একজন মানুষ আর একজন কবির মধ্যে অনেক তফাৎ ভর করে থাকাটাই বাস্তবতা। কবিতার কবিরা সাধারণতই মানুষের কথা বলে, সমাজের কথা বলে, রাস্ট্রের কথা বলে, সাম্যের কথা বলে। তখন কবিকে সত্য আর মিথ্যার বেড়াজালে আঁটকে রেখে ইতিহাসের কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে অনেকে কোনো না কোনো ধরণের ছলচাতুরির আশ্রয়ই নেয়! তা যেন বিষাক্ত সামুরাই এর মত এক তরফার তরী তে ভাসিয়ে আড়াল করার চেষ্টার বীজ বপন করেই চলে। আর এটাই মানুষের সাভাবিক সহজাত স্বভাবও বটে।
আমরা যখন দুচোখের মাঝে তৃতীয়চোখ আনয়ন করি তখন আমাদের চেতনা বা বিশ্বাসে ভর করে আস্থার করিডোর। আর যখন এক চোখকে কানা রেখে সম্মূখের পথ পাড়ি দেয়ার মনস্থ হই তখন বিপরীত মেরু থেকে চিৎকার আসে একচোখা বাক্যের বিষাদগালি।
তেমনই এক কবি কে নিয়ে আজকের এ অবতারণা। তিনি আর কেউ নন। তিনি হলেন – নিশিডাকের কম্বলে মোড়ানো এক কৃতজ্ঞতাময়ী সাম্যের কবি। একজন কবি অালমাহমুদ যখন সমাজতন্ত্রের কিঞ্চিত সাম্যে বিশ্বাসী ছিলেন তখনও তিনি মানুষের কাব্য রচনা করেছেন। আবার যখন বৃহৎ ও পরিপূর্ণ আস্থার কেন্দ্র কবির হাতে ধরা দিয়েছে তখনও তিনি পরিপূর্ণ সাম্যের জায়গায় নিজেকে মানিয়ে নিতে সচেষ্ট হলেন এবং সফলও হলেন। তখনও তিনি মানুষের কাব্য রচনা করেছেন। একজন আল মাহমুদের পক্ষে তা পরিপূর্ণতা পেয়েছে।
কবি আল মাহমুদ একজন ভদ্রসুলভ আপাদমস্তক বিশ্বাসের কৃতজ্ঞতাময়ী কবি ছিলেন। স্বাধীনতা পরবর্তী কবি আল মাহমুদ একজন পরিপূর্ণ সাম্যতন্ত্রের ধর্মের বিশ্বাসে নিজেকে জড়িয়ে নিতে গিয়ে নিজের সব রাগ, হিংসাকে আড়াল রেখে অনেক সত্যকে ডামাঢোলে না পেটালেও ‘নিশিডাক ‘এর মতো একটি কবিতায় ৭ই মার্চকে যেমন ধারণ করলেন তেমনি ধারণ করেছেন বাংলাদেশের এক প্রবাদপুরুষকে। যে পুরুষের কণ্ঠই ছিল বুলেটের মত। সেই জাতির জনকের প্রতি তাঁর চমৎকার দায় যেনো নির্লজ্জদের মুখে চুনকালি লেপন করে গেল!

কবি আল মাহমুদ নিয়ত নিজের বিশ্বাসের প্রতি অনড় ছিলেন। যেমন ছিলেন কবিতার প্রতি, গল্পের প্রতি, উপন্যাসের প্রতি, প্রবন্ধের প্রতি এবং নিজস্ব সংস্কৃতি ও মননের প্রতি তেমনি তিনি কাব্যের গায়ে আঁচড় বসাতে বসাতে নিজের জবাবদিহিতাও পরিস্কার করেছেন বোদ্ধাবক্ত পাঠকের হৃদয়ে।
যারা কবি আল মাহমুদের ‘বখতিয়ার ঘোড়ার’ পরের লেখাগুলোকে স্বাকৃতি দিতে চান না তাদের প্রতি বিনয়ের সহিত চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিতে ইচ্ছে করছে। কবি আল মাহমুদের মহাকাব্যের নাম শিরোনামীয় একটি মহাকাব্য রচনার সাহস দেখাতে? কবি আল মাহমুদ যে সময়ে মহাকাব্য রচনা করেছেন সে সময়কে পায়ে ঠেলে কেউ তারুণ্যের তাড়না নিয়ে যদি কাব্যে স্ফুলিঙ্গ ঘটিয়ে নতুনত্ব দেখাতে পারতো তবেই আল মাহমুদকে অস্বীকারের নামান্তরে যেতে পারতো!

