‘মোর প্রিয়া হবে এসো রাণী
দেব খোঁপায় তারার ফুল’

এই আহবান শুধু নজরুলের একার নয় বিখ্যাত ইংরেজ কবি ডব্লিও বি ইয়েটসেরও। দুই প্রান্তের দুই কবি অভিন্ন প্রতিপক্ষ ব্রিটিশ শোষকের বিরুদ্ধে লড়েছেন স্বদেশের স্বাধীনতার লক্ষ্যে। ১৮৬৫ সালে জন্ম নেয়া ইয়েটস ও ১৮৯৯ সালে জন্ম নেয়া কাজী নজরুল যে অত্যন্ত প্রতিভাবান ছিলেন, তা শৈশবেই সবার নজরে পড়ে। দুই জনের রচনাতেই পৌরাণিক গাঁথা ও নানা লোক ঐতিহ্যেরে উপস্থিতি লক্ষ্যণীয়। দুজন কবিই একাধিক নারীকে ভালোবেসেছেন আবার ভালোবাসা না পাওয়ার দুর্বহ বেদনায় মুষড়ে পড়েছেন। সেই প্রত্যাখাতের অভিঘাতে অভিমানে সৃষ্টি করেছেন অগণিত অমর সাহিত্যকর্ম। তাতে ঋদ্ধ হয়েছে কবি তাতে ঋদ্ধ হয়েছে কবিতা তাতে ঋদ্ধ হয়েছে বিশ্বসাহিত্য।

কবি কাজী নজরুল প্রেয়সির প্রতি অভিমান করে ‘অভিশাপ’ কবিতায় বলেন,
“যেদিন আমি হারিয়ে যাবো
সেদিন তুমি বুঝবে
অস্তপারের সন্ধ্যাতারায়
আমার খবর পুছবে
বুঝবে সেদিন বুঝবে।”

নজরুল দ্রোহের কবি প্রেমের কবি তবে সে প্রেম রবীন্দ্রনাথের প্রেমের মত পরমাত্মার প্রেম নয়, নয় সে প্রেম জীবনানন্দ দাশের কিংবা বিভূতিভূষণের রূপসী প্রকৃতির। এ প্রেম রক্ত মাংসের রমণীর প্রেম। নারীকে যখন নির্মোহ ভাবে দেখেছেন তখন তার চোখে নারী সদর্থক নারী ইতিবাচক নারী মহিয়সী। তখন কবি নারীকে পুরুষের সমান মর্যাদা দিয়ে বলেছেন,
“এই পৃথিবীর যা কিছু মহান সৃষ্টি চীর কল্যাণকর
অর্ধেক তার করিয়াছে নারী অর্ধেক তার নর”। (সাম্যবাদী)

কিন্তু নারীকে যখন প্রেমিকা রূপে দেখেছেন তখন নারীকে সন্দেহ, অশ্রদ্ধা ছলনাময়ী, লোভী বলে ভৎর্সনা করেছেন। তাই ‘পূজারিণী’ কবিতায় কবি বলেন,
“নারী নাহি হতে চায় শুধু একা কারো
এরা দেবী এরা লোভী
যত পূজা পায় এরা চায় তত আরো।
ইহাদের অতি লোভী মন
একজনে তৃপ্ত নয়
এক পেয়ে সুখি নয়
যাচে বহু জন।

ওদিকে ইংরেজি সাহিত্যের শেষ রোমান্টিক কবি ইয়েটসের লেখায় রোমান্টিকতার আধার হিসেবে নশ্বর নারীকুলকেই খুঁজে পায় পাঠক। আইরিশ কবি ইয়েটস ছিলেন দুই বিশ্বযুদ্ধের মধ্যবর্তী সময়ের আশ্চর্যজনক ফসল এবং রোম্যান্টিসিজম ও মর্ডানিজমের এক শ্রম শিল্পী। ইয়েটসের প্রেমিকারা হলো- অসাধারণ সুন্দরী মডগন, মডগনের কন্যা ইসল্ট, অলিভিয়া শেকস্পীয়র ও জর্জিয়া এসব নারীরা কবি ইয়েটসকে প্রভাবিত করে রেখেছিলো তার পুরোটা জীবন যৌবন জুড়েই। আবার কবি নজরুলকে প্রভাবিত করেছিলো নার্গিস, প্রমীলা, ফজিলাতুন্নেসা, উমা মৈত্র, রানু সোম, জাহানারা বেগম ও কানন দেবী।

