২০১৫ এর জুন মাসে কবি আল মাহমুদের সাথে চট্টগ্রামের সাহিত্যবোদ্ধাদের এক মনোরম আড্ডা বসে। সে আড্ডায় প্রস্তাব হয় ‘নোঙর’ এর পরবর্তী (তেইশতম) সংখ্যা হবে ‘কবি আল মাহমুদ সংখ্যা।‘ আনুষ্ঠানিকভাবে সে কথা জানানোও হলো কবিকে। কবিকে সাক্ষী রেখে সিদ্ধান্ত নেয়ার কারণ, ভালোবাসার সাথে সাথে যাতে দায়িত্ববোধের তীব্রতা থাকে। প্রচুর উৎসাহের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সবাই কাজে ঝাঁপিয়ে পড়লাম। বছরখানেক প্রস্তুতি শেষে বোঝা গেল সংখ্যাটি গায়ে-গতরে বড় হবে। এর সাইজ ‘নোঙরে’র প্রচলিত সাইজের রেকর্ড ছাড়িয়ে যাবে। তাতেও আমাদের উৎসাহের অভাব হলো না।

হঠাৎ ছন্দপতনের আবহ। কর্ম ব্যপদেশে আমাকে চলে যেতে হলো বগুড়া। কিন্তু হতোদ্যম হবার সুযোগ নেই। বিশেষ সংখ্যার কাজগুলো চলতে থাকল যথারীতি। বগুড়ার অবসরগুলো আল মাহমুদ চর্চার নব আনন্দে ভরে উঠল। প্রুফগুলো চট্টগ্রাম থেকে প্রসেস করে কবি ইকবাল করিম রিপন ও আবু সাঈদ হান্নান পাঠাতেন আমার কাছে। সেগুলো বরং একাকীত্বে আমাকে নতুনভাবে সন্দীপিত করত। ফলে কাজগুলো প্রায় গুছিয়ে আনা সম্ভব হয়েছিল বগুড়ার প্রবাসে।

ছয় মাসের মাথায় স্বপ্নময় বগুড়া বাস শেষে কুমিল্লা চলে এলাম। বৃহত্তর কুমিল্লায় কিছুটা ঘুরে বেড়ানো আমার পেশাগত দায়িত্ব। কবির শৈশবের নদী তিতাস আর মেঘনা বিধৌত ব্রাহ্মণবাড়িয়া, আখাউড়া, আশুগঞ্জ, নবীনগর, বাঞ্ছারামপুর, দাউদকান্দি ইত্যাদি এলাকা ঘুরি আর মনে মনে কবির বর্ণনার সাথে বাস্তবের নদী ও জনপদের মিল খুঁজতে থাকি। তাঁর গল্প উপন্যাসে চিত্রিত দৃশ্যাবলী আর চরিত্রগুলো কোথায় লুকিয়ে আছে, এতদঞ্চলের মাটি-মানুষ আর ইতস্তত ছড়ানো নদ-নদীতে তাদের সন্ধান করি। এর সাথে ‘নোঙরে’ প্রকাশিতব্য লেখাগুলোর পঠন-পাঠন ও সুলুকসন্ধান মনে অনির্বচনীয় আনন্দ এনে দেয়। ফাঁকে ফাঁকে চট্টগ্রাম গেলে সংশ্লিষ্টদের সাথে বসে সংকলনের অগ্রগতি পর্যালোচনা করি।

কাজটা সত্যি খুব দেরি হয়ে যাচ্ছিল। খবর আসে, কবির স্বাস্থ্য দিন দিন ভেঙে পড়ছে। মনে মনে সন্দেহ — কবির জীবদ্দশায় সংখ্যাটি প্রকাশ পাবে তো ? আমাদের আকাঙ্ক্ষা কি পূরণ হবে ? সকল জল্পনার অবসান ঘটিয়ে অবশেষে ২৭ এপ্রিল ২০১৭ কবি ইকবাল করিম রিপন খবর দিলেন প্রথম চালানের একশ’ কপি ‘নোঙর’ এখন তার হাতে। ৪৭৬ পৃষ্ঠার তেইশতম ‘নোঙর’ আল মাহমুদ সংখ্যা হাতে পেয়ে প্রায় বাইশ মাস নিরবচ্ছিন্ন কষ্টের অবসান হলো। সাথে দূর হয়ে গেল সন্দেহ-সংশয়-অবসাদের যন্ত্রণা। অনেক অপেক্ষা শেষে আমাদের বাসনা কিছুটা হলেও পূরণ হলো।

