কবিতা চরের পাখি, কুড়ানো হাঁসের ডিম, গন্ধভরা ঘাস/ ম্লান মুখ বউটির দড়ি ছেঁড়া হারানো বাছুর/ গোপন চিঠির প্যাডে নীল খামে সাজানো অক্ষর/ কবিতা তো মক্তবের মেয়ে চুলখোলা আয়েশা আক্তার।
সোনার দিনার নেই, দেন মোহর চেয়ো না হরিনী/ যদি নাও, দিতে পারি কাবিনহীন হাত দুটি/ আত্মবিক্রয়ের স্বর্ন কোনকালে সঞ্চয় করিনি/ আহত বিক্ষত করে চারদিকে চতুর ভ্রুকুটি;/ ছলনা জানিনা বলে আর কোন ব্যবসা শিখিনি ।
এমন অসংখ্য কালজয়ী কবিতার স্রষ্টা দেশের প্রধান কবি আল মাহমুদ। বাংলা কবিতাকে গৌরবোজ্জ্বল অবস্থানে নিয়ে এসেছেন তিনি। আমাদের কবিতায় যে ঐতিহ্য ও আধুনিকতার ঊণ্মেষ ঘটেছে তিনিই তার নায়ক।
প্রখ্যাত সমালোচক অধ্যাপক শিবনারায়ণ রায়ের মতে, সমকালীন যে দুজন বাঙালী কবির দুর্দান্ত মৌলিকতা এবং বহমানতা আমাকে বারবার আকৃষ্ট করেছে, তাদের মধ্যে একজন হলেন বাংলাদেশের আল মাহমুদ, অন্যজন পশ্চিমবঙ্গের শক্তি চট্রোপাধ্যায় ।
দুই বাংলার অপরাজেয় এই কবির জন্ম ১৯৩৬ সালের ১১ জুলাই। বার্ধক্য তাকে দমিয়ে রাখেনি, ডিকটেশনের মাধ্যমে জীবনের শেষ সময়েও চালিয়ে গেছেন তার লেখালেখি। ২০১৯ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি শুক্রবার রাত ১১টায় ৮২ বছর বয়সে ইন্তেকাল করেন বাংলা সাহিত্যের তারকা লেখক কবি ও কথাসাহিত্যিক আল মাহমুদ।
স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠ্য আল মাহমুদের কবিতা। দেশ-বিদেশে তাকে নিয়ে গবেষণা হচ্ছে। বইয়ের সংখ্যা শতাধিক। চল্লিশের বেশী কাব্যগ্রন্থ, বিশের অধিক উপন্যাস এবং দশটির মতো গল্পগ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। তার শিশু সাহিত্য কিংবা কিশোর কবিতা বাংলা সাহিত্যে দুর্লভ। আট খণ্ডের রচনা সমগ্রও পাঠকের হৃদয় ছুঁয়েছে। বাংলা ভাষা ও সাহিত্য এবং আল মাহমুদ যেন এক ও অভিন্ন।
এমন একজন কবির চোখে দেখা জীবন ও জগতের অনেক কিছু জানতে ইচ্ছে হয়। তার সাধনা ও ভাবনাগুলো একত্রিত করতে পারলে আগামীতে লেখক-গবেশষকদের কাজ সহজ হবে। আর এই প্রত্যাশা থেকে তিন যুগ ধরে কাছে থেকে দেখা আল মাহমুদকে পাঠকের সামনে তুলে ধরার প্রয়াসে এক ভিন্ন রকম আলাপচারিতা।
এক বৃষ্টি ভেজা দুপুরে হাজির হলাম আল মাহমুদের বাসায়। কবি কন্যা আতিয়া মীর সাথে ছিলো। প্রাথমিক খুশ গল্পের পরই সাহিত্য নিয়ে আলোকপাত শুরু। কবি বললেন, আগের মতো লেখালেখির কাজ চালিয়ে যেতে পারছি না। আজ এক অস্বস্তির মধ্যে আকাশ-পাতাল ভাবছি। ভাবনাটিকে লিখে ফেলতে হয়। কিন্তু মন স্থির না থাকলে লেখাটা এলোমেলো হয়ে যায়। সব কিছুতেই একটা বৃষ্টির বিড়ম্বনা আমাকে জাপটে ধরে রাখে।
এক ডুবন্ত ঢাকা শহর, ঘরে বসে লিখব এমন রুটিন লেখায় মন ভরছে না, নগরটাকে দেখতে ইচ্ছে করে। ঘরে বসে কিছু লিখতে গেলে সব ঘটনাই চলে যায় ঢাকার বাইরে। অদ্ভুত সব মানুষ আমার স্মৃতিতে এসে ভিড় করে। এসব তো আর সেভাবে অক্ষরে বিম্বিত হতে চায় না। তবু আমি গল্প বানাই এবং গল্পটি এক জায়গায় শেষ করতে হয়। কিন্তু আমার কাহিনী তো সীমানা মানতে চায় না।
জানতে চাইলাম, সারা জীবন কবিতার সাথে ঘর-সংসার করলেন। এখন এ নিয়ে ভাবতে কেমন লাগে? আল মাহমুদ বললেন, জীবনের পড়ন্ত বেলায় কবিতা নিয়ে ভাবতে ভালো লাগে। অতীতকে স্মরণ করে আমি ভীষণ আনন্দ বোধ করি। একসময় কবিতাই ছিল আমার একমাত্র আরাধনার বিষয়। আর এখনকার সময়টা একটু ভিন্ন- বয়সের পরিণত অবস্থায় ডিকটেশন দিয়ে লেখাতে হয়।
চোখে দেখে লিখতে পারলে কতই না ভালো হতো! আফসোস না করে বলি- আমি তো লিখেই পুরো জীবন পার করলাম, সময় সাক্ষী। এখন আর তেমন লিখা হয় না। তবু স্বজন-শুভাকাঙ্ক্ষিদের আবদারে একটু-আধটু লিখতে হয়, তারা একটা নতুন লেখার জন্য সদা তৎপর। আমার ব্যাপারে পাঠকের এই আগ্রহের একটা মূল্য আছে, তাই এখনো কাউকে নিয়ে লিখতে বসি।
কবি আল মাহমুদের সাথে এভাবেই শুরু হয় কথোপকতন। এ এক ভিন্ন রকম আলাপচারিতা। ভিন্ন ভিন্ন সময়ে ঢাকায় ও সিলেটে কবির সাথে নানা বিষয়ে আলোচনা বা সাক্ষাৎকারের খুব অল্পই এখানে তুলে ধরা হল। পরবর্তী প্রকাশনায় আল মাহমুদকে তার নিজস্ব শব্দে তুলে ধরতে চাই। শব্দের নিগূঢ় রহস্য নির্মাণই যার কাজ। তিনি সাহিত্য ভুবনে সার্বভৌম কবিরূপে অধিষ্ঠিত হতে পেরেছেন। আশা করি তার মুখে প্রকৃতি ও মানুষের বিভিন্ন রূপের যথার্থ বর্ণনায় পাঠক মুহিত হবেন।

সাঈদ চৌধুরী: জীবনের স্বপ্ন ও স্মৃতিগুলো কবিতার চেয়ে গদ্যে সহজে তুলে এনেছেন বলে কি মনে করেন?
আল মাহমুদ: আমার অনেক স্বপ্ন আছে, স্মৃতি আছে। চোখের সামনে সৃস্টি কিংবা ধ্বংস হয়ে যাওয়ার অনেক ইতিহাস আমি জানি। আমার পাঠকদের ভারাক্রান্ত করতে চাই না বলে বেদনাময় ইতিহাস লেখা হয়না। আমি এমন গল্প বলি, যা মানুষকে দুঃখ দেয় না। অনুতাপে দগ্ধ করে না। আমি ইচ্ছে করলেই কিছু বানিয়ে তুলতে পারি না। যখন কোন কাহিনীসূত্র আমার মনে পড়ে তখনই গল্পটি তৈরী করি। এজন্য আমার গল্পে অশ্রুজল নেই, ধৈর্য ধারণের দৃষ্টান্ত আছে।
সাঈদ চৌধুরী: আপনার এখন ডিকটেশন দিয়ে লেখাতে হয়। ইচ্ছে মতো লিখতে না পারায় কেমন লাগে?
আল মাহমুদ: আমি কিছু না লিখলে আমার নিদ্রার বেঘাত ঘটায়। কিন্তু কি করব! কারো সাহায়্যে ডিকটেশন দিয়েই লেখাতে হয়। সবসময় মনে হয় পেছনে এমন কিছু ফেলে এসেছি, যা না থাকলে মানুষ মরীচিকার হাতছানিতে কেবল স্থান থেকে স্থানান্তরে ঘুরে বেড়াতে থাকে। কোনো গন্তব্যে পৌঁছায় না। আমি কবি, আমার প্রতিজ্ঞা হলো বাস্তব হোক বা স্বপ্নই হোক, আমাকে গন্তব্যে পৌঁছতে হবে। আমার বিশ্বাস, আমার কবিতা সেখানে ঠিকই পৌঁছে যাবে।
সাঈদ চৌধুরী: আপনি কবিতায় না গল্পে অমর হতে চান?
আল মাহমুদ: কবিরা সত্য ও স্বপ্ন মিলিয়ে কবিতা তৈরি করেন। মানুষ নিন্দায় উত্তেজিত হয় এবং দুঃখে দারিদ্র্যে ভেঙে পড়ে। আর এই কাহিনীই হলো মহাকাব্য। কবির রচনায় মানুষ মহাকাব্যের অমরতার স্বাদ আস্বাদন করে।
সাঈদ চৌধুরী: আপনার অনেক লেখায় নর-নারির প্রেম প্রাধান্য পেয়েছে। আপনার মূল্যায়ন কি?
আল মাহমুদ: নর-নারী একে অন্যকে বিশ্বাস করে ঘর বাঁধে, এই বিশ্বাসটুকু না থাকলে জগৎ অরণ্যে পর্যবসিত হতো। আর এই বিশ্বাসের নামই হলো প্রেম। একে অন্যের জন্য পাগল হওয়ার নাম প্রেম নয়। প্রেম হলো এক স্বর্গীয় অনুভূতি। এর ওপর দাঁড়িয়ে আছে জগতের শ্রেষ্ঠ সৃজনশীল কর্ম। সব শিল্পীই এই জায়গায় একবার নীরবে দাঁড়ায়। মানবিকতাকে প্রেমকে একই সাথে প্রেমের পরিণতিকে শ্রদ্ধা জানায়।
সাঈদ চৌধুরী: বিষয় নির্ধারণ করে লিখেন নাকি লিখতে বসে ঠিক করেন?
আল মাহমুদ: আমার বিষয় কী হবে, তা আগে থেকে স্থির করে নিতে পারি না। আমি লিখি কোনো তাৎক্ষণিক উদ্দীপনায় কিংবা লিখি অন্তরের তাগিদে। আমি বহুদ্রষ্টা একজন বয়স্ক ব্যক্তি, এই জীবনে অনেক ঘটনা ও দুর্ঘটনার সাক্ষী। মানুষের সুখ-দুঃখ নিয়ে অনেক পুস্তক রচনা করেছি, এর মধ্যে কবিতার বইও আছে; যেমন আছে উপন্যাস।
সাঈদ চৌধুরী: পাঠকদের প্রত্যাশা পুরণে কি সক্ষম হয়েছেন?
আল মাহমুদ: আমি সাহিত্যের অঙ্গনে যাকে যে কথা দিয়েছিলাম তা রক্ষা করার চেষ্টা করেছি, তা মোটামুটিভাবে সন্তোষজনকই হয়েছে। এখন হয়তো মউতের দোলনায় দুলছি, এখন আমার প্রভু যদি আমাকে সাহায্য করেন তাহলে আমার দিনগুলো আমি স্বস্তিকরভাবে পার হয়ে যেতে পারব ইনশাআল্লাহ। তার পরও মানুষের কিছু দাবি আমার ওপর থেকেই যাবে। এ ব্যাপারে আমার কথা হলো আমি একজন কবি বৈ আর কিছু নই। মানুষের যেটুকু সাধ্যে কুলায় সেটুকু আমি পরিপূরণের প্রয়াসী ছিলাম।
যেহেতু আমি কবি ছাড়া আর কিছু নই, সে কারণে বাংলাদেশের সাহিত্যের ইতিহাসে একটি দৃষ্টান্ত স্থাপন করে যেতে চেয়েছি। কেমন হয় কবিরা? কোথায়, কিভাবে জন্মায় একজন কবি? কবির কী প্রয়োজন একটি দেশের জন্য? এসব প্রশ্নের জবাব অতীতে দেয়ার চেষ্টা করেছি। অনেক কথা লিখেছি, যা অন্য কবিরা লিখতে সম্মত হবেন না। আমি লিখেছি; কারণ আমি আমার পাঠকদের কাছে সততার দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে চাই।
সাঈদ চৌধুরী: আপনার গল্প-উপন্যাস কি জীবন থেকে নেয়া?
আল মাহমুদ: অনেকে প্রশ্ন করেন, আমার উপন্যাসগুলো কি আমার জীবনেরই কোনো রঙ চড়ানো? আমি জবাব দিই না। কারণ এর কোনো জবাব হয় না। আমি মনে করি, উপন্যাস রচয়িতাদের নিজের জীবন ছাড়া লেখার আর কোনো বিষয়বস্তু থাকে না। থাকলেও সেটা শেষ পর্যন্ত নিজের জীবনেই এসে মিশে যায়। আমিও এর ব্যতিক্রম নই।
যখন ধারাবাহিকভাবে উপন্যাস রচনা করতাম, তখন আমার কিছু বন্ধু জুটেছিল। তারা সবাই সাংবাদিক, এখনো পেশায় নিয়োজিত। আবার কেউ এই লেখালেখির জগৎ থেকেই দূরে সরে গেছেন। কিন্তু তাদের স্মৃতি আমার মতো এক অযোগ্য কবির ঘাড়ে চাপিয়ে দিয়ে তারা অন্তর্হিত হয়েছেন। সাধ্যমতো তাদের কথাও আমার রচনাবলির কোথাও না কোথাও জমা করে রেখেছি। বলা যায় আমি তাদের এককালীন স্মৃতিকে বিস্মৃত হইনি।
সাঈদ চৌধুরী: আপনার লেখালেখিতে কোন দায়বদ্ধতা আছে কি?
