যেকোনোভাবেই হোক, একটা বদ্ধমূল ধারণা সমাজে প্রোথিত করা হয়েছে- ইসলামের নবী হজরত মুহাম্মদ সা. সাহিত্য সম্পর্কে খুবই নেতিবাচক ধারণা পোষণ করতেন। নবী মুহাম্মাদের সা. সাহিত্য বিষয়ক চিন্তা-ধারা নিয়ে অন্যান্য ভাষায় বহুবছর ধরেই অনেক গবেষণা হয়েছে, এখনও হচ্ছে। কিন্তু বাংলাতে এ সব নিয়ে তেমন উল্লেখযোগ্য কাজ না থাকায় আধুনিকমনস্ক মানুষের মধ্যে খুব স্বচ্ছ-ধারণা অনুপস্থিত। হালে এদেশে এ নিয়ে কম-বেশী লেখালেখির দরুন বিষয়টি সম্পর্কে মানুষের জানার আগ্রহ প্রবল হয়েছে। রাসূলের সা. সীরাত পাঠের মাধ্যমে দেখা যাচ্ছে তিনি প্রকৃত পক্ষে কবিদের খুবই কাছের মানুষ ছিলেন। আর সে রকমই নজির আমরা এখানে উপস্থিত করছি। এ থেকেই প্রতিয়মান করা যাবে তিনি কবিদের কত আপন।

এটা ঠিক যে, প্রতিটি মুমীনের অন্তরেই তার প্রকৃত মাহবুব হজরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ভক্তি, শ্রদ্ধা ও প্রীতি-ভালোবাসার সবোর্চ্চ স্থান দখল করে আছেন। কারণ তিনিই তো মুমীনের প্রকৃত প্রেমাস্পদ এবং মাহবুব, তাঁরই প্রেম-মাধুরী মুমীনের অন্তরে শক্তি সাহস যোগায়, জীবনী শক্তিহীন আত্মায় নবচেতনার সঞ্চার করে। মানুষ যখন আত্মমর্যাদা ও আত্মপরিচয় বিস্মৃত হয়ে অধঃপতনের অতল গহ্বরে তলিয়ে যাচ্ছিল, মানবতার এমনই এক দুর্দিনে বিশ্ব মানবের প্রকৃত সুহৃদ ও কল্যাণকামী, ত্রাণকর্তা ও মুক্তিদাতা হজরত মুহাম্মদ সা. মুক্তির জিয়নকাঠি নিয়ে আবির্ভূত হন। এ সত্য সমাজের সবখানেই প্রতিফলিত হয়েছিল। সাহিত্য নিয়ে তিনি তাঁর সুস্পষ্ট মনোভাব বিভিন্নভাবে, বিভিন্ন সময়ে ব্যক্ত করেছেন। পাশাপাশি চিন্তা ও বিশ্বাসের স্বাধীনতা নিশ্চিত করেছেন।
এ কথা কারো পক্ষে অস্বীকারের সুযোগ নেই যে, সাম্রাজ্য, পদমর্যাদা ও ধন-সম্পদের প্রতি মহানবী সা.-এঁর কোনো প্রকার আসক্তি ছিল। অবশ্য তিনি মুসলমানদের স্বচ্ছল জীবনযাপনের প্রত্যাশী ছিলেন। তাতে অন্যদের মতো মুসলমানরা স্বাধীনভাবে তাঁদের বিশ্বাস ও চিন্তাধারা প্রকাশ করতে সক্ষম হবে। তিনি চাইতেন- মুসলমান, ইহুদী, খ্রিষ্টান সবাই এই স্বাধীনতা সমভাবে ভোগ করুক। অমুসলীম সম্প্রদায় যেমন তাদের চিন্তাধারার প্রতি অন্যদের আহ্বানের অধিকার ভোগ করছে, অনুরূপ মুসলমানরাও এই অধিকার দ্বারা উপকৃত হোক। কারণ স্বাধীনতার পৃষ্ঠপোষকতার দ্বারাই সত্য জয়লাভ করে থাকে। আর এর ফলে সারা বিশ্ব অগ্রগতি ও সমৃদ্ধি লাভ করতে পারে।
