সোনালী কাবিন কাব্যগ্রন্থের পর পরবর্তী কালের কাব্যচর্চা সম্পর্কে মূল্যায়ন করতে গিয়ে বিস্ময়কর কাব্য প্রতিভার অধিকারী কবি আল মাহমুদ বলেছিলেন, সুফি মত আমার কবিতায় বিশেষ প্রভাব ফেলেছে! আর পবিত্র কোরআন আমার কবিতা লেখার প্রধান পাথেয়! ইসলাম আমি গ্রহণ করেছি যা আমার জীবনের সকল সমস্যার সমাধান! আমি বিশ্বাস করি ইসলামী সাহিত্য আগামী দিনে সারা বিশ্বকে পথ দেখাবে! মায়াবী পর্দা দুলে ওঠো কাব্য গ্রন্থএ আল মাহমুদ লিখলেন,

পৃথিবীর সর্বশেষ ধর্মগ্রন্থটি বুকের ওপর রেখে
আমি ঘুমিয়ে পড়েছিলাম! হয় এ ছিলো সত্যিকার ঘুম
কিংবা দুপুরে খাওয়ার পর ভাতের দুলুনি! আর ঠিক তখুনি
সেই মায়াবী পর্দা দুলে উঠলো, যার ফাঁক দিয়ে
যে দৃশ্যই চোখে পড়ে, তোমরা বলো, স্বপ্ন!

আমার মনে হলো, কানে তালা লাগানো প্রচণ্ড বিস্ফোরণের শব্দে
কারাগার ভেঙে পড়েছে! আমি চিতকার করে
বিছানায় লাফিয়ে উঠলাম! আমার বুকের ওপর থেকে
উজ্জ্বল গ্রন্থটি গড়িয়ে পড়ল বালিশে!
চারিদিকে বিশাল বিম, ইট আর সুরকিতে আমার কামরা
আচ্ছন্ন হয়ে গেলো! যেন দৈবক্রমে আমি রক্ষা পেয়েছি!
এই ধ্বংসস্তূপের মধ্যে আমার খাটটাকে মনে হলো
নূহের নৌকা !
আমি কুণ্ডলীকৃত কালো ধোঁয়ার আড়াল থেকে বেরিয়ে
ধ্বংসের ওপর রেখে আসা আল্লাহর আদেশ
বুকে তুলে নিলাম! মৃতের দুর্গন্ধ ওঠার আগেই
আমাকে কোথাও পালাতে হবে!

মুক্তিযোদ্ধা কবি আল মাহমুদ বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর মাওলানা ভাসানী র বাকশাল বিরোধী আন্দোলনের সমর্থনে বঙ্গবন্ধুর বিরুদ্ধে ধারাবাহিকভাবে দৈনিক গণকন্ঠের সম্পাদক হিসেবে কলম লিখতে থাকেন! এর ফলে শাসক মুজিবর রহমানের রোষে পড়েন! তাকে বাড়ি থেকে ডেকে নিয়ে গিয়ে কারাগারে অন্তরীণ রাখা হয়! কারাগারে থাকাকালীন কবি আল মাহমুদের চিন্তা-চেতনায় পরিবর্তন আসে! যৌবনের মার্কসবাদে বিশ্বাসী কবি আল মাহমুদ কোরআন নির্দেশিত আধ্যাত্মিক চেতনায় বিশ্বাসী হয়ে ওঠেন! এক বছর কারাবাসের পর তিনি মুক্তি পান! আল মাহমুদের দৃঢ় বিশ্বাস জন্মায় আল্লাহর প্রতি আনুগত্যের কারণে তিনি মুক্তি পেয়েছেন! সেই বিশ্বাস তিনি পরবর্তীতে সারাজীবন বহন করে চলেছিলেন! কবি আল মাহমুদের চিন্তার জগতের পরিবর্তন তার পরবর্তী কাব্যগ্রন্থ গুলি তেও প্রবল ভাবে অনুভূত হয়! কারামুক্তির পর থেকে আল মাহমুদ নিজের জীবন চর্চায় কোরআন নির্দেশিত পথ বেছে নিয়েছিলেন! তিনি দৃঢ়তার সঙ্গে জানালেন বিশ্বাস ও আত্মপ্রত্যয় ব্যতীত বলিষ্ঠ উজ্জ্বল কাব্য কবিতা রচনা করা অসম্ভব! বিশ্বাসের দীপ্তি প্রত্যেক কবির কাব্য ভুবনে চন্দ্রালোকের উজ্জ্বল কিরণ প্রভা বিকিরণ করে!
অদৃষ্টবাদীদের রান্নাবান্না কাব্যগ্রন্থের হযরত মোহাম্মদ সা: নামক কবিতায় তিনি লেখেন-

গভীর আঁধার কেটে ভেসে ওঠে আলোর গোলক
সমস্ত পৃথিবী যেন গায়ে মাখে জ্যোতির পরাগ;
তাঁর পদপ্রান্তে লেগে নড়ে ওঠে কালের দোলক
বিশ্বাসে নরম হয় আমাদের বিশাল ভূভাগ!

হেরার বিনীত মুখে বেহেশতের বিচ্ছুরিত স্বেদ
শান্তির সোহাগ যেন তার সেই ললিত আহ্বান,
তারই করাঘাতে ভাঙ্গে জীবিকার কুটিল প্রভেদ
দুঃখের সমাজ যেন হয়ে যাবে ফুলের বাগান!

লাত মানাতের বুকে বিদ্ধ হয় দারুন শায়ক
যে সব পাষাণ ছিল গঞ্জনার গৌরবে পাথর
একে একে ধসে পড়ে ছলনার নকল নায়ক
পাথর চৌচির করে ভেসে আসে ঈমানের স্বর!

লাঞ্ছিতের আসমানে তিনি যেন সোনালী ঈগল
ডানার আওয়াজে তার কেঁপে ওঠে বন্দীর দুয়ার;
ছিন্নভিন্ন হয়ে যায় জাহেলের সামান্য শিকল
আদিগন্ত ভেদ করে চলে সেই আলোর জোয়ার!

বখতিয়ারের ঘোড়া কাব্যগ্রন্থের নাত কবিতায় ও শুনতে পাই বিশ্বনবীর প্রতি গভীর বিশ্বাস এর প্রতিধ্বনি-

কোনদিন আমি দেখব কি কোনকালে
সেই মুখ সেই আলোকোজ্জ্বল রূপ?
এই দুনিয়ায় কিংবা পেরিয়ে গিয়ে
মোহের পর্দা হায়াতের পর্দাকে,
দেখবো নবীকে, আল্লাহর শেষ নবী
আছেন সেখানে, হদটির কাছে তার
স্ফটিকের মতো স্বচ্ছ অমৃত জলে
ছায়া পড়ে যেনো ধরে নাম, কাওসার!

