মগ্নচৈতন্যের ভিতর ডুব দিয়ে যে সকল চিত্রকল্প বা ভাবাদর্শরূপকে রূপদান কওে থাকেন কিবতা হচ্ছে সেইরূপ জিনিস। এখানে প্রকৃতি চেতনা, প্রেম-অনুরাগ, ইতিহাস-ঐতিহ্য সমাজ চেতনা বা সুররিয়ালিজম অথবা মৃত্যুভাবনা এগুলো পরম্পরা কবির অবচেতন মানসে ফুটে ওঠে। ঐ মগ্ন চৈতন্যে দানাবাঁধা স্বপ্ন ভাবের বসে কিব লিখে যুান তাঁর কবিতা- স্তবকের পর স্তবক। কবিতার আধুনিকতা বা কাব্যেও রূপান্তর ত্ত্ব এগুলো সব গৌন ব্যাপার মুখ হচ্ছে কবিত্ববোধ যেটা কিবংবা কবিতর একামনআত ভাবনা বা কল্পন তার অনুতশক্তির অসাাধারণ রস্

বাংলাদেশে আধুনিক কবিদেও তালিকায় অবশ্রই এই প্রজন্মেও কবি মনসুর আজিজের কবিত্ব প্রতিভার স্বাক্ষর পোয়েছি তাঁর জল ও জোয়ারের কাব্যগ্রন্থটিতে। এই কাব্য প্রন্থটিতে সম্ভবত চৌষট্টিটি কবিতা স্থান পেয়েচে। যার বেশিরভাগ কবিতাই কবির অসাদারণ সব নতুন শব্দের ঐতিহ্যেও ঘ্রাণে সুবাসিত হয়েছে।আলোড়িত করেছে তরুন পাঠকের মন।জানিনা তিনি সুররিয়ালিস্ট কি না। কিংবা সমাজ চৈতন্যের আলোকে বিশ্বাসী কিনা। তবে তার কবিতায় এগুলো বেশিরভাগ ধরা পড়েছে। বহু উপমা রূপক বা অ্যালিটারেশনের ছড়াছড়ি এবং সর্বপরি তাঁর কবিতায় একটা স্বাপ্নিক কাব্যময়তা (ড্রিমভিশন-) সুগন্ধের মতো ছড়িয়েছে।
কবি মনসুর আজিজ এর কবিতায় চিত্ররূপময়তা, চিত্রকল্প এক অনন্য সাধারণ উজ্জ্বল আভায় উদ্ভাসিত হয়ে উঠেছে।
আধুনিক জীবনযাত্রা যেমন জটিল হয়ে উঠছে তার যন্ত্রণা ও বহুবিধ। যে কবিতা একদিন মানুষের মনে আনন্দ দেয়ার জন্য সৃষ্টি হতো, তা হয়ে উঠলো জীবনমুখি। দৃষ্টিপাত করলেন বৃহত্তর লোক সমাজ ও ঐহিত্যের দিকে। তাঁদের কবিতায় নতুন আঙ্গিকে নবতর উপস্থাপনাম আধুনিকজীবন উপলদ্ধিতে বিভিন্নভাবে উঠে এলো লোকজ বিষয়-আশয়।
আধুনিক কবিরা যুগধর্মকে কবিতায় তুলে আনলেন প্রধান উপজীব্য বিষয় হিসেবে। কিন্তু ঐতিহ্য বিস্তৃত হননি। কবি মনসুর আজিজ তেমনই এক কবি এবং লোকজ ঐহিত্য আর সংস্কৃতির শিকড় আঁকড়ে ধরা কবি। লোকজ ভাষা ব্যবারেও তিনি যথেষ্ট প্রাজ্ঞতার পরিচয় দিয়েছেন। কবিতার চরণে লোকমুখে ব্যবহৃত শ্বদ তিনি অবলিলায় ব্যবাহর করেতে পেরেছেন। কবি মনসুর আজিজ এর কবিতায় শিল্পপ্রকরণের প্রভাব প্রকট। রূপক গভীর থেকে গভীরতর। যেমন-

