পুরনো ঢাকায় আমরা দক্ষিণ মৈশন্দি নারিন্দা রোকনপুর কলতাবাজার এলাকায়। শিশুকাল থেকে আমার যত স্মৃতি সবই এই এলাকার। যখন কৈশোর এলো তখন সাঁতার কাটতাম নারিন্দার দোলাই খালের স্বচ্ছ পানিতে। মনে আছে, আমাদের সাঁতারের চৌহদ্দি ছিল নারিন্দার পুল থেকে রায়সাহেব বাজারের পুল অবধি। মসজিদের নিচে যে ঘাট ছিল, সে ঘাট অবধি। যখন বর্ষা আসত সে খাল ভরে যেত স্বচ্ছ সুন্দর টলমলে নতুন পানিতে। ১৪ আগস্ট সে খালে হতো নৌকা বাইচ। আমরা থাকতাম লালমোহন সাহা স্ট্রিটে ১৫২ নম্বর বাড়িতে-মনে আছে এখনো চার কামরার একতলা একটি বাড়ি। আলাদা রান্নাঘর। সে রান্নাঘরে অচিন্তনীয় এক বাতাস আসত নারিন্দার খাল থেকে- সরু একটি লম্বা গলি দিয়ে। পুরনো ঢাকার ভঙিতে একটি জানালা ছিল আমার আম্মার সে রান্নাঘরে। বাতাস আসত খাল থেকে- পানিতে ভেজা বাতাস। আমার আম্মার খুব পছন্দ ছিল সেই বাতাসের স্পর্শ। কোনো কোনো দিন বলতেন- আজকের বাতাসে অনেক পানি- বৃষ্টি নামবে এখনি।
সত্যি বৃষ্টি নামত- নারিন্দার খাল থেকে শুরু করে লোহার পুল, আর লোহার পুল থেকে বুড়িগঙ্গার উপরে বিশাল আকাশ পর্যন্ত। জিঞ্জিরা কেরানীগঞ্জ চুনকুটিয়া আন্দোলিত হতো সেই বাতাস ভরা বৃষ্টিতে। একাকার হতো পূর্বদি পশ্চিমদি উত্তরদি দক্ষিণদি। ছল ছল করে উঠত আবদুল্লাহপুর রাজেন্দ্র পুর আরো একটি দূরে ধলেশ্বরী নদীর ঘনিষ্ঠ জলের শরীর।
কিন্তু হায় আমি তখন ম্যাট্রিক পরীক্ষা দিয়েছি মাত্র- কিংবা সম্ভবত ম্যাট্রিক পাস করেছি মাত্র। পড়ছি জগন্নাথ কলেজে। সতেরো বছর বয়সে আমার একটি দু’টি কবিতা প্রকাশিত হয়েছে পত্রিকায়। কবিতার আশ্চর্য সুবাতাস আমার অস্তিত্বের চতুর্দিকে। সে সময় একদিন। আব্বা জানালেন আমরা চলে যাচ্ছি দক্ষিণ মৈশন্দি ছেড়ে। ঢাকার উপকন্ঠে কমলাপুর নামে একটি গ্রামে। শুনে প্রায় কান্না পেল আমার। আম্মা অস্থির হলেন, বললেন- আমি আমাদের কুমিল্লার বাড়িতে চলে যাবো।
যদি গ্রামেই থাকতে হয় নিজেদের গ্রামেই থাকব। ছোট বোন জ্যোৎস্না আমায়-জিজ্ঞেস করল সেখানে কি স্কুল আছে ভাইসাব- ঘোড়ার গাড়ি চলে। আব্বারও দেখলাম মন খারাপ। তবে বাইরে থেকে বুঝবার উপায় নেই।
