একটি শাসিত জনগোষ্টীর ভাষা হতে জন্ম নেয় ক্ষোভ আর দ্রোহের মর্মজালার অগ্নিস্পুলিঙ্গ। যেখানে গাঁথা থাকে মানবতার কথা, শান্তির কথা, বাঁচার কথা বালবাসার কথা, আবার বাঁচতে জানা অথবা স্বপ্নভূক মুক্ত মনের মানুষের কথা হলেতো নব্য যুগের সূচনা হবেই। যদি হয়ে থাকে একজন স্বাধীনচেতা ও রঙের কবির কথা তাহলে আশাব্যঞ্জক রথের তরী ভাসবে শূন্যে ভাসমান প্রলাপের আয়নায়।
এ সময়ের কবিদের কাব্য নিয়ে আলোচনা করতে বসা মানে আকামের কাঠখড়ি নিয়ে অযাচিত চর্বিত চর্ব ন করা। আবার কতেক কবির কর্ম নিয়ে বসা মানে জ্ঞানের মাপকাঠি নিয়ে বসা আবার নতুন স্বপ্নের চরাচরে ঢুকে পড়া , তখন স্বার্থকতা এসে করজোড়ে নাড়া মেয় স্মৃতির মর্মজ্বালা।
গত শতাবদ্বীর অন্যতম এক কবি নিয়ে তথা কবির সৃষ্টিকর্ম নিয়ে আজকের এই আলোচনা। কবি ’একতরবারির সঙ্গে’ কাব্যটিতে সময়ের চাহিদা নিয়ে কথা বলেছেন। গবেষণার নির্যাস নিতে ছুঁড়ে দিয়েছেন নব প্রজন্মের হাতে একটি শক্তিশালী অপ্রতিরোধ্য ধারালো তরবারি । যে তরবারি ভালবাসতে জানে , কাছে টানতে জানে, মায়ার আঁচলে বাঁধতে জানে , স্বর্গ ও নরক দেখাতে জানে। দিতে পারে একটি সুন্দর ও সাবলীল জীবনের মিথস্ক্রিয়ার নতুন মিথ।
প্রতিনিয়ত দেখে আসছি এই কক্ষির ভেতর থেকে রসায়ন বের হচ্ছে। কঠিন এক রসায়ন, যেখানে স্বপ্ন ও বাঁচতে জানার পাশাপাশি দ্রোহেরও আছে সীমাবদ্ধতা। কবি মানবের ব্যর্থ আয়োজন ব্যর্থ করার প্রত্যয়ে সংশয় প্রকাশ করে বলেন-
খরাক্লিষ্ট মরুঝড়ে উড়ে যাচ্ছে আষাঢ শ্রাবণ
মৃত্যুর হাত থেকে বেঁচে যাওয়া বৃক্ষের পায়তাঁরা কাঁপছে

তারা জানে——————–

সেদিন এই ইদিপাস শাসিত শহরে
রক্ত বৃষ্টি হবে ।
কবি সময়ের অযাচিত প্রলাপে ব্যথিত হয়ে রক্ত বৃষ্টি হওয়ার সংশয় প্রকাশ করেছেন।
মৌমাছির গানে অস্থির দেশের ৎকবি দেশের গন্ডি ছাড়িয়ে আর্ন্তজাতক পরিমন্ডলে ঢুকে পড়েছেন বিবেকের দায়বদ্ধতা থেখে । কবি এক কঠিন উত্তরাধিকার এই শতাব্দীর প্রজন্মের কাছে তুলে ধরতে গিয়ে বলেন-
দলবেঁধে লাইনে দাঁড়ানো প্রতিটি বন্ধী শব্দ
গুয়ানতানামো কারাগারে ফুঁপিয়ে ফুপিঁয়ে কাঁদছে
টলমল করছে ম্যাণ্ডেলার মুখ।
