাহিত্যের ওপর অসাধারণ দখল এসে গিয়েছিল একজন আরব হওয়ার কারণে। এ ছাড়া কবি ও কবিতার প্রতি তার একটি স্বভাবসুলভ আগ্রহ ও কৌতূহল ছিল। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) নিজে যেমন কবিতা শুনতে ভালোবাসতেন তেমনি অন্যদের ও তিনি কবিতার প্রতি আগ্রহী করে তোলার জন্য সচেষ্ট ছিলেন। তিনি বলেছেন, দুটি মনোরম আবরণে আল্লাহতায়ালা বিশ্বকে সাজিয়ে থাকেন কবিতা তার একটি। রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আরও বলেছেন নিঃসন্দেহে কোনো কোনো কবিতায় রয়েছে প্রকৃত জ্ঞানের কথা। তিনি সাহাবিদের নির্দেশনা দিয়েছিলেন তোমরা তোমাদের সন্তানদের কবিতা শেখাও। এতে তাদের কথা মিষ্টি ও সুরেলা হবে। হজরত আয়েশা সিদ্দিকা (রা.) আরও বর্ণনা করেন- ‘মহানবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন- তোমরা কাফির, মুশরিকদের নিন্দা করে কাব্য লড়াইয়ে নেমে পড়। তীরের ফলার চেয়েও তা তাদের বেশি আহত করবে’। ইবনে রাওয়াহাকে পাঠানো হলে তার কবিতায় মুগ্ধ হতে পারলেন না নবী করিম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)। কা’ব বিন মালিককেও পাঠানো হল অবশেষে যখন হাস্সান এলেন, বললেন- ‘সবশেষে তোমরা ওকে পাঠালে’। ওতো লেজের আঘাতে সংহারকারী তেজোদ্দীপ্ত সিংহ শাবক’। কথা শুনে হাস্সান (রা.) আনন্দে জিভ নাড়তে নাড়তে বললেন, সেই মহান সত্তার শপথ যিনি আপনাকে সত্য বাণী সহকারে পাঠিয়েছেন। এ জিভ দিয়ে তাদের চামড়া ছুলে ফেলার মতো গাত্রদাহ সৃষ্টি করেই ছাড়ব।

এ দিন থেকেই আনসারদের মধ্যে তিনজন কবি হাস্সান বিন সাবিত, কা’ব বিন মালিক এবং আবদুল্লাহ ইবনে রাওয়াহা কাফিরদের বিরুদ্ধে কাব্য লড়াইয়ে নেমে পড়লেন। একবার রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) দীর্ঘ সফরে বের হয়েছেন। জনমানবহীন প্রান্তরে মরুপথে উটের পিঠে অবস্থান করছেন। রাতও হয়েছে বেশ, বললেন হাস্সান কোথায়? হজরত হাস্সান (রা.) এগিয়ে এলেন, বললেন ইয়া রাসূলাল্লাহ এই তো আমি। মহানবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন, আমাদের কিছু ‘হুদা’ শুনাওতো। শুরু করলেন কবি। ওদিকে মহানবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) মন দিয়ে শুনছেন এবং উট চলছে অধিকতর ক্ষিপ্রতায়। উটের দ্রুত চলার কারণে মনে হচ্ছে হাওদা যেন পেছন দিকে ভেঙে পড়ে যাবে। মহানবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) হাস্সানকে থামতে বললেন : আর মন্তব্য করলেন, কবিতাকে এ জন্যই বলা হয় বিদ্যুতের চেয়ে দ্রুত গতিসম্পন্ন এবং এর আঘাত শেলের আঘাতের চেয়েও ক্ষিপ্র ও ভয়ানক।

রাসূল (সা.)-এর উৎসাহ ও প্রেরণায় সাহাবিদের মধ্যে যাদের কাব্যচর্চার প্রতিভা ছিল তারা প্রায় সবাই কাব্যচর্চা করতেন। সাহাবি কবিদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিলেন- হাস্সান বিন সাবিত (রা.), কা’ব বিন মালিক (রা.), আবদুল্লাহ বিন রাওয়াহা (রা.), আলী ইবনে আবু তালিব, আবু বকর সিদ্দিক (রা.), উমর ফারুক (রা.), লবিদ বিন রাবিয়াহ (রা.), কাব ইবনে যুহাযের (রা.), আব্বাস বিন মিরদাস (রা.), যুহায়ের বিন জুনাব (রা.), সুহায়েম (রা.), আবু লায়লা (রা.) প্রমুখ।