ইয়েটস মত প্রকাশ করেছেন যে, নারী চিত্ত বিজয়ের প্রচেষ্টা একটি নির্বুদ্ধিতার কাজ ব্যতিত কিছু নয়। তিনি পরামর্শ দিয়েছেন যে, পুরুষেরা যেন নারীদের প্রতি অতি উৎসাহী ও উন্মত্ত না হয়। তিনি পুরুষদের সান্ত্বনা দিতে গিয়ে বলেন,
`For everything that’s lovely
But a brief ,dreamy ,kind delight’

ইয়েটস তার আধ্যাত্মিক প্রেমিকা মডগনকে ১৮৯১, ১৮৯৯, ১৯০০, ১৯০১ সালে বিয়ের প্রস্তাব দেন কিন্তু মডগন তাকে প্রতিবারই নিরুৎসাহিত করেন। তখন ইয়েটস বলেন, তোমাকে ছাড়া সুখি হতে পারবো না। মডগন বিয়ে করেন ১৯০৩ সালে বিপ্লবী মেজর মেম ব্রাইটকে। মডগন ইচ্ছা পোষণ করেন বন্ধু হয়ে দুজন পাশাপাশি থাকার। এতে কবি ক্ষুব্ধ হয়ে No Second Troy’ কবিতায় মডগনকে ধ্বংসাত্মক গ্রীক সুন্দরী হেলেনের সাথে তুলনা করেন। Why should I blame her that she filled my days
with misery,or that she would of late’

১৩ বছর পর মডগনের স্বামী মারা গেলে আবার মডগনকে বিয়ের প্রস্তাব দেন। কিন্তু তাতেও কাজ হয়নি। অনেক পরে মডগনের কন্যা ইসুয়েল্টগনকে বিয়ের প্রস্তাব দেন কবি ইয়েটস। কিন্তু যতবারই বিয়ের প্রস্তাব দেন ততবারই প্রত্যাখ্যাত হন। কবি মডগনের স্মৃতি হৃদয় থেকে কখনই মুছে ফেলতে পারেননি। মডগন ছিলেন কাজী নজরুলের এই গানের মতই ‘মোরা ঝঞ্ঝার মত উদ্দাম/মোরা ঝর্ণার মত চঞ্চল-বন্ধনহীন জন্ম স্বাধীন/চিত্তমুক্ত শতদল।’ এ গানের ভাববস্তুর বৈশিষ্ট্যধারী নারী হলেন মডগন। মডগনের প্রতি ইয়েটসের চিরস্থায়ী ভালোবাসা প্রকাশিত হয়েছে `A last confession’ কবিতায়। ব্যর্থ হয়ে পরলোকে মডগনকে পাবার আশা কবি পোষণ করেন। কাজী নজরুল ইসলামও নারী প্রেমে ব্যর্থ হয়ে বলেন, পরজনমে দেখা হবে প্রিয়/ভুলিও মোরে হেথা ভুলিও। কাজী নজরুল ১৯২৮ সালে পরিচিত হন ফজিলাতুন্নেসার সাথে কাজী মোতাহের হোসেনের মাধ্যমে। কবি অল্প বিস্তর জ্যোতিষবিদ্যা জানতেন ঐ উছিলায় বিশ^বিদ্যালয় ছাত্রী ফজিলাতুন্নেসার বাসায় হাত দেখার নামে যাতায়াত শুরু করেন, হাত দেখার বাহানায় হাত ধরার বাসনায়। জহির রায়হান একবার বলেছিলো,‘একবার যদি রটে যায় হাত দেখতে পারে, তাহলে সবচেয়ে সুন্দরী মেয়েদের হাত ধরা যায় ’। হাত দেখতে দেখতে, দিনে দিনে হাত দেখা মেয়েটির প্রতি কবি দুর্বল হয়ে পড়লেন। কিন্তু ফজিলাতুন্নেসা তাকে নির্মম ভাবে প্রত্যাখান করেন। তাকে উদ্দেশ্য করে মোতাহের হোসেনকে ৭টি ও ফজিলাতুন্নেসাকে ১টি মোট ৮টি পত্র ফজিলাতুন্নেসাকে প্রেরণ করেছিলেন। উত্তরে ফজিলাতুন্নেসা ১টি মাত্র চিঠি লেখেন নজরুলকে এই বলে, ‘আর যেন তাকে চিঠি না লেখা হয়।’ উচ্চ শিক্ষার জন্য বিলেত যাবার সময় ‘সঙগাত’ পত্রিকার কার্যালয়ে সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে কবি অভিমানে মঞ্চে না এসে রুমে বসে থাকেন,পরে তাকে উদ্দেশ্য করে মঞ্চে এসে গান ধরেন,
‘থেকো না স্বর্গে ভুলে, এ পারের মর্তকুলে, ভিড়ায়ো সোনার তরী, আবার এ নদীর বাঁকে।’
বিলেত থেকে সঙ্গী নির্বাচন করে দেশে ফিরে এসে ফজিলাতুন্নেসা বিয়ে করেন। খবর শুনে নজরুল লেখেন-
“বাদল বায়ে মোর নিভে গেছে বাতি
তোমার ঘরে আজ উৎসবের রাতি।
তোমার আছে হাসি আমার আঁখি জল
তোমার আছে চাঁদ আমার মেঘ দল।”