আল মাহমুদ: দায়বদ্ধতা একটি অদৃশ্য বিবেক। আমি বিবেকের তাড়নায় লিখি এবং বিবেকের তাড়নায় এই বয়সেও শিখি। আমাদের সমকালীন সাহিত্যে নানা বিষয়ে আমাকে সজাগ থাকতে হয়।
সাঈদ চৌধুরী: এক সময় আপনি বিপ্লবী বলয়ে ছিলেন। কবি হিসেবে ভয় হতোনা?
আল মাহমুদ: মানুষ মৃত্যুর সামনেও মেরুদণ্ড সোজা করে দাঁড়িয়ে থাকতে পারে। কবিরা এটা পারে বলেই কবিতা লেখে এবং মৃত্যুতে কাতর হয় না। আমি সব সময় আমার প্রভুর ওপর ভরসা করে থেকেছি। এখনো আছি।
সাঈদ চৌধুরী: কবিরা অনেক কিছু স্বপ্ন দেখেন, বাস্তবে কতটা প্রতিফলিত হয়?
আল মাহমুদ: আমার পথ হলো কবির পথ। খানিকটা স্বপ্নে, খানিকটা বাস্তবে হাঁটাচলা করাই আমার কাজ। আমি অনেক দিন পর্যন্ত এই কাজটি করে চলেছি। যে পথে কেউ হাঁটেনি আমি সে পথে হাটে-বাটে-ঘাটে একদা বিচরণ করেছি। আমার মনেও প্রশ্ন জেগেছে¬ এত দিন লিখছি, সমাজে কতটা প্রতিফলিত হয়েছে। এর পাঠক আছে কি না। লেখকের পরমাত্মীয় হলো একজন পাঠক বা পাঠিকা। আকস্মিকভাবে আমার ঘরে টেলিফোন বেজে ওঠে। তারা আমার পাঠক। কণ্ঠস্বর পুরুষেরই হোক কিংবা কোনো নারীর, খুবই বিমোহিত হই। আনন্দে হৃৎপিণ্ড দুলতে থাকে। ভাবি এই তো লেখকের সার্থকতা।
হঠাৎ যখন কোনো অজ্ঞাত স্থান থেকে কিংবা বলা যায় এক মহাদেশ থেকে অন্য মহাদেশ পর্যন্ত বিস্তৃত এই যে আমাদের পৃথিবী, এরই একটি গৃহকোণে হঠাৎ বেজে উঠেছে টেলিফোন; কী বার্তা, তা যখন জিজ্ঞেস করি তখন উত্তর আসে¬ আপনি লিখে যান, শুধু লিখে যান।
এ কথায় আমার অন্তরাত্মায় আনন্দের ফোয়ারা উদ্ভাসিত হতে থাকে। ভাবি আমার লেখা পৌঁছে গেছে। আমি যেখানে যেতে পারিনি কোনো দিন, যেখানে ছিলাম না সেখানেও আমার কলমের কালি মাখা অগ্রভাগটি কাজ করা শুরু করেছে। আমার মন প্রফুল্লতায় একদম ভরে যেতে থাকে। আমি যাইনি; কিন্তু আমার আত্মার শক্তি বিশ্বব্যাপী আত্মীয়তা বৃদ্ধি করে চলেছে। এর চেয়ে বড় সার্থকতা কবির জন্য আর কী হতে পারে?
সাঈদ চৌধুরী: প্রবাসেও আপনার বইয়ের কাটতি ভালো। এতে লেখকের না প্রকাশকের ভূমিকা বেশি?
আল মাহমুদ: বই লিখেছি প্রচুর, এই বই কোনো আন্তর্জাতিক সীমা মানে না। তা ছাড়া বইয়ের কোনো দেশ-বিদেশ নেই। সে চলে যায় আপন মনে উড়াল দিয়ে বিশ্বের নানা জায়গায় ছড়িয়ে থাকা নিবিষ্ট পাঠকের কাছে। বইয়ের এই শক্তি চিরকালীন।
যখন লিখেছি তখন তা কেউ না কেউ পড়বেই। প্রতিক্রিয়া হয়তো জানব না, কিন্তু আমার প্রতিষ্ঠা জগৎব্যাপী ঘুরে বেড়াবে। এটুকুই তো লেখকের সার্থকতা, আর যদি তিনি কবি হন তাহলে তো কথা নাই। স্বপ্নের ভেতর থেকে স্বপ্ন জন্ম নেবে। এভাবেই তৈরি হয় প্রকৃত আত্মীয়তা, যা রক্তের সম্পর্ককেও তুচ্ছজ্ঞান করে অনাত্মীয়কে একান্ত আপন করে তোলে। এ জন্যই তো বেঁচে থাকা। কলমের কালি শুকায় না। কারণ জীবনের উৎসমুখ সিক্ত হয়ে আছে আমারই আত্মার রসে লাল হয়ে।
সাঈদ চৌধুরী: চলে যাওয়া কোন মানুষটি আপনার স্মৃতিতে সমুজ্জ্বল?
আল মাহমুদ: আমার মায়ের মুখটি স্মৃতিতে সমুজ্জ্বল হয়ে আছে। মনে পড়ে, এই ঢাকা থেকে বাড়ি ফিরে আমাদের আঙ্গিনার সিঁড়ি ভেঙে ওপরে উঠতে উঠতে চিৎকার করে মাকে ডাকতাম। মায়ের শব্দ শুনতে পেতাম, আমার নাম ধরে বলতেন, ‘এসেছিস- দাঁড়া, দরজা খুলে দিচ্ছি।’ দরজা খুলে দিলে পেতাম আমার মাকে। ভাত-তরকারি গরম করে সাজিয়ে দিতেন আমার সামনে। ক্ষুধার্ত বালক, আমার মা ভাবতেন আমি বহু দিন কিছু খাইনি। ঘরে যা ছিল সবটাই আমার জন্য সাজিয়ে পাশে বসে থাকতেন। এই তো আমার মা, চিরকালীন মাতৃ প্রতিচ্ছবি।
এই ছবি কিছুতেই আমার স্মৃতি থেকে সরে যায় না। আমার মা জানতেন, তার একটি ছেলে কবি হৃদয় নিয়ে জন্মেছে। আর সব ছেলের মতো নয় সে। বিষয় বুদ্ধিহীন এই বালকটির জন্য আমার মায়ের দুশ্চিন্তার সীমা ছিল না। তিনি জানতেন, একে সবাই ঠকাবে। আর আমি জানতাম, সবার কাছে ঠকেও কিভাবে জিতে যাবো।
সাঈদ চৌধুরী: আত্মজীবনী লেখার কোন আগ্রহ আছে কি?
আল মাহমুদ: একটি আত্মজীবনীর খসড়া তৈরি করতে মাঝে মধ্যে আমার ভেতর থেকে প্ররোচনা আসে। তবে আমি অনেক কিছু লিখেছি, যা আমার ওপর দিয়ে একদা প্রবাহিত হয়ে গেছে। তাই আমার লেখাতেই আমাকে খুঁজলে পাওয়া যাবে।
আমার কৌশোরে এই দেশটিকে আমি ভালোবেসে পর্যবেক্ষকের মতো বারবার পায়ে হেঁটে দশ দিক ঘুরে চিনেছিলাম। কতভাবে যে আমি বাংলাদেশকে প্রত্যক্ষ করার সুযোগ পেয়েছি, সে কথা বলতে গেলে অফুরন্ত এক মহাকাব্যের উপাদান আমার ভেতর থেকে বেরিয়ে আসবে।
আবার বিস্মৃতিতেও মিলিয়ে গেছে এমন বহু মুখের কথা বিদ্যুতের ঝলকের মতো আমার অকস্মাৎ মনে পড়ে যায়। কিছু দিন আগেও বেশ কিছু প্রতিভাবান মানুষ আমার সংস্পর্শে ছিলেন। এই মুহূর্তে তারা পৃথিবীর নানা প্রান্তে ছড়িয়ে আছেন। ভেবেছিলাম তারা অনেক দূরে চলে গিয়ে আমার স্মৃতি মন থেকে মুছে ফেলেছেন। কিন্তু তাদের আকস্মিক টেলিফোনে আমার ঘুম ভেঙে গেলে আমি ছুটে গিয়ে টেলিফোন ধরতেই তাদের কণ্ঠস্বর শুনতে পাই।
পৃথিবীর বহু দূর দেশ থেকে তারা তাদের ব্যাকুলতা ও ভালোবাসার আহ্বান ছড়িয়ে দিয়ে আমার কুশল জানতে চায়। আমি জবাবে যতই বলি ভালো আছি, তবুও প্রশ্ন করে কেবল একটাই, কেমন আছেন? তাদের তো আর বলতে পারি না আমি ভালো নেই। একটা দেশের সাথে একজন কবির রক্ত-মাংস জড়িত। দেশ যেমন থাকে একজন কবিও তেমনি থাকেন, তার অন্য কোনো ভালো-মন্দ নেই।
সাঈদ চৌধুরী: এদেশের সাধারণ মানুষের ব্যাপারে আপনার মূল্যায়ন কি?
আল মাহমুদ: সাধারণ মানুষের প্রতি আমার রয়েছে অগাধ শ্রদ্ধাবোধ। তারা হাল-বলদের চাষের জমিতে সোনার শস্য ফলিয়েছে।
সাঈদ চৌধুরী: কবিতা আপনার রক্তের মধ্যে ছিল নাকি সাধনার মাধ্যমে অর্জিত?
আল মাহমুদ: কবিতা খুবই কঠিন কাজ। অনেক সাধনা আর পরিশ্রমের কাজ। ছন্দ-মিল জানতে হয়। এজন্য আমাকেও অনেক কসরত করতে হয়েছে। সারাক্ষণ কবিতার ছন্দ, অন্তমিল ইত্যাদি নিয়ে ভেবেছি। এনিয়ে প্রচুর পড়াশোনা করেছি। যদিও লেখার কাজটা সবার কাজ নয়, তা যদি হতো তাহলে তো কেরানিরাই জগতের শ্রেষ্ঠ লেখক হতেন।
কবিকে অবশ্যই আলাদা মানুষ হিসেবে, স্বপ্নের সৃজনকর্তা হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। তবে আমি যে কবি, এটা সম্ভবত আমার রক্তের মধ্যে ছিল। কবিতার ছন্দ আমাকে সুখ-দু:খের গন্ধ দেয়। কবিতা না হলে জীবনের যে একটা ছন্দ আছে, সেটা জানা হতো না।
একজন কবির সার্থকতা হলো সৃজন রীতির মধ্যে বসবাস করতে করতে তিনি একদিন অলৌকিকতার ছোঁয়া পান এবং নিজেকে চিনতে পেরে এমন অবস্থায় পৌঁছে যান, যখন তার প্রতিটি বাক্যই তার জীবনের মহাকাব্য তৈরি করতে থাকে। এজন্যই হয়তো বলা হয়, নবীর পরেই কবির স্থান। যে দেশে কবি জন্মায় না সেখানে প্রকৃতিও আক্ষেপের ধ্বনি তুলতে থাকে। সৌভাগ্য সেই দেশের, যে মাটিতে একজন ভাল কবির জন্ম হয়েছে।
সাঈদ চৌধুরী: আপনি অনেক ভেবে চিন্তে লিখেন নাকি তাৎক্ষনিক?
আল মাহমুদ: খুব ধীরে সুস্থে, যথেষ্ট চিন্তাভাবনা করে লিখি। কী ঘটেছে তা মাথায় নিয়ে আমি লিখি। কল্পনায় একটি চিত্র তৈরী করি। সেটা অন্যরকম এক ব্যাপার। সহিত্যের মানুষ ছাড়া সহজে তা বোধগম্য নয়।
কবি হিসেবে আমার কল্পনা শক্তির সীমানা অনেক বড়। আমি চোখ বন্ধ করলে কল্পনার তরঙ্গে অনেক খুঁটিনাটি বিষয় চলে আসে। আমার শৈশব, কৈশোর, যৌবন, জীবনকাল এবং আত্মীয়-পরিজনের মুখ ভেসে আসে। এসব নিয়েই তো আমার কাহিনী, আমার কাব্য । এক অর্থে আমার জীবনেরই প্রতিচ্ছবি।
আমি লিখি আমার ভেতরের তাগিদে। আমি প্রতিশ্রুত লেখক। তবে আমি দায়িত্বজ্ঞানহীন লেখক নই। আমার লেখায় প্রতিক্রিয়া থাকে। শত্রু -মিত্র উভয় পক্ষই আমার লেখার জন্য অপেক্ষা করে।
সাঈদ চৌধুরী: আপনার সম্পর্কে মানুষের কৌতূহল যেমন বেশী তেমনি কিছু মানুষের বিদ্বেষও পরিলক্ষিত হয়। এই বিদ্বেষটা কেন?
আল মাহমুদ: আমার সম্পর্কে কিছু মানুষের কৌতূহল ছিল। আবার কিছু মানুষের ইর্ষা-বিদ্বেষও ছিল। যারা আমার প্রতি বিদ্বিষ্ট ছিলেন তারা কুৎসা রটিয়ে অন্তর্হিত হয়েছেন। আর আমি স্বপ্ন জাল বুনে চলেছি। আমার বই কেউ না কেউ পড়ছে। লেখকের পরমাত্মীয় হলো তার পাঠক-পাঠিকা। তারা এক মহাদেশ থেকে অন্য মহাদেশ পর্যন্ত বিস্তৃত, তাদের অন্তরাত্মায় আনন্দের ফোয়ারা দেখে আমার মন প্রফুল্লতায় ভরে যায়। আমার আত্মার শক্তি বিশ্বব্যাপী আত্মীয়তা বৃদ্ধি করে চলেছে। এর চেয়ে বড় সার্থকতা কবির জন্য আর কী হতে পারে?
সাঈদ চৌধুরী: লেখালেখি আপনার পেশা নাকি প্রশংসা ও পরিতৃপ্তির জন্য লেখেন?