রাসূলে আরাবি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সাহাবি কবিদের মধ্য থেকে কবি হাস্সান বিন সাবিতকে সভা কবির মর্যাদা দিয়েছিলেন। তাকে বলা হতো শায়েরুর রাসূল বা রাসূলের কবি। হজরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিস থেকে জানা যায় কবি হাস্সান বিন সাবিত কবিতা আবৃত্তি শুরু করলে কবিকে উৎসাহিত করার জন্য কখনও কখনও নবীজী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সবাইকে শুনিয়ে বলতেন ‘হাস্সানের জিভ যতদিন রাসূলের পক্ষ হয়ে কবিতার বাণী শুনিয়ে যাবে ততদিন তার সঙ্গে জিবরাইল (আলাইহিস সালাম) থাকবেন। কবিতা লেখার পুরস্কার হিসেবে কবি হাস্সান বিন সাবিত (রা.) জীবিত অবস্থায় জান্নাতের সুসংবাদ পেয়েছিলেন। হাস্সান বিন সাবিতের কবিতা শুনে রাসূলে আরাবি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ঘোষণা দিয়েছিলেন- ‘হে হাস্সান আল্লাহর কাছ থেকে তোমার জন্য পুরস্কার রয়েছে জান্নাত।’

কাব্যে অশ্লীলতা বর্জনের ব্যাপারে আল্লাহ নবীর কঠোর নির্দেশ ছিল। তিনি বলেছেন ‘ইসলাম গ্রহণের পরও যে অশ্লীল কবিতা ছাড়তে পারল না, সে যেন তার জিভটাই নষ্ট করে ফেলল।’ রাসূলে মাকবুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আরও বলেছেন ‘কারো পেট বা হৃদয় যদি পুঁজপূর্ণ হয়ে পচে যায় তবু সেই পেট বা হৃদয় অশ্লীল কবিতার চেয়ে উত্তম।’ প্রিয়নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর দরবারে একবার কবিদের নিয়ে আলোচনা হচ্ছিল। আলোচনাক্রমে জাহেলি যুগের অশ্লীল কবিতার জনক ইমরাউল কায়েসের প্রসঙ্গ এলে রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তার সম্পর্কে বললেন, দুনিয়ায় তিনি খ্যাতনামা হলেও আখিরাতে তার নাম উচ্চারণ করার কেউ থাকবে না। কবিদের যে বাহিনী জাহান্নামের দিকে যাবে সে থাকবে তার পতাকাবাহী।

কবি ও কবিতা সম্পর্কে রাসূলে আরাবি (সা.)-এর মনোমুগ্ধকর চিত্তাকর্ষক, নিপুণ মূল্যায়ন আজকের শ্রেষ্ঠ কাব্য সমালোচকদের মন্তব্যকেও হার মানায়। তিনি বলেছেন- নিশ্চইয় কবিতা হচ্ছে সুসংবদ্ধ কথামালা। যে কবিতা সত্য আশ্রিত সে কবিতা সুন্দর। আর যে কবিতা সত্য বিবর্জিত সে কবিতার মধ্যে কোনো কল্যাণ নেই। উট থামাতে পারে তার সুকরুণ ক্রন্দন। কিন্তু আরবরা থামাতে পারে না তাদের কবিতার সুর। নিশ্চয়ই কবিতা বিদ্যুতের চেয়ে দ্রুতগতি সম্পন্ন তীরের ফলার চেয়েও ক্ষিপ্র ও ভয়ানক। আরবদের সুসংবদ্ধ কথা হল তাদের কবিতা। কবিতার ভাষায় কিছু চাইলে তারা মন ভরে দান করে। তাদের ক্রোধের আগুন নিভিয়ে ফেলে কাব্যের ছন্দ। সাহিত্যের আসরে কবিতাই হল তাদের মনকাড়া শ্রেষ্ঠ উপহার।