আশির দশকের তারুণ্য ও ভালোবাসার কবি রফিক মজিদ। ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ার সময় থেকেই তিনি একসময় অন্তরের ভাবকে শব্দমালায় গ্রথিত করার চেষ্টা চালান। দিনে দিনে ভরে তুলেন তার কবিতার খাতা। স্কুলের গণ্ডি পেরিয়ে পা রাখেন কলেজের বারান্দায়। এবার নিজের লেখাগুলো ছাপার অক্ষরে রূপদান করার জন্য কলেজের বন্ধুদের নিয়ে নিজের সম্পাদনায় “কবিতা কাগজ” নামক ভাঁজপত্রের জন্ম দিলেন। উৎসাহ-উদ্দীপনা নিয়ে প্রকাশ করেছেন অনেকটি সংখ্যা। পড়ালেখা শেষ করে একসময় তিনি সাংবাদিকতাকে পেশার সাথে জড়িত হোন এবং পাশাপাশি বাবার স্বর্ণালঙ্কারের ব্যবসা দেখাশোনার ভার গ্রহণ করেন। পেশা এবং সাংসারিক জীবনের বন্ধন তাকে কবিতা থেকে একসময় অনেকটা দূরে সরিয়ে দেয়। ফেসবুকের কল্যাণে এবং বন্ধু-বান্ধবদের উৎসাহে ইদানিং তিনি আবারো কবিতার প্রেমে পড়েছেন। শুধু তাই নয়, শেরপুরের কবিদের নিয়ে তিনি “গাঙচিল সাহিত্য ও সংস্কৃতি পরিষদ” নামক সাহিত্য সংগঠন করে ইতিমধ্যেই দেশ-বিদেশের কবি-সাহিত্যিকদের নিকট একজন আদর্শ ও সফল সংগঠক হিসেবে সুনাম অর্জন করেছেন। বিভিন্ন সাহিত্যগ্রুপের কবিদের সাথে যৌথভাবে একাধিক কাব্যগ্রন্থ প্রকাশের পাশাপাশি ২০২০ সালের অমর একুশে গ্রন্থমেলায় গাঙচিল প্রকাশনা থেকে তিনি “অদৃশ্য অনুভূতি” নামক একটি একক কাব্যগ্রন্থ প্রকাশ করেছেন যার কাটতি গ্রন্থমেলায় বেশ ভালো ছিলো। কবি তার জীবনের বিভিন্ন সময়ে ঘটে যাওয়া হৃদয়ের অনুভূতি নিয়ে তার কাব্যগ্রন্থটিকে সাজিয়েছেন। কভার পৃষ্ঠায় চমৎকার প্রচ্ছদে ৫৭টি মূল ও বেশ কয়েকটি গুচ্ছ কবিতা দিয়ে সাজানো কাব্যগ্রন্থটির কবিতাগুলো বিশ্লেষণ করতে গেলেও হৃদয়ে অদৃশ্য এক অনুভূতির স্পন্দন ঘটায়।

“অদৃশ্য অনুভূতি” নামক প্রথম কবিতায় তিনি অনুভব করেছেন হৃদয়ের সম্পর্ক, প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি, কাব্যের ছন্দ এবং স্বপ্ন মানুষের জীবন থেকে সাময়িক পতন হলেও তা অনুভবে রয়ে যায়। সে অনুভূতি কল্পনার জগত থেকে বিলুপ্ত হয় না বলেই তা অদৃশ্য থেকে যায় এবং কবি তা প্রতিনিয়ত অনুভব করে থাকেন।

দ্বিতীয় কবিতায় কবি বাংলাদেশের জন্মের সময় বীর মুক্তিযোদ্ধাদের কঠোর পরিশ্রমের ফসল ঘরে তোলার অনুভূতির বর্ণনা করেছেন। কবি অনুভব করেছেন তার লেখনিতে-
হবে স্বাধীন বাংলা
পরাধীনতা থেকে
বুকের রক্ত দিয়ে
মানচিত্র এঁকে।

দেশপ্রেমের এমন ভাবনা মানুষের হৃদয়ে এক দারুণ অনুভূতি সঞ্চার করে, যা সত্যিই প্রাণে অদৃশ্য অনুরণন ঘটায়। “হ-য-ব-র-ল” কবিতা কবি তার কষ্টের অনুভূতির প্রকাশ করেছেন। তিনি লিখেছেন-
কষ্টের তাড়া খেয়ে
বেদনার ঝোপে
লুকিয়েছিলাম
রক্তচোষা জোঁকের দাপটে
সে আশ্রয়ও হারালাম…