মোহাম্মদ- এ নামেই বাতাস বয়,
মোহাম্মদ- এ শব্দে জুড়ায় দেহ,
মোহাম্মদ- এ প্রেমে আল্লাহ খুশি
দোজক বুঝিবা নিভে যায় এই নামে!

ওই নামে কত নিপীড়িত তোলে মাথা
কত মাথা দেয় শহীদেরা নির্ভয়ে,
রক্তের সীমা, বর্ণের সীমা ভেঙে
মানুষেরা হয় সীমাহীন ইয়াসিন!

এই নামে ফোটে হৃদয়ে গোলাপ কলি
যেন অদৃশ্য গন্ধে মাতাল মন,
যেন ঘনঘোর আঁধারে আলোর কলি
অকূল পাথারে আল্লাহর আয়োজন!

কবি আল মাহমুদ এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছিলেন, মুসলিম পরিচিতি আন্তর্জাতিক বোধ অর্জনের ক্ষেত্রে বাধা হতে পারে না! পৃথিবীতে ১০০ কোটির বেশি মুসলমান বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে রয়েছে! এত বড় একটা বিশ্বাস এত বড় করে ছড়িয়ে আছে, এটাও এক ধরনের আন্তর্জাতিকতা!, আমি একজন মুসলমান, মরক্কোতে একজন মুসলমান আমার মত কিংবা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একজন মুসলমান আছে- এটাও তো পরস্পরকে জানার একটা আন্তর্জাতিকতা! পবিত্র আল কোরআন কে আমি আল্লাহর বাণী বলে বিশ্বাস করি! কোরআন শরীফ প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত পাঠ করলে দেখা যায় কোথাও বলা হয়নি ও আরব, ও বাঙালি! সব সময় বলা হয়েছে মানব সভ্যতা বা মানব সমাজ! আমি কোরআন শরীফ পাঠ করেছি মনে হয়েছে কমান্ড এর মত বলছে! এটা না কোন কবিতা, না কোন ভাষা গত আর্ট এর বই! এটা একটা আলাদা ভয়েস! যখন বলা হচ্ছে বাইরে থেকে বলা হচ্ছে, একটা উঁচু জায়গা থেকে বলা হচ্ছে! আকাশ সম্পর্কে যখন বলা হচ্ছে, তখন বলছে না একটি আকাশ, যখনই বলা হচ্ছে মনে হচ্ছে যেন অনেকগুলো আকাশ! আমি কোরআন শরীফ পড়েই তো মুসলমান! যে বই নিজেই এতটা আন্তর্জাতিক, যে কোন জাতরেখা মানছে না, কোন দেওয়াল স্বীকার করছে না এবং সমস্ত জাতিগত সম্প্রদায়গত দেওয়াল ভেঙ্গে এসে প্রবেশ করতে চাচ্ছে! ধর্মগ্রন্থ এবং ক্লাসিক লিটারেচার সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র জিনিস! ধর্মগ্রন্থ তো নির্দেশ! যেমন ধরো মুসা আলাইহি ওয়াসাল্লামের টেন কমান্ডমেন্টস! লিটারেচার এর সাথে এর মিল কোথায়? এটাতো মানবসমাজকে সভ্য করার কথা বলছে! এটা করিও না, ওটা করিও না! অন্যদিকে লিটারেচার হল মানব সমাজের দুঃখকষ্টের কাহিনী, ভালোবাসার কাহিনী, যুদ্ধের কাহিনী, মানব সংঘর্ষের কাহিনী! ধর্মগ্রন্থ কি মানব সংঘর্ষের কাহিনী? মানব সমাজের যে গতি, যে কালে মানব সমাজ পদচারণা করে চলে আসছে, তার মোড়ে মোড়ে ধর্মগ্রন্থগুলো তাদেরকে নির্দেশ দিচ্ছে! কোন সময় কোন নবীর উপর একটি আস্ত গ্রন্থ এসেছে, কোন নবীর উপর আস্ত একটি ধর্মগ্রন্থ আসেনি, হয়তো কয়েকটা মাত্র নির্দেশ এসেছে! নবীরা মানবসমাজকে একটা সভ্যতার দিকে নিয়ে এসেছেন এবং সর্বশেষ আমরা যেটা পাই সেটা হল পবিত্র কোরআন! এটা এমন এক জায়গায় নাযিল হয়েছে যেখানে মানুষ একেবারে পশুস্তরে ছিল! সেখানে অক্ষরজ্ঞানহীন একজন লোকের উপর এটা নাযিল করা হয়েছে! শ্রুতিধর হিসেবে তিনি এটা ধরেছেন এবং তা মানুষের কাছে বলেছেন! পবিত্র কোরআন এসেছে এই বাক্য দিয়ে: ইকরা বিসমি রাব্বিকাল- আল্লাহর নামে পাঠ করো! আর কোন ধর্মগ্রন্থ পাঠের নির্দেশ দেয় নি! কারণ পাঠের শুরু হয়েছে সামন্ততন্ত্রের ধ্বংসের পর যখন ধনবাদের উত্থান ঘটছে! কোরআন গণতন্ত্রকে নাকচ করে! কোরআন সুদকে হারাম করে দিচ্ছে! কারণ সুদ ছাড়া ধণতন্ত্র দাঁড়াতে পারে না!কবি আল মাহমুদ এক সাক্ষাৎকারে স্পষ্টভাবে বলেছেন, তিনি মার্কসবাদে একসময় বিশ্বাস করতেন! সেই বিশ্বাস থেকে সরে আসার পেছনে ধর্মগ্রন্থ আল কোরআন পাঠের একটা বিরাট ভূমিকা ছিল! কিন্তু সামগ্রিকভাবে ধর্মগ্রন্থ পাঠই মূল কারণ ছিল না! আল মাহমুদ জানিয়েছিলেন, তিনি এক রক্ষণশীল ধার্মিক পরিবার থেকে উঠে এসেছেন! খুব ছোটবেলা থেকে তার মধ্যে ধর্ম প্রবণতা ছিল! তার বিশ্বাসের পরিবর্তন ব্যাপারটা সহসাই ঘটেনি, পড়াশোনার মধ্য দিয়েই ঘটেছে! কবি আল মাহমুদ বলেছেন, অখন্ড বাংলা সাহিত্যে আধুনিক কালে মুসলমানদের সাহিত্য চর্চার প্রমাণ আমরা খুব কমই দেখেছি! আমার একটা চেষ্টা ছিল এই যে- তখন ধর্ম নিয়ে যতটা না ভেবেছি তার চেয়ে বেশি ভেবেছি কবিতা নিয়ে! তখনকার আধুনিক সাহিত্য বলতে যা বুঝেছি তার মধ্যে মুসলমানদের অভ্যেস, আচরণ, প্রেম ভালোবাসার কথা আমি কোন বইয়ে পড়িনি! সব সময় আমার চেষ্টা ছিল আমি যেমন ঠিক তেমনি লিখব! আমি আমার কবিতায় দেশপ্রেম, সমাজ, পরিবার, ধর্ম ইত্যাদি যুক্ত করেছি! আমি আমার পরিবেশ থেকে শব্দ ব্যবহার করেছি! এমন কিছু শব্দ ব্যবহার করেছি যা আগে ব্যবহার করা হয়নি! অবশ্য প্রথম শুরু করেছিলেন কাজী নজরুল ইসলাম! নজরুল যখন লিখলেন:
গড়াগড়ি দিয়ে কাঁদে কচি মেয়ে ফাতিমা
আম্মাগো পানি দাও ফেটে গেল ছাতি মা,