সকাল হেঁটে চলে বাউ-ুলে দুপুরের দিকে
তার আগে প্রাত:ভ্রমণে বের হয় রমনায়, চন্দ্রিমা উদ্যানে
ভোরের বাতাসে সকাল নেচে ওঠে কিশোরী ফুলকন্যার মতো
নারীফুল সুগন্ধে টাকা ওড়ে
বক্ষে
নিতম্বে
(বাউণ্ডুলে দুপুর)
অথবা তার একবার এসো দুকূল ছাপিয়ে কবিতাটি। সুগন্ধি আচল কবিতাটিতে মনসুরের শিল্প প্রকরণ উদ্ভাসিত হয়েছে চমৎকার গাঁথুনিতে। কয়েকটি ম্যাজিক লাইন কবিতাটিকে আলোকিত হরেছে বলে মনে করি-
‘সুগন্ধি আঁচলে তোমার রূপ দেখি বারবার
বোধিবৃক্ষে বুদ্ধেও ধ্যান ভাাঙাতে চাই না বলে
দেখা হয় না প্রশান্ত দৃষ্টির বীজতলা…
………………………………………..
তুর থেকে সিনাই নুড়ির তসবি টিপে
সুগন্ধি আচলে মুখ ঢাকি হেরার গুহায়।
সুতরাং ড্রিম ভিশন (স্বাপ্নিক কাব্য) বা আলিটারেশনের (অনুগ্রাফ) চূড়ান্ত-পর্যায়ে কবিতাটিতে প্রতিভাস হয়েছে এবং পাঠককুলকে মুগ্ধ করে- সন্দেহ নেই।
কিছু কিছু কবিতার নামকরণে কবি আলাদা একটা কাব্যসত্ত্বার উপস্থিতি জানান দেন বলে আমাদের বিশ্বাস। মেমন- বৃষ্টির ফটোফ্রেম, নাগরিক ডল, সময়ের বোররাক, তাকওয়ার কলস, আত্মারা খামারে ফিরে যাবে, মানবিক ঐশ্বর্যের গম্বুজ, আততায়ী ডুবোচর ইত্যাদি।
অনুবাদেও মনসুর আজিজ তার স্বকীয়তার স্বাক্ষর রেখেছেন। আধুনিক চীনা কবিতা দেশীয় অনুসঙ্গে তুলে ধরেছেন বাঙালি পাঠকের সামনে। তাও চু’র কবিতাটি তিনি যখন তর্জমা করে সামনে হাজির করেন তখন ভাষার দেয়াল আর থাকে না। যেমন- বসন্তের দিনগুলো কাটছিলো আনন্দে
কিন্তু আমি প্রকৃতিকে ধন্যবাদ দেবো না
তার এই অকৃপন দানের জন্য
হঠাৎ ঝড় এসে চুরমার কওে দিলো সব টালিঘর
এই হিংস্র বন্যায় ছিন্নভিন্ন করে দিলো সব।
অথবা চেন ম্যাঙজিয়ার কবিতায়-
একটি গাছের প্রতিচ্ছায়া
নড়ে ওঠে সন্তর্পনে
কতো অলৌকিক মনে হয়-
যখন পূর্ণচাঁদ মৃদু হাঁটে পুব থেকে পশ্চিমে…
তখন এই অসাধারণ পঙক্তিগুলো এমনভাবে আচ্ছন্ন, প্লাবিত, মুগ্ধ হরে যে মনে হয় কোথায় অনুবাদ! এ যেন মনসুর আজিজ এর অন্তরর্গত প্রগাঢ় স্বর। এর কারণ একটাই, মনসুর আজিজ অনুবাদেও তার কবিস্বত্বার বিস্তৃতি ঘটিয়েছেন শতভাগ। কবিতায় বিষয়মূলকে অক্ষুন্ন বা অ-ব্যাহত রেখেও তিনি বাংলায় এর রূপ দিয়েছেন তার নিজস্ব কাব্যভাষা ও স্টাইলে। ফলে তার কবিতা ও অনুবাদ একাকার হয়ে যায়।
কবিতা ও ছবি যদি প্রকৃত রিয়েলিটিকে প্রকাশ করতে চায়, তবে তা হবে অটোমেটিক রাইটিং। চিত্রকলা থেকে পরাবাস্তববাদী শিল্পী হলেন ম্যাক্স আর্নস্ট। এছাড়া স্পেনের প্রখ্যাত চিত্রশিল্পী সালভাদর দালি ও সুইস পল ক্লে। মনসুর তার কিছু কবিতায় মনে হয় এই ধরণের একটা ফ্যান্টাসি সৃষ্টি করেছেন। তার অনেক কবিতায় রোমান্টিসিজমের গন্ধও পেয়ে থাকি। মেযন-
স্বপনের মধুবনে নাড়া দেই কোনো একদিন
তারাজ্বলা রাত দেখে বনপথে পথ চলা শুরু
তোমার পরশ পেয়ে নিথর নদীতে জাগে ঢেউ
যৌবনের ভরা নদী বেজে ওঠে নাড়া দিলে কেউ
চোখ ফিরে তাকাতেই হই কেনো আমি বেচইন।
(স্বপনের মধুবনে)