অনিবার্যভাবে পরিলক্ষিত, কবিতায় যেমন ভালো দিক রয়েছে, তেমনিভাবে মন্দ দিকেরও নজির কম নয়। এ কারণে রাসূল সা. এ বিষয়ে দু’ধরনের মনোভাব ব্যক্ত হয়েছে। মন্দ ও অশ্লীল কবিতার প্রতি ছিল তাঁর বিরূপ মনোভাব। ফলে এগুলো শুনতে ও আবৃত্তি করতে স্বভাবতই তিনি নিরুৎসাহিত করেছেন, এগুলোর রচয়িতার ব্যাপারে তিনি বিরাগ-ধারণা পোষণ করেছেন। রাসূল সা. বলছেন, তোমাদের কারো পেটে (এমনি মন্দ) কবিতা থাকার চেয়ে সে পেটে পুঁজ জমে তা পঁচে যাওয়া অনেক উত্তম। হজরত আয়েশা রা. হাদিসটি শুনে বলেছিলেন, রাসূল সা. কবিতা দ্বারা ওই সমস্ত কবিতা বুঝিয়েছেন, যাতে তাঁর কুৎসা বর্ণিত হয়েছে। ইবন রাশীক তার উমদা গ্রন্থে এর ব্যাখ্যায় বলছেন, এখানে সেই ব্যক্তির কথা বলা হয়েছে যার অন্তরে কবিতা এমনভাবে বদ্ধমূল হবে এবং কবিতায় সে এমনভাবে মত্ত হয়ে যাবে যার ফলে কবিতা তাকে দীন থেকে গাফেল করে দিবে এবং সে কবিতা তাকে আল্লাহ্র জিকর, নামাজ ও কুরআন তিলাওয়াত থেকে বিরত রাখবে। আর এক্ষেত্রে শুধু কবিতাই নয় বরং যার ভূমিকা এ ধরনের তাই-ই নিষিদ্ধ। যেমন জুয়া খেলা। আর যেসব কবিতার ভূমিকা এ ধরনের নয় বরং তা সাহিত্য, কৌতুক ও নৈতিকতা শিক্ষা দেয় তাতে কোনো দোষ নেই।

সে কারণে দেখা যায়, খুলাফায়ে রাশেদীন, বহু উচ্চ পর্যায়ের সাহাবী, তাবেঈ, ফকীহ প্রমুখ কবিতা আবৃত্তি করেছেন। অপরদিকে ভালো কবিতা সম্পর্কে তিনি তাঁর ধারণা পোষণ করেছেন, কোথাও তার উচ্চসিত প্রশংসা করেছেন। কোথাও আগ্রহভারে আরও শুনতে চেয়েছেন, কোথাও সে সব কবিতা আবৃত্তি করতে সাহাবী কবিদের নির্দেশ দিয়েছেন, সে সব কবিতা বলতে বিভিন্নভাবে অনুপ্রাণিত করেছেন। কোথাও সে কবিদের প্রতি সমবেদনা ও সহমর্মিতা প্রকাশ করেছেন আবার কোথাও বা কবিকে পুরস্কৃত করেছেন আবার কখনো স্বয়ং নিজেই কবিতা আবৃত্তি করেছেন তার কিছু বিবরণ নিচে পেশ করা হল-

কবিতা সম্পর্কে তাঁর সাধারণ মনোভাব ব্যক্ত করে তিনি বলেছেন যে, কবিতা তো এক ধরনের কথামালা। আর কথার মধ্যে যেগুলি উত্তম ও সুন্দর, কবিতার মধ্যেও সেগুলো উত্তম ও সুন্দর। আবার কথার মধ্যে যেগুলি খারাপ ও ঘৃণিত, কবিতার মধ্যেও সেগুলো খারাপ ও ঘৃণিত। ইমাম বুখারী আদাবুর মুফরাদে উদ্ধৃত করেন, রাসূল সা. বলেন, কবিতা কথার মতই। ভালো