আশ্চর্য হয়ে গেলাম আম্মা শব্দের ব্যবহার দেখে! এটা সম্ভব তাহলে! আমি চেষ্টা করলাম এরমধ্যে আমার অভ্যেস, আচরণ, আমার খাসলত এটা প্রবেশ করানোর! আমার প্রথম কবিতা থেকেই এটা লক্ষ্য করা যাবে!

আকাঙ্খার মতো সিক্ত মোহময় মাটিতে কি আমি
রাখবো প্রথমই পা? অথবা যে প্রশংসার বাণী
আমরা ধারণ করি হৃদয়ের কোমল কৌটোয়
তার কোনো কলি
উচ্চারিত হবে এই অধমের নত মুখ থেকে?
আদমের কালোত্তীর্ণ সেই পাপ যেন
হে প্রভু আবার কভু ছদ্দবেশী সাপের মতন
গোপন পিচ্ছিল পথে বেরিয়ে না আসে!
(নূহের প্রার্থনা, লোক লোকান্তর)

হে মুয়াজ্জিন, তোমার আহবান কে
কি করে আজান বলো, যা এতো নির্দিষ্ট!
আর হে নাস্তিক
তোমার উচ্চকণ্ঠ উল্লাস কে কোন শর্তে আনন্দ বলো
যা এত দ্বিধান্বিত
তাই আমি নাস্তিক নই!
(পিপাসার মুখ, লোক লোকান্তর)

তাকান, আকাশে অই অন্ধকার নীলের দ্যুলোকে
এমন তারার কনা, যেন কোন স্থির বিশ্বাসীর
তসবিহ ছেঁড়া স্ফটিকের দানা! শূন্য সৌরলোকে
পরীর চাঁদের নাও দোল খায়! অলীক নদীর
অস্থির পানির আভা স্পর্শ করে দূর বাতাসের
অসীম সাহস-
(অসীম সাহসী, কালের কলস)

কবিতা তো ফিরে যাওয়া পার হয়ে হাঁটুজল নদী
কুয়াশা- ঢাকা- পথ, ভোরের আজান কিম্বা নাড়ার দহন
পিঠার পেটের ভাগে ফুলে ওঠা তিলের সৌরভ
মাছের আঁশটে গন্ধ, উঠোনে ছড়ানো জাল
আর বাঁশঝাড়ে ঢাকা দাদার কবর!
(কবিতা এমন, সোনালী কাবিন)

একদা এক অস্পষ্ট কুয়াশার মধ্যে আমাদের যাত্রা
তারপর দিগন্তে আলোর ঝলকানিতে আমাদের পথ
উদ্ভাসিত হয়ে উঠলো! বাতাসে ধানের গন্ধ,
পাখির কাকলিতে মুখরিত অরণ্যানী!
আমাদের সবার হৃদয় নিসর্গের এক অপরূপ ছবি হয়ে
ভাসতে লাগলো-
আনন্দে আপ্লুত হয়ে আমরা স্বপ্নের দিকে
রওনা দিয়েছি! দুঃখ আমাদের ক্লান্ত করে না!
দুর্যোগের রাতে আমরা এক উজ্জ্বল দিনের দিকে
মুখ ফিরিয়েছি!
(স্বপ্নের শানুদেশে, সোনালী কাবিন)

কোথাও রয়েছে ক্ষমা, ক্ষমার অধিক সেই মুখ
জমা হয়ে আছে ঠিক অন্তরাল আত্মার ওপর!
আমার নখের রক্ত ধুয়ে গেলে
যেসব নদীর জল লাল
হয়ে যাবে বলে আমি ভয়ে দিশাহারা
আজ সে পানির ধারা পাক খেয়ে নামে
আমার চোখের কোনে
আমার বুকের পাশ ঘেঁষে!
(তোমার আড়ালে, সোনালী কাবিন)
তোমার শাড়ির দিকে চোখ গেলে বেড়ে যায় সবুজে ঈমান
এখনো বুকের কাছে ধরে আছো পাথরকুচির কটি পাতা?
হোক তা চিত্রিত লতা, পোশাকের মুদ্রিত বাগান,
তবুতো তোমারই মধ্যে গুল্মময়ী মানুষের মাতা-

যখনই ধরতে যাই সেই গাছ, অতিরিক্ত ডাল,
পাঠ করো- বলে ওঠে নামুস জিবরীল!

ঘুমের মধ্যে কারা যেন, মানুষ না জিন
আমার কবিতা পড়ে বলে ওঠে, আমিন, আমিন!
(সবুজ ঈমান, মায়াবী পর্দা দুলে ওঠো)

আমরা যে পদশব্দের জন্য অপেক্ষা করছিলাম
বুঝিবা তিনি নিকটবর্তী হলেন! পৃথিবীর আহার্য
ঠোঁটে নিয়ে যেমন পাখিরা ঘরে ফেরে, তেমনি!
তার স্থির সুন্দর হাসি
যেন নাজ্জাশীর দরবারে দন্ডায়মান জাফর
কিংবা রেহেলের ওপর বিশ্বাসীর কোরআন মেলে ধরা!
তিনি চুলার পাশে প্রাত্যহিক সংগ্রহ সাজাতে সাজাতে
আল্লাহর প্রশংসা করলেন! আর আমরা
চারপাশে গোল হয়ে এগিয়ে এলাম!
আমাদের অদৃষ্টের ভেতর থেকে এক্ষুনি যে শিখা
লকলক করবে, আমরা সে আলোয় পরস্পরকে
চিনে নিতে চাই!
(অদৃষ্টবাদীদের রান্নাবান্না)

