‘ঐকতানের মতো পবিত্রতম বৃষ্টি’র ‘নাজিল হয়ে’ যাওয়ার মতো মল্লিকের আত্মানুভূতি বা একান্ত ব্যক্তিগত বাসনা কামনা ও আনন্দ-বেদনা আবেগকম্পিত সুরে অখণ্ড ভাবমূর্তিতে আত্মপ্রকাশ লাভ করেছে তার চিত্রল প্রজাপতি কাব্যগ্রন্থের কবিতাসমূহে। ভাষা ব্যবহার, চিত্রকল্প ও উপমা নির্মাণের শিল্পকুশলতায় তার ব্যক্তি অনুভূতির কান্তিময়তা পাঠকের অনুভুতিতে কখনো থির থির এবং কখনোবা প্রবল ঢেউয়ের সৃষ্টি করে। প্রকৃতি ও মানব সমাজের বিচিত্র বিষয় যেমন বৃষ্টি, নদী, পাতা, শীত, বসন্ত, বৃক্ষ/মানুষ সাদৃশ্য, কবিস্বভাব, কবিতা, ভাষা, কৌলিণ্য, বন্ধন, মন, রাসুল, খ্যাতি, পদমর্যাদা, সাধ্যের সীমানা, সাম্রাজ্যবাদ, ন্যায়বিচার, সাম্য, বিজয়, দৃষ্টিভঙ্গি, নাটক, সংসার, ধ্বংসাত্মক রাজনীতি, মানবিক পূর্ণতা, বন্ধু বিরহ, হৃদয়, জ্ঞান ও ভাবনা, আদর্শ মানুষ ইত্যাদির প্রভাবে ব্যক্তিমনে যে বিচিত্র অনুভুতির জন্ম লয় তারই কাব্যময় প্রকাশ ঘটেছে এই গ্রন্থের বেশ কয়েকটি কবিতায়। গভীরভাবে সমাজ সংলগ্ন এসব বিষয় নিয়ে গ্রন্থটি তাই সমৃদ্ধ ও বৈচিত্রময়।
‘‘ঐকতানের মত পবিত্রতম বৃষ্টিরা নাজিল হয়ে যায়
শুভ্র ও শুভ্রতার মত
নরম কাশফুলেরা নেমে আসে আকাশ থেকে’’
অথবা কোমল উপলব্ধির মত-
‘‘স্বপ্নের পাখিরা একই সঙ্গে
ডানা মেলে দিলো পৃথিবীর উপর’’

এভাবে অত্যন্ত সহজ ও সাবলিল গতিতে সঙ্গীতমুখর হয়ে বৃষ্টির অনুভূতি ও উপলব্ধি নিয়ে আত্মপ্রকাশ করে ‘বৃষ্টিরা’ কবিতাটি। এখানে ঐকতানের সাথে বৃষ্টির তুলনা বৃষ্টিকে দেয় সঙ্গীতময়তা। অতঃপর ‘কাশফুল’ এবং ‘স্বপ্নের পাখিরা’র উপমা পবিত্র এবং প্রাণময় এক দৃশ্যের অবতারণা করে। এর ভেতর আবার ‘শুভ্র ও শুভ্রতা’ এবং ‘কোমল উপলব্ধি’র উপমা কবির উপলব্ধি ও পাঠকের উপলব্ধিকে একাকার করে দেয়। এখানে মূর্ত অনুষঙ্গকে বিমূর্তের সাথে তুলনা করে গতানুগতিক একটি বিষয়কে আমাদের কাছে আকর্ষণীয় করে তুলেছেন কবি। আর এখানেই ঘটেছে সেই অবিদিতিকরণ defamiliarization যাকে মিখায়েল বাখতিন সাহিত্যের লক্ষ্য বলে অভিহিত করেছেন। এর মধ্যে আবার ‘নরম’ ও ‘কোমল’ শব্দদ্বয়ের প্রয়োগ আমাদেরকে ভাসিয়ে নিয়ে যায় বৃষ্টির কাছে।
