[ডক্টর মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান কবি ফররুখ আহমদের এক পুত্র মাসুদের বন্ধু। সে সুবাদে কবি-পরিবারের সাথে তাঁর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক স্থাপিত হয়। কবির কবিতা তাঁকে বিশেষভাবে আকৃষ্ট করে। ফলে কবির প্রতি তাঁর অগাধ শ্রদ্ধা জন্মে। কবির শেষ জীবনের দুঃসহ অবস্থা তিনি স্বচক্ষে অবলোকন করে মর্মপীড়া বোধ করেন। তাঁর মৃত্যুর পর কবির কাব্যসম্ভার সংরক্ষণ, প্রকাশ ও কবি-পরিবারের সাহায্যে তিনি যথাসাধ্য চেষ্টা করেন। এখানে তাঁর সে সময়কার তৎপরতা সম্পর্কে একটি আলেখ্য তুলে ধরা হলো।-সম্পাদক]

অধ্যাপক আবুল ফজল চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ছিলেন। একসময় আমার বিশ্ববিদ্যালয়ের বন্ধু মাসুদের বাবা কবি ফররুখ আহমদের অনাহারে করুণ মৃত্যুর পর আমি তাঁদের পরিবারের আর্থিক সহায়তার কাজে জড়িয়ে পড়ি। আমি তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ি। আমাদের পরিবার তখন চট্টগ্রামে, যেখানে আমার আব্বা কলেজে শিক্ষকতা করতেন। কবি ফররুখ আহমদ তখন ভিন্নমত অসহিষ্ঞুতার শিকার। তাই ফররুখ-পরিবারকে সহায়তা করার জন্য কী করা যায়, তা নিয়ে বাবার বন্ধু অধ্যাপক আহমদ শরীফের সঙ্গে আলাপ করি। এ ব্যাপারে চট্টগ্রামে কার সঙ্গে আলাপ করা যায় জিজ্ঞেস করলে তিনি অধ্যাপক আবুল ফজলের নাম বলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছুটি হয়ে গেলে আমি চট্টগ্রামে চলে যাই। সেখানে গিয়ে উপাচার্য অধ্যাপক আবুল ফজলের নুর আহমদ সড়কের বাসায় দেখা করি। সেখানে আমরা ফররুখ স্মৃতি তহবিল গঠন করি এবং এই তহবিলের জন্য সাহায্য চেয়ে একটি বিবৃতি প্রচার করা হয়।

বিবৃতিতে অধ্যাপক আবুল ফজল, আবু হেনা মোস্তফা কামাল, মাহবুবুল আলম, নাট্যকার মমতাজউদ্দীন আহমদসহ চট্টগ্রামের বিশিষ্ট বুদ্ধিজীবীরা স্বাক্ষর করেন। এ ব্যাপারে অর্থসাহায্য সংগ্রহের জন্য অগ্রণী ব্যাংক চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ শাখায় একটি অ্যাকাউন্ট খোলা হয়। প্রথমে সংগৃহীত পাঁচ হাজার টাকা, অধ্যাপক আবুল ফজলের একটি চিঠি ও ডিমান্ড ড্রাফটসহ কবিপত্তনীকে পাঠানো হয়। চিঠির অংশবিশেষ নিচে উদ্ধৃত করা হলো:
‘বেগম কবি ফররুখ আহমদ, আপনার স্বামী মরহুম কবি ফররুখ আহমদের অকালমৃত্যুর জন্য দেশের আরও বহুজনের মতো আমরাও অত্যন্ত মর্মাহত। তাঁর জীবদ্দশায় তাঁর প্রতি সুবিচার করা হয়নি-এ অপরাধে আমরাও অপরাধী। তাঁর জন্য এখন দুঃখ আর অনুশোচনা করে লাভ নেই। কবি আজ এসবের অতীত। আমাদের বর্তমান দুর্ভাবনা আমরা কীভাবে আপনার ও আপনার ছেলেমেয়ের কিছুটা অন্তত দুঃখ লাঘব করতে পারি। এ উদ্দেশ্যে আমরা চট্টগ্রামে ‘‘ফররুখ স্মৃতি তহবিল’’ নামে কিছু অর্থ সংগ্রহের উদ্যোগ নিয়েছি, আমরা কতখানি সফল হলাম বলতে পারছি না। আপাতত হাজার পাঁচেক টাকা আমাদের তহবিলে সংগৃহীত হয়েছে। সেই টাকাটার একটা ব্যাংক ড্রাফট এই সঙ্গে পাঠাচ্ছি। প্রাপ্তি স্বীকার করলে বাধিত হব। ব্যক্তিগতভাবে আমি মাননীয় শিক্ষামন্ত্রীকেও আপনাদের জন্য কিছু সরকারি সাহায্য বরাদ্দের জন্য একখানা চিঠি লিখেছিলাম। তাঁরা কিছু করেছেন কি না, আজও জানতে পারি নাই। আপনাদের আপত্তি না থাকলে আমরা এই সাহায্যের কথা কাগজে প্রকাশ করতে চাই। তাহলে আমাদের বিশ্বাস, এই অবহেলিত কবির অবদানের প্রতি জনগণের দৃষ্টি আকৃষ্ট হবে।’