লবিদ ছিলেন আলোর পথে পদচারণাকারী
একজন সত্যিকারের মানুষ! একজন কবি!
তিনি আল্লাহর সত্যবাণী ও মানুষের কন্ঠস্বরের
পার্থক্য নির্ণয় করেছিলেন! তিনি জানতেন
কালস্রোতের কাছে মানুষের কথা ও নিষ্প্রভ
হয়ে আসে!
কিছুই যখন দাঁড়াবে না তখন আমার
অবনত হয়ে থাকাই ভালো! অবনত
সেই বিনাশহীন সত্যের কাছে
যেখানে সকল বিতন্ডাকারী কবিরা
নির্বাক হয়ে ফিরে যায়!
(লবিদের কথা, অদৃষ্টবাদীদের রান্নাবান্না)

যেসব ভারসাম্যহীন মানুষ সত্যের চেয়ে
স্বপ্নকে বড় বলে ভাব তো, একদা
আমি ছিলাম তাদের দলে!
আজকাল বাতি নিভিয়ে ঘুমোতে পর্যন্ত
সাহস হয় না!
ভয়ে বেদনায় আমি
আলোর জন্য বিদ্যুতের বোতাম খুঁজতে
দেওয়ালে পৃথিবীর মানচিত্র খামচে ধরলাম!
(ভারসাম্যহীন মানুষ, অদৃষ্টবাদীদের রান্নাবান্না)

আর উপশম নেই, তবুও এই ব্যথার বিষয়
তোমাকে জানাতে বড় সাধ আজ জেগেছে হৃদয়ে
এই তবে ভালোবাসা? এই নাকি প্রেমের গুঞ্জন—
দেওয়ালে তোমাকে দেখে কেঁপে ওঠা আপাদমস্তক?

আমাকে ফিরতে হবে! বাঁধাছাঁদা হলো না এখনও!
কে তুমি নৌকার মাঝি ধরে আছো মাস্তুলের দড়ি
ঢেউয়ের মাতম দেখে ভুলে গেছি কোন দিকে যাব
কোনদিকে, কোনদিকে- কোন দিকে বিশ্বাসের চর?
(বিশ্বাসের চর অদৃষ্টবাদীদের রান্নাবান্না)

অনন্তকালের মধ্যে তুমি কি করে থাকবে?
যেখানে একটি নদী চলতে চলতে অদৃশ্য হয়ে যায়,
একটা পাখি উড়ে যায় এমন অসীম শূন্যতায়
মনে হয় নিজের দৃষ্টিই ফিরে এলো নিজের দিকে!

অনন্তকাল কি করে চুম্বনের শব্দ?
কোন পরিচিত বৃক্ষের সবুজ কি অনন্তকাল?
আমাদের বাড়ির পুকুর পাড়ে
সবনে গাছে একটি পাখি!
আমার সমস্ত সচেতন কালের মধ্যে এর পালক খোঁচানো
আমি অবলোকন করি!
(অনন্তকাল, অদৃষ্টবাদীদের রান্নাবান্না)

তারপর জগতের সবচেয়ে নিরহংকার
একটি বিষয়ের দিকে আমার চোখ পড়লো
মোগল যুগের একটি পুরনো মসজিদের
গগনভেদী মিনারের দিকে!
মিনারটি বিশাল আর আকাশ ফুঁড়ে
অসীমের দিকে উঠে গেছে!
প্রত্যেকদিন একটা ছোট্ট মানুষ
সিঁড়ি ভেঙে তার চূড়ায় গিয়ে দাঁড়ায়
আর মানুষের সন্ততিদের
মঙ্গলের দিকে ডাকে!
(মানুষের আদি অভ্যাস, অদৃষ্টবাদীদের রান্নাবান্না)

পৃথিবী থেকে অনেক দূরে যেখানে মেঘের গোল- গম্বুজ
অকস্মাৎ সেখানে হযরত আলীর খঞ্জের মতো
ঝলসে উঠল আমার ঈদের চাঁদ!

আশেপাশে কোন মানুষজন না দেখে
আমি লাইটপোস্টের গায়ে হাত রাখতে রাখতে
বললাম ঈদ মোবারক!

সাথে সাথে ঢাকা মহানগরী থেকে এক অপার্থিব জ্যোৎস্নায়
ঝলসে গিয়ে নিস্তব্ধ হয়ে গেলে
পশ্চিমাকাশ থেকে মেরাজের ঘোড়ার মতো
নেমে এসে আমার সামনে নূহের নৌকার
মতো দুলতে লাগলো– ঈদের চাঁদ!
(সব ইমারতের বাইরে, অদৃষ্টবাদীদের রান্নাবান্না)

আমি আমিনাকে, পৃথিবীর সর্বশেষ বিনম্র নারীকে,
যে তার কলস ভেঙে ছুঁড়ে ফেলে হাতের কাঁকন
গোয়ালে আগুন দিয়ে শিশু ও পশুর পাল
ঠেলে দিয়ে অদৃষ্টের হাতে
নদীর উদ্দেশ্যে গিয়ে হয়ে গেল নদী,
তার নাম পৃথিবীর সমস্ত ভাষায়
মানবজাতির সব অপরূপ স্তম্ভের ওপরে
উপমাবিহীন ভাবে লিখে রেখে চলে যেতে চাই!
(মানুষের স্মৃতিস্তম্ভে, অদৃষ্টবাদীদের রান্নাবান্না)

ভোরের নদীর মতো মনে হয় তোমাকে কখনো,
কখনো বা সন্ধ্যার নদী, আবছা ছায়ার নিচে
দূর গ্রামে সূর্য ডুবে যায়
পড়ন্ত আলোর মধ্যে প্রকৃতির রহস্য জড়ানো
আমি দেখি সেই মুখ নত আর ও নত প্রার্থনায়!

তোমার সিজদা দেখে এ ঘরের পায়রা ডেকে ওঠে
গম্বুজের ভিতরে যেন দম পায় সুপ্ত এক দরবেশের ছাতি,
কি শীতল শ্বাস পরে! শান্ত শামাদানের সম্পূটে
বাতাসে যেন নিভে গেল ফজরের মগ্ন মোমবাতি!

তুমি কি শুনতে পাও অন্য এক মিনারে আযান?
কলবের ভিতর থেকে ডাক দেয়, নিদ্রা নয়, নিদ্রা নয়, প্রেম
সমুদ্রে খলিয়ে ওযু বসে থাকে কবি এক বিষণ্ণ, নাদান!
সবারই আর্জি শেষ! বাকি এই বঞ্চিত আলেম!

তোমার সালাত শেষে যেদিকে ফেরাও সালাম
বামে বা দক্ষিনে, আমি ওমুখেরই হাসির পিয়াসী,
এখন ও তোমার ওষ্ঠে লেগে আছে আল্লাহর কালাম
খোদার দোহাই বল ও ঠোঁটেই আমি ভালোবাসি!