সঞ্চিতা কাব্যগ্রন্থ তাকে উৎসর্গ করতে চাইলেন কিন্তু ফজিলাতুন্নেসা রাজি না হওয়ায় রবীন্দ্রনাথকে ঐ গ্রন্থ উৎসর্গ করেন।
নজরুলের প্রথম প্রেম নার্গিসের সাথে। নার্গিস ছিলো আলী আকবরের বোনের মেয়ে। কলকাতার ৩২ নং কলেজ স্ট্রিটে আলী আকবর খানের সাথে নজরুলের প্রথম পরিচয় হয়,তারা পাশিপাশি থাকতেন। আলী আকবর নিজে পুস্তিকা লেখে সাথে দু একটা ছড়া লেখে নিজেই ফেরি করে বিক্রি করতেন। তার ছড়ার মান খারাপ দেখে নজরুল ‘লিচু চোর’ছড়াটি তাকে লেখে দেন। তখন আলী আকবর চিন্তা করল কবিকে নিজের আয়ত্তে রাখতে পারলে লাভবান হবেন। তাই ১৯২১ সালে তাকে নিজের জেলা কুমিল্লাতে নিয়ে যান পরিবারের কারো সাথে বিয়ে দেবার দূরভিসন্ধিতে। নজরুলের বন্ধুরা আলী আকবরকে মোটেই পছন্দ করত না। তারা নজরুলকে সাবধান করে দেন কিন্তু সরল নজরুল আলী আকবরের চালাকি বুঝতে পারেননি। কলকাতার বন্ধুদের না জানিয়ে তার সাথে কুমিল্লায় চলে আসেন। এসে আকবরের বন্ধু বীরেন্দ্রনাথের বাসায় ওঠেন। বীরেন্দ্র এর মায়ের নাম ছিলো বিরজা সুন্দরী দেবী। চার পাঁচ দিন সেখানে থাকার পরে, বিরজা সুন্দরী দেবীর সাথে নজরুলের ভালো সম্পর্ক গড়ে ওঠে। উনাকে নজরুল মা বলে ডাকতেন। (পরে এই বিরজা সুন্দরী দেবীই যখন নজরুল ৩৯ দিন জেলে অনশন করছিলেন তাকে অনশন ভাঙান।) তারপরে যান দৌলতপুর গ্রামের খাঁ বাড়িতে। খাঁ বাড়ির পাশেই ছিলো আলী আকবর এর দরিদ্র বিধবা বোন আসমাতুন্নেসার বাড়ি। খাঁ বাড়ির দীঘির ঘাটে বসে নজরুল বাঁশী বাজাতেন, তা শোনে মুগ্ধ হয়ে যায় যুবা নার্গিস। আলী আকবর ব্যাপারটি লক্ষ্য করে, সে মনে মনে চাইত নিজেদের কারো সাথে বিয়ে দিয়ে নজরুলকে কুমিল্লায় রাখলে তার প্রকাশনী ব্যবসা ভালো চলবে। (নজরুলকে আটকানোর ফন্দির কথা পরে নার্গিসের ভাইয়ের কাছ থেকে জানা যায়।) দিনে দিনে নার্গিসের সাথে নজরুলের প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠল। এ সময় কলকাতার কোন বন্ধুকে চিঠি দিতে দিতেন না বা লেখা চিঠি সরিয়ে ফেলতেন। বিয়ের কিছুদিন আগে নজরুল এ সমস্ত ঘটনা জানতে পারেন। নার্গিসের দ্বিতীয় স্বামী আলী আকবরের বই বিক্রির ম্যানেজার কবি আজিজুল হক পরবর্তীতে সেই চিঠি গুলো জনসম্মুখে প্রকাশ করেন। ১৩২৮ বঙ্গাব্দের ৩ আষাঢ় শুক্রবার বিয়ে ধার্য হয়। বিয়ের আকদ্ সম্পন্ন হলেও কাবিনে ঘর জামাইয়ের শর্তে বিরোধ সৃষ্টি হলে নজরুল বিয়ে না করেই কাদাময় পথে লুঙ্গি কাচা মেরে দৌলতপুর ত্যাগ করে বিরজা সুন্দরীর বাড়ি কুমিল্লার কান্দির পাড়ে সেনবাড়িতে চলে আসেন। সেখানে ২১ দিন অবস্থান করেন। তারপরে গোমতির পানি অনেক দূর গড়িয়েছে। ১৫ বছর পর আবার নার্গিসের সাথে দেখা হয়,সেই সাক্ষাৎ কালেই আনুষ্ঠানিক ভাবে বিবাহ বিচ্ছেদ হয়। তার আরো ৮ মাস পরে নার্গিসের দ্বিতীয় বিয়ে হয় কবি আজিজুল হাকিমের সাথে। ১৯৩৭ সালে নজরুলকে নার্গিস একটি পত্র লেখেন তখন কবির বন্ধু শৈলজানন্দ উপস্থিত ছিলেন। শৈলজা চিঠির উত্তর লেখতে বললে নজরুল একটি গান লেখে দেন,
‘যারে হাত দিয়ে মালা দিতে পারো নাই/কেন মনে রাখো তারে ভুলে যাও ভুলে যাও/তারে একবারে। আমি গান গায় আপনার দুঃখে/ তুমি কেন দাঁড়াও সম্মুখে/আলেয়ার মত ডাকিও না আর/ নিশীথ অন্ধকারে।