কবি অচেনা নগরে ঢুকে চেনাচ্ছেন সময়ের মসৃণ পথ গুলো। কবি অর্ন্তচক্ষু দিয়ে দেখেন বর্হিগমনের দৃশ্যাবলী। দেয়ালের ও পাশে কবিতাটিতে কবি কেবলই রুপান্তর চেয়েছেন। আর সে রুপান্তরে হযরত আলীর প্রান্তরের অতি তুচ্ছ তৃণ তুলে আনতে দিধাবোধ করেননি।
কবি অতীত সংস্কৃতি মন্থন করেতে গিয়ে ঐতিহ্যকে তুলে এনেছেন নির্মম সত্যকে ছাপিয়ে। গণিত নামক কক্ষিতাটির শুরুতে গণিত শিখােিলন এভাবে-
গণনা শিখেনি যারা অনুমানে ফসল মেপেছে
কখানো হারায় যদি পাল থেকে ভেড়া বা মহিষ।
সুনিশ্চিত বোঝে তারা দলে থকে ক’টি খোয়া গেছে
কবি কাঠিন্যতাকে ঘর করাতে চেয়েছেন নির্মম ভাবে। কবি জানে ইতিহাস ঐতিহ্য ব্যতিরেকে সাহিত্য চর্চা আদৌ সম্ভব নহে। কবি আইনষ্টাইনের সূত্রের মতে পেছন ফিরে তাকাতে ভালবাসেন। সাথে স্বপ্ন দেখান আল মাহমুদ অথবা য়য়োসা মার্কেজের মতো।
কবি মুক্ত বাজার অর্থনীতির বেড়াজালে কিভাবে জীবন চলে , কিভাবে ঢুকে যায় রক্তের ভেতর রক্ত, কিভাবে ছিঁড়ে যায় একে অপরের কলজে। সে দৃশ্য বর্ণনা দিয়েছেন মুক্তবাজার কবিতায়—
কে কাকে ছিঁড়ে খাবে জানে না কেউ কিছু
ক্ষুধার হার বাড়ে শুধুই মাখাপিছু।
কবির যে জাতিস্বত্তার বিবেক এবং স্বপ্ন দেখান সে কথা কবি রেজাউদ্দিন ষ্টালিন আবার তারঁ কবিতায় প্রমাণ করেছেন। মুক্ত গদ্যের পদ্য কবি ’স্বাক্ষ্য’ কবিতায় আন্তর্জাতিকতা বাদের সাথে সাথে স্বজাতির কথাও বলতে ভুলে যাননি। বর্তমান প্রেক্ষাপটে এই লাইনগুলো আবার নাড়া দেবে জাতিকে। জাতি আজ সময়ের কঠিন কান্তিকাল পার করছে ।কবি বলেন এভাবে- এখন আমরা ভুলে গেছি যেন সোজা হয়ে দাঁড়াতেও
ঘনদূর্গম বন্ধুর পথে প্রান্তর মাড়াতেও
কৃতদাস সেজে বাঁচাটাই আজ অভ্যাসে পরিণত
রক্ততুলিতে দাঙ্গা আঁকছি বর্ণ ও জাতিগত।
আজ বাংলাদেশ রাজনীতির বেড়াজালে আক্র্ন্তা। জাতি রাজনীতির অন্তরালে আঁটকা পড়েছে। রাজনীতির ছন্দে দন্ধ বেড়েছে ম হয়ে উঠছে প্রতিশোধ পরায়ণ। প্রজন্ম খেলে চলেছে রক্তের হালিখেলা। বিবেকে ক্যাকটাস করেছে আঘাত।পঁচন ধরেছে হিসেব। মিলছেনা যোগবিয়োগ।