আমার রোদনে যেন জন্ম নেয় সর্বলোকে ক্ষমা
আরশে ছড়িয়ে পড়ে আলো হয়ে আল্লাহর রহম,
পৃথিবীতে বৃষ্টি নামে, শষ্পে ফুল, জানো কি পরমা
আমার কবিতা শুধু ওই দুটি চোখের কসম!
(কালো চোখের কাসিদা, বখতিয়ারের ঘোড়া)

আল্লার সেপাই তিনি দুঃখীদের রাজা!
যেখানে আযান দিতে ভয় পান মোমেনেরা,
আর মানুষ করে মানুষের পূজা,
সেখানেই আসেন ! খিলজীদের সাদা ঘোড়ার সওয়ারি!
দেখো দেখো জালিম পালায় খিড়কি দিয়ে
দেখো, দেখো!
(বখতিয়ারের ঘোড়া)

আজ হৃদয় অকস্মাৎ প্রার্থনায় সুস্থির হাতের মতো
উঁচু হয়ে উঠেছে!
এসো বসে পড়ি হাঁটু মুড়ে! আজ রাতে পৃথিবী
নুয়ে পড়েছে নিজের মেরুতে কাত হয়ে! ঝড়ো বাতাসের
ঝাপটা থেকে তোমার উড়ন্ত চুলের গোছাকে
ফিরিয়ে আনো মুঠোর মধ্যে! বেণীতে বাঁধো
অবাধ্য অলকদাম!
কেন জিনেরা তোমার কেশ নিয়ে খেলা করবে?
আজ ইবলিসকে তোমার ইজ্জত শুঁকতে দিও না!
সত্য ও মিথ্যার লড়ায়ে আমরা
হকের তালিকায় লিপিবদ্ধ!
চলো অপেক্ষা করি সেই ইমামের
যিনি নীল মসজিদের মিনার থেকে নেমে আসবেন
মেশকের সুরভী ছড়িয়ে পড়বে
পৃথিবীর দুঃসহ বস্তিতে!
(নীল মসজিদের ইমাম, বখতিয়ারের ঘোড়া)

ফিরতে হবে জানি আমি!
কিন্তু কবে, সে ফেরার দিনক্ষণ কবে
জানতে বড় সাধ জাগে
তখন কি যাকে বলে মেধা তার কিছু অংশ থাকবে শরীরে
ডাকবে কি নাম ধরে কেউ? বলবে কি
আমাদের মামুদটা দেখো
কি দারুন ভাগ্যবান
তেল ফুরাবার আগে গিয়েছে ফুরিয়ে!
(চেতনাবিন্দু, বখতিয়ারের ঘোড়া)

-আমি কৃষ্ণা ছায়াসঙ্গীনি তোমার, হে গিফারী! সেই কালো খাপ, যাতে প্রবিষ্ট ছিলে ঈমানের তীক্ষ্ণ তরবারি তুমি! সোনা ও চাঁদির পাহাড় নির্মাণকারীদের বিরুদ্ধে তুমি ছিলে পবিত্র কোরআনের তুফান! আমি বাতাসের বেগ নিয়ে তোমার ঝড়কে চুম্বন করি প্রিয়তম! আমি তোমার জানাজার পবিত্র সাথীদের ডেকে আনবো!
( গিফারীর শেষ দিন, বক্তিয়ার ঘোড়া)

আমি চাই শব্দের ভেতর শব্দ ধ্বনির ভেতরে আরো
উন্মীলিত ধ্বনির প্রোটন
যেন মানবিক আওয়াজের ঘূর্ণমান আণবিক ফুলের সৌরভ
বয়ে যায় সরোদের, এস্রাজের গায়ে পড়া সাহায্য ব্যতীত;
একমাত্র কবিতাই দিতে পারে মানুষের আত্মার আহার
সতেজ সবুজ খাদ্য, আর না চাইতেই ভরগ্লাস ডাবের সিরাপ!

শুনেছি আকাশে নাকি মোরগের রূপ ধরে পুণ্য এক ফেরেশতা থাকেন
ঊষার প্রারম্ভে তার ডাক শুনে নড়ে ওঠে পৃথিবীর সমস্ত মোরগ!
ডেকে ওঠে কোকিলেরা ,শালিক, তিতির
হু হু শব্দে ভরে তোলে এ গ্রহের প্রতিটি সকাল!
নিদ্রা নয়, নামাজই উত্তম-
(যে ভালোবাসে না গান, বখতিয়ারের ঘোড়া)

মৃত্যু নেমে এসেছে একটি উপত্যকায়! একদা যাদের
উদ্দাম জীবিকা আর স্বাধীনতার দুর্দম খ্যাতি
পৃথিবীকে মৌসুমী বাতাসের মতো বেস্টন করতো
যাদের আযানের শব্দ হিন্দুকুশ এর সর্বোচ্চ পাথরটিতে ও
অবলীলায় আঙ্গুল বুলিয়েছে! আর
মেঘের মধ্যে মিলিয়ে যেতে যেতে পাখিদের বুকে ও
আনন্দের শিহরণ!শোনো
আজ ধাবমান সাদা মেঘকেও কেউ বিশ্বাস করে না!
(হত্যাকারীদের মানচিত্র, বখতিয়ারের ঘোড়া)

আর নয় প্রেম, দাও দয়া
আরোগ্যের গন্ধে ভরা হাত
নিঃসীম আকাশে শ্বেত বয়া
ছোঁয় যেন আমার বরাত !

ভাগ্যেরও অদৃশ্য এ বসে যিনি
ঠিক রাখে আত্মার বাদাম
আমি ঠিক চিনি বা না চিনি
তারই প্রতি হাজার সালাম!
(ডাক, আরব্য রজনীর রাজহাঁস)

সিজদায় পড়ে থাকি! তোমাকে যাচনা করে মন
তসবি ঘুরিয়ে বলি, দাও তাকে! নেকাব সরালে যার নীল
তিলের চিহ্নের জন্য তড়পায় আমার নিখিল
কিংবা হৃদয়ে বসে লজ্জাহীন মাছির গুঞ্জন!
ইশকের আগুনে বসে মাওলানা রুমির গজল
গাও কি রুহের পাখি? নাকি কোন সুফির সাধনে
দেহের বিনাশ মেনে ভর রাখে নূরের ওপর!
প্রেম কি আলোই তবে? দীপ্তিরই অন্য পরিণাম?
(নেকাব, আরব্য রজনীর রাজহাঁস)