কথা যেমন সুন্দর ভালো কবিতাও তেমনি সুন্দর এবং মন্দ কবিতা মন্দ কথার মতই মন্দ। ইবন রাশীক তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ উমদায় উদ্ধৃত করছেন, কবিতা সুসমঞ্জস্য কথামালা। যে কবিতা সত্যনিষ্ঠ সে কবিতা সুন্দর। আর যে কবিতায় সত্যের অপলাপ হয়েছে সে কবিতায় কোনো মঙ্গল নেই।
অন্য এক হাদিসে বর্ণিত হচ্ছে- কবিতা তো বাক্য। আর বাক্যের মধ্যে খারাপও থাকে, ভালোও থাকে। এ ব্যাপারে সবচেয়ে প্রসিদ্ধ হাদিস হলো: ইবন আব্বাস রা. থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, একদা এক বেদুঈন রাসূল সা.-এঁর কাছে এসে আলাপ করতে লাগল। তার আলাপে বিমোহিত হয়ে রাসূল সা. বললেন, কোনো কোনো বর্ণনাতে যাদু রয়েছে। আর কোনো কোনো কবিতায় রয়েছে প্রকৃষ্ট জ্ঞানের কথা। এক বর্ণনায় আছে যে, আমর ইবনুল-আহতামের আলাপ যখন তাঁকে বিমোহিত করেছিল তখন উপর্যুক্ত উক্তি করার সাথে সাথে ছন্দবদ্ধভাবেও তিনি বলেছিলেন, আমি ভয় পাচ্ছি যে, তুমি যাদুকর হয়ে যাবে। কখনো বর্ণনাকারী হবে আর কখনো কবি হবে। হজরত উবাই ইবন কাব রা. থেকেও অনুরূপ বর্ণিত আছে।

এখানে আমরা পয়েন্ট আকারে কিছু তথ্য পরিবেশন করছি। ভবিষ্যতে সময় সুযোগমত এনিয়ে বিস্তারিত লেখার আগ্রহ রইল।
১. সচ্চরিত্রবান কবি-র উত্তম ও সুন্দর কবিতা শুনতে রাসূল সা. আনন্দবোধ করতেন। শারীদ আস্সাকাফি থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি একবার রাসূল সা.-এঁর পেছনে উটে আরোহণ করেছিলাম। পথিমধ্যে রাসূল সা. বললেন, তোমার কী উমাইয়া ইবন আবিস সাল্ত-এর কবিতা জানা আছে? আমি বললাম, হ্যাঁ, তিনি বললেন, আবৃত্তি কর। আমি একটা কবিতা আবৃত্তি করলে তিনি বললেন, আরও শুনাও। আর একটি আবৃত্তি করলে বললেন, আরও শুনাও। এমনি করে সে-দিন আমি একশোটি কবিতা আবৃত্তি করলাম।
এক বর্ণনায় আছে যে, কবিতা শুনে রাসূল সা. বলেছিলেন, এ ব্যক্তির জিহ্বা ঈমান এনেছে কিন্তু অন্তর কুফরী করেছে। উমাইয়া ইবন আবিস সালাত এর ন্যায় একজন মুশরিক কবির কবিতা শুনতেও তিনি বিমুখ হননি, বরং আগ্রহ প্রকাশ করেছেন, কারণ হল সে কবিতার বিষয়বস্তু। এ থেকে বুঝা যায়, (ভালো) কবিতার প্রতি তাঁর কত আগ্রহ ও অনুরাগ ছিল।
মহিলা সাহাবী কবি হজরত খানসা রা. ইসলাম গ্রহণ করার সময় কবিতা বললেন, রাসূল সা. বললেন, আরও শুনাও হে খুনাস!