আল মাহমুদ: আমি কবি। আমি স্বপ্নের কথা বললেও স্বপ্ন আমার খাদ্য নয়। আমি স্বপ্ন ভাঙিয়ে খুচরো পয়সার মতো নানা দুঃখ, অশ্রুজল ও অনুভূতি ক্রয় করে থাকি। যদিও লেখাটাই আমার পেশা। অন্য জীবিকায় যেতে মন চায়নি। আমার জাতির জন্য আমার যা করণীয় ছিল, তা করেছি, কোনো পুরস্কার বা তিরস্কার ভেবে নয়।
সাঈদ চৌধুরী: আপনিতো জীবন ও কবিতাকে দেখেছেন অভিন্ন দৃষ্টিতে, নতুন কিছু ভাবছেন কি?
আল মাহমুদ: ভাবনা-চিন্তার মধ্যে বহির্গমন ছাড়া নতুনত্ব আসেনা। বয়সের কারণে প্রতিবন্ধীর মতো বিছানায় পড়ে আছি। যদিও চোখ বন্ধ করে ভাবলে বহু দূর পর্যন্ত পেছনটা দেখতে পাই। তবে স্মৃতিভ্রষ্ট রোগে ভুগছি। অনেক কিছু মনে রাখতে পারি না। লেখার যে সতেজতা ও প্রাণশক্তি দরকার, সেটা তো আর নেই। হাত গুটিয়ে বসে থাকার মাঝেও এক ধরনের আরাম খুঁজি। কিন্তু তা হয়না। শেষ পর্যন্ত লেখাই আমার নিয়তি। লেখালেখির ব্যাপারে এখনো শ্রান্ত হয়ে পড়িনি। কেউ সাহায্য করলে এখনো অনর্গল বলে যেতে পারি।
সাঈদ চৌধুরী: কবিতা ও গল্পের মতো আত্মজীবনী রচনায় সাফল্য আপনার মুকুটে আরেকটি পালক যোগ করেছে! আপনার শৈশব ও বেড়ে ওঠার কোন্ স্মৃতি বার বার মনে পড়ে?
আল মাহমুদ: আমার জন্ম ও বেড়ে ওঠা বেশ স্মৃতি কাতর বিষয়। কবিতার প্রতি আমার আসক্তি এবং একদিন কবি হয়ে উঠা, আমার দেখা দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ, ভাষা আন্দোলন ও আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রাম- এসবই বিধৃত হয়েছে আমার উপন্যাসে। একটি পূর্ণাঙ্গ আত্মজীবনী লেখার ইচ্ছা আমার বহুদিনের। যেভাবে বেড়ে উঠি-তে অনেক কথা এসেছে। জীবনের খন্ড চিত্র বলা চলে। কবির মুখ বইটি হয়তো কিছুটা পূর্ণতা দেবে।
সাঈদ চৌধুরী: আপনার পিতৃপুরুষের গল্প শুনেছি। ধর্মপ্রচারক হিসেবে এদেশে তাদের আগমন।আপনার জীবনে তাদের প্রভাব কতটুকু?
আল মাহমুদ: আমি আমার নয় পুরুষের নাম জানি। আমাদের বাড়িতে একটা কুরসিনামা ছিল, তা থেকে আমি জেনেছি। এরা বাইরে থেকে এসেছিলেন। ধর্ম প্রচারক ছিলেন। সামাজিক জীবনে এদের ব্যাপক প্রভাব ছিল। রাষ্ট্রিয় উত্তান পতনে তারা নানা দিকে ছড়িয়ে পড়েছেন।
সুলতান শামসুদ্দিন ফিরোজশাহ ১৩০৩ খ্রিস্টাব্দে সিলেট ও উত্তর কুমিল্লা দখলে আনেন। এর দুই শতাব্দী পর আমার পূর্বপুরুষগণ এদেশে আসেন। তারা একটি ইসলাম প্রচারক দলের সাথে বাংলাদেশের ভাটি অঞ্চলে প্রবেশ করেন। এই অঞ্চলের দক্ষিণ দিকে শাহ রাসিত, উত্তর-পূর্ব দিকে শাহ গেছু দারাজ ও নুর নগর-বরদাখাত অঞ্চলের কাইতলার। এখানকার মীর পরিবারের ব্যাপক প্রচার-প্রচেষ্টায় গ্রামের পর গ্রাম ইসলামের দিকে ঝুঁকে পড়ে। কাইতলার মীরদেরই একটি শাখায় আমার উদ্ভব।
সম্ভবত ১৫০০ সালের দিকে ইসলাম প্রচারের জন্যই তারা এ অঞ্চলে আসেন। তাদের সম্পর্কে যা কিছু লিখেছি এর মধ্যদিয়ে এই শতকে সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারের সংস্কৃতি ও সামাজিক অবস্থান সম্যক অনুধাবন করা যাবে। তৎকালীন সামাজিক-সাংস্কৃতিক পরিবেশ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ইত্যাদি বিষয় সম্পর্কেও সঠিক ধারণা পাওয়া যাবে।
বৃটিশ ঔপনিবেশিক আমলে কাইতলার মীর পরিবারের এক সুদর্শন যুবক ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ইংরেজি স্কুলে ভর্তি হন। তার নাম ছিল মীর মুনশী নোয়াব আলী। পিতৃপুরুষের খানকার বাইরে এসে ইংরেজি পড়াশোনা করে স্থানীয় আদালতে চাকরি গ্রহণ করেন তিনি।
কর্মস্থলে বসবাসের সুবাদে শহরের ব্যবসায়ী মাক্কু মোল্লার কন্যাকে বিবাহ করেন মীর মুনশী নোয়াব আলী । এই শহরের গোড়াপত্তনকালে সমগ্র সরাইল পরগণায় নিজেদের প্রতিভা-প্রতিপত্তিতে যারা খ্যাতিমান ছিলেন মাক্কু মোল্লা তাদের অন্যতম। তিনি ছিলেন সফল ব্যবসায়ী, দানবীর ও পরহেজগার । মাক্কু মোল্লার পূর্বপুরুষগণ বহিরাগত ছিলেন না। তারা ছিলেন স্থানীয় মুসলমান। সুলতানী আমলের প্রথম দিকে তারা ইসলাম গ্রহণ করেন। এলাকায় তারা ছিলেন অত্যন্ত বিশ্বস্ত এবং ধর্মীয় কারণে সকলের শ্রদ্ধার পাত্র। এই মুনশী নোয়াব আলী হলেন আমার প্রপিতামহ। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মৌড়াইল মোল্লাবাড়ি হল অমার জন্মস্থান। এই বাড়িতেই ১১ জুলাই ১৯৩৬ খ্রিস্টাব্দে আমার জন্ম।
সাঈদ চৌধুরী: আপনার পুরো নাম মীর আবদুস শুকুর মাহমুদ। ডাকনাম পিয়ারু। আল মাহমুদ হলেন বিভাবে?
আল মাহমুদ: হ্যা! আমার পুরো নাম মীর আবদুস শুকুর মাহমুদ। নামটি অনেক বড় তো, তাই লেখালেখির প্রায় শুরুর দিকেই এডিট করে নামটি ছোট করে ফেলি, মাহমুদের আগে “আল” শব্দটি বসিয়ে হয়ে যাই আল মাহমুদ। “আল” শব্দটিকে ইংরেজিতে “The” বলা হয়।
আর আমার ডাকনাম ছিল পিয়ারু। সে-সময় কলকাতায় পিয়ারু নামে বিখ্যাত এক কাওয়ালি গায়ক ছিলেন। আমার আব্বা ছিলেন তার গানের ভক্ত। আমার জন্মের পর ওই কাওয়ালি গায়কের নামে তিনি আমাকে পিয়ারু বলে ডাকতেন। অনেক আদর করে রেখেছিলেন নামটি।
সাঈদ চৌধুরী: আপনি কোথায় লেখাপড়া করেছেন? তখনকার শিক্ষার পরিবেশ কেমন ছিল?
আল মাহমুদ: মক্তবের পাশাপাশি মিডল ইংলিশ স্কুলে ক্লাস সিক্স পর্যন্ত, জর্জ সিক্স হাই স্কুলে সেভেন, সীতাকুন্ড হাই স্কুলে এইট এবং নিয়াজ মোহামদ হাই স্কুলে নাইন-টেন করেছি। এরপর সারাট জীবন কতিতার চর্চাই করেছি।
প্রথম যে স্কুলে লেখাপড়া করেছি, আমাদের বাড়ি থেকে সেটা ছিল অনেক দূরে- নাম মিডল ইংলিশ স্কুল।
প্রথম দিন স্কুলে একটা আচকান পরে গিয়েছিলাম। ক্লাসে ঢুকেই দেখি, আমার সহপাঠী সবাই ব্রাহ্মণের ছেলে, উঁচুজাত। একদম শেষ বেঞ্চে একটা মুসলমান ছেলে ছিল- তার নাম রহমতুল্লাহ। একেবারে নিরীহ গোছের গরীব মানুষ। আমি ব্রাহ্মণ সহপাঠিদের পাশে বসলাম। বিষয়টি তারা সহজভাবে নেয়নি। এমনকি শিক্ষক মশাইও ভাল চোখে দেখেননি।
সেদিন যে শিক্ষক আমাদের ক্লাস নিলেন, তার নাম গজেন্দ্র বিশ্বাস। তিনি আমাকে বললেন, তুমিই মোল্লা বাড়ির ছেলে? আমি মাথা নাড়ালাম। স্যার তখন হাসতে হাসতে বললেন, এতদিন বামুন-কয়েতদের পিটিয়ে মানুষ করেছি, এখন মোল্লা এসে হাজির হয়েছে।
এই হলো ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দুদের আচরণ এবং একজন মুসলিম ছাত্রের বিড়ম্বনার চিত্র।একারণে ইংরেজি শিক্ষা ও সংস্কৃতিতে মুসলমানরা হিন্দুদের অনেক পিছনে ছিল। ধনবান হিন্দু অভিভাবকের সন্তান কর্তৃক মুষ্টিমেয় মুসলিম শিক্ষার্থী নিগ্রহের শিকার হতো।
সাঈদ চৌধুরী: ছোটবেলা থেকেই আপনার লেখালেখি শুরু। গ্রামীন পরিবেশে সাহিত্য চর্চার উৎসাহ পেলেন কীভাবে?
আল মাহমুদ: আমাদের বাড়ির পরিবেশটাই ছিল ভিন্ন রকমের। সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে তখন বাংলা ভাষা কম বলা হতো। বাইরে বাংলা বললেও বাড়ির ভেতরে উর্দু আর ফার্সির চল-ই ছিল বেশি। আমার দাদা-দাদি নিজেদের মধ্যে চোস্ত ফার্সিতে কথা বলছেন- ছেলেবেলায় এটা আমি নিজেই দেখেছি। আমার পরিবারের লোকজন কবিতা পড়তেন- উর্দু ও ফার্সি ক্লাসিকাল কবিতা। দাদির মুখেই প্রথম শুনেছি শাহনামা’র কাহিনি।
আমার দাদার নাম মীর আবদুল ওয়াহাব। তিনি কবি ছিলেন। জারি-সারি লিখতেন। তার একটা লেখা ছিল এমন- ”পত্র পায়া হানিফায়/শূন্যে দিল উড়া,/দুই ভাই মইরা গেল/ কবুতরের জোড়া।”
দাদার লেখা জারিগুলো খুব ভালো লাগত। গানগুলো গাইতে গাইতে সবাই ঘুরে ঘুরে নাচত। আমার আব্বাও গান-বাজনা পছন্দ করতেন। কিন্তু তাকে আমার নানা আবদুর রাজ্জাক বাদশার ব্যবসা-বাণিজ্য দেখতে হতো । ব্যবসার কারণে মাঝে মধ্যেই কলকাতায় মাল আনতে যেতে হতো তাকে। ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় জগত্বাজার ও আনন্দবাজারে আমাদের জুতা ও কাপড়ের দোকান ছিল। ফলে ব্যবসা সামলাতে গিয়ে আব্বার গানের শখ অকালেই থেমে গেল।
পারিবারিক সাহিত্য চর্চার একটা প্রভাব আমার মধ্যে জন্মেছিল। প্রথম যখন লেখালেখি শুরু করি, তখন আমি অষ্টম শ্রেণীতে পড়ি। আজ মনে হয়, দাদা কবিতা লিখতেন বলে পরিবারে আমার লেখালেখিও সাদরে গৃহীত হয়েছিল।
যখন আমি কিশোর ছিলাম, কবিতা রচনা বা সৃজন-মূহুর্তের উত্তেজনা সারাদিন আমাকে দখল করে রাখতো।নিজের লেখা বার বার পড়তাম।পড়তে পড়তে হাটতাম এবং হাটতে হাটতে পড়তাম। মুখস্ত হয়ে যেত।
সাঈদ চৌধুরী: প্রথম কবিতা লেখার অনুভূতি কেমন ছিল? কখন মনে হলো আপনিও কবি?
অল মাহমুদ: প্রথম কবিতা পড়তে ভালো লাগত- কেমন যেন ঘোরের মতো। রবীন্দ্রনাথ থেকে শুরু করে ত্রিশের দশকের সব কবির বই-ই পড়েছি। মনে আছে, জীবনানন্দ দাশের “ধূসর পাণ্ডুলিপি” পড়ে মনের মধ্যে কেমন যেন হলো। মনে হলো, এ এক অন্য রকম জিনিস! এভাবে পড়তে পড়তেই আগ্রহ জেগে উঠল- কী খেয়ালে লিখে ফেললাম কবিতা। তখন মনে হয়েছিল, আমিও তো পারি!’
কবি হতে কী কী করা লাগে, কোন পথে হাঁটতে হয়, প্রথম প্রথম সে-সবের কিছুই জানতাম না, কিন্তু ছোটবেলা থেকেই আমার সখ ছিল, আই উইশ টু বি অ্যা পোয়েট। তখন পত্র পত্রিকায় অনেক সংকোচ নিয়ে লেখা পাঠাতাম। সেটা ছাপা হয়ে যেত। সুখের কথা হলো, আমার কোনো লেখাই পত্রিকার সম্পাদকদের কাছ থেকে প্রত্যাখ্যাত হয়নি। এটাকে জীবনের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি বলে মনে হয়।
সাঈদ চৌধুরী: বাম রাজনীতিতে সম্পৃক্ত হলেন কিভাবে?