একজন কবি আল মাহমুদ হয়ে গেলেন সর্বস্ব প্রতিভূর কেন্দ্রবিন্দু। যদিও চেতনার আড়ালে বসে নিতান্তই ব্যক্তি আল মাহমুদকে একত্ববাদবিশ্বাসের ঘেরাকলে ফেলে মৌলবাদের দোহায় দিয়ে যতই নেভাতে চেষ্টা করা হোক না কেনো, তিনি সৃষ্টিকর্মের পাতায় বসে সময়ের সব সাহিত্য জ্বল জ্বল করে দাঁড়াবেনই। সোনালীকাবিন’ র কবিকে কালোনৌকা’য় চড়ালে যেমন সৌরভের কাছে পরাজিত হয় না তেমনি গন্ধবণিকের ঘ্রাণের মতো উপমহাদেশ তাঁকে নিয়ে যাবে দিক্ থেকে দিগন্তে, এক প্রান্ত থেকে মহাপ্রান্তের সীমানায়।
কবি আল মাহমুদ তাঁর আত্মবিশ্বাসের খড়কুটো এমনভাবে ছিটিয়ে দিয়েছেন যেখান থেকে শুধু মেশকে আম্বরের মতো ঘ্রাণ বাতাস ছুঁয়ে চলেছে। মহাবিশ্বের বিস্ময়ের কাছে নতজানু হতে গিয়ে কবি আল মাহমুদ গুটি কয়েকের কাছে নিতান্তই প্রগতি নামের অপ্রগতির লেবাসে আঁটকে রেখে মৌলবাদের ধৌঁয়া গায়ে মাখতে হয়েছিল। কবি আল মাহমুদ নিতান্তই মৌল বিশ্বাসের সারথি হতে চেয়েছিলেন। তার প্রমাণ তিনি লোকজ শব্দের গোড়াতে নিজেকে করেছেন প্রতিষ্ঠিত। যে মৃত্তিকার সারনির্যাস থেকে কবির তথা সব মানুষের সৃষ্টি সে নির্যাসকে অস্বীকারকারিরাই মূলত মৌলবাদহীনতার সারথী। তবে যে বা যারা মৌলবাদের অবিশ্বাসে অথবা মৌলবাদের ভয়ে অথবা চেতনার ঘাঢ়তায় আঁটকে নিজেকে আড়ালের চেষ্টা করেন তারা কিন্তু ঠিকই গৌরে যাওয়ার সময়পূর্ব থেকে একদম ধোঁড়া সাপের মতো সোজা হতে আপ্রাণ যেমন চেষ্টা চালিয়ে যায় তেমনি মৌলের সব এপ্লাই করতে আত্মীয়স্বজনকে দাঁড় করিয়ে রাখে। যা নিতান্তই নিজের সাথে, ভক্তের সাথে, সৃষ্টির সাথে বেইমানিরই নামান্তর! সে ক্ষেত্রে কবি আল মাহমুদ নিজের কাছে, ভক্তের কাছে, সৃষ্টির কাছে এবং স্রষ্টার কাছে নিজেকে সমানপক্রিয়ায় উপস্থাপন করতে সক্ষমতাই যেনো মিথ্যাবাদীদের ঘাঁড়ে রৌ বসিয়ে দিলেন। কবি আল মাহমুদ সব সফলতার পরিচ্ছন্নতা রেখে গেছে তার মহাকাব্যের গল্পে।
বিশ্বাসের এ কবি চিরস্থায়ী আবাসনের নিখুঁত বিশ্বাসের সারথি হওয়ার শেষ ইচ্ছায় যেনো নিজেকে আজীবনের স্বপ্নের ইচ্ছে দ্রষ্টায় রুপান্তরিত হয়েই গেলেন মৌলতান্ত্রিকের নিজস্ব ভালোবাসায়। যে ভালোবাসার জন্য যোজন যোজন কাল প্রতীক্ষার প্রহর গুনতে হয়। সে প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে শুক্রবারের তালিকায় নিজেকে নিয়ে গড়ে গেলেন নতুন ইতিহাস। জন্মের স্বাদ আর বেড়ে উঠার লীলায় চড়ে কবি আল মাহমুদ ইতিহাসের কাছেই নিজেকে সমর্পন করে গেছেন মনের আনন্দে। সমাজতন্ত্র আর বিশ্বাসিতন্ত্রের মিশেলে পাখা চড়িয়ে নিজেকে এক ব্যতিক্রমী কাব্যপুরুষে স্থান দিয়ে আমাদের করে গেলেন চিরঋণি। আমরা চেতনার সোহাগে হারিয়েছি যথাযথ ভাব ও ভবের পুরো কারিশমামাটিক ভদ্রতাও! সত্য আর ধর্ম দুটোই সহোদরা। দুটোর কোনো একটাকে হারিয়ে কবি হওয়া গেলেও যাতনার বহ্নিশিখায় শব্দরা নিরবে আগুন ভোজনে ব্যস্ত হতে থাকে। জাগতিকচেতনার কাছে কবিতা গান ধরে না। কবিতা গান ধরে স্বপ্নের কাছে, ভালোবাসার কাছে,ইতিহাসের কাছে।কবি আল মাহমুদ সবটুকুই আত্মস্থ করে আপনখোলসে তার পরম ইচ্ছর কাছে নতজানু হয়েই পায়রাদের পাখায় চড়ে হাস্সান ইবনে সাবিতের উত্তরসুরি হয়েই স্থায়ী বাসস্থানে বিজয়ী বরের বেশে যেতে পেরেছেন বোদ্ধাপাঠক মনে করে। কবি আল মাহমুদ মাটিগন্ধা স্বপ্নের সানু হয়ে পাঠকের হৃদয়ে গেঁথে গেছে আস্থাশীলতার সবটুকু। যেটুকু বাংলা সাহিত্য দাবী রাখে।