সবারই মন খারাপ-এক ধরণের বিষণ্নতায় ভরা। তবু যেতে হলো শহর ছেড়ে। দক্ষিণ মৈশন্দি ছেড়ে। তবু যেতে হলো। শহর ছেড়ে। দক্ষিণ মৈশন্দি ছেড়ে। আমার বন্ধু রহমান, সেলিম, জালালকে ছেড়ে। নতুন এক গ্রামে। নতুন এক আকাশের নিচে। কমলাপুরে। মনে আছে আমি প্রায় প্রতিদিনই পায়ে হেঁটে চলে যেতাম দক্ষিণ মৈশন্দি নারিন্দা আর রোকনপুর কলতাবাজারে। নারিন্দা পুলে বিকেল বেলা বসত যে চীনাবাদামওয়ালা-প্রায় আব্বার বয়সী-সেই সালাম মিয়ার কাছ থেকে কিনতাম এক পয়সা দিয়ে এক ছটাক চীনাবাদাম। মনে হতো এমন চীনা বাদাম সারা পৃথিবীতে আর কোথাও পাওয়া যাবে না। আমি যেন পুরনো ঢাকাকে কিছুতেই ভুলতে পারছিলাম না। আসলে এই এত বছর এত যুগ পরও আমি পরনো ঢাকাকে ভুলতে পারিনি। কিন্তু সেটা তো অন্য কাহিনী অন্য এক ভুবনের রূপকথা। সংক্ষিপ্ত বচনে চলে আসি কমলাপুরে।
আমার জীবনের অন্য এক পর্ব। ভিন্ন এক মঞ্চ এবং আমার প্রথম যৌবনের মতো নতুন এক কাহিনী। কমলাপুর আমাকে অনেক খিছুই দিয়েছিল। নতুন পায়ে হাঁটা পথ নতুন মানুষ নতুন সব মাটির ঘর নতুন বৃক্ষরাজি নতুন আম্রকানন নতুন পুকুরঘাট নতুন লেবুবন এবং নতুন কায়েপাড়, ঠাকুরপাড়া।
কিন্তু সবচেয়ে বড় পাওনা আমার কমলাপুরে এসে এখন মনে হয়, দু’জন মহৎ কবির সান্নিধ্য। জসীমউদ্দিন আর ফররুখ আহমদ। আধুনিক বাংলা কবিতার দুই অমর শিল্পী। এত কাছে, এত নৈকট্যে- যা আমি কোনো দিন ভাবিনি, ভাবতে পারিনি। এর মধ্যে ফররুখ ভাইয়ের সঙ্গে কেমন করে যেন ঘনিষ্ঠতর সম্পর্ক হয়ে গেল আমার এখন মনে হয়-সম্ভবত সাত সাগরের মাঝির কারণেই কিংবা হয়তো অসামান্য সেই কাব্যগ্রন্থের কারণে যাকে আমরা অবহেলায় গভীর খাদে নিক্ষেপ করে বসে আছি- হাতেম তা’য়ীর জন্য।
এখন আমি নির্ভয়ে নির্দ্বিধায় বলতে পারি ব্যক্তি ফররুখ আহমদকে যারা দূর থেকে দেখেছেন, তারা তাকে আসলে প্রকৃত অর্থে দেখতেই পাননি। আর কিংবা ফররুখ আহমদের কবিতা পড়ে যারা তাকে একজন মোল্লা মনে করেছেন তারা আসলে তাঁর কবিতা সত্যিকার অর্থে বুঝতে পারেননি, উপলব্ধি করতে পারেননি। ফররুখ আহমদ এমন একজন কবি যিনি বাংলা ভাষায় আমাদের জন্য একটি নতুন পৃথিবী নতুন ভুবন নির্মাণ করেছেন, যিনি তাঁর কবিতার জন্য নতুনতরো শব্দ আবিষ্কার করেছেন, নতুন অর্থে প্রতিষ্ঠা করেছেন এবং কবিতার শরীরে অসামান্য কাব্যনিষ্ঠার এবং নৈপুণ্য গ্রথিত করেছেন সাত সাগরের মাঝি কাব্যগ্রন্থের বহু কবিতা তার প্রমাণ। হাতেম তা’য়ী মহাকাব্যটি তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ। আমি কিছু পঙক্তি এখানে উল্লেখ করতে পারি। যেমন সিন্দাবাদ কবিতায়-
কেটেছে রঙিন মখমলদিন, নতুন সফর আজ,
শুনছি আবার নোনা দরিয়ার ডাক,
ভাসে জোরওয়ার মউজের শিরে সফেদ চাঁদির তাজ,
পাহাড়-বুলন্দ ঢেউ ব’য়ে আনে নোনা দরিয়ার ডাক;

নতুন পানিতে সফর এবার, হে মাঝি সিন্দাবাদ !