কবি বেঁচে থাকতেই যখন এটি প্রকাশ পেলো, দ্রুত সিদ্ধান্ত নিলাম,ঢাকা গিয়ে সরাসরি ‘নোঙর’ তুলে দেবো কবির হাতে। চট্টগ্রাম থেকে সংশ্লিষ্ট সবার ঢাকায় যাওয়া সহজসাধ্য নয়। সম্পাদক চৌধুরী গোলাম মাওলা কিংবা নির্বাহী সম্পাদক ইকবাল করিম রিপনকে সঙ্গী করা সম্ভব হলো না। অবশেষে চট্টগ্রামের দুই তরুণ আবু সাঈদ হান্নান ও বশির উল্লাহ সাইমুম ঢাকা রওয়ানা হল ৫ মে ২০১৭। সকালবেলা কুমিল্লা থেকে রওয়ানা হয়ে প্রথমে গেলাম ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগর। পথের অপ্রত্যাশিত সমস্যার জন্য অতিরিক্ত সত্তর মাইল রাস্তা ঘুরে ঢাকা পৌঁছাতে হল। তবুও উৎসাহের এতটুকু অভাব নেই। পথে খবর পেলাম অসুস্থ কবি বাসায় নেই, হাসপাতালে। তাই সরাসরি ইবনে সিনা হাসপাতালে পৌছালাম, যেখানে অপেক্ষা করছেন কবি আশরাফ আল দীন,কবি বুলবুল সরওয়ার, শিল্পী আহসান হাবিব, শিল্পী গিয়াস কাদের , নাভিদ আনাস সাদমান প্রমুখ। চট্টগ্রামের তরুণ প্রতিনিধি দু’জন তো আছেই।

অনেক আগ্রহ নিয়ে সবাই মিলে ঢুকলাম ইবনে সিনা হাসপাতালের ৫১৬ নম্বর কক্ষে, যেখানে ঘুমিয়ে আছেন অসুস্থ কবি। বিছানার সাথে যেন লেপ্টে আছে তাঁর ক্ষীণ শরীর। ঘুম থেকে জাগানো কি ঠিক হবে? ওখানে কবির দুই পুত্র রোগীর শুশ্রূষায় নিয়োজিত। যেহেতু অনেক দূরের দর্শনার্থী, তারা কবিকে ঘুম থেকে জাগানোর চেষ্টা করলেন। কবি চোখ খুললেন বটে, কিন্তু তেমন দেখতে পাচ্ছেন না। শুনছেনও অনেক কষ্টে। তবে ইশারা মোটামুটি বুঝতে পারছেন। সবাইকে দেখে তিনি যে অনেক খুশি তা চোখেমুখে প্রকাশ পাচ্ছে। কষ্ট করেও উঠে বসতে পারছিলেন না। এক এক করে সবার পরিচয় নেবার চেষ্টা করলেন।

চট্টগ্রামের প্রতিনিধিদলের পরিচয় করিয়ে দিলেন কবি বুলবুল সরওয়ার। আশরাফ আল দীন, আমীরুল ইসলাম প্রমুখের নাম শুনে আবেগে থরোথরো হলেন কবি। সবার খোঁজ-খবর নিলেন। শুরু হলো খুচরো আলাপ আর স্মৃতিচারণ। চট্টগ্রামের নানা প্রসঙগ উঠে এলো কথামালায়।