এছাড়া অধ্যাপক আবুল ফজল আমাকে বলেছিলেন, ‘আমি ঢাকায় গিয়ে এ ব্যাপারে বঙ্গবন্ধুর সাথে কথা বলব।’ কথা অনুযায়ী তিনি বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে গণভবনে দেখা করলে বঙ্গবন্ধু নারায়ণগঞ্জের আওয়ামী লীগ নেতা, যত দূর মনে পড়ে মোস্তফা সারোয়ারকে বকা দিয়ে বলেন, ‘কবি ফররুখ আহমদ অর্থকষ্টে অনাহারে মারা গেলেন, তোরা তো কেউ আমাকে কিছু জানালি না।’ বঙ্গবন্ধু তাঁর স্বভাবসুলভ মহানুভবতায় প্রধানমন্ত্রীর তহবিল থেকে কবি-পরিবারের সাহায্যের জন্য পাঁচ হাজার টাকা মঞ্জুর করেন এবং বলেন, তিনি স্বয়ং এটা কবি-পরিবারকে পৌঁছে দেবেন। আবুল ফজল সাহেব বলেন যে, তিনি বঙ্গবন্ধুর পক্ষে এটা কবি-পরিবারকে পৌঁছে দেবেন। তিনি কবিপত্মীর সঙ্গে দেখা করে চেকটা তাঁকে পৌঁছে দেন। এরপর আমরা কবির সাহিত্যকর্ম প্রচার ও এর সংরক্ষণের জন্য উদ্যোগী হই। কবি-পরিবার থেকে জানতে পারি যে তাঁর বেশ কিছু অপ্রকাশিত পান্ডুলিপি রয়েছে। ফররুখ স্মৃতি তহবিলের সভায় সিদ্ধান্ত হয় যে, ‘ফররুখ আহমদের শ্রেষ্ঠ কবিতা’ প্রকাশ করা হবে এবং এর বিক্রয়লব্ধ অর্থ দিয়ে কবি-পরিবারকে সাহায্য করা হবে। আবার অধ্যাপক আবুল ফজলের স্বাক্ষরে বইটি প্রকাশের জন্য অর্থসাহায্য চেয়ে আবেদন করা হয়। তদনুযায়ী ‘ফররুখ আহমদের শ্রেষ্ট কবিতা’ প্রকাশিত হয়। এটি সম্পাদনা করেন বিশিষ্ট কবি, সমালোচক আব্দুল মান্নান সৈয়দ।

ফররুখ আহমদের বিষয়ে এখানে বিস্তারিত আলোচনার কারণ হলো, আদর্শিক দিক থেকে অধ্যাপক আবুল ফজল ও কবি ফররুখ আহমদ ছিলেন দুই বিপরীত মেরুর বাসিন্দা।

অধ্যাপক আবুল ফজল নিজেও ফররুখ আহমদের শ্রেষ্ঠ কবিতার ‘প্রসঙ্গ কথা’য় লিখেছেন: ‘-তাই তাঁর তিরোধানে এমন একটা শূন্যতার সৃষ্টি হয়েছে, যার জন্য আমরা বিপরীত-মনারাও বেদনাবোধ না করে পারি না।’

এতৎসত্ত্বেও ভিন্নমতাবলম্বী একজন কবির পরিবারকে আর্থিক সহায়তা ও তাঁর সাহিত্যকর্ম প্রচার ও সংরক্ষণের জন্য তিনি কী না করেছেন! আজকের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে এমন কোনো নজির পাওয়া যাবে কী?

লেখক সাবেক সচিব।