আবার তার মধ্যরাতে ভাটিয়ালি গান কবিতায় লিখেন-
দুঃস¦প্নের মধ্যরাত তাড়া করে প্রত্যহ
স¦প্নেরা জীবনের গলিপথ চিনে গেছে
বিষাক্ত তীরে রক্তাক্ত করে মন
স¦প্নের শরীর বেয়ে রক্ত গড়িয়ে পড়ে

এখানে যেন কথা শেষ হয়ে যায়নি। তার বিষণ্ন সুরটি পাঠকের মনকে যেন আঘাত করতে থাকে। এখানে মিউজিক না থাক মেলডি আছে। কবির জল ও জোয়ারের কাব্যে কিছু কিছু কবিতায় তিনি সুনিপুন নতুন নতুন শব্দ গেঁথেছেন যা তাঁর একান্ত স্বতন্ত্র শব্দ রূপে ধরা দেয় এবং বাংলা শব্দের ভাণ্ডারকে সমৃদ্ধ ও সুষমামণ্ডিত করে। যেমন- জিয়র সময়, বাবলবৃত্ত, চোয়াল ভাঙা পুকুর, সময়ের বোররাক, বাউ-ুলে দুপুর, কচি কচি মানব পাতা, ফরমালিনের মেয়ে, নিমা পরা ফলের ত্বক, আততায়ী ডুবোচর ইত্যাদি।

কবিতাকে বলা হয় সূক্ষ্মতম শিল্প। ভাব বা কল্পনার রসে জারিত হয়ে কবিতা প্রসূত হয়। কবি মনসুর আজিজ এর অনেক কবিতায় আমরা অ্যালিটারেশন বা অনুপ্রাসের গন্ধ খুঁজে পাই। বাংলাদেশের প্রখ্যাত আধুনিক কবি প্রাবন্ধিক, সাহিত্যিক ড. হুমায়ুন আজাদ এর ভাষায়- ‘যদি অজর হতো মানুষ উদ্ভিদ, চাঁদ, সূর্য, ওষ্ঠ, আলিঙ্গন, নারী পুরুষ- তাহলে দরকার পরতো না কবিতার; চূড়ান্ত অর্থহীনতাকে অর্থজ্যোতির্ময় করার জন্যেই দরকার কবিতা এবং কবিতাই দরকার।’
কবি মনসুর আজিজ সেটা দেখিয়েছেন এবং সেখানেই এই চির সবুজ কবির সার্থকতা। পরিশেষে আমি এই কবির চল্লিশতম জন্ম উৎসবে তার দীর্ঘায়ু কামনা করছি।