এ বাংলায় কখনো এ নাগরিক নিসর্গের রূপে,
কখনো বা রৌদ্রমাখা দুঃখিত প্রাচীন ধ্বংসস্তৃপে
চোখ রেখে, ঔদাস্যে কাটিয়ে বেলা নিতেছে নিশ্বাস
করুণ যে আফ্রোদিতি এক কোণে, দ্রুত ক্যাকটাস
আগে তার হাত কুঁড়ে, কাস্পিয়ান কম্পমান চোখে,
হৃদয় সুদূর পথরেখা হয় কবেকার শোকে ৷
ভীষণ কর্তিত আকাঙক্ষার পিঙ্গল অলক আর
মধ্যরাতে স্বপ্নে তার বাজে অশ্বক্ষুর বারবার।

এ ক’টি পংক্তি পঞ্চাশের নাগরিক মানুষের কবি শামসুর রাহমানের শ্রেষ্ঠ কবিতা উৎসর্গ পত্রের। বাংলাদেশের কবিতা যে ক’জন কবির হাত ধরে বঙ্গজ হয়ে ওঠে, তার মধ্যে শামসুর রাহমান অন্যতম। জন্ম ২৩ আক্টোবর ১৯২৯, মৃত্যু ১৮ অগাস্ট ২০০৬।
ত্রিরিশের পঞ্চপাণ্ডব খ্যাত আধুনিক কবিরা, বাংলা কবিতাকে য়ুরোপবাহিত ক্লেদকুসুমে সাজিয়ে তার বুনো বঙ্গজ ঘ্রাণ হারাতে বসেছিলো। বিশেষ করে বাংলাদেশের পঞ্চাশের কবিপঞ্চক শামসুর রাহমান, আল মাহমুদ, ওমর আলী, শহীদ কাদরী, সৈয়দ হক এর কবিতায় তা আবার পূর্ববঙ্গের সামাজিক বাস্তবতায় ঘ্রাণ প্রাণময় হয়ে বঙ্গীয় রূপ পরিগ্রহন করে।
পেশা ও নাগরিক চৈতণ্যে শামসুর রাহমান অগ্রসর ছিলেন বলে, তার বেড়ে ওঠা ৪৭ পরবর্তী নতুন বাংলার নতুন রাজধানী ঢাকা হওয়ার কারণে, এবং বাংলাদেশের কবিতার ইতিহাস ও শামসুর রাহমান জমজ স্বত্বার বেড়ে ওঠার প্রেক্ষাপটে, তাঁর কবিতা আধুনিক বাংলা কবিতার পাঠকের কাছে গুরুত্বপূর্ণ।

শামসুর রাহমানের শ্রেষ্ঠকবিতার ভূমিকায় তাই কবি আত্মব্যাখ্যা দেন নিজ কবিতার: ‘কবিতা লেখার সময়, কোনো এক রহস্যময় কারণে, আমি শুনতে পাই চাবুকেব তুখোড় শব্দ, কোনো নারীর আর্তনাদ; একটি মারেগের দৃপ্ত ভঙ্গিমা, কিছু পেয়ারা গাছ, বাগানঘেরা একতলা বাড়ি, একটি মুখচ্ছবি, তুঁত গাছের ডালের কম্পন, ধিকিয়ে চলা ঘোড়ার গাড়ি, ঘুমন্ত সহিস ভেসে ওঠে দৃষ্টিপথে বারবার। কিছুতেই এগুলি দূরে সরিয়ে দিতে পারি না। যা কিছু মানুষের প্ৰায় অপ্রিয়, যা কিছু জড়িত মানব নিয়তির সঙ্গে, সে সব কিছুই আকর্ষণ করে আমাকে৷ সবচেয়ে বড় কথা, সুদূর সৌরলোক, এই চরাচর, মানুষের মুখ, বাঁচার আনন্দ কিংবা যন্ত্রণা, সব সময় বন্দনীয় মনে হয় আমার কাছে। এসবের বন্দনাই কি আমার করি? বলা মুশকিল কবিতা বড় গৃঢ়াশ্রয়ী, বড় জটিল। আমিতো জীবনের স্তরে স্তরে প্রবেশ করতে চাই, কুড়িয়ে আনতে চাই পাতালের কালি, তার সকল রহস্যময়তা। যে মানুষ টানেলের বাসিন্দা, যে মানুষ দুঃখিত, একাকী- সে যেমন আমার সহচর, তেমনি আমি হাঁটি সেসব মানুষের ভিড়ে, যারা ভবিষ্যতের দিকে মুখ রেখে তৈরি করে মিছিল।’

কবি শামসুর রাহমান তাই বেড়ে ওঠা বাংলাদেশের সমাজ রাজনীতির সহোদর। তার কবিতায় তাই নাগরিক বাস্তবতা ওঠে আসে তুমুল নগ্নতায়। পষ্ট করে দেয় আমাদের নাগরদের চারিত্র্য। নেংটো হয়ে ওঠে আমাদের দণ্ডমুণ্ডের খোলশ। অট্টহাসি তে ভেঙ্গে ভেঙ্গে কেঁপে ওঠে আমাদের তল্লাট। আহা সমাজ, আহা…
নাগরিক নিম্ন মধ্যবিত্তের মনোভূগোল জানতে হলে, শুধু শামসুর রাহমানের কবিতাই আমাদের শব্দের মোহজালে নিয়ে যাবে এক একটি গল্পে, তার স্বাদ আহলাদ, আশা-আকাঙ্খা, সামর্থ ও বৈপরীত্য, সুবিধাবাদ ও নস্টালজিক অনুসঙ্গ, মায়া ও পিছুটান শব্দের বৈভবে, নাগরিক অসঙ্গতির রেখাচিত্রে আমাদের জাগাবে।

