কবিতা আত্মা পরমাত্মায় ও আত্মার সরে মনের কথা বলে, বিবেকরকে বিদ্যুতের গতির নেয় ঝলোক মারে আর অতিচেতন বা অবচেতনের সেই মহান জগতটা কাঁপিয়ে যায়। কবিতা শরতের মেঘের মত,শ্রবণ ধারার মত মনের হাজারো গোপন রহস্য প্রকাশ করে দেয়। এই কারনে কবিকে হতে হয় একজন চুলচেরা দার্শনিক বিশ্লেষক ও দক্ষ বিচার, ন্যায় পরায়ন শাসকের ভূমিকা পালন করতে হয়। তখনি তো কবি হয়ে উঠেন বিশ্বজয়ী, কালজয়ী লৌহমানব। ছন্দ,রূপক অনুপ্রাস রুপ অলংকারের মাধ্যমে একটি নতুন বার্তা আবিষ্কার করে কবিতা। তাই তো কবিতা এক প্রকার দর্শনের সমাহার, বিজ্ঞানের বিজ্ঞান, কল্পনার কল্পনা, পরিকল্পনার অণুকল্পনা। প্রেম ভালবাসা, দুঃখ, ব্যথা, বেদনা, আঘাত, বিচ্ছেদ, বিরহ যাতনা, যুদ্ধ, বিগ্রহ, বিভিশিখা, মহামারি, সন্ধিবার্তা, চুক্ত, শ্বেতপতাকা, ক্ষুধা, দূর্ভিক্ষ নিরাশার বালু চরে আশার প্রদীপ সমাহার।

কবিতা পাঠকের মনের গোপন দরজায় জানালায় খিঁড়কিতে আনন্দের দোলা যেমন দেয় তেমনি মনের রহস্যময় ক্ষুধা নিবারণ করে নিমিষে আবার মনের গহীন অন্ধকার অন্ধকূঁপে নিদারুণ দগদগে ক্ষতটাকে শুকাতে যাদুকরী দাওয়ার অমৃত সুধাকর হিসাবে কাজ করে। পাঠক কবিতার মোহে আত্মনিমগ্ন হয়ে যায় আর কবিতার প্রেমের সুঘ্রাণে শিঁকল বন্দির বিন্তে নিজেকে সোপে দেয় অবলিলাক্রমে। পুকুর জলাশয় ঝর্ণা নদীও সাগরে গোসল করলে যেমন একটা শীতল শীতলতা সুখ ভাব অনুভূতি জাগে সর্বাঙ্গে তেমনি কবিতা তার মনের মধ্যে ফুল ফোটায় আনন্দ মমতা ভালবাসার সুঘ্রাণ জাগিয়ে তোলে যেন ভোরের হাওয়া সোনালী এক ঝলমল ঝিকঝাক প্রভাত।

কবিতার প্রভাব প্রতিপত্তি নিরবে নির্ভিতে বিশাল বট বৃক্ষের মত কখনো কখনো শত সীমান্ত ভৌগোলিক সীমারেখা পার হয়ে গোটা পৃথিবী নাচিয়ে তোলে। এই দেশদেশান্তর জগৎসংসারকে লক্ষ্য জাতীকে আন্দলোনের মেরুকরণের মাঝ দরিয়ায় উতাল পাতাল টালমাতাল করে তোলে। কবিতা দেশ জাতির মধ্যে সম্পপ্রীতির বন্ধন আবদ্ধ করে প্রেম ভালবাসার মালার এক সূঁতায় গেঁথে দেয়। কবিতা যেমন স্বর্গ সুখের সংসার পাতায় তেমনি এক রোখা নরকের লেলিহানশিখা রূপে সে সংসার রাজদরবার ভেঙ্গে খান খান করে দেয়। কবিতা ইতিহাস সংস্কৃতিক রূপরেখা ভেঙে দেয় নতুন সাংস্কৃতিক ইতিহাসে মোড় নেয়, কালে কালে নদীর মত মোহনায় বাদাম তোলে,নতুন অধ্যায় বাঁক ঘুরায়। কখনো বা দেশ জাতির মধ্যে বিপ্লবী বীজ বোনে রক্তাক্ত বিপ্লবের আজাদী ঝংকারে মাতায়। তখন কবিতা জেগে উঠে পতাকায়,আত্মায় আত্মায় আত্মার জনতার কথা বলে মিছিলে আর বুলেটের বোমারু বারুদের ঝাজরায়।