বিয়ে না করে চলে যাবার পরে ১৯২১ সালে জুলাই মাসে আলী আকবরকে চিঠি লেখেন-
বাবা শশুর,
আপনাদের এই অসুর জামাই পশুর মত ব্যবহার করে এসে যা কিছু কসুর করেছে তা ক্ষমা করো সকলে। আমি সাধ করে পথের ভিখারী সেজেছি বলে লোকের পদাঘাত সইবার মতন ক্ষুদ্র আত্মা অমানুষ হয়ে যায়নি। অপ্রত্যাশিত এই হীন ঘৃণা অবহেলা আমার বুক ভেঙ্গে দিয়েছে বাবা। আমি মানুষের উপর বিশ্বাস হারিয়ে ফেলেছি। আলী আকবর কলকাতায় গিয়ে টাকার লোভ দেখালে নজরুল আরো ক্ষেপে যায়। ছায়ানট, পুবের হাওয়া ও চক্রবাক কাব্যগ্রন্থের অনেক কবিতা নার্গিসকে কেন্দ্র করে লেখা।

ওদিকে প্রেমে ব্যর্থ হয়ে ভারাক্রান্ত হৃদয়ে ইয়েটস বলেন,
‘Never Give All the Hearts’ মুক ও বধির প্রেমিকরাই প্রেমে পড়ে হাবুডুবু খায় পরে ভুল বুঝতে পেরে লজ্জা পায়। কবি বলেন
‘He that made this knows all the cost,
For he gave all his heart and lost.’

ইয়েটস এর সর্বোত্তম কবিতা হচ্ছে The Wilde swans at coole’ Upon the brimming water among the stones
Are nine and fifty swans’
লেখক এখানে ৫৯ বিজোড় সংখ্যা দিয়ে বুঝাচ্ছেন একটির জোড়া নেই। জোড়াহীন হাঁসটি যেন সে নিজে। সে নিঃসঙ্গ সে একাকী।

এ কবিতায় জর্জ হাইড লীর সাথে কবি চিত্তের ভাবানুভূতি প্রকাশ পেয়েছে। যা মডগনের কাছে পাননি সেই ইপ্সিত প্রাণোচ্ছ্বাস পেয়েছেন হাইড লীর মাঝে তখন তার বয়স ৫১ বছর। ৫২ বছর বয়সে ১৯১৭ সালে তরুণী জর্জ হাইডলীর সাথে বিয়ে হয়। বয়সের ব্যবধান (২৮ বছর) তাদের মধ্যে বিয়ের বাঁধা হয়ে দাঁড়াতে পারেনি।