একই কবিতায়-
কোথায় জাহাজ হবে ফিরে বানচাল,
তক্তায় ভেসে কাটবে আবার দরিয়ার কতকাল;
সে কথা জানিনা মানি না সে কথা দরিয়া ডেকেছে নীল!
খুলি জাহাজের হালে উদ্দাম দিগন্ত ঝিলমিল,
জংগী জোয়ান দাঁড় ফেলে করি দরিয়ার পানি চাষ,
আফতাব ঘোরে মাথার উপরে মাহতাব ফেলে দাগ,
… … … …
বিষ নিশ্বাসে জিন্দিগী ফের কেঁদে ওঠে বিস্বাদ,
নতুন পানিতে সফর এবার, হে মাঝি সিন্দাবাদ।

ফররুখ ভাইয়ের সঙ্গে আমার প্রথম আলাপ প্রায় আকস্মিক- সম্ভবত কার সঙ্গে আমি যেন পুরনো ঢাকায় রেডিও পাকিস্তানের অফিসে গিয়েছিলাম সেইখানে। আমাকে আলাপ করিয়ে দিলেন যিনি- বললেন, ফররুখ ভাই ওর নাম (আবুল) ফজল শাহাবুদ্দীন-ও কবিতা লেখে।
ফররুখ ভাই খুব স্বাভাবিকভাবেই আমার দিকে ফিরে তাকালেন। আমাকে এক আকুল বিস্ময়ে ঠেলে দিয়ে আসলেন বললেন, তোর কবিতা পড়েছি দিলরুবায়।
কার সঙ্গে যেন কথা বলতে বলতে ফররুখ ভাই একটু দূরে চলে গেলেন। এতদিন পর হলেও এখনও মনে আছে। তিনি আমাকে প্রথম দিনেই তুই সম্বোধন করেছিলেন। সে সময় আরো একজন আমাকে দুই বলেছিলেন। তিনি সমকাল সম্পাদক কবি সিকান্দার আবু জাফর। এখন মনে হয় জাফর ভাই আমাকে খুবই ভালোবাসতেন। এখন আমার খুব ভারাপ লাগে ভাবতে আমাদের সাহিত্যে এই সব ভালোবাসা আর নেই।
ফররুখ ভাই থাকেন কমলাপুরের বাজারের কাছে আসিরুদ্দিন সরদারদের বাড়ির দিকের কোনো একটা জায়গায়। একটা টিনের ঘরে। আজকাল সেই রকম টিনের ঘরে আমরা আর থাকি না। সে টিনে ঘরের একপাশে ছোট্ট একটা অংশ বসার রুম ছিল। আমি বহুবার গেছি সেখানে কিন্তু আমরা ঘরে বসে খুব কমই আড্ডা দিয়েছি কিংবা কবিতা নিয়ে আলোচনা করেছি। ফররুখ ভাইয়ের বাসার পেছন দিকে একটু হেঁটে গেলেই ছিল বিশাল খোলা মাঠ- আজকের টি এন্ড টি কলোনি পর্যন্ত সরাসরি বিস্তৃত। আমরা বলতাম ছান্দার মাঠ।
সে মাঠে অনেক হেঁটেছি আমরা। কথা বলেছি। কবিতার কথা কবিদের কথা। কখনো দেশের কখনো বিদেশের। কখনো নজরুল কখনো রবীন্দ্রনাথ। আবার কখনো বা শেক্সপীয়র আর রোমান্টিক কবিরা। কখনো আমাদের আধুনিক বাংলা কবিতা- কলকাতার আধুনিক বাংলা কবিতা। ত্রিশের কবি ও কবিতা। বুদ্ধদেব বসুর কবিতা, জীবানানন্দ দাশের বনলতা সেন, সাতটি তারার তিমির প্রভৃতি কবিতা। সুধীন দত্ত, অমিয় চক্রবর্তী এমনকি সুভাষ মুখোপাধ্যায় প্রমুখ। ছান্দার মাঠে আমার আর ফররুখ ভাইয়ের সাথে কখনো কখনো আরো একজন দু’জন থাকতো। কখনো আরো বেশি। বেশ আড্ডার মতো মনে হতো তখন।