কবিতা প্রেমের সুর বাঁসরী বাজায় প্রেমিক প্রেমিকার সহৃদয় কার্নিশে আর আপদ মস্তককুঁজ্ঞ জাতকে। কবিতার বৈরী হাওয়া মহান শিল্পী শিল্পীমনকে দর্শকমহলকে সংস্কৃতির আদলে ঘুমান্ত পথিককে ভোরের সূয্যের জ্যোতির নেয় গোঁলক ধাঁধায় পথে নামিয়ে দেয়। কবিতার মাধ্যমে কপোত কপোতীর জীবনে রক্তচূঁড়ায় অভিসারী ফুল্লেল যাত্রায় দোলা দেয় আর নবমীর চাঁদ হয়ে জ্যোৎস্না বিলায়। মেঘ পরীর মায়াবী মমতায় কবিতা মনের মাধুরিতে বাঁসা বাঁধে। সেতারের সুর হয়ে কল্ কল্ বেনীকলা তাল লয় বীনার তালে তালে বেঁজে ওঠে।

কবিতার গন্ধে পৃথিবী হাসে আবার কখনো জগৎসংসার কাঁদে। উল্লাসে ফেটে পড়ে তাঁর ফাল্গুনির অসীম সীমাহীন ধারায়। কাব্য সংগীত শিল্পকর্মগুণ লেখনী শক্তির কৌশল তাঁর দেওয়া সর্বকালের সেরা উপঢৌকন। এই উপহার যার হাতে এসে পড়ে সে হয়ে পড়ে সেরাদের সেরা। তাইতো লেখা যখন উপর থেকে আসে তাতে হাজারো মন মাতানো সুবাস ঝরে, সে কবিতার গন্ধে মানবকুল এক বিন্দুতে মিলিত হয় আর আকাশ চুম্বি জয় ধ্বণিতে বিশ্ব মাতিয়ে তোলে এবং সে ঢেউ পৃথিবীব এক প্রান্ত থেকে অপার প্রান্তে এক পলোকে পাড়ি জমায়।

মৌরী ফুলের মত কবিতার গন্ধে মৌমাছির নেয় কবিতা প্রেমিক মধুর আশায় আর সুবাসে মাতোয়ারা হয়ে যায়। নিজেকে সাজায় গোলাপ, বেলী, রজনীগন্ধা, হসনাহেনা ফুলের বরণডালায় আর তখন কবিতা হয়ে যায় রাজদরবার। কবিতার বরণমালায় সাজ সাজ রব ওঠে, মিছিলের সারি সারি শ্লোগান। আবার কবিতা হয়ে যায় তোমার কথা, আমার কথা, দেশের কথা, দশের কথা, প্রজার কথা, রাজনীতির কথা, রাজার কথা।

ইটের পাঁজার আগুনের লেলিহানশিখা যেন কবিতার বহুব্রীহি কলা।বিরহকাল, বিরহ মহাকাল। কবিতা যুগেযুগে বেদনার বাঁশিবাজায়, মহাযোগে পুঁড়ে পুঁড়ে শিরা উপশিরা কোষকলা, রক্তকণিকা, জীবন প্রদীপ ধুঁকে ধুঁকে নিভে যায়।

কবিতার মোহে রাজা অমর্ত্যবর্গ নেচে উঠে,নেচে উঠে রাজা, রাজদরগাহ।দেশকাল মঞ্চ কাঁপায়, কাঁপায় পৃথিবীর গোটা মানচিত্র। কবিতার বলায় জাগিয়ে তোলে ঘুমান্ত পৃথিবীকে। কবিতা হাইতোলে আসমান, জমিন, পাতালপুরী, মেঠোপথ, শাশ্বত চৌকাঠে। কবিতার দোলায় দুলে উঠে স্বর্গ, নরক, সমতল, ভূতল, ধর্ম,অধর্ম, ধার্মিক, অধার্মিক, বাতাসের ভাঁজ, সমুদ্রজল,পাহাড় পর্বত, টিলা সুড়ঙ্গ। কবিতায় চোখের পলোক কাজল হয়ে আসে আবার বিরহ বিষে হয়ে ঝরে পড়ে শিশিরের দহন কণা।