অথবা

ক্ষুধার্ত পেটে হারামির হাতছানি
তাই অভুক্ত রাত কাটাই…

“হৃদয় সমাচার” কবিতায় কবি যেন ব্যর্থ প্রেমিকের অন্তর্দাহের অনুভূতি প্রকাশ করেছেন।
কবির কলমের আঁচড়ে স্পষ্ট হয়েছে-
তুমি বিহীন আমার এখন
কাটেনা যে রাত…
একলা আমি তোমার আশায়
যায় যে বেলা যায়…

কবি তাই “প্রিয় তুমি” কবিতায় ফেসবুকে তার প্রিয়াকে খুঁজেছেন, খুঁজেছেন তিনি শপিংমলে আর মার্কেটে। অবশেষে প্রেমিকাকে লোভ দেখিয়ে বলেছেন-
দু’হাত ভরে প্রেম দিব
থাকো যদি আমার
অন্যদিকে “ভালোবাসার ক্রসফায়ার” কবিতায় আক্ষেপ করে বলেছেন-
বিশ্বাসের নিকুঞ্জে আজ লেগেছে আগুন
প্রেমিকের পোড়া মনে আসে না ফাগুন।

অবশেষে যম এসে দিল ক্রসফায়ার
অকালে মরণ হলো মোর ভালোবাসার।

সুগভীর ভাবাবেগে কবি বোশেখের ভালোবাসা কবিতায় লিখেছেন-
এলোকেশে চলো যেন শাওনের কালো মেঘ
কুসুমিত গন্ধ ছড়ায় বাড়ায় হৃদয়ের আবেগ।

অনেক পরে কবি বুঝতে পেরে নিজের ভাঙ্গা মনকে সুদৃঢ় করতে “শূন্যস্থান” কবিতায় লিখেছেন-
তবে তোমার ঐ ঠুনকো ভালোবাসার জন্য
কিছুই হারাবো না আমি।
কেবল বুকের মাঝে একটি শূন্যস্থান রেখে
বেঁচে থাকব আমার পৃথিবীর সাথে।

এখানে প্রেমিক কবিকে ব্যর্থতার আগুনে পোড়া এক খাঁটি সোনার কারুকার্যময় অলংকারের সাথে তুলনা করা যেতে পারে। অন্যদিকে কবি তার কবিতার বাস্তব জীবনে এর প্রতিফলন ঘটাতে গিয়ে “সাদা-কালো সময়” কবিতায় শৈশবের দুরন্তপনাময় অতীত স্মৃতি রোমন্থন করতে গিয়ে বলেছেন-
মহল্লার গাছে গাছে ছিল যত ফল
রাতের আঁধারে হতো আমাদের দখল।

বাস্তব চিত্রকল্পকে কবি এখানে অনুভূতির মায়াবী সুতায় গেঁথে রেখেছেন। “জাল টাকা” কবিতায় তিনি নিরীহ মানুষের ধোঁকায় না পড়ার জন্য সজাগ থাকতে বলেছেন।
প্রকৃতির চিত্রকল্প ধারণ করতে গিয়ে কবি “বর্ষা এখন” কবিতায় প্রকৃতির বিরূপ অবস্থার চিত্র তুলে ধরেছেন। তিনি লিখেছেন-
চলছে বর্ষাকাল কাঠফাটা রোদ্দুরে একি বর্ষার হাল!
চমৎকার বর্ণনায় তিনি প্রকৃতির বদলে যাওয়া অবস্থার চিত্রকল্প তুলে ধরেছেন।

আধুনিক কবিতার অবয়বে “তুমি কার” কবিতায় কবি আবারো ফিরে গিয়েছেন তার মানস প্রিয়ার কাছে। বলেছেন-
ঝর্ণার জল মাড়িয়ে
ছুটে গেলে ঐ দূর পাহাড়ের গাঁয়
যেখানে মেঘ ছুঁয়ে দেবে তোমায়
তাহলে তুমি-
থাকলে কি আর?

