ইসলাম একটি পরিপূর্ণ জীবন ব্যবস্থার নাম। ইসলামের সুমহান আদর্শকে দুনিয়ার বুকে ছড়িয়ে দিতে যুগে যুগে অগণিত নবী আর রাসূল আগমন করেছেন সুন্দর এই বসুন্ধরায়। নবীগণের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ ছিলেন আমাদের প্রিয় নবী ও রাসূল হযরত মুহাম্মদ (সা:)। এই মহান নবীকে নিয়ে অসংখ্য কবি সাহিত্যিকগণ লিখেছেন নিজের মত করে। তাঁর জীবন আদর্শের বুনিয়াদী শিক্ষা তুলে ধরেছেন যুগে যুগে। বিশ্বের অসংখ্য কবি সাহিত্যিকদের পাশাপাশি আমাদের বাংলাদেশের লিখিয়েরাও পিছিয়ে নাই। নবীন-প্রবীণ লেখকদের মাঝে কবি গোলাম মোহাম্মদ অন্যতম একজন। তাঁর রচিত গান-কবিতা থেকে রাসূল প্রেমের কিছু লেখা তুলে ধরব আজকের গদ্যে।

কবি আমাদের নবীকে দ্বীনের রবি বলেছেন। রবি যেমন দিনের বেলায় দুনিয়াকে আলোকিত করে, রাতের সকল আঁধার কালো অমানিশা দূর করে দেয়, জগতকে পরিস্ফুটিত করে তোলে ঠিক তেমনি আমাদের দ্বীনের নবীও সকল জাহেলী অন্ধকারের কালো অমানিশা দূর করে সত্য ও সুন্দরের সকাল দেখিয়েছেন। ভোরের সূর্যের ন্যায় আলোকিত জগত গড়িয়েছেন। পরিচ্ছন্ন হৃদয়ের মানুষ গড়িয়েছেন। একটি সুন্দর স্বপ্নীল বসুন্ধরা গড়তে কাজ করেছেন। দুনিয়াকে গড়েছেন জান্নাতের বাগানের মত করে। সুখ আর শান্তির ফল্গুধারা বইয়ে দিয়েছেন জাহেলী সমাজে। কবির ভাষায়-
দ্বীনের নবী নূরের নবী তিনি মুহাম্মদ
এই নামেরই দরুদে হয় দুনিয়া জান্নাত।।
হ্যাঁ, সত্যিই রাসূলের আদর্শের ছোঁয়ায় জাহান্নামী মানুষেরা হয়েছিল জান্নাতী মানুষ। জাহেলিয়াতের আঁধারে নিমজ্জিত দুনিয়া হয়েছিল জান্নাতের বাগান। জান্নাতী পরিবেশ গড়ে উঠেছিল তাঁর অবগাহণের দুনিয়া।

রাসূল ছিলেন এমন একজন মহামানব যাঁর আদর্শের ছোঁয়ায় জগত হয়েছিল ধন্য। ঘৃণিত হৃদয়ের কপটজনেরা হয়েছিল সোনার মানুষ।

পরশপাথরে পরিনত হয়েছিল প্রতিটি হৃদয়। জুলুম, শোষণ আর অত্যাচারের দুনিয়ার বুকে নেমে এসেছিল শান্তির আবেশ। জনে-জনে, হৃদয়ে-হৃদয়ে গেঁথেছিল ভালোবাসার বন্ধন। মুক্তির মিল্লাত লাভ করেছিল মানবজাতি। কবির ভাষায়-
তাঁর দরুদে অন্ধজনের হৃদয় স্বর্ণ হয়
মরুর বুকে তাঁর ছোঁয়াতে প্রেমের নদী বয়।
সত্যিই রাসূলের আদর্শের ছোঁয়ায় জগতবাসী মুক্তির সনদ খুঁজে পেয়েছিল। পেয়েছিল মানবতার সত্যিকারের পাওনা।