শামসুর রাহমানের কবিতা মানে তাই, নাগরিক মানুষের নিজের চারিত্র্য কে নিজেই দেখতে পাওয়া। এ বঙ্গ অঞ্চলে যতদিন নাগরিক সভ্যতা থাকবে, শামসুর রাহমানের কবিতা ততদিন পাঠ্য থাকবে। আবার যুগযুগান্তরে যখন এ বাংলাদেশ থাকবে না, সেই দিন এ বাংলাদেশ কেমন ছিলো তার প্রত্ন ইতিহাস নির্মানে, বিশেষ করে নাগরিক মানুষের বৈষ্যবিত্তির রেখাচিত্র উদ্ধারে শামসুর রাহমানের কবিতা প্রাসঙ্গিক হবে।
আজ ২৩ অক্টোবর, কবির ৯০তম জন্মদিনে কবির প্রতি রইলো শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা। আমি ১৯৯৭ সালে বাংলা একাডেমি’র তরুণ লেখক প্রকল্পে থাকা কালে এ অগ্রজ কবির সাথে অসাধারণ কিছু সময় কাটানোর সুযোগ হয়েছিলো। তা মধুময় ও স্মৃতি জাগানিয়া। অসম্ভব বিনয়ী এ কবি আমাদের জন্য রেখে গেছেন তাঁর সৃজনশীলতার তুমুল সৃষ্টি কবিতাবলী, স্মৃতিকথা, অনুবাদ কবিতা, কলামসহ নানা মাত্রার গদ্য। আজ নিবেদন করছি তাঁর দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ ‘রৌদ্র করোটিতে’ থেকে দুটো কবিতা। সময়ের অনেক চারিত্র্য ভেসে ওঠে আজও তাঁর শব্দ স্বরে।

মেষতন্ত্র
শামসুর রাহমান

মেষরে মেষ তুই আছিস বেশ,
মনে চিন্তার নেইকো লেশ I

ডানে বললে ঘুরিস ডানে
বামে বললে বামে I
হাবে ভাবে পৌঁছে যাবি
সোজা মোক্ষধামে।
চলার ঢিমে তালে রেশ,
মেষরে তুই আছিস বেশI

যাদের কথায় জগৎ আলো
বোবা আজকে তারা,
মুখে তুবড়ি ছোটে তাদের
আকাট মূর্খ যারা I

দিন দুপুরে ডাকাত পড়ে
পাড়ায় রাহাজানি,
দশের দশায় ধেড়ে কুমির
ফেলছে চোখের পানি I

পৃথিবীটা ঘুরছে ঘুরুক
মানুষ উড়ুক চাঁদে,
ফাঁটায় বোমা সাগর তালায়
পড়ছে পড়ুক ফাঁদে।

তোর তাতে কি? খড়-বিচুলি
পেলেই পোয়াবারো।
জাবর কেটে দিন চ’লে যায়,
পশম বাড়ুক আরো।

জগৎ জোড়া দেখিস ঐ
সবুজ চিকন ঘাসের দেশ।
মেষরে মেষ তুই আছিস বেশ।

কৃতজ্ঞতা স্বীকার
শামসুর রাহমান

এদেশে হায়েনা, নেকড়ের পাল,
গোখরো, শকুন, জিন কি বেতাল
জটলা পাকায় রাস্তার ধারে।
জ্যা’ন্ত মানুষ ঘুমায় ভাগাড়ে I

অথচ তোমার চুল খুলে দাও তুমি I

এ দেশে কতো যে ফীকির অছিলা,
কালো বাজারের অপরূপ লীলা ৷
আত্মহত্যা গুম খুন আর
ফটকা বাজার-সব একাকার I

এখনো খোঁপায় ফুল খুঁজে দাও তুমি।

মড়ক মারীর কান্নার রোল
সারা দেশটার পাল্টায় ভোল I
হা-ভাতে ছোঁড়ারা হুজুরের দোরে
সোনালি আমের মরশুমে ঘোরে I

এখনো তোমার বাহু মেলে দাও তুমি ৷

এ দেশে আ’মরি যখন তখন
বারো ভূতে খায় বেশ্যার ধন ৷
পান নাকো হুঁকো জ্ঞানীগুণীজন,
প্রভূরা রাখেন ঠগেদের মন I

এখনো গানের সুরে ভেসে যাও তুমি I

এ দেশে নেতারা হাওদায় চ’ড়ে
শিকার গাঁথেন বাক্যের শরে,
আসলের চেয়ে মে কি টাই দামী।
বিচিত্র দেশ, কৃতজ্ঞ আমি

এখনো যে মেয়ে হাসি জ্বেলে দাও তুমি।