এই তপ্ত আহ্বান থেকে তবে কি মুক্তি নেই আমার? হে আল্লাহ,
একটিমাত্র দরজা খুলে দাও! দাও উন্মুক্ত বাতায়ন কিংবা
কোনো রন্ধ্র দেওয়ালের! অন্তত এখন চাই মুক্তি এই উন্মুক্ত
বাহুর ক্রমাগত এসো, এসো থেকে!
এসো এসো, লাফিয়ে উঠছে তার সুগন্ধি কেশপাশ! যেন হাবিয়ার
নীল শিখা খুঁজে ফেরে বাতাসের সিঁড়ি! বাতাসের সিঁড়ি বেয়ে
খল খল শব্দে হেসে ওঠে! হেসে ওঠে বৈশ্বানর পুরুষের মর্মে মর্মে,
অস্থিতে, মজ্জায়! কিন্তু আমিতো প্রতিজ্ঞাবদ্ধ আমানত আমার পিতার!
নবী তিনি, সিজদারত, কেনানের মেষের রাখাল!
তোমার নিবিষ্ট দাস ইয়াকুব, বংশ ইব্রাহিমের!
মনে পড়ে কেনানের মরুদ্দ্যান! যেখানে আমার জন্ম! আধো-অন্ধ
স্নেহময় এক বৃদ্ধের কথা মনে পড়ে, তাঁবুর এক অন্ধকার কোনে হয়তো
এখনও বসে আছেন তিনি! তার অনুচ্চ বিলাপধ্বনি ঘুরছে প্রান্তরের
ঘূর্ণিধুলোয়! সিজদার বিশাল দাগ গোল হয়ে বসেছে কপালে! হাতে
ঘুরতে তসবিদানা !তোমার করুণাময় যত নাম তুমি আদমের সন্তানদের
উপহার দিয়েছো, সবই তার ঠোঁট বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে প্রার্থনার সফেদ চাদরে!
(ইউসুফের উত্তর, প্রহরান্তের পাশফেরা )

আজ বারবার মনে পড়ছে, আমিতো অস্ত্র চালনা জানতাম!
লক্ষ্যভেদ জানতাম! ঘৃণা ও ঈর্ষার আগুনে
বয়োজ্যেষ্ঠরা আমার হাত সেকে শক্ত করে দিয়েছিলেন!
মসজিদের মিনার গুলো আমাকে শিখিয়েছিল দৃঢ়তা!
আমি কেন তবে নৈঃশব্দের জন্য রাত জেগে
পৃথিবী পাহারা দেবো?
(প্রহরান্তের পাশফেরা)

এই পার্বত্য উপত্যকার
প্রতিটি পাহাড় চুড়ো পবিত্র স্তম্ভগুলোর শপথ, শপথ
পবিত্র কাবা তাওয়াফকারী এখানে উপস্থিত প্রতিটি
নর-নারীর! যদি দলবদ্ধভাবে একবার, শুধু একবার! এমনকি
নিরস্ত্রভাবেও একবার! যদি
আমার দেশ প্যালেস্টাইন! শত্রু অধিকৃত একটা শহর! আপনাদের
প্রথম কেবলা! একবার যদি ভাইগণ!
আল-কুদস এর দিকে মুখ ফেরান, একবার!
হাতে হাত! গ্রামের শীতবস্ত্র সেলাইবিহীন! একবার! শুধু
হাঁটতে হাঁটতে ও চলে যান! তবে
সামনেই জেরুজালেম, আমার প্রিয়নগরী,
বিজয়!
(মিনার প্রান্তরে ইয়াসির আরাফাত, এক চক্ষু হরিণ)

দেশের বাড়িতে গেলে সপ্তাহের শেষ শুক্রবারে
স্বজনদের কবর দেখতে যাই!
যাওয়ার সময় পথের পাশে দেখি সেই কিংবদন্তীর
রাজার পোড়ো বাড়িটা যেখানে তুমি তোমাকে ছুঁয়ে দেখার
ভয় ভাঙিয়ে দিয়ে নিজেই থরথর করে কেঁপেছিলে!
আমি কবরটার ভেতর তাকিয়ে দেখি
তোমার ক্ষুব্ধ চোখের মতো অসংখ্য ভাটফুল
ফুটে আছে!
(কবর, এক চক্ষু হরিণ)

এমনি সেদিন বৃষ্টি ছিল যাত্রী ছিলাম দোঁহে
আমার বুকে ভয়ের কাঁপন তুমি কাঁদছো মোহে!
মাঝ নদীতে নাও ভাসানো কান্ডারী ইবলিশ
বজ্রে চেরা সাপের ফণা ছাড়লো কাল বিষ!
হঠাৎ ভাবি এ নদী তো প্রেমের নদী নয়,
প্রেম কি বলো বুকের মাঝে জাগিয়ে তোলে ভয়?
লোভের নায়ে কাঁপছিল দুই কামের কবুতর
তর সয় না,ভর সয় না কে আপন, কে পর?
ঠিকানা বিহীন নাওয়ের ভাসান ঠেকলো অজান চরে
হালের মুঠি ছেড়ে শ’তান ডুবল রে অন্তরে!
বাতাস এসে ছড়িয়ে দিল বদর পীরের ফু
বুকের মাঝে উঠলো জিকির আল্লাহু আল্লাহু!
(ঠিকানাহীন নাওয়ের ভাসান, এক চক্ষু হরিণ)

হে আল্লাহ
হে সমস্ত উদয়দিগন্ত ও অস্তাচলগামী আলোকরশ্মির মালিক
আজকের এই পবিত্র মহাযামিনীর সব রকম বরকত আমাকে দাও!
আমাকে দাও সেই উত্তেজক মুহূর্তের স্বর্গীয় পুলক যাতে
একটি সামান্য গুহার প্রস্তরীভূত শিলাসহ কেঁপে উঠেছিলেন
মহানবী মুহাম্মদ সা:
(কদর রাত্রির প্রার্থনা, এক চক্ষু হরিণ)

যখন তাঁর কথা ভাবি, কেমন সংকুচিত হয়ে পড়ে হৃদয়!
এই উপমহাদেশের মানচিত্রের মতো তার বিশাল হৃদপিণ্ড
আল্লাহর উপাসনার গুঞ্জন তুলে যখন ধুকপুক করতো
তখন তার ভ্রুজোড়ার তলদেশে কি নেমে আসতো কল্লোলিত নদী?
তার গজল এমন এক জাতির প্রেম গাথা উচ্চকিত
আমার রক্তে কেন তারই গুঞ্জন শুনে আমি বিহ্বল হয়ে যাই?
মনে হয় এক বিশাল বাহিনী
আমার স্বপ্নের চেয়েও দ্রুতগামী অশ্বে আরোহন করেছে!
নেমে আসছে পৃথিবীর সমস্ত বাধার পর্বতমালা ডিঙিয়ে!
কেবলই ছড়িয়ে পড়ার জন্য উদগ্রীব এক আস্তিক মানবতা!
(ইকবাল স্মরণে, মিথ্যেবাদী রাখাল)