রাসূল ছিলেন মানবতার বাহক। মানবিক মূল্যবোধ জাগরণে তাঁর কর্মপন্থা অবিস্বরণীয়। তিনি ছিলেন সব হারাদের সহায়। তাঁর আগমনে মরুরবুকে ফুটেছিল শিউলি-বেলিরা। মরা বাগানে ফুটেছিল হাজার কোটি ফুলকলিরা। ফুলকুঁড়িরা। পাখিরা আনন্দে গেয়ে উঠেছিল গান। গানে-গানে মুখরিত করেছিল গোটা বিশ্ব। গাছে গাছে গজিয়েছিল সবুজ পাতা। কবির ভাষায়-
সব হারাদের বন্ধু এলো মরুর মদীনায়
তাই বাগানে ফুটলো কুসুম পাখিরা গান গায়।।
হ্যাঁ রাসূলের আগমনে ধরা জাগরিত হয়েছিল। মুখরিত হয়েছিল বসুন্ধরা! ফুলে-ফলে শুভোসিত হয়েছিল দুনিয়ার প্রতিটি জীবন। মানুষেরা খুঁজে পেয়েছিল শান্তির দুনিয়া।

দুঃখিজনের সেবক ছিলেন আমাদের প্রিয় নবী। রাসূলের পরশে এলে অভাবির অভাব দূর হয়ে যেত। অশান্তির আগুন নিভে যেত। শান্তির বাতাস বইত জগতময়। কবির ভাষায়-
ব্যথার সাগর থমকে দাঁড়ায় অভাব মিটে যায়
সেই আলোর ধারায় সিক্ত হলে শান্তি মিলে যায়।
আল্লাহ তায়ালার ভাষায় রাসূল ছিলেন জগতবাসীর জন্য রহমত স্বরুপ। তাইতো তাঁর পাশে এলে শান্তি অনুভব করত অশান্ত হৃদয়ের মানুষজন। সাহাবীগণের জীবন চরিত্র থেকে এমনটিই খুঁজে পাই।

রাসূল সা: ছিলেন বিশ্বনেতা। সারা দুনিয়ার মানুষ ছিল তাঁর অনুসারী। বিশ্বনবী ছিলেন তিনি। তাঁর নেতৃত্বে পরিচালিত হয়েছিল গোটা দুনিয়া। তিনি ছিলেন আরশে আজীমের প্রেমাস্পদ। আরশবাসী ছিলেন রাসূলের প্রেমিক। আশিক ছিলেন স্বয়ং আল্লাহ তায়ালা। কবির ভাষায়-
খোদার রাসূল নেতা আমার বিশ্বনবী মুহাম্মদ
আরশ পাকের সম্মানিত আল্লাহ তায়ালার প্রেমাস্পদ।।
এজন্যই বুঝি আল্লাহ তায়ালা রাসূলকে বিশ্ববাসীকে জানিয়ে দিতে বলেছেন, বল হে রাসূল! যদি তোমরা আল্লাহ তায়ালাকে ভালোবাসতে চাও, তাহলে আমাকে (রাসূলকে) অনুস্বরণ কর। তাহলে আল্লাহ তায়ালা তোমাদেরকে ভালোবাসবেন। আসুন আমরাও রাসূলকে ভালোবাসি। হৃদয়-মনে তাঁর প্রেম জাগিয়ে তুলি।

রাসূলকে ভালোবাসা ঈমানের দাবি। রাসূলকে ভালো না বাসলে ঈমানের পূর্ণতা আসবে না। রাসূলের নাম শুনে তাঁর শানে দরুদ না পড়া গুনাহের শামিল। রাসূলের নাম শুনলে দরুদ পড়া ওয়াজিব হয়ে যায়। তাই রাসূলের নামে যেন আতর মাখা থাকে। ফুলের দলে দলে যেন তাঁর নামের মালাগাঁথা থাকে। ফুলেরাও যেন রাসূলের শানে দরুদ পড়ে, সালাম জানায় হাজার কোটিবার। কবির ভাষায়-
সেই নামের আতরমাখা যেন ফুলের দলে দলে
এসো তাঁরে সালাম জানাই হাজার কোটি গলে।।
তাই আসুন আমরাও রাসূলের নাম শুনে দরুদ পড়ি, সালাম জানাই।

গোলাপ চাঁপা সূর্যমুখীরা যেন সবুজ মাখা ভোরের খোকা-খুকি। ওরা যেন রাসূলের নামে গজল গেয়ে প্রাণ জুড়ায়। ওদের গজলের সুরে যেন গোলাপ জলের আতর মাখে। কবির ভাষায় –
গোলাপ চাঁপা আমরা সূর্যমুখী
সুবাস মাখা ভোরের খোকা -খুকি
নূরের নবীর গজল গাবো
সুরের গোলাপ জলে।।
কী আবেগ আর অনুভূতির পরশ বুলিয়েছেন কবি। কত দরদমাখা কথামালা! কত উচ্ছ্বাস! কত আনন্দ! কবির এই আনন্দ উচ্ছ্বাস যেন তাঁর পারলৌকিক জীবনের সঙ্গী হয়।

