প্রকৃত পক্ষে কবিতার সমালোচনা আমি যুক্তিসঙ্গত মনে করি না। তবু সাহিত্যের সমালোচনার প্রশ্ন আসলেই কবিরা তাদের গ্রন্থটি ঠেলে সামনে নিয়ে আসে। আর কবিতা যখন সামনে দাঁড়ায় তখন স্বভাবতই বলতে হয় তুমি কে? যদিও এর জবাব কবির বইয়েই আছে এবং কিছু জানতে চাইলে সেটা হাতরে দেখে কানে শুনে এবং এসবের মর্মবস্তুর আস্বাদন গ্রহণ করে দেখতেই হয়। যে পদ্ধতিতে আমরা সকালের নাস্তার সাথে একটু চা-ও পান করি।
আমার হাতে এখন একজন তরুণ কবির তিনটি কবিতার বই হাজির হয়েছে। আমি বইগুলোর ভেতর সংকলিত প্রায় সবগুলো কবিতাই মর্মে গ্রহণ করতে সক্ষম হয়েছি। ভালো মন্দ সমালোচনার জন্য নয়, আমার অভ্যেস হলো আসলে কবিকে সমর্থন করা এবং তার পাশে দাঁড়ানো। এতেই আমাদের ভাষার তারুণ্যকে একটা উপলব্ধি এবং এর সমন্ধে বলার সুযোগ সৃষ্টি হয়।
মনসুর আজিজের তিনটি কাব্যগ্রন্থ- জল ও জোয়ারের কাব্য, জোড়া পাখি ফুলের রুমাল এবং মনুষ্যত্যের ল্যাম্পপোষ্ট-এর আস্বাদন আমার পক্ষে সম্ভবপর হয়েছে। মনসুর আজিজ একজন প্রকৃত কবি হৃদয়ের অধিকারী সন্দেহ নেই। কবিতার কাজ আবেগের, অহ্বানের এবং কোনো দৈব বাতাশের গুঞ্জনকে মর্মে গ্রহণ করা। আমি এই তরুণের তারুণ্যকে উপলব্ধি করার চেষ্টা করেছি। এবং আমার মনে হয়েছে চর্চা সাধনায় নিয়োজিত থাকলে এ কবি তার কবিত্ব শক্তির বৈশিষ্ট্য ঠিক মতো উচ্চারণ করতে সমর্থ হবেন। তার শব্দ সুন্দর, কথা যথেষ্ট প্রবাহমানতার সৃষ্টি করে এবং কৃষ্টি ও কর্মতৎপরতাকে বাড়িয়ে দেয়। এটাই প্রকৃত কবি-হৃদয়ের কাজ। কবিদের বুকে টোকা দিয়ে বুঝতে হয় তার মর্মবেদনা, অনন্দ, উল্লাস ও প্রেম কিভাবে গুঞ্জরিত হচ্ছে। আমি মনসুর আজিজের হৃদয়ের, রক্তের এবং উচ্ছ্বাসের ফেনা স্পর্শ করতে মনে হয় খানিকটা সমর্থ হয়েছি। তাকে আমার সাধুবাদ জানাবার আগে কয়েকটি কথা বলার চেষ্টা করতে আগ্রহী হয়েছি। আমার এমন সাহস নেই যে, কোনো কবিকে উপদেশ দান করি। আর করলেও সেটা কবি অনায়াসে হেসে উড়িয়ে দিতে পারেন। আমি সে পথে যেতে সবসময় বিব্রতবোধ করে এসেছি।
আমি বলতে চাইছি মনসুর আজিজ একজন কবি এবং শব্দের মধ্যে আবেগের আন্তরিকতার সংমিশ্রণ ঘটাবার ক্ষমতা তার কাব্যে চিহ্নিত করতে সক্ষম হয়েছেন। এটা কবির কৃতিত্ত্ব সন্দেহ নেই। তবে এখানে একটা কথা বিনয়ের সাথে বলতে চাই। একজন কবি সারা জীবন দ্রষ্টারূপে দুটি চোখ মেলে জগৎকে দেখে। কবি না হলেও পুরুষ নারী উভয়ই পরস্পরের প্রতি আকৃষ্ট হওয়ার আবেগে ভোগে। এই আবেগকে উচ্ছ্বাসও বলা যায়। নদীর তরঙ্গ যেমন খরস্রোতা হলে ফেনার সৃষ্টি করে তেমনি কবিরাও দায়বদ্ধ তার প্রতিভার দেনার কাছে। ঋণ নিলে শোধ করতে হবে। এটা যেমন সত্য তেমনি সাধ্যের মধ্যে না থাকলে কবিকে দোষারোপ করা আমার অভ্যাস নয়। এখানে অনুকম্পার কথা এসে পরে। কিন্তু জগতের কোনো কবিকেই তিনি পুরুষ হোন কিংবা নারী হোন, প্রতিভার ঋণ পরিশোধ করার কথা বলার দু:সাহস আমার কখনো না হোক এটা আন্তরিক ভাবেই উচ্চারণ করছি।
কবি মনসুর আজিজের কবিতার কিছু পংক্তি এখানে উদৃত করার ইচ্ছা আমার হচ্ছে, যেমন-

মনের সাহস বেড়ে যায় শুধু আসমানি তাকদির
সত্য পথের নাবিকেরা পায় অবশেষে তার তীর।

এটা কবি মনসুর আজিজের সত্য উপলদ্ধি করার সাহসিক উচ্চারণ বলে আমি মনে করি। মনসুর আজিজ, আমি আগেই উল্লেখ করতে চেয়েছি একজন আবেগপ্রবণ মানুষ। যখন তার তারুণ্যের উচ্ছ্বাসকে উপমায় পরিণত করার কবিত্বশক্তি তার ভেতরে মগজে অন্তরে এবং রক্তের গুঞ্জনে উপলব্ধি করার সময় আসবে। সন্দেহ নেই সেটা হবে তার নিজস্ব প্রতিভার পরিণত হওয়ার প্রমাণ। আমি সেদিনের জন্য অপেক্ষা করবো। আমি যদি না-ও থাকি, কিন্তু কবিতার স্বাদ গ্রহণ করার মানুষের কোনো অভাব হবে না। আনন্দের অর্থ আনন্দই। অন্য কোনো শব্দ দিয়ে আমি তার স্থান নির্ধারণ করে যেতে চাই না।
মনসুর আজিজ ছন্দে লিখতে চান- এটা তার কবি স্বভাবের স্বাভাবিক গতি। এটা কোনো কবির জন্যই কম কথা নয়। তবে ছন্দ মিল এটা কবিদের একটা স্বাভাবিক স্বতস্ফূর্ত গুণ মাত্র। কবি হলেই তাকে জানতে হবে মিল-উপমা-উৎপ্রেক্ষা কাকে বলে। এটা সবাইকেই শিখতে হয়। এবং অধ্যয়ন অনুশীলন ও চর্চা সাধনার দ্বারাই এই গুন নিজের মধ্যে সঞ্চারিত রাখতে হয়। এটা কবিকে কেউ উপদেশ দিয়ে বোঝাতে হয় না। তিনি জন্ম থেকেই এর শিক্ষা নিতে নিতে কবিত্ব শক্তির অধিকারী হন। লোকে তাকে চিহ্নিত করে। এই তো একজন কবি। এই বৈশিষ্ট আমি মনে করি মনসুর আজিজের কাব্যে প্রতিভায় এবং পরিশ্রমের মধ্যেই গুঞ্জরিত আছে।

৬.৮.২০১৪