আল মাহমুদ: আমাদের এলাকায় লালমোহন স্মৃতি পাঠাগার নামে একটি লাইব্রেরি ছিল। ওখান থেকে বই নিয়ে পড়তাম। ছোটদের রাজনীতি, ছোটদের অর্থনীতি, ইতিহাসের ধারা – এসব বই। এটা চালাত কমিউনিস্ট পার্টির লোকেরা। মোল্লা বাড়ির ছেলের বইয়ের প্রতি অগাধ আগ্রহ দেখে তারা আমাকে খুব অ্যাপ্রিশিয়েট করতেন। চাইতেন আমি যেন বাম ঘরানার দিকে ঝুঁকে যাই।
তারা আমাকে বই দিতেন। ওই বইগুলো পড়ে মনে মনে কমিউনিজমের ওপর একটা আবেগের জায়গা তৈরি হয়েছিল। আমার ওপর বামপন্থার একটা প্রভাব ছিল। কিন্তু সেটা বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। কারণ, পরিবারের পরিবেশটা সে রকম ছিল না। রক্ষণশীল পরিবারের কারণেই বামপন্থি হওয়া যায়নি। মোল্লা বাড়িতে জন্মানোর কারণে ধর্মকে উপেক্ষা করে অন্য কোনো ধ্যান-ধারণায় যেতে পারিনি আমি। ধর্ম ও কমিউনিজম- এই দুই ধারা এক সময় মনের মধ্যে দ্বিধার তৈরি করেছে, কনফ্লিক্ট করেছে। আর দ্বন্দ্ব ছিল বলেই ধর্মের কাছে ফিরে আসতে পেরেছি আমি।
সাঈদ চৌধুরী: কবিতা লেখার কারণে আপনার বাড়িতে পুলিশী হানার ঘটনায় লেখক জীবনে কোন প্রভাব ফেলেছে কি?
আল মাহমুদ: মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষার আন্দোলনে যারা জড়িয়েছে, পাকিস্তান সরকারের পুলিশ তাদেরকে দমিয়ে রাখবার চেষ্টা করেছে। মামলা দিয়ে হয়রানির চেষ্টা করেছে। আমি তাদেরই একজন। ৫২-র ভাষা আন্দোলনের ঢেউ তখন মফস্বল শহর ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় আছড়ে পড়ছে। স্থানীয় ভাষা আন্দোলন কমিটির লিফলেটে আমার চার লাইন কবিতা ছাপা হয়েছিল। যে প্রেসে ছাপা হচ্ছিল সারাটা সকাল সেখানে কাটিয়ে বাড়ি ফিরছি। লিফলেটগুলো তখনো বিলি হয়নি। এরই মাঝে আমাদের বাড়িতে পুলিশ হানা দেয়।
আমি বাড়ির গেটে এসে পৌঁছা মাত্রই পুতুল নামে আমার এক খালাত বোন কোথা থেকে যেন দৌড়ে এসে বলল, পালাও। তোমাদের ঘরবাড়ি পুলিশ সার্চ করছে। তোমাকে খুঁজছে। বইপত্র সব তছনছ করে কী যেন খুঁজছে।
আমি একেবারে হতভম্ব হয়ে গেলাম। যেন একটা বাজপড়া মানুষ। পরক্ষণে সম্বিত্ ফিরে পেলাম। আমি অন্দরের দিকে পা বাড়ালাম। কিন্তু পুতুল বাধা হয়ে দাঁড়াল। না, যাবে না। খালুর অবস্থা ভাল না? এক শ তিন ডিগ্রি জ্বর এখন। খালা মাথায় পানির ধারা দিচ্ছে। তোমাকে এ অবস্থায় ধরে নিয়ে গেলে খালু হার্টফেল করবে। পালাও।
আব্বার অসুখের কথা বলে পুতুল আমাকে একদম নরম করে দিল। কিন্তু আমি কোথায় পালাব? পূর্বদিকে কলেজের মাঠ পেরিয়ে তিতাস পাড়ের শ্মশান ঘাটের দিকে হাঁটা দিলাম।
নেতৃস্থানীয়দের বাড়িতে হানা না দিয়ে পুলিশ আমাদের বাড়িতেই কেন প্রথম সার্চ শুরু করেছে? হাঁটতে হাঁটতে ভাবছিলাম। পরে অবশ্য জেনেছিলাম প্রেস থেকে লিফলেটের কপি ডিআইবির লোকদের হস্তগত হলে তারা আমার নামসহ কবিতা দেখতে পায়। এতে অন্য কারো নামধাম ছিল না- ছিল শুধু ভাষা আন্দোলন কমিটি।ফলে এই আন্দোলনে কারা কারা জড়িত আছে সে তথ্য বের করার জন্য আমাদের বাড়িতে হানা দিয়েছে।
এই ঘটনা আমার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। কবিতার জন্য অমি ঘরছাড়া হই। আমার কবিতার শক্তি আমি অনুভব করতে থাকি।
সাঈদ চৌধুরী: পুলিশী হানার পর এলাকা ছেড়ে কোথায় গেলেন? আবার বাড়ি ফিরলেন কবে?
আল মাহমুদ: ভাষা আন্দোলনের পক্ষে লেখার কারণে আমাকে ফেরার হয়ে যেতে হল। কবিতাটি ছাপা হওয়ার পর আর বাড়ি থাকতে পারলাম না। এখানে ওখানে বেশ ঘুরাঘুরি করলাম।অবশেষে এক চোরা কারবারির সঙ্গে সীমান্ত পার হয়ে পালিয়ে গেলাম কলকাতা। সে অনেক দীর্ঘ কাহিনী।
একসময় চট্টগ্রাম এসে আশ্রয় নিলাম। তারপর ঢাকায় এসে একটা সংবাদপত্রে চাকরি পেলাম্। মাঝখানে অনেক ঘুরেছি।আমি যখন গ্রাম থেকে নগরের দিকে ছুটে চলেছি। বহু পথ আমাকে পাড়ি দিতে হয়েছে। অনেক সংগ্রাম ও সাধনা করতে হয়েছে। জীবিকার জন্য বদলাতে হয়েছে অনেক স্থান। এখান থেকে ওখানে।এভাবে নানা জায়গায় অবস্থান করতে হয়েছে। সংবাদপত্রে চাকুরি, পত্রিকা সম্পাদনা, প্রকাশনা সংস্থায় কাজ, শিল্পকলা একাডেমিতে চাকুরি ও অবসর গ্রহন।
সবখানেই কবিতা আমার সাথী ছিল।চট্টগ্রামে থাকাবস্থায় প্রতিবেশী ছিলেন গায়ক শ্যামসুন্দর বৈষ্ণব। আমি তখন গোর্খা ডাক্তার লেন বলে জেলেপাড়ার দিকে একটা জায়গা আছে, সেখানে থাকতাম। ইকবাল ম্যানসন বিল্ডিংয়ের চারতলায়। কবিতা লিখি বলে শ্যামসুন্দর খুব খাতির করতেন আমাকে- একেবারে আগলে রাখতেন।
আমাদের পাশেই থাকতেন অনেক অ্যাংলো ইন্ডিয়ান নারী। আমাকে তারা কবি বলে ডাকতেন। তাদের সাথে এক ধরণের সখ্য গড়ে ওঠে। তাদের নিয়েই লেখা হয় আমার সবচেয়ে আলোচিত সনেটগুলো। চৌদ্দটা সনেটের মধ্যে প্রথম সাতটা একটানা লিখেছি। লেখার পর নিজেরই মনে হয়েছিল, অন্যরকম কিছু একটা লিখেছি। সবগুলোই বিভিন্ন পত্রিকায় ছাপা হলো। আলোচনা-সমালোচনার ঝড় উঠল। একসময় আমি নিজেও আমার কবিতার পাঠক হতে লাগলাম।
শব্দের বুঝি অদ্ভুত গন্ধ আছে, যা কেবল কবিরাই টের পায়। আমার মধ্যেও সেই অলৌকিক ঘ্রাণশক্তি অনুভব করে আমি মেতে উঠলাম। কবিতার জন্য সেই যে বাড়ি থেকে পালিয়ে এলাম, আমার আর বাড়ি ফেরা হয়নি। তবে কবি হতে পেরেছি। এর চেয়ে বেশি আনন্দের আর কী হতে পারে।
সাঈদ চৌধুরী: কুমিল্লা বা ব্রাম্মণবাড়িয়া একেবারে যাওয়া হয়নি আর?
আল মাহমুদ: বিভিন্ন অনুষ্ঠানে গিয়েছি।গ্রামে বসবাসের জন্য ফিরে যাওয়া আর হয়নি।কয়েকদিন আগে ভিক্টোরিয়া কলেজে গিয়ে ছিলাম। ছাত্র সংসদের রবীন্দ্র-নজরুল জয়ন্তিতে প্রধান অতিথি হিসেবে।যখনই কুমিল্লা আসি, মনে হয় যেন স্মৃতির সরোবরে অবগাহন করতে এসেছি। বাল্য ও কৈশোরের অবিশ্মরণীয় কত ঘটনা যে হাটতে হাটতে মনে পড়ে যায়। পার্কের ভেতর ঢুকতেই পাথরে নিজের দুটি কবিতার লাইন উৎকীর্ণ দেখে থমকে দাড়াই।
মনে পড়ে জেলা প্রশাসক সৈয়দ আমিনুর রহমানকে।যিনি আমার পঙক্তি দিয়ে কুমিল্লার পৌর উদ্যান সজ্জিত করতে চেয়েছিলেন।সন্নিহিত দিঘী বা সরোবরে ভেসে বেড়ানোর জন্য কয়েকটি সুন্দর বোটের ব্যবস্থাও তারই কীর্তি।আমি এগুলোর নাম দিয়েছিলাম ফেনা, বাতাসী, রাজহংসী ইত্যাদি। আমিনুর রহমান কী যে খুশি হয়েছিলেন এই নামগুলো পেয়ে।
সেদিন ময়নামতি দ্বেবীদ্বারের পথ দিয়ে যাবার সময় ইতিহাসের অধ্যায়গুলো অন্তরে আন্দোলিত হতে থাকে।প্রাচীন জ্ঞানের গুঞ্জনধ্বনি এখন ধ্বংসস্তুপের শেওলাপড়া রক্তবর্ণ ইস্টক প্রাচীরে ঝিঝির কান্না হয়ে মাথা কুটছে আমার পিতৃভূমি।
কুমিল্লায় ঢুকে শাসনগাছা পেরুলেই মনে পড়ে এখানেই তো বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুলের শ্বশুরবাড়ি। দৌলতপুরের সেই প্রাচীন নোনাধরা বাড়িটাতে জন্মেছিলেন নার্গিস আসার খানম। কবি নজরুল ইসলামের প্রথম নারী নার্গিস।সেই পুকুর পাড় যেখানে নজরুল বাশি বাজিয়ে নার্গিসকে পূর্ণিমার গোল চাঁদের নিচে টেনে আনতে চাইতেন।গীত রচনা করতেন।মোর প্রিয়া হবে এসো রানী, দেবো খোপার তারায় ফুল। সেই বৃক্ষটা এখনো আছে যার কান্ডে পিঠ রেখে নজরুল তার কাঠবিড়ালী, লিচু চোর লিখেছিলেন।
শুধু কি নজরুল! বুদ্ধদেব বসু, সঞ্জয় ভট্টাচার্য, অজয় ভট্টাচার্য, ওস্তাদ আলাউদ্দিন খা, আয়াত আলী খা- আরো কত প্রতিভার প্রথম আশ্রয়দাত্রী ছিল এই শহর।
আমি ভিক্টোরিয়া কলেজের রবীন্দ্র-নজরুল জয়ন্তিতে যখন মঞ্চে দাড়িয়েছি, তখন বুকটা ধক করে উঠল। এখানেই একদা কবিগুরু রবিন্দ্রনাথ এবং বিদ্রোহী কবি নজরুল বক্তৃতা করে গেছেন। নিজেকে খুবই সৌভাগ্যবান মনে হয়েছিল।
সাঈদ চৌধুরী: কোন কাগজে কবিতা ছাপার পর নিজেকে বেশি প্রফুল্ল মনে হয়েছে?
আল মাহমুদ: বুদ্ধদেব বসু সম্পাদিত ‘কবিতা’ পত্রিকায়। এখনো মনে আছে, বুদ্ধদেবকে একসঙ্গে তিনটি কবিতা পাঠিয়েছিলাম। ঠিকানা লিখে দিয়েছিলেন শহীদ কাদরী। তার হাতের লেখা খুব সুন্দর ছিল।
কবিতা পাঠানোর ক’দিন পর বুদ্ধদেব বসু’র চিটি পেলাম। পোস্টকার্ডে তিনি আমাকে জানিয়েছিলেন, প্রীতিভাজনেষু, তোমার একটি বা দু’টি কবিতা ছাপা যাবে বলে মনে হচ্ছে। সেই পোস্টকার্ডটি অনেকদিন পর্যন্ত আমি সংরক্ষণ করেছি। বাংলা ভাষার একজন নবীন কবির জন্য এটি ছিলে অসাধারণ প্রেরণা ও স্বীকৃতির বিষয়।
আমরা তখন একসাথে আড্ডা দিতাম। আমি, শামসুর রাহমান, ফজল শাহাবুদ্দিন, জহির রায়হান, কাইয়ুম চৌধুরী, শহীদ কাদরী সহ আরো অনেকে। তারাও ‘কবিতা’ পত্রিকায় লেখা পাঠায়। কিন্তু সবতো আর ছাপা হয়না। তখন বিউটি বোর্ডিং ছিল আমাদের আড্ডাখানা। একদিন শহীদ আমাকে কবিতা পত্রিকাটা দিয়ে বললেন, তোমার কবিতা ছাপা হয়েছে। আমিতো খুশিতে আত্মহারা। কিন্তু ওরা সকলেতো আর সমান খুশি হতে পারেনি।ওই সংখ্যায় জীবনানন্দ দাশের কবিতাও ছিল। আমার কবিতা ছাপা হওয়ায়, আমার আনন্দের কোনো সীমা ছিল না।
সাঈদ চৌধুরী: প্রথম জীবনে কোন কোন কাগজে কাজ করেছেন? কোনটি আপনার সেরা কাজ?
