বইমেলা ২০২১ এ প্রকাশিত হয়েছে কবি আসাদ বিন হাফিজ’র ছড়া সংকলন “টাপুর টুপুর বৃষ্টি”। প্রকাশক- দেশজ প্রকাশন, শাহজাদপুর, ঢাকা। লেখা নির্বাচন ও গ্রন্থনা- ওয়াহিদ জামান। শিশুতোষ এই ছড়া গ্রন্থে ৩৬টি সুনির্বাচিত ছড়া-কবিতা স্থান পেয়েছে। প্রচ্ছদ ও অলংকরণ করেছেন সাইফ আলি।
একজন ডাকসাঁইটে প্রকাশক ছিলেন কবি আসাদ বিন হাফিজ। তাঁর অধুনালুপ্ত প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান ‘প্রীতি প্রকাশন’ ব্যাপক সাড়া জাগিয়েছিল বইপ্রেমিদের মাঝে। বার্ধক্যজনিত কারণ, পারিপার্শ্বিকতা এবং অনাকাঙ্ক্ষিত কিন্তু অনিবার্য কিছু ঘটনার প্রেক্ষাপটে এক পর্যায়ে তিনি ‘প্রীতি প্রকাশন’ এর কার্যক্রম গুটিয়ে ফেলতে বাধ্য হন। এর পরই তাঁর সামনে এসে যায় সীমাহীন সম্ভাবনা। এতকাল যিনি নানা কাজেকর্মে নিজেকে ব্যাপৃত রেখেছিলেন, তিনি হয়ে উঠলেন সার্বক্ষণিক কবি। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমকে প্লাটফর্ম হিসেবে বেছে নিয়ে তিনি বিরতিহীনভাবে লিখতে শুরু করেন ছড়া, কবিতা, গদ্য। আজো লিখে চলেছেন অবিরাম। বিচিত্র বিষয় নিয়ে লিখছেন। কখনো শিশুতোষ ছড়া, কখনো বিপ্লবী কবিতা, কখনো সমাজ সচেতনামূলক কবিতা। সমাজের নানাবিধ সমস্যাকে তীর্যক ভঙ্গিতে তুলে আনছেন কবিতায়। পাশাপাশি শিশুদের জন্যও লিখে যাচ্ছেন নিটোল ছন্দোবদ্ধ ছড়া-কবিতা। এমন একজন আসাদ বিন হাফিজকেই চেয়েছিল সবাই। যেভাবেই হোক মহান আল্লাহ তা’আলা সে সুযোগ তৈরি করে দিয়েছেন, আলহামদুলিল্লাহ।
কবিরা কবিতা লেখেন মনের আনন্দে। শব্দের পর শব্দ গেঁথে সৃষ্টি করেন নতুন ব্যঞ্জনা। তাঁর এই সাধনা তখনই সার্থকতা লাভ করে যখন তাতে যুক্ত হয় সামাজিক দায়বদ্ধতা, মানবতাবোধ, সৌন্দর্যবোধ এবং স্রষ্টার প্রেম। একজন নাস্তিক কবির সাহিত্য সাধনা কখনোই তার দেহসত্বার ঊর্ধে উঠতে পারে না। কাম, ক্রোধ, রিরংসাই তার সাহিত্যের প্রতিপাদ্য হতে বাধ্য। কারণ, তার কোন সামাজিক দায়বদ্ধতা নেই। যদিও কোন কোন নাস্তিক কবি-সাহিত্যিক তার সাহিত্যে মানবতাবোধের জয়গান গেয়ে থাকেন, কিন্তু সেই মানবতাবোধের জয়গান শেষ পর্যন্ত প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে দাঁড়ায়। সেখানে লেখকের স্বাধীনতা পর্যবসিত হয় কেবলমাত্র সামাজিক অনাচার, দূরাচার ইত্যাদির প্রকাশের