হজরত জাবির ইবন্ সামুরা রা. বলেন, আমি রাসূল সা.-এঁর সাথে একশোটিরও অধিক বৈঠকে বসেছি। বৈঠকে তাঁর সাহাবীগণ কবিতা আবৃত্তি করতেন। তাঁরা জাহেলী যুগের কোনো কোনো বিষয় নিয়ে কবিতা আবৃত্তি করতেন (ঠাট্টা করতেন) আর রাসূল সা. তখন চুপ থাকতেন আবার কখনো তাদের হাসিতে যোগ দিতেন এবং মুচকি হাসতেন। এতে বুঝা যায়, রাসূল সা. বৈঠকে বসে সাহাবায়ে কিরামের আবৃত্তিকৃত অসংখ্য কবিতা শুনতেন এবং তাতে আনন্দ বোধ করতেন।
রাসূল সা. ক্ষেত্র বিশেষ সাহাবায়ে কিরামকে কবিতা বলতে নির্দেশ দিয়েছেন এবং এ ব্যাপারে তাদেরকে সর্বতঃভাবে সহায়তা করেছেন। কুরায়শ কবিদের ব্যঙ্গাত্মক কবিতার জবাব কবিতার মাধ্যমে প্রদান করার জন্য হাস্সান ইবন ছাবিত, কাব ইবন মালিক ও আব্দুল্লাহ ইবন রাওয়াহা রা.-কে সরাসরি নির্দেশ দিয়েছেন তিনি। আর সে জন্য তাদেরকে বিভিন্নরূপ সহযোগিতাও করেছেন।
রাসূল সা. সুন্দর ও পছন্দনীয় কবিতা আবৃত্তি করার জন্য সে কবিকে খুশী ও আনন্দের নিদর্শন স্বরূপ কিছু হাদিয়া বা পুরস্কার দিতেন। এমনকি কোনো কোনো ক্ষেত্রে আনন্দের অতিশয্যে তিনি নিজের গায়ের চাদর পর্যন্ত কবিকে উপহার দিয়েছেন। একজন মুমীন কবি-র জন্য এরচেয়ে মর্যাদার আরকি হতে পারে! আব্বাস ইবন মিরদাস রা. রাসূল সা.-এঁর প্রশংসায় কবিতা আবৃত্তি করলে তিনি তাঁকে কাপড় দান করেন।

ইসলামের বিজয় কেতন যখন চারিদিকে উড়ছে সে সময় সাবআমুয়াল্লাক খ্যাত কবি যুহায়র ইবন আবী সুলমার পুত্র কাব ও বুজায়র ইসলাম সম্পর্কে জানতে রাসূল সা.-এঁর কাছে হাজির হবার জন্য বের হন। কিন্তু ভ্রাতা বুজায়র মদীনায় গিয়ে ইসলাম গ্রহণ কলরে কাব ইসলামের বিরুদ্ধে ব্যঙ্গ করে কবিতা রচনা করেন। ফলে রাসূল সা. তার মৃত্যুদণ্ড ঘোষণা করেন। অবশেষে কাব রাসূল সা.-এঁর দরবারে হাজির হয়ে তওবা করে একটি কবিতা পড়ে শোনান। রাসূল সা. তার কবিতা শুনে এত খুশী হন যে, তাকে ক্ষমা করে তো দিলেনই উপরন্তু নিজের গায়ের পবিত্র চাদরখানী তাকে দিয়ে দিলেন। পরবর্তীকালে এ চাদরটি আমীর মুযাবিয়া রা. ত্রিশ হাজার দিরহাম দিয়ে কিনে নেন। মুসলিম খলিফারা রাজ্যাভিষেকের দিনে বরকতের জন্য চাদরটি পরিধান করতেন।

এভাবে সীরাত পঠনে অসংখ্য নজির পাওয়া যাবে যাতে আমরা দেখতে পাব, রাসূল সা. কবি ও কবিতার বিষয়ে খুবই ইতিবাচক ধারণা পোষণ করতেন। অযথাই বিতর্ক তৈরী করা হয়েছে যে, সাহিত্য তাঁর না পছন্দের বিষয় ছিল। কিছুকাল হল সৌদি আরবের বিশিষ্ট গবেষক ড. ওয়ালিদ কাস্সাব প্রমাণ হিসেবে রাসূলের চল্লিলশটি হাদিস হাজির করেছেন, যা কিনা সমস্তটাই সাহিত্য বিষয়ক। এ সব গবেষণাদি প্রমাণ করে, আমাদের মহানবী কবি-সাহিত্যিকদের বিষয়ে ইতিবাচক ছিলেন। আজ সেই দ্বীনের নবী মুস্তাফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ওফাত ও জন্ম দিবসে আমরা তাঁকে গভীর শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করছি।