আল মাহমুদ: ১৯৫৪ সালে দৈনিক মিল্লাতে চাকুরি হয়। প্রুফ সেকশনে, প্রুফ রিডারের চাকুরি। রোকনুজ্জামান খান দাদা ভাই আমাকে সেখানে পাঠিয়ে ছিলেন। মিল্লাতের মালিক ছিলেন মোহন মিয়া।সম্পাদক ছিলেন সিকান্দার আবু জাফর। প্রুফ দেখতে গিয়ে পত্রিকার প্রায় সকল লেখা আমাকে পড়তে হয়েছে। এক ধরণের সম্পাদনার কাজও করতে হয়েছে। এ কাজে শব্দের বানান, ব্যাপ্তি, বিস্তৃতিতে আমার দখল বেড়েছে।
কবি আব্দুর রশীদ ওয়াসেকপুরী কাফেলা নামে একটি সাপ্তাহিক সম্পাদনা করতেন। মাঝে মধ্যে আমি ইসলামপুরে তার অফিসে যেতাম।কাফেলার মালিক নাজমুল হকও আমাকে চিনতেন।ওয়াসেকপুরী একসময় কাগজটি ছেড়ে দিলে নাজমুল হক আমাকে কাফেলায় নিয়ে আসেন। সহ-সম্পাদক পদে যোগদান করি। আমি সেখানে বহুদিন সম্পাদনার কাজ করেছি।
সাংবাদিকতা জীবনের একটি বড় অংশ জুড়ে আছে দৈনিক ইত্তেফাক। পঞ্চান্নর প্রথম দিকে শুরু করে স্বাধীনতা যুদ্ধ পর্যন্ত ইত্তেফাকের সঙ্গে যুক্ত ছিলাম। গল্পকার লুৎফুর রহমানের চেষ্টায় ও উৎসাহে ইত্তেফাকে আমার চাকরি হয়েছিল।জুনিয়র সাব এডিটর পদে। নির্দিষ্ট দায়িত্বের বাইরেও আমি প্রবন্ধ-নিবন্ধ ও কবিতা লিখতাম।
নিউজ এডিটর সিরাজ সাহেব আমার লেখায় মুগ্ধ হতেন।তার উৎসাহে একদিন মফস্বল বিভাগে যোগ দিলাম বিভাগীয় সম্পাদক হিসেবে। ইত্তেফাকে সারা দেশের সংবাদদাতাদের সাথে সংশ্লিস্ট মফস্বল বিভাগ খুবই গুরুত্বপূর্ণ ছিল। প্রায় ৫ বছর এই দায়িত্ব আন্জাম দিয়েছি। ইত্তেফাকে তোহা খান ও আবেদ খানের মত লোকের সাথে কাজ করেছি। এটা ছিল এক বিশাল ব্যাপার। বেশ কিছুদিন দৈনিক সংগ্রামে সহ সম্পাদক ও দৈনিক কর্নফুলীতে সম্পাদক হিসেবে কাজ করেছি।
সাঈদ চৌধুরী: স্বাধীনতা যুদ্ধে কিভাবে সম্পৃক্ত হলেন? কোথায় ছিলেন?
আল মাহমুদ: স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় কোলকাতায় চলে গেলাম। আমার ভগ্নিপতি তৌফিক ইমামের সহায়তায় অস্থায়ী রাষ্টপতি তাজ উদ্দিন আহমদ আমাকে একটি কাজ দিলেন। প্রবাসী সরকারের স্টাফ অফিসার পদে। ৮ নং থিয়েটার রোডে ছিলাম। দেশে চলমান যুদ্ধের খরব নেয়া ও লেখালেখি। পাকিস্তানি অত্যাধুনিক অস্ত্রের কাছে এদেশের মুক্তিকামী বাঙালিরা লাঠি, ফলা, তীর-ধনুক আর হালকা ধরনের অস্ত্র নিয়ে যুদ্ধে নেমে পড়ে ছিল। আমাদের বীর জনগণ সর্বশক্তি নিয়ে আক্রমণকারী সশস্ত্র পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ছে, সেই খবর ছড়িয়ে দেয়া ছিল আমাদের কাজ।
সাঈদ চৌধুরী: যুদ্ধের পর স্বাধীন বাংলাদেশে নতুন পথ চলা কেমন ছিল?
আল মাহমুদ: স্বাধীনতা যুদ্ধের পর ১৯৭২ সালে দেশে আসি। এখানে সবকিছু তখন ওলট-পালট হয়ে গেছে। ইত্তেফাকে যোগ দিতে চাইলাম।কিন্তু আফতাব আহমদ একটা নতুন কাগজ সম্পাদনার কথা বললেন।আ স ম আব্দুর রব সহ আরো অনেকে জড়িত ছিলেন।তাদের কথায় দৈনিক গণকণ্ঠ সম্পাদনা করি।
গণকণ্ঠ’র নিঃশঙ্ক সাংবাদিকতা এ দেশের পাঠক সমাজের কাছে ব্যাপকভাবে সমর্থিত হয়। স্বাধীনতা পরবর্তী বাংলাদেশের অস্থির রাজনীতি, দুর্ভিক্ষ, সর্বহারা আন্দোলন ও রক্ষীবাহিনী ইত্যাকার পরিস্থিতিতে দেশ তখন বিপর্যস্ত, আমাদের সংবাদ প্রকাশের স্টাইল ও সাহসী সম্পাদকীয় তখন দেশবাসীর হৃদয় স্পর্শ করে। কিন্তু অল্পদিনে পত্রিকাটি পরিণত হয় শাসক গোষ্ঠীর চক্ষুশূলে। ফলশ্রুতিতে ১৯৭৩ সালে আমাকে কারাবরণ করতে হয়। দৈনিকটিও বন্ধ করে দেয়া হয়।
সাঈদ চৌধুরী: কেন আপনাকে গ্রেফতার করা হল? কিভাবে গ্রেফতার হলেন?
আল মাহমুদ: শেখ সাহেব আমাকে স্নেহ করতেন। গ্রেফতারের কয়েকদিন আগে আমাকে ডেকে নিয়ে কথা বলেছেন।এমন কিছু বলেননি, এমন কোন ইঙ্গীতা বা বিষয়ও আলোচনা হয়নি যে, আমি গ্রেফতার হতে পারি। কিন্তু দু দিন পরই আমাকে গ্রেফতার করা হল। ঘড়িতে তখন রাত ২টার কাটা ছুই ছুই। গণকণ্ঠ অফিস থেকে বাসায় ফিরে কেবল খাওয়া-দাওয়া শেষ করেছি। তখনও বিছানয় যাইনি।পুলিশ এসে হাজির।আমাকে যেতে হবে। কী আর করবো। তারা আমাকে রমনা থানায় নিয়ে গেল। রাতে সেখানেই ছিলাম।পরদিন হাজতে পাঠিয়ে দিল।
জাতীয় প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি ভযেস অব আমেরিকার বাংলাদেশ প্রতিনিধি গিয়াস কামাল চৌধুরী জেল মুক্তির জন্য অনেক সহায়তা করেছেন। তখন তিনি ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি ছিলেন।
সাঈদ চৌধুরী: কারামুক্তির পর সংবাদপত্রে যুক্ত না হয়ে সরকারি চাকরিতে কেন গেলেন? কেমন কেটেছে ওই সময়টা?
আল মাহমুদ: কারামুক্তির পর বঙ্গবন্ধু আমাকে ডেকে নিয়ে শিল্পকলা একাডেমির প্রকাশনা বিভাগের সহপরিচালক পদে নিয়োগ দেন। পরে পরিচালক হয়েছি।আট বছর ছিলাম। ১৯৯৩ সালে ওই বিভাগের পরিচালকরূপে অবসর নেই।
শিল্পকলা একাডেমিতে যখন জয়েন করেছি, তখন একাডেমির মহাপরিচালক ছিলেন ড. সিরাজুল ইসলাম।তিনি আমাকে চেয়ারম্যান করে কতগুলো সাংস্কৃতিক গবেষণাসুত্র সন্ধানের জন্য একটি টিম গঠন করেন।আমার দায়িত্বে ছিল সিলেট, কুমিল্লা, নোয়াখালি, চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রাম।
দায়িত্বের অংশ হিসেবে আমি যেদিন সিলেট পৌছলাম, পূর্ব কথামত আমার বন্ধু আফজাল চৌধুরী রেল ষ্টেশনে ছিলেন অপেক্ষমান।সকাল বেলা ষ্টেশনে নেমে আমার কবি-বন্ধুটির অপেক্ষমান মুখচ্ছবিকে মনে হল বৃষ্টিসিক্ত নারঙি বনের মতো। আমি মাটিতে পা দিয়েই তাকে জড়িয়ে ধরে কোলাকোলি করলাম।তারপর চলে গেলাম কবির বাসায়।
আমার উপস্থিতির খবর শহরে চাউর হয়ে যাওয়ায় তরুণ কবিরা এসে ভীড় জমালেন।শুরু হল সংলাপ সাহিত্য-সংস্কৃতি ফ্রন্টের কবিতা পাঠ। কারো কারো তারুণ্যে উজ্জল মুখে যখন কবিত্বের চিহ্ন দেখি তখন মনটা প্রফুল্লতায় ভরে যায়। কী সুন্দর ঐসব মুখ আর কী অপার্থিব দীপ্তি।
বিকেলে শাহ জালালের (র.) মাজারে যাব। কিন্তু প্রবল ধারায় বৃষ্টি নেমে এল। সিলেটের বুনো বৃষ্টি।হিমালয়ের পর্বতশিরার প্রান্তসীমার প্রতিক্রিয়া।কাছেই তো আসামের চেরাপুঞ্জি। পৃথিবীর সর্বাধিক বারিপাতের বারান্দা। আমি এই বিপুল বর্ষণ সন্ধ্যায় মাজার জিয়ারতে গেলাম।খাদেম সাহেব গোলাপজল ছড়িয়ে দিলেন মাজারের চতুরদিকে।বৃষ্টির মধ্যে গোলাপের সৌরভ সারাটা আঙিনাকে মাতিয়ে তুলল।
তেলাওয়াতের পর মোনাজাতের জন্য যখন প্রস্তুত হলাম আমার চোখের সামনে প্রবল বর্ষণের মধ্যে এক দৃশ্যান্তর অনুভব করলাম। আমি আজও জানি না তা আমারই মানসিকতার ইল্যশন বা প্রতিচ্ছবি কিনা।আমি দেখলাম কবরের পাশে দাড়িয়ে আছেন এক মধ্যযুগীয় বীর যোদ্ধা।সারা শরীর লৌহবর্মে আবৃত, মাথায় ইসপাতের হেলমেট।হেলমেটের চূড়ায় নীল ইস্পাতের চাঁদ চকচক করছে।তার মুখে সুন্দর করে ছাটা কালো দাড়ির শোভা।আর তরবারির সোনালী বাটটি পর্যন্ত আমি স্পস্ট দেখতে পাচ্ছি।ঈষৎ হাসিতে আমার প্রতি যেন প্রীতি প্রকাশ করছেন।সফেদ দন্তপঙক্তিতে দৃঢ়তার ছাপ।
মাজার থেকে বেরিয়ে আফজাল চৌধুরীকে ঘটনাটি বললাম। তিনি আমাকে জড়িয়ে ধরে চিৎকার দিয়ে বললেন, আপনি সৌভাগ্যবান।মানবতার জন্য জীবন উৎসর্গকারী ইয়ামেনের বীর যোদ্ধা ও দরবেশ হযরত শাহ জালাল কে আপনি দেখে ফেলেছেন।আপনি তার সমাজ সংস্কারের উত্তরাধিকারী হবেন। কথাটি শুনে আমি আনন্দে কেঁদে ফেললাম।
সাঈদ চৌধুরী: চাকুরী থেকে অবসর নিয়ে আবার সাংবাদিকতায়! কেমন কাটলো কর্ণফুলিতে?
আল মাহমুদ: চাকুরি থেকে অবসর নিয়ে ফিরে আসি সাংবাদিকতা পেশায়। অন্য কিছু করার আগ্রহ একেবা্রেই ছিলন না।চট্টগ্রাম থেকে প্রকাশিত দৈনিক কর্ণফুলি’র সম্পাদক হিসেবে বেশ কিছুদিন কর্মরত ছিলাম। এক নতুন রকম সাংবাদিকতার কাব্যময় ভাষা, উপমা, চিত্রকল্পের জন্ম দিয়ে পাঠকদের চমকে দেবার চেষ্টা করেছি।
সাঈদ চৌধুরী: আপনার লেখায় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কেমন প্রভাব প্রতিফলিত হয়েছে?