স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে কবি উচ্চারণ করলেন- “’পাখির কাছে ফুলের কাছে’ আর ‘সোনালী কাবিন’ চট্টগ্রামে বসেই লিখেছি।” তারপর এলো সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। কবির হাতে ‘নোঙর’ তুলে দেয়া হলে সেটি একেবারে চোখের কাছে টেনে নিয়ে গেলেন। আহা, চোখের দৃষ্টি যে কত প্রয়োজন! বুকের উপর ধরে রাখলেন কিছুক্ষণ।সংকলনটির সাইজ, প্রচ্ছদের রং কিছুটা অনুভব করলেন। জানতে চাইলেন- সংকলনটির পরিকল্পনা করেছে কারা, এর প্রচ্ছদ শিল্পী কে, উল্লেখযোগ্য কাদের কাদের লেখা এখানে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে? আমরা কায়দা মতো কবির বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছি। কবি উল্টেপাল্টে দেখছেন বিশেষ সংখ্যাটি। খুশিতে তাঁর চেহারা উজ্জ্বলতর হয়ে উঠেছে, চোখ বেয়ে নামছে আনন্দাশ্রু।

কবির গায়ে নীল প্রিন্টের হলুদ শার্ট, এটি তাকে খুব মানিয়েছে।ওষ্ঠযুগল কেন জানি পানচর্চিত ঠোঁটের মত লাল। সাদা-কালো দাড়ি কবির চেহারার মধ্যে অন্যরকম দ্যুতি ছড়াচ্ছে। অদ্ভুত এক আনন্দ অসুস্থ মানুষটির সব যন্ত্রণা যেন কিছুক্ষণের জন্য শুষে নিল।

কবিকে নিয়ে অভ্যাগতরা সবাই মশগুল। এই মধুর মুহূর্তগুলো দর্শনার্থীদের কাছে মহার্ঘ। সবাই উপভোগ করছি আনন্দঘন মুহূর্তগুলো আর মনের ক্যামেরায় বন্দী করে নিচ্ছি।

আমাদের উপর কবির অনেক ধরনের ঋণ, যা শোধ হবার নয়। তবু এক ফাঁকে তাঁর হাতে ছোট্ট একটি প্যাকেট তুলে দেয়া হলো। কবি একেবারেই আপ্লুত। আবারো ঝরঝর করে কাঁদলেন তিনি। কান্নাভেজা কন্ঠে বললেন, “আপনারা দশ টাকা কিংবা দশ লক্ষ টাকা যাই দিয়েছেন, তাতেই আমি খুশি।” মনে হলো, হাসপাতালে চিকিৎসাধীন কবিকে সহযোগিতা করা আমাদের জাতীয় কর্তব্য। আমরা তার কতটুকু করতে পারছি? সমাজের কোন হিতৈষী কবির এই বিপদে এগিয়ে এসেছেন কিনা আমাদের জানা নেই। রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতার কোন উদ্যোগ চোখে পড়ছে না। অথচ কম গুরুত্বপূর্ণ অনেক মানুষের জন্যও অনুদান মিলছে। কবি যে হাসপাতালের বেডে কষ্ট পাচ্ছেন, এই সংবাদটুকুও তেমন প্রচারিত নয়।

বিশেষ সংখ্যাটি প্রকাশনা অনুষ্ঠানের জন্য আমাদের বিশেষ পরিকল্পনা ছিল। কোন হল ঘরে না হলেও ইচ্ছে ছিল অন্তত কবির বাসায় গিয়ে ‘নোঙরে’র এই বিশেষ সংখ্যাটির আনন্দঘন মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠান করা। কিন্তু হাসপাতালের স্যালাইন আর ডেটলের সোঁদা গন্ধের মধ্যে এটা কতটুকু মানানসই?