মাধ্যম, কিন্তু তিনি তা প্রতিকারের বা নির্মূলের কোন ফর্মুলা বাতলাতে পারেন না।। প্রকারান্তরে একজন আস্তিক কবি তার সাধনার প্রতিটি ধাপে মানবতার জয়গান গেয়ে থাকেন স্রষ্টার অবিনশ্বরতার চিন্তাটা মাথায় রেখে। প্রতি পদে পদে তিনি স্রষ্টার প্রশংসায় মশগুল থাকেন। স্রষ্টার প্রেমকে ছড়িয়ে দেন সবখানে। চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেন সষ্টার মহানুভবতাকে। কারণ তিনি জানেন, মহান স্রষ্টা তার মহৎ সৃষ্টি আশরাফুল মাখলুকাতকে কতটা ভালোবাসেন। মহান আল্লাহর নির্দেশিত পথেই যে মানবতার মুক্তি এই ব্যাপারে তিনি নিঃসন্দেহ।
কবি আসাদ বিন হাফিজ একজন আপাদমস্তক আস্তিক কবি। আলোচ্য গ্রন্থের প্রতিটি কবিতা-ছড়ার পরতে পরতে ছড়িয়ে আছে সৌন্দর্যবোধ ও স্রষ্টার প্রেম। স্রষ্টার প্রেম প্রসঙ্গে তাইতো তিনি বলতে পারেন-
“খোদার লীলা দেখ অতুল
পানির তলে হিজল ফুল।” [টাপুর টুপুর বৃষ্টি, পৃষ্ঠা-৫]
“হাসনাহেনা হাসনাহেনা বন্ধু আমার ভাই
যে দিলে এমন সুবাস তাঁর গুণগান গাই।” [হাসনাহেনা, পৃষ্ঠা-১০]
“এমনি মজার গাঁ আমাদের আল্লাহ তা’লার দান
আল্লাহ তালার সৃষ্টি দেখো কতো অফুরান।
তাইতো আমরা করি সবাই তারই গুণগান
তার মতো আর নেইতো কেউ পবিত্র, মহান।” [আমার গাঁ, পৃষ্ঠা-১১]
“আল্লাহ বড়োই রহিম রহমান, নইলে শোন মা
জোসনার আলো ওদের আমি মোটেও দিতাম না।” [আকাশ ভরা তারার মেলা, পৃষ্ঠা-১৫]
“সেই আল্লাহর জয়গান মৌমাছি গায়
জিকিরের তালে তালে চৌগাছি যায়।” [মৌমাছি চৌগাছি, পৃষ্ঠা-৩৩]
কবি আসাদ বিন হাফিজ একজন গ্রাম বাংলার কবি। সবুজ শ্যামলিমায় তিনি বেড়ে উঠেছেন। এই গ্রন্থে আমরা তার পরিচয় পাই।টাপুর টুপুর বৃষ্টি, কেমনে যাবো শহরে, কাঠবিড়ালি, মধুমাস, হাসনাহেনা, আমার গাঁ, কষ্ট তাড়াও, শীতের বুড়ি, শরতের সাদা মেঘ, আয় হেমন্ত, ইষ্টিকুটুম মিষ্টিকুটুম প্রভৃতি ছড়ায় তাঁর প্রকৃতি প্রেমের বহিঃপ্রকাশ দেখতে পাই। যেমন-
“টাপুর টুপুর বৃষ্টি পড়ে
টুপুর টাপুর টাপ
আয়রে তোরা দল বেঁধে
দেবো খালে ঝাঁপ।” [টাপুর টুপুর বৃষ্টি, পৃষ্ঠা-০৫]
“ধনেপাতার ঘ্রাণ মৌ মৌ সর্ষে ফুলের শোভা
শীতের দিনের ফুলের বাহার মিষ্টি মনলোভা। [কেমনে যাবো শহরে, পৃষ্ঠা-৬]