অতঃপর বৃষ্টি ‘ঝরে ঝরে পড়ে’ ‘বৃক্ষের উপর’। আর বৃষ্টির উপমা ‘প্রেমের প্রথম কান্নারা’। যে কান্নার প্রতিটি ফোঁটা প্রেমাকুল হৃদয়াবেগের শব্দহীন প্রকাশ। এই শব্দহীন কান্নারা পাতার স্পর্শ পেয়ে শব্দময় হয়ে ওঠে। আর ‘দিগন্তের দিকে ছড়িয়ে যায়/ আনন্দের প্রথম উচ্চারণের মত/ ভালোবাসার শব্দাবলী’। এখানে ‘আনন্দের প্রথম উচ্চারণ’ সার্বিক যা একটি একান্ত ব্যক্তিগত অনুভূতিতে সর্বজনীন আবেদন সঞ্চার করে। এবং স্পষ্ট হয়ে যায় যে এ কান্না প্রেমাস্পদকে শীঘ্রই কাছে পাওয়ার আনন্দের কান্না। এই ঘটনা পরম্পরায় ‘ভালোবাসার শব্দাবলী’র সাথে বৃষ্টির তুলনা হৃদয়ে শিহরণ জাগায়। ‘এবং পাতায় পাতায় নাচতে থাকে/ হৃদয়ের অজস্র দম্পতির প্রথম শিহরণ’। এ পর্যায়ে বৃষ্টি আর হৃদয়ের মধ্যেকার ভেদ ও ব্যবধান লুপ্ত হয়ে একে অপরের সাথে একাকার হয়ে যায়। ‘যেমন এক অথৈ তন্দ্রার মধ্যে/ ওঠানামা করে জীবনের পেণ্ডুলাম।’ এভাবে উপমার ওপর উপমার জাল বুনে মল্লিক তার কবিতায় এক রহস্যময় উপলব্ধির জগৎ সৃষ্টি করেন। প্রথম চরণের ‘পবিত্রতম’ ও ‘নাজিল’ শব্দদ্বয় পৃথিবীর মানুষের জন্য প্রেরিত আল্লাহর বাণীর প্রতি ইঙ্গিত দেয়। যা একজন বিশ্বাসীর মনেও একই ধরনের উপলব্ধির সৃষ্টি করতে পারে। এভাবে পুরো কবিতাটি একটি অখন্ড চিত্রকল্পের আকারে আমাদের নিকট ব্যঞ্জনাময় হয়ে ওঠে।
প্রকৃতির অনুষঙ্গের সাথে মানবিক অনুষঙ্গের অন্তর্বয়ন মল্লিকের কাব্য প্রবণতার একটি অন্যতম বৈশিষ্ট্য। নদী ও মানবিকতার মধ্যে সাদৃশ্য স্থাপনের মাধ্যমে নদীকে নতুনভাবে উপস্থাপন করে ‘তুমি একটা নদীই’ কবিতাটি। নদীর এপার ভাঙ্গে ওপার গড়ে এবং ঢেউ তুলে ক্রমাগত বয়ে চলে – এই গতানুগতিক কথা ও চিত্রটিকে অসাধারণ চিত্রকল্পে পরিণত করে নদীর ওপর কিছু মানবিক গুণারোপ: ‘রেলিং ধরা নদীর রোদন’, ‘তবুও স্বপ্ন তোমার সমুদ্র’ এবং তার সাথে মানুষকে সম্পৃক্ত করার আবেদন ‘রেলিং ধরা নদীর রোদন/ অবহিত ক’জন’। এভাবে কবির উপমা ও ভাষা বিন্যাস একটি বিষয়ের গভীরে অবগাহন করিয়ে পাঠকের বোধ ও আবেগকে সিক্ত করে: ‘নাচের আড়ালে কাঁদে গোঙ্গানীর শব্দো অধীর/ যেন পাখির উড়াল প্রচ্ছদে স্পষ্ট/ তো অস্পষ্ট ডানার কষ্ট’। আর পাঠক এক নবতর আনন্দ আস্বাদ করে।
একইভাবে ‘মৃত্তিকা ও আভিজাত্য’ কবিতার বাউল গানের চাতুর্যপূর্ণ শব্দমালা ভাবনাকে উস্কে দেয়। কবির ভাবনা ও অনুভুতি আমাদের ভাবনা ও অনুভূতিকে সংক্রমিত করে। ‘শরীর নিয়ে কে না ভাবে?’ প্রশ্নালঙ্কার সমৃদ্ধ এই প্রথম চরণটি আমাদের চিন্তাকে কেন্দ্রবদ্ধ করে এবং একটা ইতিবাচক উত্তরই আহ্বান করে। এবং আমাদের মনে আকাঙ্খা জাগে কবির উত্তর জানতে: ‘নদীও ভাবে এবং নদীর নায়কও ভাবে/ ঢেউয়ের সাথে যার চিরদিন জানাজানি/ সাগর নিয়ে যার চিরকাল চিন্তা-ভাবনা’। শরীরের সাথে ‘নদী’র অনুষঙ্গ এবং সাথে সাথে নদীর ‘নায়ক’ এর সংস্থাপন আমাদের আকাঙ্খা ও ভাবনাকে আরও উস্কে দেয়। প্রশ্ন জাগে এই অনুষঙ্গগুলো কিভাবে পরস্পর সংশ্লিষ্ট? এর পরের চরণগুলোতেই এদের মধ্যকার point of resemblance স্পষ্ট হয়: ‘অথচ তার রহস্যময় তলদেশ/ বেগানা কারো জন্য সে কখনো/ খুলে দেয়নি।’ এখানে ‘বেগানা’ ও ‘খুলে দেয়নি’ শব্দগুলো প্রকৃতি ও মানুষের মিল বন্ধন করে এবং আবরু রক্ষার বিষয়টি চিরকালীন বোধ হিসাবে আমাদের বোধকে নাড়া দেয়। এরপর ‘অকুণ্ঠ আকাশেরও উদ্যোগ দেখি/ না হলে সে নীলিমা হতো না/ না হলে সে মৃত্তিকারও ঐশ্বর্য হতো না/ আর দিগন্তের মতো আভিজাত্য কখনো নির্লজ্জ হয় না।’ ‘দূর!’ কবিতাটিও প্রাকৃতিক অনুষঙ্গ ‘পাখি’, ‘পুঞ্জপুঞ্জ মেঘমালা’, ‘নদী’ ও ‘দখ্নে হাওয়া’ এবং সামাজিক অনুষঙ্গের আন্তর্বয়নে কিছু দ্যোতনাময় প্রশ্নমালার সমাহারে কবিস্বভাবের প্রকাশ: ‘দূর!/ দখ্নে হাওয়া কি শেষ পর্যন্ত/ কোন অফিসের সদস্য সচিব থাকে!/ থাকে নাকি?/ কিম্বা মুক্তপক্ষ কবিকুল?’ এভাবে প্রকৃতির অনুষঙ্গ ও মানবিক ক্রিয়াকর্ম মল্লিকের কবিতায় একাকার হয়ে যায় যা কেবল শক্তিশালী কাব্যিক ভাবকল্পের নিয়ন্ত্রণেই সম্ভব। তার কবিতার একটি অন্যতম অনুষঙ্গ বৃক্ষ ও মানুষের সাদৃশ্য। ‘মাত্রাবৃত্ত’ কবিতা যেমন বলে ‘আহা! বৃক্ষের সংগে মানুষের/ মাত্রাবৃত্তের কোন অবশেষ নেই।’ আর ‘বৃক্ষ ও মানুষ’ কবিতায় ‘বস্তুত কোনো কোনো বৃক্ষের অনুষঙ্গে/ কোনো কোনো মানুষের অজস্র ছবি তুলে রাখার অনন্ত দরকার থেকে গেল।’
আবেগ, অনুভূতি ও বোধের সরল উচ্চারণকে ছন্দ ও অন্তমিলের মাধ্যমে কাব্যিক আবহ প্রদানের প্রবণতা দেখা যায় তার কবিতায়। ‘স্বপ্নীল নীলিমার কোলে’ যাওয়ার একান্ত ব্যক্তিগত আবেগ মাত্রাবৃত্ত ছন্দ ও অন্তমিল এবং ‘বিজয় স্মরণী দিয়ে চলে যেতে চাই’ চরণটির ধুঁয়ার চমৎকার সমাহারে নিরলংকার শব্দের আদর মাখা বুনট আমাদেরকেও সাথে যেতে ‘হাতছানি’ দেয় ‘বিজয় স্মরণী দিয়ে’: ‘বিজয় স্মরণী দিয়ে চলে যেতে চাই/ এই পথে দুই পাশে সবুজ চাদর/ উড়িয়ে দিয়েছে কেউ জড়িয়ে আদর/ যা কিছু বলার তাই বলে যেতে চাই’। ‘পাতার বৃত্তান্ত’ কবিতায় একটি পাতাকে কেন্দ্র করে অসাধারণ বোধের একটি তালিকা মাত্রাবৃত্তের ধীর লয়ে এক অপার্থিব নির্মলতা অর্জন করে কাব্যিক হয়ে উঠেছে। ‘ত্যাগ’ কবিতার মাত্রাবৃত্তের ৬/৮ চাল ও চমৎকার অন্তমিল টানে পাঠককে: ‘চোখের দৃষ্টি ফিকে হয়ে গেছে কবে/ স্বপ্ন দেখার তবু কত কসরত?/ বার্ধক্যের সাতঘোলা উৎসবে/ উড়বার আশা কেনো করো হযরত!’