ফররুখ ভাইয়ের প্রিয় বিষয় মাইকেল মধুসূদন। মাইকেল থেকে অনবরত মুখস্থ আবৃত্তি করতে পারতেন ফররুখ ভাই। আমি মাইকেল থেকে আবৃত্তি করা শিখেছি ফররুখ ভাই থেকেই। মাঝে মাঝে শেক্সপিয়র থেকে বিশেষ করে হ্যামলেট থেকে আবৃত্তি করে তিনি আমাদের চমকে দিতেন। রেডিওর অনেককেই দেখেছি ফররুখ ভাইয়ের বাসায় আসতেন এ ছান্দার মাঠের আড্ডার জন্য। আসলে কবিতায় কোনো ক্লান্তি ছিল না তাঁর।
হাতেম তা’য়ী পান্ডুলিপি থেকে আমাকে মাঝে মাঝে শোনাতেন ফররুখ ভাই। আমার খুব উৎসাহ ছিল হাতেম তা’য়ী নিয়ে। সেটি বুঝতেন তিনি। এক দিন ফোন পেয়েছিলাম ফররুখ ভাইয়ের কাছ থেকে। বললেন, তোর হাতেম তা’য়ী থেকে ছাপছে মাসিক মোহাম্মদী- প্রথম কিস্তি বেরিয়েছে চলতি সংখ্যায়। পড়বি নিশ্চয়ই। কেমন লাগছে জানাবি। মুদ্রিত অবস্থায় না দেখলে কোনো লেখারই আসল সত্যটা বোঝা যায় না। এখন ভাবলে মনে হয়, আমাকে যে সম্মান ফররুখ ভাই সে সময় দিয়েছিলেন- এমন ভাগ্য ক’জনের হয়।
ফররুখ ভাইদের বংশের সবারই সৈয়দ পদবি ছিল। ফররুখ ভাই সেই পদবি ব্যবহার করেননি কখনো। আমি এ সংবাদটি জানতাম কিন্তু কামরুল ভাই (প্রসিদ্ধ চিত্রশিল্পী কামরুল হাসান) তাঁর একটি প্রবন্ধে এ বিষয় নিয়ে খুব সুন্দর একটি খবর দিয়েছেন। লিপিবদ্ধ করছি কামরুল হাসানের নিবন্ধ থেকে।
“ফররুখ ভাই ছিলেন সত্যিকারের নিপীড়িত আদমসন্তানদের অতি আপনজন। না হলে সেই পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার আগেই একজন ব্রিটিশ সরকারের সনদ পাওয়া পুলিশ অফিসার এবং সৈয়দপুত্র নিজের নামের আগে সৈয়দ লেখা ত্যাগ করেছিলেন। কারো নির্দেশে নয়- কোনো প্রভাবশালী নেতার ভয়েও নয়। হঠাৎ এক সময় আমরা দেখলাম, ফররুখ ভাই আর সৈয়দ লেখেন না। প্রশ্ন করলাম এক দিন। ফররুখ ভাইয়ের ভাষাতেই বলি। তিনি উত্তর দিলেন- অনেক ভেবে দেখলাম, ওই শালার সৈয়দের গোষ্ঠীর মধ্যে থাকলে সত্যিকার মানুষের গোষ্ঠীর বাইরেই থাকতে হবে আমাকে। তোরা কী মনে করিস? ও শালার ফালতু ল্যাজটা কেটে বাদ দিয়ে দিলাম।” -ফররুখ ভাই শীর্ষক প্রবন্ধ থেকে।