এই গ্রন্থটিতে শিশুদের জন্য উদ্দীপনামূলক ছড়া-কবিতা রয়েছে অনেকগুলো। তিনি শিশুদের জীবনকে সুন্দর করার জন্য, উন্নত জীবনাচার শেখার তাগাদা দিয়েছেন। তাদেরকে সংঘবদ্ধ করার জন্য অনেক ছড়া লিখেছেন। যেমন তিনি “একতার জয়” কবিতায় বলেন-
“যেখোনে ভয় সেখানে জয়
দল বেঁধে যাও যদি
কুমিরগুলো পালিয়ে যাবে
তোমরা হবে নদী।” [একতার জয়, পৃষ্ঠা-৮]
ঈদ মানে জিদ নয় কবিতায় তিনি বলেন,
“ঈদ মানে নিদ নয়
অকারণ জিদ নয়
নয় রাগারাগি
ঈদ মান এ আনন্দ
করা ভাগাভাগি।” [ঈদ মানে জিদ নয়, পৃষ্ঠা-১৪]
অথবা কষ্ট তাড়াও কবিতায় তিনি বলেন,
“কোরান পড়ো হাদিস পড়ো জীবন গড়ো রোজ
খোদার সৃষ্টি কষ্টে আছে কোথায় করো খোঁজ।” [কষ্ট তাড়াও, পৃষ্ঠা-১৭]
সবাই খুশি হন কবিতায় তিনি বলেন,
“গুরুজনকে সালাম দিলে সবাই খুশি হন

আদব কায়দা ভালো হলে শিক্ষক খুশি হন
পাড়াপড়শি আত্মীয়জন সোনার ছেলে কন।

আল্লাহর হুকুম পালন করলে সে হয় মুমিন গণ্য
সবার আদর সোহাগ পেয়ে জীবন আমার ধন্য।” [সবাই খুশি হন, পৃষ্ঠা-২১]
শিশুদের শেখার আছে অনেক কিছু। তাকে ভুতের পেলে চলবে না। হার মানলে পরাজয় হয় এ কথাটাও তাকে বুঝতে হবে। মন্দকে দূরে ঠেলে ভালোকে গ্রহণ করতে হবে। শিশুকে প্রকৃতি পাঠ করতে হবে। প্রকৃতিকে পাঠ করতে না পারলে জীবন অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। শিশুকে হতে হবে নির্ভিক, তাকে শিখতে হবে “কেমন করে লড়তে হয়”। জীবনকে উপভোগ করতে হবে “ইষ্টিকুটুম মিষ্টিকুটুম” এর দাওয়াত খেয়ে।“ইচ্ছে ঘুড়ি”র মতো উড়ে উড়ে জান্নাতে যাওয়ার পথ খুঁজে পেতে হবে।
বিষয় বৈচিত্রে ভরপুর আলোচ্য ছড়া-কবিতা গ্রন্থ “টাপুর টুপুর বৃষ্টি” কবি আসাদ বিন হাফিজের একটি অনবদ্য রচনা। রচনাশৈলী, ভাষার মাধুর্য, শব্দ চয়নে নান্দনিকতা ইত্যাদি বিবেচনায় এটি বাংলাদেশের শিশু সাহিত্যে একটি উল্লেখযোগ্য সংযোজন। শিশুতোষ মানসিকতায় গ্রহণযোগ্য করে তোলার প্রয়াসে তিনি অনেক কবিতায় ঠাস বুননের প্রয়সা ইচ্ছা করেই এড়িয়ে গেছেন বলে আমার কাছে মনে হয়েছে। আমাদের আটপৌরে কথক চালেই রচিত হয়েছে তার ছড়া-কবিতাগুলো।
বইটির প্রচ্ছদ, অলংকরণ, মুদ্রণ, বাঁধাই অত্যন্ত উন্নতমানের। এই বইটি পাঠকপ্রিয়তা পাবে বলে আমার দৃঢ় বিশ্বাস।

ঢাকা, ৫ জুলাই, ২০২১

টাপুর টুপুর বৃষ্টি
আসাদ বিন হাফিজ
প্রকাশক: দেশজ প্রকাশন
প্রকাশকাল: বইমেলা ২০২১
প্রচ্ছদ ও অলঙ্করণ: সাইফ আলি
মূল্য: ২৫০ টাকা