নজরুল বিরজা সুন্দরীর বাড়িতে অবস্থানের সময় প্রথম প্রমীলাকে দেখেন। বিয়ে ভেঙ্গে যাবার পর নুরু মুষড়ে পড়ে প্রায় তিন সপ্তাহ পরে কলকাতা থেকে তার বন্ধু কমরেড মুজফফর এলে তার সাথে চলে যান। আবার ৩ মাস পরে অক্টোবরে ফিরে আসেন। মাঝে মাঝেই সে কলকাতা থেকে কুমিল্লাতে এসেছে। একবার দূর্গাপূজার সময় এসে ১ মাস থাকেন তারপর তৃতীয় বার ১৯২২ সালে কুমিল্লায় আসেন, সেখানে অবস্থান করেন ফ্রেবয়ারি থেকে মে পর্যন্ত। ফিরে যান সঙ্গে নিয়ে ১৪ বছরের এক কিশোরীর সমগ্র হৃদয়। এ সময় কুমারী প্রমিলার সাথে কবির গভীর প্রেমের সম্পর্ক স্থাপিত হয়। বিজয়িনী কবিতায় কবি লেখেন,
“হে মোর রাণী তোমার কাছে হার মানি আজ শেষে
আমার বিজয় কেতন লুটায় তোমার চরণ তলে এসে”

নজরুল তার দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ ‘দোলন চাঁপা’, প্রমীলার নামে উৎসর্গ করেন। নজরুল কারাগার থেকে ফিরে এলে নজরুলের সাথে প্রমীলার বিয়ে দিতে চাইলেন প্রমীলার মা গিরিবালা দেবী। এতে বিরজা সুন্দরী ও তার ছেলে বীরেন্দ্রনাথ বিয়েতে রাজী হলেন না। সবার মতের বিরুদ্ধে যেয়ে গিরিবালা দেবী কলকাতায় গিয়ে নজরুলের সাথে মেয়ে প্রমীলার বিয়ে দেন।

ঢাকা কলেজের প্রিন্সিপাল সুরেন্দ্রনাথ মৈত্রের মেয়ে উমাকে গান শেখাতেন নজরুল। উমা মৈত্রের আরেক নাম নোটন। অনেকের মতে নজরুল তার প্রতি দুর্বল হয়ে পড়েছিলেন। শিউলী মালা গল্পটি তাকে কেন্দ্র করেই লেখা এ গল্পের কিছু উদ্ধৃতি,
শিউলী আমার কাছে গান শিখতে লাগল, আমাদের মালা বদল হলো না কিন্তু কণ্ঠ বদল হয়ে গেল। অবাধ মেলামেশা, সেখানে কোন নিষেধ, কোনো গ্লানি কোন বাঁধা বিঘœ সন্দেহ ছিলো না, আর এসব ছিলো না বলেই কারুর করে কর স্পর্শ করেনি। একজন অসীম আকাশ একজন অতল সাগর। কোন কথা নেই প্রশ্ন নেই শুধু এ ওর চোখে, ও এর চোখে, চোখ রেখে তাকানো।
অভিমান করে কবি লেখেন,
“নাইবা পরিলে নোটন খোঁপায় ঝুমকো জবার ফুল”
আবার ‘গানের আড়াল’ কবিতাতে উমার প্রতি কবির দুর্বলতার পরিচয় ফুটে ওঠে।
“তোমার কণ্ঠে রাখিয়া এসেছি মোর কন্ঠের গান
এইটুকু শুধু রবে পরিচয়? আর সব অবসান”
কবি উমা মৈত্রকে অনেক গুলো গান শেখান তারমধ্যে একটি হলো- ‘নিশি ভোর হলো জাগিয়া/পরাণ প্রিয়া/কাঁদে পিউ কাহা পাপিয়া”