আল মাহমুদ: দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পৃথিবীকে ওলট-পালট করে দেয়। একজন কবির মানসলোক পাল্টে যায়। পরিচিত পৃথিবীর দৃশ্যপট বদলাতে থাকে। সভ্যতার ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়াবহ যুদ্ধ এটি। ১৯৩৯ থেকে ১৯৪৫ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়সীমা ধরা হলেও এর আগে এশিয়ায় সংগঠিত কয়েকটি সংঘর্ষকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অংশ হিসেবে গণ্য করা হয়। পূর্ব এশিয়ায় একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তারের লক্ষে জাপান চীনে আক্রমণ করে। পরবর্তী কালে জার্মানি পোল্যান্ড আক্রমণ করে এবং তার ফলে ফ্রান্স ও যুক্তরাজ্য জার্মানির বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে।
১৯৪১ সালের জুন মাসে ইউরোপীয় অক্ষশক্তি সোভিয়েত ইউনিয়ন আক্রমণ করে। ফলে সমর ইতিহাসের সর্বাপেক্ষা বৃহৎ রণাঙ্গনের অবতারণা ঘটে। দানা বেঁধে উঠে স্নায়ুযুদ্ধ। এভাবেই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ বিশ্বমঞ্চে অভিনব এক নাটকের অবতারণা করে।
বাংলা কবিতায় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, দেশ ভাগ, দাঙ্গা, দুর্ভিক্ষ- এ রকম একটা সময় আমাদের বুকের ওপর দিয়ে বয়ে গেছে। প্রাগৈতিহাসিক কাল থেকে কবি-সাহিত্যিকেরা বিরামহীনভাবে যুদ্ধের বিরুদ্ধে কলম ধরেছেন। বিশ্ব সাহিত্যের প্রথম দিকে যুদ্ধ-বিরোধী কবিতা লেখেন হোমার। তারপর পৃথিবীর প্রায় সব বিখ্যাত কবিই যুদ্ধ-বিরোধী কবিতা লিখেছেন। আমাদের লেখায় তখন বরাবরই উচ্চারিত হয়েছে মানবতার মুক্তি ও মর্যাদার কথা। মানুষের অধিকারের কথা। মানবতার জয়গান উৎসারিত হয়েছে কবি আত্মার গভীর থেকে এবং জীবনের স্বাভাবিক দাবিতে।
সাঈদ চৌধুরী: ঢাকায় এসে লেখক হয়েছেন নাকি গ্রামে থেকেই নিজেকে একজন লেখক মনে করেন?
আল মাহমুদ: গ্রামে থাকাবস্থায় আমার কবিতা বেরিয়েছে কলকাতার কাগজে। চতুষ্কোণ, চতুরঙ্গ, ময়ুখ ও কৃত্তিবাস-এ অনেক লেখা ছাপা হয়েছে। তখনই নিজেকে কবি ভাবতে শুরু করি। কবিতার ডালপালায় চড়ে বেড়াতে থাকি। কবিতার শব্দরাজি আহরণের জন্য সাতার দিয়েছি দেশের নদ-নদিতে। শব্দের সন্ধানে ছুটে বেড়িয়েছি লোক থেকে লোকান্তরে।
সাঈদ চৌধুরী: আপনার কবিতা লেখার অবলম্বনটা কি ছিল?
আল মাহমুদ: একটা চিত্রকল্প থেকেও কবিতা তৈরি করেছি। অনেক সময় একটা শব্দ থেকেও। তবে বই বা বউ, জ্ঞান বা প্রেম কবির জন্য অপরিহার্য। কবির অভিজ্ঞতার কোন বিষয় নির্ধারিত থাকেনা। সম্মুখবর্তী ঘটনা কিংবা চাক্ষুস কোন দৃশ্য, মোহিনী-ঝলসিত মেঘপুঞ্জের আকর্ষিক দীপ্তির কথা ডাইরিতে লিখে আমি কোন কবিতা নির্মাণ করতে পারিনি।মনে হয় হৃদয়ের ভিতর প্রত্যেক কবির যে তারিখ বিহীন ডায়রি থাকে তা থেকে সৃজন-মূহুর্তে ছিটকে পড়ে অভিজ্ঞতাই আমার কবিতা।
বই প্রথাগত আবেগ, ছন্দের সিদ্ধি ও মাত্রা জ্ঞান কবি হৃদয়ে সঞ্চার করে দিতে পারে।মাখলুকাত গ্রন্থে মাকড়সার জালের মত ছড়ানো সৌন্দর্যের রহস্যভেদ পাঠ করে আমার মতো কবির ধ্যানশক্তি বেড়ে যায়।
বউয়ের সাথে প্রেম করে সৃস্টির গুঢ় রহস্য উদ্ভাবন করা যতটা সহজ, বাড়ির অঙিনায় কিংবা নাট্যপাড়ায় পরনারির কাছে তা বাতুলতা মাত্র। প্রেম হলো মানব সম্পর্কের সবচেয়ে অদ্ভূত ও জটিল বিষয়ের নাম। বউয়ের কাছ থেকে আমি নরনারির জীবনের বহু রহস্যময় অন্তরালকে উন্মোচনের যথাসাধ্য চেষ্টা করেছি।আমার কোন কোন সমালোচক বিদ্রুপাত্মক ভাষায় এটাকে গৃহপালিত প্রেম আখ্যায়িত করে নিজেদের পরকীয়া অভিসার অব্যাহত রাখায় সচেষ্ট ছিলেন।
সাঈদ চৌধুরী: খনার সনেটগুলো কখন লিখেছিলেন?
আল মাহমুদ: খনা একজন প্রাচীন কবি। আমাদের দেশে জন্মেছিলেন। আবহাওয়া দেখে কৃষিকাজের জন্য ভবিষ্যদ্বাণী করতেন তিনি। প্রকৃতির কবি। সনেট পঞ্চক তো অ্যাকচুয়ালি ঐতিহ্যবাহী কবিতা। যদি বর্ষে আগুনে, রাজা যায় মাগনে, এসব বিষয় এসেছে খনার কবিতা থেকে। এর প্রতি আমার মুগ্ধতা তৈরি হয়েছিল। সে মুগ্ধতা থেকে আমি খনার সনেটগুলো লিখেছিলাম। এগুলো যে এতো ভালো হবে আমিও বুঝতে পারিনি।
সাঈদ চৌধুরী: প্রথম গল্প কখন ও কোথায় প্রকাশিত হয়েছে?
আল মাহমুদ: প্রথম গল্প প্রকাশিত হয়েছে ১৯৫৪ সালে কলকাতার দৈনিক সত্যযুগ পত্রিকায়। মুক্তিযুদ্ধের অব্যবহিত পরে দৈনিক ‘গণকণ্ঠ’ সম্পাদনার সময় বেশকিছু গল্প লিখেছি। তখন সবাই স্বীকার করে নেন, আল মাহমুদ শুধু কবি নন, গল্পকারও। এ সময় পানকৌড়ির রক্ত, কালোনৌকা, জলবেশ্যা প্রভৃতি গল্পগুলো ব্যাপক সাড়া জাগায়।
১৯৬২-৬৩ সালে কপোতাক্ষ প্রকাশনা সংস্থা আমার একটি বই বের করে। আমরা তখন বিউটি বোর্ডিংয়ে আড্ডা দিতাম। মুহাম্মদ আখতার নামে এক তরুণের উদ্যোগে কবি-সাহিত্যিক-শিল্পীরা মিলে এই সংস্থা গড়ে তুলে ছিলেন। অনেক চিত্রশিল্পী ও চলচ্চিত্র নির্মাতা সাথে ছিলেন। তারা সিদ্ধান্ত নিলেন, আল মাহমুদের একটা বই করে দেয়া দরকার।সবাই মিলে প্রকাশ করলেন আমার “লোক লোকান্তর”। বইটির প্রকাশনা অনুষ্ঠান বাংলা একাডেমিতে হয়েছিল। চমৎকার বক্তব্য রেখেছিলেন প্রফেসর সৈয়দ আলী আহসান।
সাঈদ চৌধুরী: বিষয় বৈচিত্রে আমাদের কবিতায় নতুনত্ব পাচ্ছিনা। আপনার কী ধারণা?
আল মাহমুদ: কিছু কিছু কবিতা নতুন আঙ্গিকে লেখা হচ্ছে। কিছুটা নতুনত্ব আছে। বাকিরা যেন একটা চরে আটকে আছে। অধিকাংশ কবিতা গতানুগতিক। কোন ছন্দ নেই, অন্ত মিল নেই। শুধু আমি’ আরতুমি’! কোন বক্তব্য নেই। বক্তব্য ছাড়াতো আঙ্গিক দাঁড়ায় না। এটাকে বাংলা কবিতার দুর্গতি বললে অত্যুক্তি হবে না।
অবশ্য ছন্দহীন লেখাও কবিতা হতে পারে। রবীন্দ্রনাথ অনেক ছন্দহীন কবিতা লিখেছেন। চন্দ না থাকলে এর অভাব অন্যকিছু দিয়ে পূরণ করতে হবে। নইলে মানুষ পড়বে না। আজকাল অনেকেই তো গদ্য কবিতা লিখছে। কয়টা কবিতা পাঠকের মনে থাকে? কবি সমর সেনও গদ্যে কবিতা লিখেছেন। সেখান থেকে আমি অনেক কবিতা মুখস্থ বলতে পারবো। ‘তুমি তৃষ্ণা তুমি পিপাসার জল’ শিরোনামে আমার একটি কাব্যগ্রন্থ আছে। এক্ষেত্রে আমি নতুনত্ব আনার চেষ্টা করেছি।
সাঈদ চৌধুরী: ছোটগল্পের আপনার তেজোময় প্রকাশ ঘটলে কবিতা লেখায় কখনো নিরুৎসাহিত বোধ করেছেন কিনা?
আল মাহমুদ: কবিতার মতো গল্পেও নিজেকে সার্থক মনে করেছি। সমালোচকদের কাছে কবিতার পাশাপাশি কথাসাহিত্যে আমার আবির্ভাব একটি যুগান্তকারী ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। ছোটগল্পের সংকলন ‘পানকৌড়ির রক্ত’ এতোটা পাঠকপ্রিয়তা পায় যে, আমাকে যারা অপছন্দ করতো, ঈর্ষা করতো, তারাও লুকিয়ে লুকিয়ে বইটি পড়েছে।
বন্ধু শহীদ কাদরী গদ্যকার আল মাহমুদকে নিয়ে অনেক উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছেন। জসীমউদ্দিন শিল্পতরুতে আমার গদ্যের অসম্ভব প্রশংসা করেছেন।আবু রোশদও আমার গদ্য নিয়ে লিখেছেন।হুমায়ুন আজাদ, শীব নারায়ন রায় সহ আরো অনেকে আমার গদ্যের প্রশংসা করেছেন।
আমি মনে করি, গল্প-উপন্যাসে আমি যে সাফল্য দেখিয়েছি তা আমার কবি প্রতিভার জন্য। আমার গদ্য আমার কবিতারই অংশ। আমি কবি হতে চেয়েছিলাম, কবি হয়েছি।
জার্মান লেখক গুল্টার গ্রাস নোবেল পুরষ্কার পেয়েছেন। গল্পে সুখ্যাতি পেলেও কবিতা ছেড়ে দেননি।বরং কবি হিসেই আমার কাছে তিনি শ্রদ্ধার পাত্র।
সাঈদ চৌধুরী: আপনার সেরা গল্প কোনটি? অন্যদের মাঝে গদ্যে কারা ভাল করছেন?
আল মাহমুদ: অনেকে বলেন, পানকৌড়ির রক্ত আমার সেরা গল্প। হতে পারে।তবে পানকৌড়ির রক্ত গ্রন্থে সব কটা গল্পই আমার কাছে সেরা মনে হয়।
জলবেশ্যা নিয়ে অনেক লেখালেখি হয়েছে। জেলেদের নিয়ে লেখা কালো নৌকা বিদেশে অনুদিত হয়েছে।গন্ধবণিক শুরুতেই বড় বড় লাইব্রেরিতে স্থান করে নিয়েছে। সৌরভের কাছে পরাজিত গল্পে আমি রাজনীতির সামাজিক বিপর্যয় তুলে ধরেছি। একসময় দিশেহারা বাম রাজনীতির ছেলে-মেয়েদের হাতে হাতে ছিল। আমার পরিক্ষামূলক গল্পের মধ্যে একটি জটিল গল্প হল- নফস। যাদিদ ও আতসী নামে দুটি জ্বীনের চরিত্র।ধমীর্য় বিশ্বাস থেকে একটি ভিন্ন ধারার গল্প আমি তৈরী করি। এটাযে মানুষ এতো বেশি পড়বে, তা নিজেও ভাবিনি।
আমাদের সময়ে যারা গল্প লেখেন তাদের মধ্যে হুমায়ুন আহমদ ও সৈয়দ শামসুল হক গল্পকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে এসেছেন। শাহেদ আলী ও আতা সরকারের গল্পে মুন্সিয়ানা আছে।শওকত আলী, জ্যোতি প্রকাশ দত্ত সহ আরো অনেকে কিছু কিছু ভাল গল্প লিখেছেন।
সাঈদ চৌধুরী: আপনার সেরা উপন্যাস কোনটি? এ সময়ে উপন্যাসে আর কারা সফল হয়েছেন বলে আপনি মনে করেন?
আল মাহমুদ: কবি ও কোলাহল, উপমহাদেশ এবং কাবিলের বোন ব্যাপক সাড়া জাগায়। এরপর পুরুষ সুন্দর, নিশিন্দা নারী, মরু মুষিকের উপত্যকা এবং আগুনের মেয়ে পাঠক প্রিয়তা পেয়েছে। ডাহুকী উপন্যাসের চরিত্ত্রে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পতিতালয় সাহিত্যে আমি তুলে এনেছি। এতোজন এটা পড়বে তা আমার ধারণা ছিলনা।গল্পের মতো ছোট হলেও বিষয় বর্ণনায় নিশিন্দা নারী পাঠক প্রিয় উপন্যাস।
কাবিলের বোন সম্পর্কে প্রফেসর সৈয়দ আলী আহসান লিখেছেন, কবি আল মাহমুদের এ এক অসাধারণ কৃতিত্ব। সর্বাংশে দ্বিধামুক্ত হয়ে একটি সময়ের শাসনের মধ্যে দুটি ভিন্ন ভাষার জীবনকে তিনি পরস্পরের প্রতি মমতার আকর্ষণে একত্রিত করেছেন। এটা কম দক্ষতার পরিচয় নয়। কাবিলের বোন উপন্যাসের মধ্যে জীবনের যে অঙ্গীকার ব্যক্ত হয়েছে তা দীর্ঘকাল পাঠকের মনে রেখাংকন রেখে যাবে।
আগুনের মেয়ে উপন্যাসে জ্বীনেদের চলাচল বিধৃত হয়েছে। মুসলমান হিসেবে আমি জ্বীনে বিশ্বাস করি। আধুনিক লেখকদের অনেকে বলেছেন, এটা একটা অভাবনীয় কাজ হয়েছে। এরাবিয়ান নাইটসের মতো পৃথিবী খ্যাত উপন্যাসে জাদুর যে অলৌকিকতা আছে, আগুনের মেয়ে তা ছাড়িয়ে গেছে বলে কেউ কেউ মনে করেন।
হুমায়ুন আহমদ, আক্তারুজ্জামান ইলিয়াস, শওকত আলী, সেলিনা হোসেন কয়েকটি সারা জাগানো উপন্যাস লিখেছেন।হুমায়ুন আহমদ অনেক বেশি সফলতা পেয়েছেন।
সাঈদ চৌধুরী: আমাদের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে সাহিত্যমান সম্পন্ন লেখা খুবই কম। এর কারণ কী হতে পারে?