‘এমন অনেকেই আছে যে/ পথ চলতে চলতে অবশেষে পথিক হয়ে যায়/ কোথায় যেতে হবে ঠিক তা আর তার মনে থাকে না/ তারতো মনে থাকে না কোত্থেকে সে শুরু করেছিল/ যেমন অনেক যান্ত্রিক অবশেষে পটুয়াই থেকে যায়’। এভাবে ‘পথিক’ কবিতার প্রথম স্তবকে পথিক ও যান্ত্রিকের কথা এবং দ্বিতীয় স্তবকে গায়ক ও পটুয়ার কথা বলার পর কবি প্রশ্নালংকার ব্যবহার করেছেন, ‘বস্তুত একজন কবি কি কেবল একজন কবিই থেকে যাবে?’ যা ভাবনাকে নাড়া দেয়। এরপর বক্তা পারিবারিক সংলাপের আল মাহমুদীয় ঢংয়ে যখন সিদ্ধান্ত ঘোষণা করে ‘দেখো প্রিয়তমা/ আমি তোমাকে গতকালও বলেছি- / ঘুরতে ঘুরতে একদা ভবঘুরে হয়ে যাওয়ার চেয়ে/ ইবনে বতুতার মতো একজন বিশ্বাসী পরিব্রাজক/ আমার কাছে অধিকতর প্রিয়।’ তখন তা পাঠকের মনে এক ধরনের ভাল লাগার সৃষ্টি করে, এই বক্তব্যের সাথে একমত না হলেও। আর ইহাই কাব্যের বৈশিষ্ট্য।
দুটি সম্পূর্ণ বিপরীত দিক থেকে প্রথমে নাটক এবং পরে সংসারকে পাঠ করে ‘ফলক কবিতা’। দুটো পাঠই সত্য কিন্তু আপাত বিরোধী। ফলে পুরো কবিতাটিই ঢ়ধৎধফড়ী এর আকারে একটি সত্যকে মেলে ধরে যা আমাদেরকে ভাবায় এবং আনন্দ দান করে। যেমন- ‘নাটক/ নানা ছলনায় নানা ভঙ্গিতে/ নকলের গায়ে মূল রং দিতে/ মিথ্যাকে করে আটক/ নাটক/ সত্যের মতো আসল সত্য/ তুলে ধরার যে আনুগত্য/ তিক্ত এবং যা-টক।’ এখানকার অন্তমিল ‘আটক’ এবং ‘যা-টক’ দুটি অংশকে একীভুত করে।
‘হৃদয়’ কবিতায় কোরানিক গম্ভীর সুরে ‘এবং যেখানে হৃদয় থাকার কথা ছিলো/ সেখানে হয়তো হৃদয় নাও থাকতে পারে’ আমাদের হৃদয়কে টেনে ধরে। এরপর খুব স্বাভাবিক কিছু বিষয় এমনভাবে উপস্থাপিত হয়েছে যে সেগুলোকে আমরা স্বাভাবিক বলে মেনে নিতে পারি না। যেমন, ‘অনেক মেঘে বৃষ্টি নেই/ অনেক বাতাসে নেই প্রাণ/ অনেক পাখির গান নেই’। এরপর আবার প্রথম স্তবকের পুনরাবৃত্তি কবির আক্ষেপকে আরও শক্তিশালী করে যা পাঠকের মনকেও সংক্রমিত করে। ‘এবং যেখানে থাকার কথা ছিলো/ ভালোবাসার/ সেখানে ঘরবাড়ির চিহ্ন পর্যন্ত/ পাওয়া যায় না অনেক সময়।’ আর আমরা কবিতার সাথে একাত্ম হয়ে যাই। মানবিক আবেগকে নাড়া দেয়ার জন্য দৈনন্দিন উচ্চারণের সাধারণ শব্দমালা দক্ষ হাতের বয়ানে কতখানি যে শক্তিশালী ও প্রবল হতে পারে তার দৃষ্টান্ত ‘আর কোন বন্ধন নেই’ কবিতাটি: ‘নুরুল আহসান, তুমি আর যা-ই বলো না কেনো/ হৃদয়ের বন্ধন ছাড়া আর কোনো বন্ধন নেই আমার/ এই ঘর/ শুকনো পাতার এই নিগুঢ় কুটির ছাড়া / আমার আর বিশ্রামের কোন কৌলিন্য নেই।’ এই রকম আরেকটি কবিতা ‘না গেলেও তো পারি’।