হাসপাতালের বিছানাটি বেন্ড করে কবিকে বসানোর চেষ্টা করা হলো। কিন্তু কবি ভয় পাচ্ছেন। তাঁর শরীরে ক্যাথেডার লাগানো। লোভ সামলাতে না পেরে মোড়ক উন্মোচনের প্রচলিত ভঙ্গিতে শায়িত কবির চারপাশে ‘নোঙর’ হাতে দাঁড়ালাম সবাই। মাহেন্দ্রক্ষণ এলো। ক্যামেরায় ক্লিক ক্লিক। স্বাভাবিকভাবে বিশেষ মুহূর্তের সাক্ষী হতে পারে উপস্থিত সকলের চোখে-মুখে আনন্দ। আমাদের আনন্দের অংশীদার কবিও। কবির হাতে হাতে বিশেষ সংখ্যাটি হস্তান্তর করতে পারা সৌভাগ্যের ব্যাপার বৈকি।

রাত বেড়ে যাচ্ছে। মিশনও শেষ হয়ে আসছে আমাদের। উপস্থিত সবার হৃদয়-মন খুশিতে পরিপূর্ণ। শিল্পী আহসান হাবীব খুশি প্রকাশে আচমকা ঘোষণা করলেন- “কবির কবিতা নিয়ে শীঘ্রই আবৃত্তি সন্ধ্যা হবে ঢাকায়।” বোঝা গেল, কবির প্রতি ভালবাসা থেকে শিল্পী আহসান হাবীবের তাৎক্ষণিক ঘোষণা এটি। ঘোষণা শুনে উপস্থিত সবাই অনেক খুশি। মনে আবার নানা প্রশ্ন উদিত হচ্ছে। সে আবৃত্তি সন্ধ্যায় সশরীরে আসতে পারবেন তো কবি?

কবির কাছ থেকে এবার সত্যি সত্যি বিদায় নেবার পালা। আমাদের ফিরতে হবে- একেকজন এক এক দিকে। ঢাকা মহানগরীর এ প্রান্তে ও প্রান্তে, কেউবা রওয়ানা দেবেন চট্টগ্রামের উদ্দেশ্যে। আমাদের একেকজনের অনুভূতি একেক রকম। সবার মনে কবি দর্শনের তৃপ্তি থাকলেও প্রিয় বিচ্ছেদের কষ্টও কম নয়। আমরা কি ঘটা করে আরেকবার এই প্রিয় মানুষটির সাথে সাক্ষাতের সুযোগ পাবো? আবার কি আমাদের দেখা হবে? অনেক সংবেদনশীল প্রশ্ন।

কবির কাছ থেকে ফর্মাল বিদায় নিয়ে আমরা একে একে তাঁর কক্ষ থেকে বেরিয়ে পড়লাম। বিদায় প্রিয় মানুষ, বিদায় কবি আল মাহমুদ।

কবির স্বাস্থ্যের উন্নতির কোনো লক্ষণ নেই, বয়সও তার অনুকূল নয়। অনিবার্য সত্যের মত আমাদের আশঙ্কা বাস্তবে পরিণত হলো। দীর্ঘ রোগভোগের পর ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৯ কবি তার আকাঙ্ক্ষিত শুক্রবারে চিরদিনের অন্তিম শয়ানে চলে গেলেন।

মধ্যখানে কবিকে পুনরায় দেখার কোন সুযোগ করতে পারি নি। শিল্পী আহসান হাবিব ঘোষিত কবিতা সন্ধ্যা আয়োজনের আকাঙ্ক্ষাও বাস্তবায়িত হলো না। আমাদের গোপন ইচ্ছেগুলো গোপনেই দুমড়ে মুচড়ে গেলো। শিল্পী আহসান হাবীব নিজেও অনেকদিন কঠিন রোগ ভোগ করে ১৮ নভেম্বর ২০১৯ প্রভুর আহবানে সাড়া দিলেন।

আমরা যারা সেদিন কবিকে দেখতে গিয়েছিলাম সবার হৃদয়ে সারা জীবনের অমূল্য স্মৃতি হয়ে থাকলো সেদিনের সেই অপূর্ব সন্ধ্যার কবি-সান্নিধ্য।