আল মাহমুদ: ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধ তো আমরা করেছি। দেশ স্বাধীন করেছি। দেখতে হবে মুক্তিযুদ্ধে এদেশের কয়জন লেখক-কবি অংশ গ্রহণ করেছিলেন।দু’একজন যারা করেছেন তাদের কথা আমরা জানি। আমার উপমহাদেশ ও কাবিলের বোন একজন মুক্তিযোদ্ধার প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার ফসল। সত্য ঘটনা অবলম্বনে। মুক্তিযুদ্ধের ওপর কেউ যদি কাজ করে থাকে, তা আমি-ই করেছি।
সাহিত্য হলো নিজের অভিজ্ঞতা থেকে, অন্তরঙ্গতা থেকে সৃষ্ট হয়। কোনও নকল কিছু শেষ পর্যন্ত ধোপে টেকে না। শামসুর রাহমান যখন ‘বন্দী শিবির থেকে’র পাণ্ডুলিপি কলকাতায় আবু সয়ীদ আইয়ুবের কাছে পাঠান আমি তখন সেখানে ছিলাম। এটা পড়ে কখনও তো মনে হয়নি তিনি বন্দী শিবিরে ছিলেন! তার অনেক সীমাবদ্ধতা ছিল। সমস্যায় ছিলেন তিনি। ফলে দেশত্যাগ করতে পারেননি। এজন্য অবশ্য তাকে দোষ দেয়া যায় না।
সাঈদ চৌধুরী: আপনাদের সময় লেখক সাহিত্যিকদের মধ্যে ঈর্ষা কাতরতা বেশী ছিল বলে মনে হয়। আপনার অভিমত কি?
আল মাহমুদ: ঠিক মনে হয়নি। আমি, শামসুর রাহমান, শহীদ কাদরী ও ফজল শাহাবুদ্দিন- আমরা চার বন্ধু ছিলাম। আমাদের মধ্যে গভীর সম্পর্ক ছিল। একসঙ্গে কাব্যরচনা শুরু করেছিলাম। নিজস্ব বলয়ে সকলেই দাড়িয়েছি।
শামসুর রাহমান আমার ভাল বন্ধু ছিলেন। বয়সে একটু বড় ছিলেন। আমি তাকে সবসময় সম্মান দিয়ে এসেছি। আমি তার বিবাহের অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত ছিলাম। যখন কারাগারে ছিলাম, তখন তিনি আমাকে দেখতেও গিয়েছিলেন। শেষের দিকে তার কবিতায় পৌনঃপুনিকতা এসেছে। তিনি প্রচুর লিখতেন বা লিখতে বাধ্য হতেন। হয়তো তিনি সব সময় পত্রিকায় সবার উপরে থাকতে চেয়েছেন। এতে তার কোনও উপকার হয়নি।
আমাদের সময়ে আরো অনেকে লিখতেন। মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান, মোহাম্মদ মাহফুজুল্লাহ, আবু হেনা মোস্তফা কামাল, জিয়া হায়দার, ওমর আলী, আসাদ চৌধুরী, আব্দুল মান্নান সৈয়দ, আফজাল চৌধুরী, দিলওয়ার। আরো পরে আসলেন আবিদ আজাদ, নির্মলেন্দু গুন, মতিউর রহমান মল্লিক, সোলায়মান আহসান, হাসান আলীম, মুকুল চৌধুরী, তমিজ উদদীন লোদী, মোশাররফ হোসেন খান, রেজাউদ্দিন স্টালিন, খন্দকার আশরাফ হোসেন, আসাদ বিন হাফিজ, রুদ্র মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ, নিজাম উদ্দিন সালেহ প্রমুখ। এদের অনেকে সফল হয়েছেন। তাদের সাথেও আমার প্রীতিভাব ছিল। আরো অনেকে লিখতেন। সকলে কবি হতে পারেনি। যারা সফল হয়নি তাদের কারো কারো মধ্যে কাব্যহিংসা ছিল। থাকাটা অস্বাভাবিক নয়। ঈর্ষা কাতরতা মানুষের এক ধরণের সহজাত প্রবৃত্তি।
সাঈদ চৌধুরী: অগ্রজদের ব্যাপারে আপনার মূল্যায়ন কি?
আল মাহমুদ: আমি জীবনানন্দ পড়েছি বার বার। জীবনানন্দ দাস জনপ্রিয় কবি ছিলেন। আমার সোনালী কাবিন প্রকাশের আগে প্রেম ও প্রকৃতি নিয়ে তার মতো লেখা যাবে এটাতো অঘটনীয় ব্যাপার ছিল।
জসীমউদ্দীনের নকশিকাঁথার মাঠ কিংবা সোজন বাদিয়ার ঘাট কী অপূর্ব। ‘কাল সে আসিবে মুখখানি তার নতুন চরের মতো’। এই যে উপমার প্রয়োগ, এটা অসাধারণ। জসীমউদ্দীনতো নবেল পুরষ্কার পাওয়ার মতো কবি। তার গদ্য যে এতো সুন্দর তা বোঝা যায় যখন ঠাকুর বাড়ির আঙিনায় বা চলে মোসাফির বইটা পড়া হয়। অসাধারণ এক গদ্যশক্তির অধিকারী ছিলেন তিনি।
রবীন্দ্রনাথ কে নিয়ে আমার কয়েকটি লেখা আছে। তিনি নবেল পুরষ্কার পেয়েছেন। রবীন্দ্র রচনার ব্যক্তি এবং সৌন্দর্যবোধ আমাকে মুগ্ধ ও বিস্মিত করে। ছন্দ, উপমা ও উৎপ্রেক্ষা এক কথায় অনন্য। তবে আমাদের এখানে মহাকাব্যের যে সম্ভাবনা ছিল রবীন্দ্রনাথ তা শেষ করে দিলেন। নিজে মহাকাব্য লিখতে পারেননি বলে আর কেউ পারবে না এমন নয়, রবীন্দ্রনাথের এটা একটা ফালতু অজুহাত। আধুনিক সময়ে মহাকাব্য হতে পারে।
আমাদের কাজি নজরুল ইসলামও নবেল পুরষ্কার পাওয়ার যোগ্য। অসম্ভব জ্ঞানী লোক ছিলেন। সাহসী বিপ্লবী ছিলেন। আমি নজরুলের কবিতার ভক্ত। তার গানও অসাধারণ। কিন্তু আমি গান নিয়ে বেশি ঘাটাইনি।
‘রাত পোহাবার কতো দেরী পাঞ্জেরী?’ ফররুখ আহমদের কী আশ্চর্য লাইন! ফররুখ আহমদ ছিলেন প্রখর বুদ্ধিসম্পন্ন। পাখির উপর লেখা তার ছড়া তো অমর কাজ। তার জীবনটা ছিল আলিফের মতো। মহৎ ও সুন্দর মনের একজন মানুষ।
মাইকেল মধুসুদনও আধুনিক কবি। সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ একজন বড় লেখক। তার কাজ কম হলেও লেখক হিসেবে তিনি অনেক বড় ছিলেন। লালসালু, বাহিপীর, কাদো নদী কাদো, চাদের আমাবশ্যা এগুলো খুবই জনপ্রিয় সাহিত্য।
মীর মশাররফ হোসেন অসাধারণ গদ্য চর্চার পরিচয় দিয়ে গেছেন। আব্দুল্লাহ উপন্যাসে কাজী ইমদাদুল হকের গদ্য শক্তি অসাধারণ। সৈয়দ আলী আহসান, আহসান হাবীব, শাহেদ আলী, আক্তারুজ্জামান, শওকত ওসমান নিজেদের অবস্থান তৈরী করেছেন।
বিদেশী ভাষার কবিদের মধ্যে ইউরোপের টেড হিউজ, তুরস্কোর এলহামবাগ, ইরানের তাহারাত সফরজাদি, ভারতের ফজলে আলী, সরদার জাফরী সহ অনেকের সাথে জানাজানি বা সখ্যতা ছিল। যারা কালোতীর্ন হয়েছেন।
সাঈদ চৌধুরী: উপমহাদেশের রাজনীতি চেতন কবিতার উত্তরাধিকার ধারণ করে আপনি উজ্জীবিত। কবিতার চেয়ে আপনার ছড়ায় অনেক বেশি রাজনীতি পরিলক্ষিত হয়। আপনি কি বলেন?
আল মাহমুদ: আমি যুগপৎভাবে দৈশিক ও বৈশ্বিক রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সাক্ষী। ভাষা আন্দোলন ও স্বাধীনতা সংগ্রামে উজ্জীবিত ছড়া/কবিতায় এইসব প্রতীক উপমার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বাঙালির সংগ্রামের ইতিহাস। ভাষা আন্দোলন থেকে স্বাধীনতা সংগ্রাম। আমরা তখন রাজপথে। বামপন্থিরা ছয়দফায় বিশ্বাসী ছিলেন না। শেখ সাহেবের ছয়দফা তারা মানতো না। তাই এনিয়ে তারা লিখেনি। আমি লিখেছি। মুক্তিযুদ্ধেও অনেক বামপন্থি সম্পৃক্ত হয়নি। ফলে আমাদের স্বাধীনতা নিয়ে তাদের কোন ভাল লেখা নেই।
রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, অন্নদা সংকর, সুকুমার রায় ছড়া সাহিত্যে অনেক অবদান রেখেছেন। সুকুমার রায়ের রাম ছাগলের ছানা, হাসতে নাকি মানা- কী অসাধারণ। ধান ফুরালো, পান ফুরালো, বর্গী এলো দেশে- এসব ছড়া এক সময় কদর পেয়েছে। ছড়ায় তীর্যক বা বিদ্রুপাত্মক শব্দ দিয়ে রাজনৈতকি ধাক্কা সৃস্টি করা হতো। আবুল খায়ের মুসলেহউদ্দিন, সকুমার বড়ুয়া, সাজ্জাদ হোসাইন খান, আবু সালেহ, লুৎফুর রহমান লিটন সহ অনেকে ছড়া লিখে ভালো জনপ্রিয়তা পেয়েছেন।
ফেব্রুয়ারির একুশ তারিখ / দুপুর বেলার অক্ত / বৃষ্টি নামে, বৃষ্টি কোথায় / বরকতেরই রক্ত।
হাজার যুগের সূর্যতাপে / জ্বলবে, এমন লাল যে, / সেই লোহিতেই লাল হয়েছে / কৃষ্ণচূড়ার ডাল যে!
ট্রাক! ট্রাক! ট্রাক! / শুয়োর মুখো ট্রাক আসবে / দুয়োর বেঁধে রাখ।
কেন বাঁধবো দোর জানালা / তুলবো কেন খিল? / আসাদ গেছে মিছিল নিয়ে / ফিরবে সে মিছিল।
আমার এসব ছড়া এখনো আলোচিত হয়। আমি যে একুশের ছড়া বা উনসত্তরের ছড়া লিখেছি তা শিশুরাও আবৃতি করে। পাখির কাছে ফুলের কাছে কিংবা একটা পাখি লেজঝোলা- এগুলো শিশুদের কাছে খুবই প্রিয়।
সাঈদ চৌধুরী: কবি হবেন একটু অন্য মনস্ক আর কবিতা হবে ছন্দবদ্ধ। এমন ধারণা কতোটা সঠিক?
আল মাহমুদ: কবি হবেন স্বাপ্নিক মানুষ। তাকে হতে হবে বাস্তব বুদ্ধি সম্পন্ন। মাওলানা রুমী কবি ছিলেন। অনেক জ্ঞানের আকর ছিলেন। ওমর খৈয়াম, ফেরদৌসী এরাও অনেক জ্ঞানের অধিকারী ছিলেন। আধুনিক কবিদের সেরকম হতে হবে। শুধু প্রেম-প্রকৃতি জানলে চলবেনা। স্থাপত্যকলাও জানতে হবে। বিজ্ঞান ও টেকনোলজি সম্পর্কে জ্ঞান থাকতে হবে। সমকালীণ চিন্তা-ভাবনায় প্রখর হতে হবে। আকাশ, গ্রহ, নক্ষত্র নিয়ে লেখার মত যোগ্যতা থাকতে হবে।
ঘরসংসার বাদ দিয়ে কবি হওয়ার মানসিকতা বদলাতে হবে। ষাটের দশকে রফিক আজাদ, নির্মলেন্দু গুন, মোহাম্মদ রফিক সহ আরো অনেকের বউ চলে গেল। অন্যের বউয়ের সাথে ঘুরার একটা ফ্যাসন চালু হল। সৃস্টি হল পারিবারিক সংঘাত। তখন আমি লিখেছিলাম- সবাই বলে ভাঙো, ভাঙো, কেউ কি কিছু ভাঙে।/ষাটের দশক বগল বাঝায় বউ কেড়ে নেয় লাঙে। এ নিয়ে অনেক প্রতিক্রিয়া হয়েছে। কিন্তু বাস্তবতায় ফিরে আসা ছাড়া কোন গত্যন্তর ছিলনা।
কবিতায় অবশ্যই ছন্দ থাকতে হবে। কবির পরিচয় তার ছন্দের জ্ঞানে। লেখায় ছন্দের তরঙ্গ থাকতে হবে, মিলের তরঙ্গ এসে যোগ হবে- তখনই হবে কবিতা। কবিতা হলো ছন্দবদ্ধ নিগূঢ় উপলব্ধি। উপমা উৎপ্রেক্ষায় তরঙ্গ সৃস্টি হবে এবং ছন্দ মিলে লেখা হবে ঝর্ণার মতো। পয়ার ও মাত্রাবৃত্ত দুটুতে আমি কাজ করেছি। আবার একই কবিতায় মাত্রাবৃত্ত ও স্বরবৃত্ত ব্যববহার করেছি। এমনকি মুক্ত ছন্দেও লিখেছি। ছন্দ জানা থাকলে নানা ভাবে খেলা যায়। আমার ইউসুফের উত্তর কবিতায় এধরনের মিশ্র শব্দের ব্যবহার আছে।
সমর সেন গদ্য লিখেছেন। তবে তার একটা নিজস্ব ষ্টাইল ছিল্। এক ধরণের ছন্দবদ্ধ। ফলে তিনি হয়তো আমাদের টানতে পেরেছেন। কিন্তু সবাইকে পারেননি। দস্তভয়স্কি উপন্যাস লিখেছেন। ক্রাইম এন্ড পানিশমেন্ট। এর ভাষা, বিষয়, অনুভূতি, বর্ণনা মিলিয়ে দেখলে মনে হবে এক ধরণের মাহাকাব্য। টলস্টয়’র ওয়ার এন্ড পিস – এতো মহাকাব্য। যদিও ছন্দবদ্ধ ভাষায় লেখা নয়।
সাঈদ চৌধুরী: আপনি বলেছেন ঢাকাই হবে বাংলা সাহিত্যের রাজধানী। তখনতো কোলকাতায় লেখা পাঠিয়ে সকলেই ধন্য হতেন?