লায়লা তুমি কি জিনদের মেয়ে? রহস্যময়ী,কোন অশরীরি,
অতৃপ্তির ছায়া কি তুমি? নাকি জ্যোতির্ময়ী পরম ধানে আপ্লুত
নারীসত্তা? বলো, তুমিই কি তবে রাবেয়া বসরী? লায়লা বলে দাও
তুমি কে? বলো হাওয়ার কন্যা, পিতা আদম তোমাকে আদর করে
কোন নামে ডেকেছিলেন? তিনিই তো আল্লাহর প্রতিটি নির্মাণের
নাম নির্ধারণ করে আদি ও অন্তের কবি হয়ে উঠেছিলেন! লায়লা,
তুমি কি কাবিলের বোন, যার জন্য মানুষ প্রথম মৃত্যুর স্বাদ চেখেছিল?
সত্যিই কি তুমি নিষ্পলক রাত্রির নিধান!
লাইলা বলে মৃত্যুতে ও তার শেষ হবে না! মৃত্যুর পরেও সে এক জায়গায়
যাবে! আমি যখন বলি জায়গাটা কোথায়? আঙ্গুল মটক
লায়লা হেসে ওঠে! আর চোখের ভাষায় বলতে থাকে, সেই জায়গাটার
জন্যই তো কত মানুষের কপালে বরাভয় এর সীলমোহর, পৃথিবীর
সমস্ত তসবিহ দানা ঘুরছে! আর অসংখ্য মিনার উঠে গেছে
আকাশের দিকে! মাটিকে মোরব্বার মতো ক্ষত করে রচিত হয়েছে
প্রাণের শেষ শয্যা!
(এক লায়লার কাহিনী, মিথ্যেবাদী রাখাল)

কোন এক ভোরবেলা, রাত্রিশেষে শুভ শুক্রবারে
মৃত্যুর ফেরেশতা এসে যদি দেয় যাওয়ার তাকিদ;
অপ্রস্তুত এলোমেলো এ গৃহের আলো অন্ধকারে
ভালোমন্দ যা ঘটুক মেনে নেবো এ আমার ঈদ!

আমার যাওয়ার কালে খোলা থাক জানালা দুয়ার
যদি হয় ভোরবেলা স্বপ্নাচ্ছন্ন শুভ শুক্রবার!
(স্মৃতির মেঘলাভোরে, আমি দূরগামী)

তার মতো মানুষের জন্য কবির হৃদয় ও দুঃখী হয়ে ওঠে! অথচ কে না জানে কবিদের হৃদয় এক একটা মায়াবী পাথর! নিরেট কিন্তু মর্মভেদী
অনুকূল নিঃশ্বাসেই গলে ছলছলানো আমিও এককাপ ঠাণ্ডা কালো কফি মাত্র!
আমান ভাই, এখন আমার মর্মবস্তুতে এক পেয়ালা কালো পানি
ছলছল করছে!
এভাবে খবর না দিয়ে পুণ্যবান মানুষের চলে যাওয়াটাই নিয়ম, জানি!
তবুও সহযাত্রীদের তো সকলেই যাত্রার মুহূর্তে আঙ্গুলের গুঁতোয়
সজাগ করে যায়!
জানি আমার জন্যে অনন্তের মধ্যে আপনার দাঁড়াবার
উপায় রইল না! তবুও পুলসিরাতের আগে
মুখ ফিরিয়ে একটু দেখতে ভুলবেন না! কে জানে হয়তো
আপনার হাসিমুখ এক ঝলকের জন্য আবার দেখব!
দেখবো আপনার আকাঙ্ক্ষিত গন্তব্যে তাঁর অপরিসীম করুণা
অব্যাহত ধারায় বৃষ্টির মতো ঝরছে!
(আবদুল আজিজ আলআমান স্মরণে, দোয়েল ও দয়িতা)

আমি তাল মাত্রা বাদ্যযন্ত্র ছাপিয়ে ওঠা আত্মার কেরাত!
আরম্ভ ও অন্তিমের মাঝখানে স্বপ্ন দেখি সূর্যের সিজদারত নিঃশেষিত
আগুনের বিনীত গোলক!
নবী ইব্রাহিমের মত অস্তগামী দের থেকে আমি মুখ ফিরিয়ে নিয়েছি!
আমিও জেনে গেছি কে তুমি কখনো অস্ত যাও না! কে তুমি চির বিরাজমান! তোমাকে সালাম! তোমার প্রতি মাথা ঝুকিয়ে দিয়েছি! এই আমার রুকু,
এই আমার সিজদা-
অপ্রস্তুত আত্মা আমি! কিন্তু জানি তুমি ছাড়া আমার
দোদুল্যমান শরীরের নৌকা খানি অন্য ঘাটে জমায়নি পাড়ি!
পারানির কড়ি নেই! কিন্তু ছিল তোমাতে ভরসা!
পাপী আমি! কিন্তু জানি বহু দূরে আছে এক ক্ষমার তোরণ!
ভ্রান্ত আমি! কিন্তু জানি আছে এক দয়ার্দ্র হাসির দীপ্তি অনন্তে, অসীমে!
হে আমার আরম্ভ ও শেষ!
(হে আমার আরম্ভ ও শেষ, দোয়েল ও দয়িতা)