কিন্তু পরক্ষণেই যখন “এই আমি সেই তুমি” কবিতা পাঠ করা হয় তখন দেখতে পাওয়া যায়-
এই আমি সেই তুমি-
বদলাইনি এতটুকু!
মান-অভিমান যাইনি দূরে সরে
কেবল বিশ্বাস টিকিয়েছে সেটুকু।

কবি এখানে ভালোবাসার মানুষদের মনের অপরিবর্তনীয় অবস্থার বর্ণনা দিয়েছেন কবিতার কাব্য নিজেকে কখনো ব্যর্থ অথবা প্রিয়ার বিরহে কাতরতা এবং কখনো একাত্মতার মিশ্র পরিচয় ব্যক্ত করেছেন।
“আমার আকাশ” কবিতায় তিনি প্রেমিকাকে খুশি করতে আকাশ ছুঁতে চেয়েছেন। “তোমার ছায়া” কবিতায় তিনি নির্ভীক প্রেমিক পুরুষের দারুণ অনুভূতির বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়েছেন। কবি বলেন-
আগ্নেয়গিরির অগ্নিশিখায় জ্বলবো না ভালোবাসার শীতল পরশে আছি তোমার।

আবার “ভালোবাসার মানে কি?” কবিতায় কবি বলেছেন-
ভালবাসার শেষ বেলাতে কিছু নেই থাকবে শুধু অনুভব আর স্মৃতি।

“অতীত বর্তমান” কবিতায় কবির শৈশব-কৈশোর-যৌবন থেকে বর্তমানকালেরও অদৃশ্য হওয়া অনুভূতির বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়েছেন। স্বপ্ন হারা মানুষ, পাথর সময়, বন্ধু আড্ডা, বান- এসব কবিতায় কবি সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনের বিচিত্র চিত্র ফুটিয়ে তুলেছেন। গ্রন্থের শেষাংশে কবি দশটি গুচ্ছ কবিতার শেষ কবিতা “আমার আকাশ”- এর মাধ্যমে কবির মনের আকাশে তার প্রিয়াকে অনন্তকাল হাঁটার আহ্বান জানিয়েছেন।

কবির কাব্য পাঠে স্পষ্ট হয় তিনি প্রেমিক হৃদয়ের অনুভূতিকে বিভিন্ন মাত্রিকতায় সাজিয়েছেন। কয়েকটি কবিতাতে প্রকৃতির বিরূপ অবস্থা চিত্রিত করেছেন, কিছু কবিতা সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনের বাস্তব চিত্র ফুটিয়ে তুলেছেন। একটি কবিতাতে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিময় অনুভূতির বিস্ফোরণ ঘটিয়েছেন। কবিতাগুলোতে ব্যাকরণের পা-িত্যপূর্ণ ভাব ততটা প্রদর্শিত না হলেও গভীর রসবোধ, উপমা-উৎপ্রেক্ষা ব্যবহারে বেশ মুন্সিয়ানার পরিচয় উপস্থাপন করেছেন।

সম্পাদক সাহেব ইচ্ছে করলে বইটিতে কবিতাগুলো প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি এবং প্রকৃতির কবিতা হিসেবে বিভাজন করে সাজিয়ে দিতে পারতেন। এক্ষেত্রে সম্পাদক সাহেবের সুতীক্ষণ বোধের একটু অভাব লক্ষ্য করা গিয়েছে। তাছাড়া কয়েকটি বানানের স্বাভাবিক ভুল ব্যতীত তেমন কোন গুরুত্বপূর্ণ অসঙ্গতি বইটিতে দৃষ্টিগোচর হয়নি। কৈশোরে যার কবিতা লেখা শুরু সেই রফিক মজিদ অর্ধশত বছর বয়সে এসে একটি চমৎকার কাব্যগ্রন্থ আমাদেরকে উপহার দিয়েছেন। কবি তার কাব্যটিতে নামকরণের সাথে অন্তর্নিহিত ভাবের যথোপযুক্ত সম্মিলন ঘটাতে সক্ষম হয়েছেন। সেইসঙ্গে উপযুক্ত প্রচ্ছদ অঙ্কনেও দক্ষ শিল্পীমনের পরিচয় লক্ষ্য করা গিয়েছে। যৎসামান্য ত্রুটিকে হিসেবের খাতায় না রাখলে গ্রন্থটি পাঠ শেষে সত্যিই পাঠকের অন্তরে অদৃশ্য অনুভূতির জাগরণ ঘটাবে। জয় করবে পাঠকের হৃদয়। কবিতা লেখার মাধ্যমেই কবি বেঁচে থাকবেন মায়াময় পৃথিবীর মাঝে।