আবার রানু সোম (১৯১৫-২০০৬) ছিলেন নোটনের বান্ধবী। বলে রাখা ভালো রানু সোমের আরেক নাম প্রতিভা বসু । বাবা আশুতোষ ছিলেন কৃষি কর্মকর্তা পৈতৃক নিবাস ঢাকা বিক্রমপুরের হাঁসাড়া গ্রাম। রানু সোমের সাথে নজরুলের যখন পরিচয় হয় তখন তার বয়স ১৩ বছর। তার অনন্য আত্মজীবনী ‘জীবনের জলছবি’তে নজরুলের সাথে ঘটে যাওয়া নানা ঘটনার বর্ণনা আছে বইটিতে এই বইতে নজরুল সম্পর্কে বলেন,
“একদিন বিকেল বেলায় ঝড়ো হাওয়ার মতো কবি নজরুল উড়ে এলেন বনগ্রামের বাসায়, দরজা খুলে দেখি সুশ্রী এক ব্যক্তি দাঁড়িয়ে আছে দরজায়, এক মুখ হেসে আমাকে ঠেলেই প্রায় ঢুকে এলেন ঘরে। আমার মুখের দিকে তাকিয়ে হাসতে হাসতে বললেন, ‘তুমি নিশ্চয় রানু? বল ঠিক ধরেছি কিনা?’ খোলা গলায় হাসলেন, বয়স তখন বত্রিশ-তেত্রিশ হবে যৌবন তার চোখে মুখে, সারাক্ষণ হাসি সমস্ত শরীরে নদীর স্রোতের মত বহমান। মস্ত বড় বড় কালো টানা চোখ, এলোমেলো ঘন চুলের বাবরি তীক্ষ নাসিকা, ঘষা তামার মত রং সব মিলিয়ে একটা ব্যক্তিত্ব বটে’। সে যাত্রায় একমাস ঢাকায় অবস্থানকালে প্রতিদিনই তাদের বাড়িতে আসতেন। বেশ কিছু কালজয়ী গান রানুদের বাড়িতে বসেই নজরুল রচনা করেন। একদিন সকালে এসে কবি বলল, নাও গানটা তুলে নাও রাতে লেখেছি নয়তো ভুল হয়ে যাবে।
“আমার কোন কূলে আজ ভিড়লো তরী এ কোন সোনার গাঁয়/
আমার ভাটির তরী আবার কেন উজান যেতে চায়।”
প্রতিভা বসু বলেন গান শেখাতে শেখাতেই সুরটা ঠিক করে নিলেন।
তিনদিন পরে একদিন কবিকে হঠাৎ চা এনে দিলে কবি আনন্দে গেয়ে ওঠলেন “এতো চা ঐ পিয়ালায় এমন করে আনলে বলো কে? অতিরিক্ত চা পান করতেন কবি চা পেয়ে রানু সোমকে বলেন ‘তোমার মত মেয়ে হয় না’। পরের দিন সৃষ্টি হলো সেই কালজয়ী গান ‘এত জল ও কাজল চোখে পাষাণী আনলে বল কে?’
প্রতিভা বসু আরো বলেন, “তখনকার সমস্ত গান আমাকে উজাড় করে শিখিয়ে ছিলেন”। নজরুলের এ বাড়িতে ঘনঘন আসা আশেপাশের হিন্দু যুবকেরা মেনে নিতে পারছিলেন না। এরই মধ্যে নজরুল বিরোধী সজনীকান্ত তার ‘শনিবারের চিঠি’ পত্রিকাতে নজরুলের বিখ্যাত গান প্যারোডি করে লেখেন-
“কে বিদেশি বন উদাসি বাঁশের বাঁশি বাজাও বনে” এই প্যারোডি প্রকাশ হবার কয়েকদিন পরেই একদিন রাতে রানু সোমের বাড়ি থেকে ফেরার পথে নজরুল ৭/৮ জন হিন্দু যুবকের আক্রমণের শিকার হন। এ ব্যাপারটা পুলিশ পর্যন্ত গড়িয়েছিলো।

রানু সোম তখন গায়িকা ও নাট্যকর্মী গানের শিক্ষক দিলীপকুমারের বাড়িতে গান শিখতে গিয়ে প্রথম বুদ্ধদেব বসুকে দেখেন। তখন বুদ্ধদেব ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের সুপরিচিত মেধাবী ছাত্র ‘প্রগতি’ পত্রিকার সম্পাদক। পরিচয়ের সূত্র ধরেই ১৯৩৪ সালে পরিণয় বন্ধনে আবদ্ধ হন পরিবর্তিত নাম হয়ে যায় প্রতিভা বসু। বিয়ের পরে গানের চেয়ে লেখালেখিতে বেশি মনোযোগ দেন। ‘পথে হলো দেরি’ ‘ আলো আমার আলো’ ‘বিবাহিতা স্ত্রী’ এসব বিখ্যাত চলচিত্রের কাহিনীকার হলেন প্রতিভা বসু। ১৯৪০ সালে ঢাকায় নতুন বেতারকেন্দ্রের উদ্বোধন অনুষ্ঠানে যোগ দিতে এসে দেখা হয়ে যায় অনুষ্ঠানে আগত কবি নজরুলের সাথে বুদ্ধদেব দম্পতির। ২০০১ সালে প্রতিভা বসু মৃত্যুর আগে একবার ঢাকায় আসার অভিপ্রায় ব্যক্ত করেছিলেন কিন্তু তার সেই ইচ্ছা অপূর্ণই রয়ে গেল, মারা গেলেন ২০০৬ সালে।