কবিতার ফসল তজবিদানা গোটা পৃথিবীকে এক সূত্রে গেঁথে দেয় জীবন চয়নিকার ও মানবতার অনন্য রূপালি আত্ম দর্শনে। কবিতা ভাতের হাঁড়ির মত সুপিয়ো সালুনের মাঝ-বরাবর নির্যাস টগবগে উত্তপ্ত ঝোল। কবিতা বর আর কনের মিলনের মাদল বাসরীর বাঁশির ললিতো সুর।

কবিতা শাসকের চোখের তারায় হাতের বাঁজুতে পঞ্চমী চাঁদের মত শতরুপ শ্লোকবোনে। রাতদিন কালবুটের একতালে শব্দ তোলে আর শাঁই শাঁই ছড়ি ঘুরায় ও গোলা বারুদের ঝাঝরা ছড়িয়ে পড়ে রক্ত মাংস হৃদপিন্ড ক্ষুধার্ত জমিনে।
কবিতা হয়ে উঠে বারুদের ফলা,ইউরিনিয়ামের হাওয়ার তুরুফের তুড়ি। কবিতা পাঁজর ভেঙ্গে দেয় কোন ব্যক্তিকে, সমাজকে, সংস্কৃতিকে, রাজনীতিকে, মহানায়ককে, জাতিকে, দেশকে, মহাদেশকে, মহাকালকে। কবিতা আকাশ মহাকাশকে, গ্রহ গ্রহপুঁজ্ঞকে, তারকা হাওয়ালা উপগ্রহকে মেপে মেপে ঘ্রাণ নেয়, ছুয়ে ছুয়ে দেখে।

কবিতা হয়ে ওঠে করুনা ও করোনার জীবন সন্ধিরপালা বার্তা। আগামী দিন যাপনের দিন লিপিকা জীবন কলা, সূত্র কলা।কবিতার সম্মোহনী ক্ষমতার মায়া জাল অনন্তকাল ব্যাপি।তার স্রোত ধারা অব্যাহত ভাবে প্রবাহমান থাকে। যার আবেদন কোনদিন কোনকালে শেষ হবেনা এযেন স্বর্গীয় পুরুষের হাতে গড়া স্বর্গীয় যাদুর মহিনী তসবিদানা।

একজন শব্দ বিজ্ঞানী জীবনে প্রেম ভালবাসার মায়া জাল বুনতে পারে তুষার বৃষ্টি, বরফের আচ্ছাদন, পর্বতচূড়া, হিমালয়, ঝড়ঝজ্ঞা, গভীর সমুদ্র, ঝর্ণা, নদী, ধুষার মরুভূমি, বিশাল বালির খাড়ি, অগ্নিবর্ষা, অগ্নিলাভা, বারমুডা ঢেউ তরঙ্গের মত জটিল প্রকৃতির অণুসঙ্গের বিচিত্রার সাথ। কবিতার আত্মায় প্রকৃতির বসোবাস। কবিতার সঙ্গে প্রকৃতির এক মহা মিলন মোহনা।

কবিতার অসীম ক্ষমতা, কবিতা বৃত্তভাঙ্গতে শেখায়, নতুন নতুন বৃত্তগড়তে অনন্য সূত্র বাতলে দেয়। কবিতার সিঁড়ি ধরে বৃত্ত ওঠা নামা করে। তাই এই যাত্রার পথ ধরে জগৎসংসারকে নতুন ভাবে নতুনত্বকে বরণ করে নেয় আর পুরাতনকে বিদায় বার্তা জানান দেয়। এভাবে কবিতা নতুন পথে যাত্রা করে, আর সৃজন করে নতুন নতুন কবিতা আগামীর জন্য। এই নতুন বৃত্তের কর্মাণু প্রেরনায় নতুন কর্ম কাঠামোয় নিজেকে সাংগঠনিক মানে গড়ে তোলে একজন দক্ষ শব্দ বিজ্ঞানী। সেই সাথে মানবিক গুণাবলীর বিকাশ ঘটায় এবং সমাজে নিজেকে নজির হিসাবে পেশ করার একটা নতুন সুযোগ এনে দেয় কবিতা রাজকীয় ভাবে। আর তখন কবিতা বহুরুপে স্মৃতির মিনার গাঁথে ময়ূরীর পেখমের রঙ্গিন পালকের মত থরে থরে ভীড় জমে, বাক নেয় জীবনের প্রতিটা গোপন অলিগলিতে। এ ভাবে ভব সংসারে কবিতা জীবনের জয় গান গায়।