চৈত্রের হালখাতার ন্যায় একটি খাতায় থাকে তার সব হিসেব নিকেশ। পুরো বছরের হিসেব্ ঘর করে এইবেহিসেবি খাতায়। পাতায় পাতায় ছোঁয়া থাকে কালো কালির বর্ণমালা ও রেখাচিত্র। কবি জীবন তরবারির বর্হিপ্রকাশ অন্তরালের আরেক সিনথিসিস। এই থিসিস কবির একান্ত নিজস্ব। কবি হিসেব মিলাতে বসতে চাপ । তখন দেখা হয়ে যায় এক জীবন্ত ডায়রীর । যে ডায়রীতে কবির চাওয়া পাওয়া এবং না পাওয়ার সব হিসেব নিকেশ নিহিত। এ ডায়রী হচ্ছে কবির ওপারের ছায়া ডায়রী ।আর এখানে কবির সাথে বার বার দেখা তরবারির সঙ্গে।
কবি রেজাউদ্দিন ষ্টালিন ’সুখ’ নামক কবিতার শেষ চরণগুলো হুঁশিয়ারী বার্তা দিয়েছেন জাতিস্বত্তাকে।যারা এ দেশে জন্মগ্রহণ করে সুখ পায়নি তাদের নিয়ে কবি বলেন- এই দেশেতে সুখ হলো না কোথায় যাবি
ভাঙ্গা নৌকা ছেঁচলে ভবে কি আর পাবি।
নৌকা আমাদের ছেঁচা হয়ে গেছে। আর কিছই নেই । ডাঙ্গায় ভাসালেও আর ভাসবে না। সময়কে স্মরণ করে ক্ষমা চাইলে হয়ত সুখ পেতে পারিস তোরা। তা না হলে সুখ পাবিনা কোথাও।

দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার অন্যতম কবি রেজাউদ্দিন ষ্টালিন। একটি দেশের দুঃখ ও সংশয় কাটিয়ে স্বর্ণ ও পূর্ণতা ফিরে আসুক এমনটা আশাবাদ ব্যক্ত করে কবি প্যালষ্টাইন নিয়ে বলেন- তোমার নির্বাতাস নক্ষত্র বুকে
চরাচর রুপী কান্নার রোল দিগন্ত বিদীর্ণ চিৎকার হোক
হিরন্ময় হাত রক্তাক্ত পতাকার লৌহ দন্ড
আর এতগুলো মৃত্যু ও সাহসের নাম স্বাধীনতা হোক।
কবি ’এক তরবারির সঙ্গে’ নামক কাব্যগ্রন্থটিতে অনেকটা আন্তর্জাতিক নির্ভর হয়ে লিখেছেন। কবির চিন্তা , চেতনা ,স্বপ্ন শুধু দেশ নিয়ে নহে। কবি সারা ক্ষিশ্বকে দেখতে ও দেখাতে চান। যেভাবে দেখেছেন সেভাবে। কবির অনেক কবিতায় শিশু নিয়ে লিখে বুঝাতে চেয়েছেন প্রজন্ম থেকে প্রজন্মকে। যে প্রজন্ম রাই নেতৃত্ব দিবে আগামীর।কবি তাঁর প্রজন্মের অন্তরালে মায়ের মন নিয়ে গভীর মমতায় বলেন- শুধু মাতৃমন বিচারের দিন
চিৎকার করে ওঠে, ঐ যে আমার সন্তান
নির্দোষ- ওকে ক্ষমা করো প্রভু।
কিন্তু এ কবি জন্মের দায় নিহ ঘাড়ে নিতে প্রস্তুত। কবি মনে করেন
’পিতা নয় মাতা নয় কবির জন্মের দায় কবির একার ’

সুখপিয়াসী ও সৌন্দর্যমুখ এবং হাস্যমুখী এক কবি কিভাবে এত নির্মম কবিতা লিখতে পারেন অবাক লাগে। সাধারণত ভাবগম্ভীর লোকগুলো নির্মমতা ও কাঠিন্যতা নিয়ে লিখতে ভালবাসে । তবে এ কবি ব্যতিক্রম হয়ে দেখালেন নতুন নতুন স্বপ্নের নতুন পরিসীমা। জয়তু জয় হোক এই কবির।