কবি ফররুখ আহমদ অত্যন্ত নির্লোভ মানুষ ছিলেন। রেডিওতে যে চাকরিটি তিনি করতেন- তা প্রকৃত পক্ষেই একটি সামান্য চাকুরি ছিল। কিন্তু সেই রেডিওতেই তিনি কখনোই একজন সামান্য মানুষ ছিলেন না। একজন কবির সম্মানকে তিনি সব সময় অত্যন্ত সযত্নে উচ্চাসনে অধিষ্ঠিত করে রেখেছিলেন। রেডিওর ডিজি সাহেব করাচি থেকে যখন আসতেন তখন তারা দেখা করতে হলে সম্মান করে কবি যেখানে বসতেন সেখানে যেতেন। কবিকে ডাকতেন না তাদের কামরায়।
একবার পাকিস্তান সরকার সিদ্ধান্ত নিলো কবি ফররুখ আহমদকে পাকিস্তানের রোভিং অ্যামস্যাসেডর হিসাবে বিদেশ ভ্রমণে পাঠাবেন। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে তাঁকে যেতে হবে একজন রাষ্ট্রীয় দূত হিসাবে এবং সেখানে তিনি নিজের কবিতা পাঠ করবেন বাংলায়। সেই সরকারি সিদ্ধান্ত নিয়ে ঢাকায় তখন এসেছিলেন করাচির ইনফরমেশন মন্ত্রণাললের সেক্রেটারি সুবিখ্যাত আলতাফ গওহর। পাকিস্তান সরকার তাঁকে কোনো চিঠি দেননি। একজন পূর্ণ সেক্রেটারিকে পাঠিয়ে ছিলেন ঢাকা- কমলাপুরে তাঁর বাসায় সে টিনের ঘরে। আমরা জানি, আলতাফ গওহর একজন কবি ছিলেন একজন লেখক ছিলেন একজন অধ্যাপক ছিলেন- তিনি শুধু সিএসপি ছিলেন না। তাকে পাঠিয়ে ছিলেন পাকিস্তান সরকার। কবি ফররুখ আহমদকে বোঝাতে, রাজি করাতে। কবি হিসাবে এখানে কোনো অসম্মান করা হচ্ছে না। নিজের দেশের জন্য তিনি শুধু নিজের কবিতাই পাঠ করবেন- তার বেশি কিছু নয়।
কবি ফররুখ আহমদ তাঁর কমলাপুরের সেই টিনের ঘরে বসে আলতাফ গওহরের সব কথাই শুনেছিলেন এবং কোনো কথাকেই তিনি অযৌক্তিক বলে প্রত্যাখান করেননি। তিনি সবিনয়ে শুধু একটি কথাই বলেছিলেন, এটা একজন কবির কাজ নয়। তিনি সেই বিশাল প্রস্তাবকে সবিশেষ বিনয়ের সথে ফিরিয়ে দিয়েছিলেন।
একজন কবির এমন প্রবল নির্লোভ মানসিক শক্তি এ দেশে আর দ্বিতীয়টি তো আমি আজ পর্যন্ত দেখিনি। ভবিষ্যতে দেখার কোনো সম্ভাবনা আছে বলেও আমার মনে হয় না। কেননা বাংলাদেশের কবিরা অন্য এক পরিপ্রেক্ষিতে নিজেদের সনাক্ত করে বেশ আনন্দের সাথেই মঞ্চে আরোহণ করে বসে আছেন। এসব প্রসঙ্গ নিয়ে আলাপ-সংলাপ না করাই ভালো। ফররুখ ভাই এবং তাঁর কবিতায় ফিরে আসি।