আল মাহমুদ: বাংলা ভাষার জন্য এদেশের মানুষ জীবন দিয়েছে। একুশে ফেব্রুয়ারী আমরা জন্ম দিয়েছি। একটি জাতির একটি ভাষা। সারবিশ্বে বাংলা সাহিত্যের একটা আলাদা অবস্থান আছে। তাই ঢাকাই হবে বাংলা সাহিত্যের রাজধানী। এ কথা আমিই প্রথম বলেছিলাম। পরবর্তী সময়ে আমার প্রয়াত বন্ধু সুনীল গাঙ্গুলীও স্বীকার করেছেন এবং এ উক্তি মেনে নিয়েছেন। বাংলা সাহিত্যে সুনীলও কিছু কাজ করে গেছেন। বন্ধু হিসেবে তাকে খুব ফিল করি। কোলকাতার আরো অনেকে ভাল বাংলা উপহার দিয়েছেন। কিন্তু এটা তাদের জাতীয় ভাষা নয়। সেদেশের অতিশয় ক্ষুদ্র অংশের মানুষ বাংলা ব্যবহার করে।
এটা সত্য, একসময় কোলকাতায় লেখা ছাপা হলে আমরা পুলকিত হতাম। একটা স্বীকৃতি বলেই মনে হতো। আমি, শামসুর রহমান, শহীদ কাদরী সকলেই এমনটা করেছি। এটা এক ধরণের হীনমন্যতা। স্বাধীন জাতি হিসেবে এটা আমরা এখন কাটিয়ে উঠেছি।
সাঈদ চৌধুরী: নতুন শতাব্দির কবিতা হচ্ছে সহজ ও প্রাণবন্ত। একজন আধুনিক কবি হয়ে আপনি স্বচ্ছ ও বোধগম্য কবিতার বিপক্ষে কেন?
আল মাহমুদ: রহস্যময়তা কবিতাকে ছায়াচ্ছন্ন রাখুক, এটাই আমার সাম্প্রতিক কালের কাব্যাদর্শ।কবিতা কাচের মতো স্বচ্ছ করে তোলার আমি ঘোর বিপক্ষে। ছন্দ ও অন্তমিল না জানার ফলে ভাষার আয়ত্ব না থাকার কারণে সম্ভবত এই সহজতাটাই কবিদের কাম্য হয়েছে।
আমাদের আধুনিক কবিদের একটা ম্বাভাবিক প্রবনতা আজকাল দেখতে পাচ্ছি, তারা গদ্য ভাষার যৌক্তিকতার দোহাই পেড়ে কবিতাকে স্বচ্ছ ও বোধগম্য করার জন্য এক ধরণের সহজতাকে অবলম্বন করছেন। আমি নিজে তখনই গদ্য কবিতা লিখি যখন গদ্য ভাষায় আমি রহস্যের নিগূঢ়তা নির্মাণে সক্ষম হই।
সাঈদ চৌধুরী: একজন সমালোচকের দৃষ্টিতে কবিতায় আপনি কখনো আধুনিক আবার কখনো মৌলবাদী।এই বৈপরিত্য কেন?
আল মাহমুদ: সোনালী কাবিন লেখার পর আধুনিক কবি হিসেবে আমার স্বীকৃতির কোন প্রয়োজন হয়নি। সর্বত্র আলোচনার ঝড় বইছে। সোনালি কাবিন বা কালের কলস বাংলা সাহিত্যে শ্রেষ্ঠতম শৈল্পিক সৃস্টি হিসেবে মনে করা হয়।
আমার মায়ের সোনার নোলক হারিয়ে গেল শেষে / হেথায় খুঁজি হোথায় খুঁজি সারা বাংলাদেশে। ‘বাঙলা’ মায়ের হারানো সম্পদ ও ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনতে একজন কবি সদা সরব। এই ‘নোলক’ বাঙলা মায়ের যুগসঞ্চিত প্রাণ-ঐশ্বর্যের প্রতীক হয়ে ওঠেছে।
মায়াবী পর্দায় দূলে ওঠো- দেশের সামাজিক সংঘাত ও জেল জুলুম মিলিয়ে একটা আধুনিক কাব্য হয়েছে। এর মধ্যে আধ্যাত্বিকথাও আছে।
কোরআনের আয়াত আমি কবিতায় নিয়ে এসেছি। প্রতীকী ভাবে হুদহুদ পাখির কাহিনী এনেছি। এতে যে রাজনৈতিক কবিতা রয়েছে তা নিয়ে ক্লাসে প্রশংসা করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপক আবুহেনা মোস্তফা কামাল।
তবে হ্যা! এক সময় ধর্ম নিয়ে পীর নিয়ে কবিতা লিখে অবিশ্বাসিদের আমি ভাবিয়ে তুলেছি। আমার শেষ কবিতার বই, নদীর ভেতরে নদী- এতে পুনরুত্থানের ফুৎকার নামে কবিতায় যে শৈলী ও চিত্রকল্প তা পাঠক মনে রাখবে।
রাসুলুল্লাহ’র (সা) যুগে কবিতা মসজিদের মিম্বরে পাঠ হয়েছে। আমিও কবিতাকে মসজিদের দিকে নিয়ে এসেছি। এটাকে তারা হয়তো মৌলবাদী বুঝাতে চায়। এটা তাদের অজ্ঞতা বা হীনমন্যতা ছাড়া আর কিছু নয়।
শিল্পী লেখকের সত্য সুন্দরের কাছে আত্মসমর্পনের ঘটনা আমাদের সময়েও আছে। বন্ধু কবি আবু জাফর সাম্প্রতিক কালে সবচেয়ে মননশীল গান বা গীত রচয়িতা হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেছেন।যার একটি গান সামান্য নির্জনাতা পেলে আমার মতো বেসুরা মানুষও গেয়ে উঠি- এই পদ্মা, এই মেঘনা, এই যমুনা সুরমা নদী তটে… ।
তিনি হঠাৎ একদিন তার স্ত্রী সুকন্ঠি গায়িকা ফরিদা পারভীন সহ আমার বাসায় এলেন।বললেন মাহমুদ ভাই আমার সমস্ত শিল্পকর্ম- কবিতা, গান ও সুর সবই মহান প্রভূর উদ্দেশ্যে নিবেদিত। আমি চমকে তাকালাম এই দম্পতির স্বর্গীয় লাবন্যের দিকে।আমার বিবেচনা ও বিচারবোধ সতেজ হয়ে ছড়িয়ে পড়ল নিজেরই আত্মবিশ্বাসের ওপর।
সাঈদ চৌধুরী: আপনি অনেক দেশের সাহিত্য সম্মেলনে গিয়েছেন। ভারতে এশিয় কবিতা উৎসবে প্রতিনিধিত্ব করেছেন। আমাদের সাহিত্য সম্পর্কে তাদের মূল্যায়ন কি?
আল মাহমুদ: ভারতের ভুপালে এশিয় কবিতা উৎসবে অংশ গ্রহণের সৌভাগ্য আমার হয়েছিল। এর বছর দুয়েক আগে ঢাকায় এশিয় কবিতা উৎসবের অভিজ্ঞতা আমাদের ছিল। প্রতিবেশী দেশ সমূহের সাহিত্যিকগন স্ব স্ব দেশের সাহিত্যকে কতটা সমৃদ্ধ করেছেন তা জানার প্রত্যাশা থেকেই ছিল এই উৎসবের আয়োজন। কবিতা কেন্দ্রের উদ্যোগে এটি হয়েছিল। আমিও তাতে সম্পৃক্ত ছিলাম।
সোভিয়েত রাশিয়ার নন্দিত কবি কুগোলতিনভ, জাপানের জনপ্রিয় কবি কুওজোসাতো, ইরানের বিপ্লবী কবি তাহেরা সফরজাদেহ, তুরস্কে এই সময়ের শেষ্ঠ কবি ইলহান বার্ক, ভারতের অন্যতম সেরা কবি সচ্ছিদানন্দ বাৎসায়ন, শ্রীলংকার কবি এ্যাডমান, নেপালের মধাব ঘিরেমী সহ অনেক নামী ও জ্ঞানী লেখক এসেছিলেন।
বিদেশী কবি ব্যক্তিত্ব যে কয়দিন বাংলাদেশে ছিলেন তাদের কবিতার স্বাদ, বিচিত্র প্রকাশভঙ্গী ও স্বপ্রতিভ কাব্যালোচনায় আমরা সকলেই প্রাণসিক্ত ও অভিভূত হয়েছি। তারাও আমাদের কবিতা সম্পর্কে জেনে নিজ নিজ দেশের সংবাদ মাধ্যমে অত্যন্ত জোরালো প্রশংসা করেছেন।
ঢাকার পরই ভুপালের ভারত ভবন ট্রাষ্ট সরকারি সহযোগিতায় দ্বিতীয় এশিয় কবিতা উৎসবের আয়োজন করে। সে উৎসবে আমি বাংলাদেশের পক্ষ থেকে কবিতা আবৃতি ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্রে বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী অবস্থান তুলে ধরেছি।
অনুষ্ঠানে বোম্বায়ের সেলিম পীরাদিনা আমার কবিতার ইংরেজি অনুবাদ পাঠ করামাত্র সারা হল হাত তালিতে ফেটে পড়ে। ভারতের বর্তমান কালের শ্রেষ্ঠ উর্দু কবি আলী সরদার জাফরীর মত স্বনামখ্যাত ব্যক্তিত্ব আসন ছেড়ে এসে আমাকে সাধুবাদ জানান। পশ্চিমবঙ্গের সুভাষ মুখোপাধ্যায় আমার প্রতি তার গভীর স্নেহ ব্যক্ত করেন। এশিয় দেশ থেকে আগত প্রায় সকল কবি সাহিত্যিক আমার কবিতা ও আবৃতি শুনে প্রাণবন্ত উচ্ছাস প্রকাশ করেন।
তখন মনে হয়েছে, আমাদের দেশের অনেক লেখক-সাহিত্যিক একটি বিষয়ে ক্ষুদ্রতা ও হীণমন্যতা থেকে বেরিয়ে আসতে পারেননি। নিজের বন্ধুদেরও ভাল লেখার স্বীকৃতি দিতে তারা খুবই কৃপন বলেই মনে হয়। পৃথিবীর অন্য কোন জাতির মধ্যে এমনটি দেখিনি।
লন্ডনে আমাকে নিয়ে সাহিত্য অনুষ্ঠান হয়েছে। ম্যানচেষ্টার, ওল্ডহাম, বেডফোর্ড সহ বিলেতের অনেক শহর ঘুরেছি। আমেরিকায়ও গিয়েছি। নিউ ইয়র্ক থেকে ওয়াশিংটন পর্যন্ত ঘুরে বেড়িয়েছি। প্যারিস, ইরান, আরব আমিরাত আর সাউদি আরবের জেন্দা ও আমার প্রিয় মক্কা-মদীনায় যাবার সৌভাগ্য আমার হয়েছে। সর্বত্রই কবি ও কাব্যমোদিদের দ্বারা পরিবেষ্ঠিত ছিলাম। যেখানেই গিয়েছি, সেখানকার ভাষার রূপ রস আশ্বাদনে সচেষ্ট হয়েছি। বিদেশী সাহিত্যের অজস্র সোনালী শস্য থেকে যৎসামান্য আমাদের ভূমিতে ফলানো যায় কিনা তানিয়েও ভেবেছি।
লন্ডন কিংবা নিউইয়র্ক সবখানে আমাদের প্রবাসিদের সাংস্কৃতিক তৎপরতায় আমি মুগ্ধ ও আশান্মিত হয়েছি। আমাদের কবি সাহিত্যিকদের লেখা বিশ^ময় বিভিন্ন ভাষায় ছড়িয়ে দেয়ার লক্ষে সাম্প্রতিক কালে লন্ডনে সংলাপ সাহিত্য-সংস্কৃতি ফ্রন্ট ও আল মাহমুদ ফাউন্ডেশন যে কার্যক্রম হাতে নিয়েছে তার সাফল্যের ঝান্ডা তুলনারহিত কৃতিত্বের সাথে অব্যাহত আছে।
সাঈদ চৌধুরী: আপনি কেমন জীবন চেয়েছিলেন? প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির মধ্যে ব্যবধান কততুটু?
আল মাহমুদ: আমি নিয়তিতে বিশ্বাস করি। আমি তো আমার জীবন সাজাইনি। এই জীবন আমার অদৃষ্ট সাজিয়েছে। আমার তো সাধ্য নেই কিছু বদলাবার। এ জীবনের সব অংশই আমার কাছে সমান গুরুত্বপূর্ণ। এর কোনো অংশ না থাকলে জীবন অপূর্ণ থাকত। আসলে মানুষকে প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির মধ্যেই দোল খেতে হয়।