‘পাশ্চাত্য গণতন্ত্রের ভেতরে’ কবিতাটি সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে প্রবল ঘৃণা ও ক্ষোভের প্রকাশ। রাক্ষসের রূপকথার আদলে আমেরিকার সাম্রাজ্যবাদী চেহারার শক্তিশালী প্রকাশ: বুশের সবগুলো হিংস্র দাঁত বেরিয়ে যাবার পর/ গণতন্ত্রের নামতা পড়তে গেলেই/ আমেরিকার অঙ্ক বেরিয়ে আসে/ ‘কী চমৎকার দেখা গেলো’র মত পেন্টাগনের/ ভুগোলখেকো জঠর থেকে বেরিয়ে আসে ইরাকের কঙ্কাল/ ফিলিস্তিনের খুলি এবং হাড়গোড়’ । এরপর ঘৃণার প্রাবল্যকে প্রকাশ করার জন্য প্রশ্নবোধক বাক্য ব্যবহার করা হয়েছে: ‘কে বলে ঘৃণার কোন সীমা আছে’। অতঃপর রোগ এবং হিংস্র পশুর সাথে সাদৃশ্য রচনার মাধ্যমে ঘৃণা ও ক্ষোভের প্রাবল্যকে প্রকাশ করা হয়েছে।
‘মনের মধ্যে মন’ গানের আকার হলেও মরমী অনুভূতির প্রকাশক ও ইঙ্গিতময়। দেশের চলমান রাজনৈতিক অবস্থার প্রেক্ষাপটে রচিত হলেও ভাষার গতি ও চিত্রময়তার গুণে ‘অস্ত্রের ভাষা’ ও ‘একটি লোকের জন্য’ শেষ পর্যন্ত শ্লোগান সর্বস্ব না হয়ে কাব্যময়: ‘অথচ কোনো সর্বোচ্চ দলীয় দাপটের একটা মাত্র অস্ত্রের ভাষাই/ মৃহূর্তের মধ্যে চট্টগ্রাম থেকে অগনিত আগ্নেয়াস্ত্র হয়ে/ এ-ফোঁড় ও-ফোঁড় করে দিলো/ বাংলাদেশের চৌদ্দ কোটি স্বদেশ-প্রেম/ মূলত আইন হাতে তুলে নেয়ার চেয়েও/ আগ্নেয়াস্ত্রের ভাষায় থাকে/ গৃহযুদ্ধের মতো অসংখ্য গণহত্যার অপরাধ’। অথবা ‘একটি লোকের জিহ্বা কি আজ ভয়ঙ্কর হিশ্ হিশ্ !/ গোখরা সাপের সর্বনাশক বিষের চেয়েও বিষ!/ ঈঁদুর পোষার রাজনীতি তার ক্ষেত করে তছনছ!/ সবচে’ প্রাচীন ইবলিশও বাহ! মানছে তাকেই বস্।’
সবশেষে বলা যায়, কবি মল্লিকের চিত্রল প্রজাপতি নামক কাব্যগ্রন্থের কবিতাগুলো ভাব-গভীরতা, আবেগের আন্তরিকতা, শিল্পচাতুর্য ও সাঙ্গীতিক ধ্বনিদ্যোতনার সমাহারে মানব মনের বিচিত্র অনুভুতির শব্দরূপ। গীতিকবিতা গান না হলেও আজ পর্যন্ত বাংলা সাহিত্যে যে গীতিকবিতা সৃষ্টি হয়েছে তাতে রয়েছে সুরের প্রাধান্য। মল্লিক নিজে গীতিকার ও গায়ক হওয়ায় তার কবিতায় সাঙ্গীতিকতা এক বিশেষ স্থান অধিকার করে আছে। তার ভাষা সহজ সরল। চিত্রকল্প, উপমা ও ছন্দের সাহচর্যে এই ভাষা অপূর্ব ব্যঞ্জনাময় হয়ে তার গভীর অনুভুতিতে লীন হয়।