আমরা ফুলের পাশে গেলে প্রশান্তি পাই। ফুলকে নিস্পাপ ভাবি! ফুলের মত পবিত্র যেন আর কিছু নেই আমাদের চোখে। চাঁদের মত মনোহর আর কীইবা আছে আমাদের ভাবনায়। কিন্তু আমাদের আজকের কবি চাঁদ আর ফুলকে অনেক দূরে রেখেছেন রাসূলের থেকে। ফুলের পরশ আর রাসূলের সহবত আকাশ পাতাল দূরত্ব কবির আকুতিতে! চাঁদের চেয়েও সুন্দর আমার রাসূল। কবির ভাষায়-
ফুল বলে আমি নই তিনি সুন্দর
চাঁদ বলে আমি নই তিনি মনোহর।।
আহ! কী আবেগ আর অনুভূতির পরশ কবির কাব্যমালায়! কবির আত্মার অবগাহণ কত গভীরে!

নদী আর সাগর কত গভীর! কতইবা শীতল তাদের বুক চিরে প্রবাহিত পানি জল! কলিজায় শান্তি আনতে কতইবা ভুমিকা রাখতে পারে সেই পানি জল! বনের বৃক্ষলতা কতইবা বেশি সবুজাভাব আবরণ তৈরি করে! আমার রাসূল তার চেয়েও অনেক বেশি শীতল এবং সবুজ! আমরা খুঁজিনি কখনও তা। খুঁজেছেন আমাদের প্রিয় কবি গোলাম মোহাম্মদ। কবির ভাষায়-
নদী বলে আমি নই তিনিই শীতল
কলিজার শান্তি তিনিই গীতল
বন বলে আমি নই সবুজ তিনি
প্রাণ ভরে সবুজের বনানী যিনি।।

সবুজের বন আমাদের নবী। নদী আর সাগরের অথৈ জল তাঁর হৃদয় জমিন! এই নবীর জীবন আদর্শ বাস্তবায়নে সেই সময়েও এগিয়ে এসেছিল নবীন-প্রবীণেরা! শিশুকিশোরেরা তাঁর হাতে হাত রেখে কাজ করেছিল সারাজীবন ধরে। আমাদেরকেও কাজ করতে হবে তাঁর জীবন আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে। তবেই সবুজ জমিন হবে আরো সবুজ। আরো স্বপ্নীল সুন্দর বসুন্ধরা হবে আমাদের এই দুনিয়া। তাই আমাদের সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে এক্ষুণি। কবির ভাষায়-
কিশোর তরুণ একত্র হয় মিলায় কচি হাত
রুখতে হবে পাপ অনাচার রুখতে হবে রাত।।

রাসূল সা: বলেছেন, তোমাদের যে কেউ কোন অন্যায় কাজ করতে দেখলে তা যেন হাত দিয়ে বাধা দেয়। এতে যদি সামর্থ না হয় তাহলে যেন মুখের ভাষায় প্রতিবাদ করে। এতেও যদি সামর্থ না হয় তাহলে সে মনে মনে ঘৃণা করে। আর এটি হচ্ছে সবচেয়ে দুর্বল ঈমানের পরিচয়। প্রিয় কবি গোলাম মোহাম্মদ তাঁর গান কবিতার পরতে পরতে রাসূলের আদর্শ মেনে চলার যে আহবান জানিয়েছেন আমরা যেন তা মেনে চলতে পারি। পরিশেষে কবির আত্মার মাগফিরাত কামনা করছি। দোয়া করছি আল্লাহ তায়ালা যেন প্রিয় কবির জীবনের ভুলগুলো ক্ষমা করে দেন। তাঁর জীবনের নেক আমলগুলো মঞ্জুর করে জান্নাতের মেহমান হিসেবে কবুল করেন। সেই সাথে আসুন আমরাও যেন রাসূলের আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে সুন্দর একটি বিশ্ব গড়তে ভুমিকা রাখি। আল্লাহ তায়ালা আমাদের সবাইকে এগিয়ে আসার তাওফিক দিন। আমীন।