মনে করা হয় কবির আর একজন প্রিয়সী ছিলেন পশ্চিমবঙ্গের মেয়ে জাহানারা বেগম চৌধুরী তিনি ‘বর্ষাবাণী’ পত্রিকার সম্পাদিকা ছিলেন। নজরুলের সাথে পরিচয় হয় ১৯৩১ সালে দার্জিলিং ঘুরতে গিয়ে। সে সময় দার্জিলিং এ উপস্থিত ছিলেন রবি ঠাকুর, মৈত্রীয় দেবী ,উমা মৈত্রসহ আরো অনেকে। এখানে পরিচয় হয় জাহানার বেগমের সাথে নজরুলের। তার কাছে ছিলো নজরুলের ৮টি কবিতা ও ৭টি গান। নজরুলের জীবন কালে এগুলো অপ্রকাশিত থেকে যায় । জাহানারা বেগম চৌধুরী মরে যাবার আগে এগুলো প্রকাশের অনুমতি দিয়ে যান।
তাকে লেখা কবিতা
১. ‘তুমি সুন্দর তুমি নয়ন তোমার মানস নীলোৎপল।
২. ‘সুন্দর তনু সুন্দর মন হৃদয় পাষাণ কেন?
আবার গান লেখে দেন “সাগরে যে জোয়ার জাগে জানে না তা চাঁদ”

ঐদিকে ইয়টেস যখন বিয়ে করেন তখন তার বয়স ছিলো ৫২ আর স্ত্রী জর্জিয়ার বয়স ছিলো ২৪। জর্জিয়া তখন উত্তাল টগবগে তরুণী। স্বামীর পছন্দের কারণে নিজের আসল নাম ত্যাগ করে জর্জি থেকে জর্জ হয়েছিলেন। ঐদিকে নজরুলের বিয়ের সময় বয়স ছিলো ২৩ আর প্রমীলার ছিলো ১৪ বছর। স্বামীর পছন্দের কারণে স্ত্রীর নাম দুলি থেকে হয়ে যায় প্রমীলা। দুই কবিই নিজের স্ত্রীর পূর্বের নাম বদলে নতুন নাম রাখেন। দুই নারীই তাদের স্বামীকে খুবই ভালোবাসতেন। দুই কবি তাদের প্রেমিকাকে যে সব চিঠি লেখেন তার বেশ কিছু চিঠি জন সাধারণ অনেক পরে জানতে পেরেছে।

কবি এজরা পাউন্ড বিয়ে করেছিলেন ইয়েটসের প্রেমিকা অলিভিয়ার মেয়েকে। অলিভিয়ার সাথে কবি ইয়েটসের লিভ টুগেদার ছিলো তখনও ইয়েটস মনে মনে মডগনকে কামনা করত ব্যাপারটা বুঝতে পেরে অলিভিয়া কবির কাছ থেকে দূরে সরে যান, নিজেকে সরিয়ে নেন। অনেক পরে ইয়েটসের প্রেমের চিঠি এজরা পাউন্ড জন সম্মুখে প্রকাশ করেন।
ইয়েটসের প্রেমিকারা অধিকাংশই ছিলো তার চেয়ে বয়সে বড় অলিভিয়া ছিলেন ২ বছরের বড় ,ফ্লোরেন্স ছিলেন ৫ বছরের বড়, আর লেডি গ্রেগরি ছিলেন ১৩ বছরের বড়, কিন্তু মডগন ছিলেন ১ বছরের ছোট। এছাড়াও প্রখ্যাত ব্রিটিশ অভিনেত্রী পরিচালক ও কাহিনীকার ফ্লোরেন্স ফার ক্যানসারে মৃত্যবরণ করলে কবি মর্মাহত হয়ে কেঁদে ছিলেন। আবার লেডি গ্রেগরির কাছ থেকে ইয়েটস তার জীবন সমস্যার সমাধান পেতেন। ফ্লোরেন্স ও লেডি গ্রেগরিকে ইয়েটস ভালোবাসতেন।