দীর্ঘদিন আগে শামসুর রাহমান ফররুখ ভাই এবং তাঁর কবিতাকে নিয়ে একটি নাতিদীর্ঘ প্রবন্ধ লিখেছিলেন। প্রবন্ধটি প্রকাশিত হয় সে সময়কার দৈনিক পত্রিকা মিল্লাত-এর সাহিত্য পাতায়। সে পাতায় আমার একটি গদ্য রচনা ছাপা হয়েছিলো। আর ছাপা হয়েছিল লতিফা রশীদের হৈমন্তিক গ্রামে একটি কবিতা। সেই রচনায় শামসুর রাহমান ফররুখ ভাইয়ের সাত সাগরের মাঝি কাব্য গ্রন্থটির বিশেষ প্রশংসা করে লিখেছিলেন, তিনি সাত সাগরের মাঝি কবিতা গ্রন্থটিকে আধুনিক বাংলা কবিতার একটি বিশেষ ঘটনা বলে মনে করেন- যে অর্থে বুদ্ধদেব বসুর বন্দীর বন্দনা, সমর সেনের কয়েকটি কবিতা এবং সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের একাধিক আধুনিক বাংলা কবিতার এক একটি বিশেষ ঘটনা।
আমার আজও স্পষ্ট মনে আছে- রচনাটি তখনকার মিল্লাত-এর সাহিত্য সম্পাদক রহীমউদ্দিন সিদ্দিকীকে দেয়ার আগে শামসুর রাহমান লেখাটি আমাদের দু’জনকেই পড়ে শুনিয়েছেন। লেখাটির নাম ছিল একজন কবি। ফররুখ ভাই তখন বেঁচে ছিলেন।
কবি ফররুখ আহমদ সম্পর্কে একজন পাঠক হিসাবে আমার অনুধাবন অত্যন্ত সহজ এবং সরাসরি। ত্রিশের কবিদের পরবর্তী সময়ের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য কবি বলে তাঁকে আমি মনে করি। আমার ধারণা আধুনিক বাংলা কবিতার যারা সৎ পাঠক তাদের বেশির ভাগই আমার এবং আমাদের এই সহজ অনুধাবনকে মেনে নেবেন। আমাদের সাথে একমত হবেন। কমলাপুরের বাড়িতে দীর্ঘদিন ছিলাম আমরা।
কবি ফররুখ আহমদও ছিলেন কমলাপুরে অনেকদিন। সেই টিনের চালার ঘরে। কবি জসীমউদদীনের দোতলা বাড়িটা এখনো কমলাপুরের এক প্রান্তে। তাঁর বাড়ির কাছে আছে একটি সরু গলি- যার নাম কবি জসীমউদ্দিন রোড। এ গলির নাম কবি জসীমউদদীন রোড রেখেছিল গ্রামেরই একদল তরুণ ছেলে পঞ্চাশ দশকের শুরুতে।
ফররুখ আহমদের নামে কোন রাস্তা-গলি কিংবা মাঠের নাম নেই এই কমলাপুরে কবি ফররুখ আহমদের সংস্কৃতিতে বাংলাদেশের অন্য কোথাও কোন কিছু আছে কিনা আমার জানা নেই।
ফররুখ ভাইয়ের কথা মনে হলেই আমার মনে পড়ে পঞ্চাশ দশকের সেই কমলাপুরের কথা- যেখানে বৃক্ষ ছিল, পাখি ছিল, প্রজাপতি ছিল, পুকুর ছিল আর ছিল ছান্দার মাঠ। ছিলেন কবি জসীমউদদীন ছিলেন ফররুখ আহমদ। ছিল আঁকাবাঁকা পায়ে চলার পথ, ছিল জাহাজবাড়ি।