মুক্তিযোদ্ধা কবি আল মাহমুদ বঙ্গবন্ধু সরকারের উগ্র বামপন্থাবাদ, আধিপত্যবাদ বিরোধী লেখালেখির কারণে কারারুদ্ধ হয়েছিলেন! এক বছরের এই কারাবাস কালেই কবির জীবনের সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন সংঘটিত হয়েছিল! তার নিজের ভাষায়: আমি নিসর্গ রাজি অর্থাৎ প্রকৃতির মধ্যে এমন একটা সংগুপ্ত প্রেমের মঙ্গলময় ষড়যন্ত্র দেখতে পাই, যা আমাকে জগৎ রহস্যের কার্যকারণের কথা ভাবায়! এভাবেই আমি ধর্মে এবং ধর্মের সর্বশেষ এবং পূর্ণাঙ্গ বীজ মন্ত্র পবিত্র কোরআনে এসে উপনীত হয়েছি! আমি ইসলাম গ্রহণ করেছি জীবনের একটি অলৌকিক কিন্তু প্রাকৃতিক নিয়ম হিসেবে! মার্কসবাদ সম্বন্ধে বীতশ্রদ্ধ হয়ে! আমি ইসলামকেই আমার ধর্ম ইহলোক ও পারোলৌকিক শান্তি বলে গ্রহণ করেছি! আমি মনে করি একটি পারমাণবিক বিশ্ব বিনাশ যদি ঘটেই যায়, আর দৈবক্রমে মানবজাতির যদি কিছু অবশেষ ও চিহ্নমাত্র অবশিষ্ট থাকে, তবে ইসলামই হবে তাদের একমাত্র আচরণীয় ধর্ম! এই ধর্ম প্রতিষ্ঠার জন্য আমার কবি স্বভাবকে আমি উৎসর্গ করেছি! আল্লাহ প্রদত্ত কোন নিয়ম নীতি ই কেবল মানব জাতিকে শান্তি ও সাম্যের মধ্যে পৃথিবীতে বসবাসের সুযোগ দিতে পারে আমার ধারণা! পবিত্র কোরআনে ই সেই নীতিমালা সুরক্ষিত হয়েছে এই হল আমার বিশ্বাস! আমি এ ধারার একজন অতি নগন্য কবি!সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আমার ভাবনার পরিবর্তন হয়েছে! পারিপার্শ্বিকতার সঙ্গে সঙ্গে তো মানুষের বিশ্বাস ও বোধের পরিবর্তন আসে! আমারও এসেছে! আমার ধর্মের প্রতি আরো বেশি বিশ্বাসী হয়ে উঠেছি! এটাকে সাম্প্রদায়িকতা বলে না! এটাকে মৌলবাদ বলে না ! আমি একজন মুক্তিযোদ্ধা! আমি জেলে ও গেছি! মায়াবী পর্দা দুলে ওঠো র কবিতাগুলি আমি ঢাকা সেন্ট্রাল জেলে বসে লিখেছি! এখান থেকেই আমি আমার সাহিত্য সাধনায় একটা বাঁক নিই! অনেকে বলেন আমার মার্কসবাদ থেকে সরে আসা! অনেকে অপব্যাখ্যা করেন আমি নাকি সাম্প্রদায়িক হয়ে উঠেছি! এসব কুৎসা রটনায় আমার কিছু যায় আসে না! আমার কেন কোন কবির কিছু যায় আসে না! রাজনীতি ও ধর্মকে ধর্ম মানে ধর্মীয় উপমা কে আমি কবিতার দৃষ্টান্ত করে তুলেছি! যেমন উপকথা বা প্রবচন কেউ আমি কবিতায় নিয়ে এসেছি! মিথ্যেবাদী রাখাল এর মূল মরালটাই আদি বদলে দিয়েছি! আল মাহমুদের নিজের কথায়, আমি সুফি মানুষ! প্রচলিত ধর্মবোধের বাইরে ও আমি একটু বিচরণ করি! সুফিরা প্রচলিত ধর্মচর্চার বাইরে ও নানা পদ্ধতিতে ধর্মপালন করেছেন!সুফি মত আমার কবিতায় বিশেষ প্রভাব ফেলেছে!আমি ইসলামী সাম্যবাদে বিশ্বাসী কবি। যারা বলে পাঁচ আঙুল সমান হয় না, তারা ধর্মের যে সাম্য, ইসলামে যে সাম্যের কথা বলে সেটা বুঝতে পারেনি। মোহাম্মদ স. একজন নিরক্ষর লোক ছিলেন, এতিম ছেলে মক্কার। ৪০ বছর বয়সে তিনি নবী হন। তার কাছে ধনী-নির্ধন, উঁচু-নিচু, সাদা-কালোর কোনো ভেদাভেদ ছিল না। ইসলাম শান্তি এবং মানবতার ধর্ম।ইসলাম একটা সহনশীল ধর্ম।ইসলামের আগের যুগের এক ইমরাউল কায়েস অসাধারণ কবিত্ব শক্তির অধিকারী ছিলেন!কবিদের সম্পর্কে ইসলাম ধর্মে স্বীকৃতিমূলক খুব বেশি বলা হয়েছে।এত বেশি স্বীকৃতিমূলক কথা ইসলামে আছে যে তা দিয়ে একটি পুরো গ্রন্থ হতে পারে। ইসলামের নবী হযরত মোহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহিসাল্লাম সব সময় কবিদের আদর করেছেন। নিজের গায়ের পিরহান খুলে দিয়ে দিয়েছেন কবিকে। নানা ভাবে পুরস্কৃত করেছেন। কবিদের সম্পর্কে কোরআনে একটা সুরাই আছে- সেখানে পরিষ্কার বলা আছে কবিদের সম্বন্ধে। শয়তান কবিদের কীভাবে বিভ্রান্ত করে এবং বিশ্বাসী কবিদের কাজটা কী। এটা ঠিক না যে কবিতাকে ইসলাম নিরুৎসাহিত করে। কবি ইমরাউল কায়েস যিনি আইয়ামে জাহেলীয়া যুগে জন্মেছিলেন। মুসলমানরা এত দীর্ঘদিন ধরে তাঁকে পড়িয়ে আসছে। কারণ তিনি আরবী ভাষার খুব গুরুত্বপূর্ণ ক্লাসিক পোয়েট।
কবি আল মাহমুদ কোন গতানুগতিক মুসলমান নন! আধুনিক বিভিন্ন মতবাদ, প্রচলিত প্রধান ধর্ম সমূহ ইত্যাদি গভীর অভিনিবেশ সহকারে অধ্যয়ন করে, ঐশী গ্রন্থ আল কোরআনের সাথে তাল মিলিয়ে ইসলামের শ্রেষ্ঠত্ব সহজেই উপলব্ধি করতে সক্ষম হন! তাই প্রচলিত ধারণা বা অন্ধ বিশ্বাসের বশবর্তী হয়ে নয়, গভীর প্রত্যয় এর সাথে মুক্তমন ও উদার যুক্তিপূর্ণ মানসিকতা থেকেই তিনি ইসলামকে একমাত্র সত্য ধর্ম হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন! এক সাক্ষাৎকারে কবি আল মাহমুদ জানিয়েছিলেন, আমার ধর্মে আমি বিশ্বাস করি! একটা আধ্যাত্মিক শাসনের মধ্যে বাস করি! আমার একটি ধর্মীয় জগৎ আছে ! স্মৃতির মেঘলা ভোরে কবিতায় কবি আল মাহমুদ নিজেই চেয়েছিলেন শুক্রবারে মৃত্যু! কি অদ্ভুত সমাপতন সেই শুক্রবারই হল কবির মৃত্যু হয়েছে! প্রিয় কবির প্রয়াণে আমাদের মায়াবী পর্দা বারে বারে দুলে উঠছে!কবি আল মাহমুদ পরিতৃপ্তির বিশ্রাম নিতে অনন্ত শূন্যে মিলিয়ে গিয়েছেন! আর আমরা যারা তার গুণআগ্রহী পাঠক তাদেরকে রেখে গিয়েছেন অপরিতৃপ্তির গভীর অন্ধকারে!