শিল্পী কানন দেবীকেও নজরুল গান শিখিয়েছিলো। কলকাতার পত্রিকা ‘শনিবারের চিঠি’ এ নিয়ে নানা রসালো কাহিনী ছাপতে থাকে। রটানো হয়েছিলো যে কবিকে কোথাও পাওয়া না গেলে, কানন দেবীর বাড়িতেই পাওয়া যাবে। একদিন রাত হয়ে যাওয়াতে কবি তাদের বাড়িতে থেকে যায়। এ নিয়ে নিন্দুকেরা গুজব ছড়াতে থাকে। ‘ব্যথার দান’ গ্রন্থ উৎসর্গে কবি লেখেছেন, মানসী তোমার মাথার কাঁটা নিয়েছিলুম বলে ক্ষমা করনি,তাই বুকের কাঁটা দিয়ে প্রায়শ্চিত করলুম। এ গ্রন্থ তাকেই উৎসর্গ করা হয়েছিলো। মেগাফোন কোম্পানির স্বত্তাধিকারী জিতেন্দ্রনাথের মাধ্যেমে কবির সাথে পরিচয় হয় কানন দেবীর। ১৯৩৯ সালের মে মাসে কানন দেবীর কন্ঠে ‘সাপুড়ে’ চলচিত্রের গানগুলো রেকর্ড়িং করা হয়। তার মধ্যে একটি বিখ্যাত গান হচ্ছে -‘আকাশে হেলান দিয়ে পাহাড় ঘুমায় ঐ/ ঐ পাহাড়ের ঝর্ণা আমি ঘরে নাহি রই’
কানন দেবী বলেন, ‘দেখি পাঞ্জাবী পরা এক ভদ্র লোক হারমোনিয়ামে সুর ভাঁজছেন। আমার দিকে তাকিয়ে বলল, “ডাগর চোখে কি দেখছো আমি হলাম ঘটক। এক দেশের সুর অন্য দেশের কথা,বর কনে-কে এক করতে হবে কিন্তু দুটির জাত আলাদা হলে চলবে না।” আরো বলেন, ‘কথা সুর মনের মতো হলে প্রিয় খাদ্যের মত কবি গানের রস আস্বাদ করতেন।’

রানু সোম উমা মৈত্র জাহানারা বেগম চৌধুরীকে গান শেখাতে গিয়ে কবি নজরুল তাদের প্রতি আকৃষ্ট হয়েছেন এমনকি বইও উৎসর্গ করেছেন। কিন্তু কাননবালা ইন্দুবালা আঙ্গুরবালা বিজনবালা সুপ্রভা সরকার ও ফিরোজা বেগমের ক্ষেত্রে এমনটা ঘটেনি। চিনের দুঃখ হোয়াংহো নজরুলের দুঃখ কুমিল্লা। নজরুল ভালোবাসা না পেয়ে ব্যর্থ মনোরথে বলেন, “যদি আর বাঁশি না বাজে,আমি কবি বলে বলছি না,আমি আপনাদের ভালোবাসা পেয়েছিলাম সেই অধিকারে বলছি,আপনারা আমায় ক্ষমা করবেন। আমায় ভুলে যাবেন আমি প্রেম পেতে এসেছিলাম কিন্তু প্রেম পেলাম না বলে, এই নীরস পৃথিবী থেকে চিরদিনের জন্য বিদায় নিলাম।”

ইয়েটসের প্রেমিকারা ছিলো সুধী সমাজে সম্মানিত তাদের সাথে প্রেম যতটা না ছিলো শারীরিক তার চেয়ে বেশি ছিলো আধ্যাত্মিক। তাতে ছিলো সৃষ্টির উন্মাদনা অনুপ্রেরণা উৎসাহ এবং অনাবিল সুখের সংস্পর্শ। কবি নজরুলের ক্ষেত্রেও প্রায় একই কথা প্রযোজ্য। শৈশব থেকেই স্নেহ ভালোবাসা বঞ্চিত নজরুল যার ভেতরে সৌন্দর্যের দীপ্তি সৃষ্টির সুষমা ভাবের উচ্ছ্বাস দেখেছেন তার প্রতিই মোহাবিষ্ট হয়েছেন। ডব্লিও বি ইয়েটস ও কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্বসাহিত্যে ধ্রুবতারার মতই চীর জাজ¦ল্যমান চির অম্লান চির ভাস্কর হয়ে থাকবে।