মনে আছে আমার ফররুখ ভাই যে দিন ইন্তেকাল করেছিলেন সে খবরটি আমাকে দিয়েছিলেন কবি শামসুর রাহমান টেলিফোনে। ঠিকানা দিয়েছিলেন ফ্ল্যাট বাসাটির। আর আমরা দু’জনই সকাল ১০টার মধ্যে সেখানে পৌঁছে গিয়েছিলাম।
প্রায় বিকেলের দিকে কবি বেনজীর আহমদ বলেছিলেন ফররুখকে আমি নিয়ে যাব আমার শাহজাহানপুরের বাড়িতে এবং নিয়ে গেলেনও।
ছান্দার মাঠের খুব কাছে- ফররুখ ভাইয়ের সাথে আমরা সেখানে হাঁটতাম তার খুব কাছে- সমাহিত করা হলো ফররুখ ভাইকে। বেনজীর আহমদের সৌজন্যে। আমি এখন থাকি বাসাবোতে। আমার বাবার রেখে যাওয়া বাড়িতে। এখান থেকে শাহজাহানপুরের পথ খুব বেশি দীর্ঘ নয়। দূরে নয়। তবু আমি কিন্তু জানি না কোথায় বেনজীর আহমদের বাড়ি- কোথায় কবি ফররুখ আহমদের সমাধি। বেনজীর আহমদ এখন আর নেই- কে তাহলে দেখাশোনা করে সেই সমাধি। নাকি দিল্লিতে গালিবের কবরের মতো নিঃসঙ্গ পড়ে আছে। অসম্ভব কিছু নয়।
এত কাছে- তবু জানি না কিছুই। খবর নিতে পারি না -নিই না। নিজেকে ভীষণ অপরাধী মনে হয় মাঝে মাঝে। মনে হয় কবি ফররুখ আহমদকে ভয়ঙ্কর এক একাকিত্বের মধ্যে নিক্ষেপ করেছি আমরা। এমন কি তাঁর কবিতাকেও শামসুর রাহমান ফররুখ ভাইয়ের একটি কবিতার কথা বারবার আমাকে বলতেন। একটি সনেট। আমারও প্রিয় কবিতা এই সনেট। বন্দরে সন্ধ্যা। শেষ করার আগে কবিতাটি এখানে উদ্ধৃত করতে চাই।
গোধূলি-তরল সেই হরিণের তনিমা পাটল
-অস্থির বিদ্যুৎ, তার বাঁকা শিঙে ভেসে এল চাঁদ,
সাত সাগরের বুকে সেই শুধু আলোক-চঞ্চল;
অন্ধকার ধনু হাতে তীর ছোঁড়ে রাত্রির নিষাদ।
আরব সমুদ্র-স্রোতে ক্রমাগত দূরের আহ্বান,
তরুণীর মুখ থেকে মুছে গেছে দিনের রক্তিমা,
এ দিকে হরিণ আনে বাঁকা শিঙে চাঁদঃ রমজান;
ক্ষণাঙ্গীর প্রতীক্ষায় যৌবনের প্রাচুর্যঃ পূর্ণিমা।

ষোল পাঁপড়িতে ঘেরা ষোড়শীর সে পূর্ণ যৌবনে
আসিল অতিথি এক বন্দরের শ্রান্ত মুসাফির!
সূর্যাস্তের অগ্নিবর্ণ সেহেলির বিমুগ্ধ স্বপনে,
নিভৃত ইঙ্গিত তার ডেকে নেয় পুষ্পিত গহনে;
অনেক সমুদ্র তীরে স্বপ্নময় হ’ল এ শিশির,
তারার সোনালি ফুল ছিটে পড়ে রাত্রির অঙ্গনে॥