এমনটাও যে হতে পারে তা একেবারে কল্পনায় ছিলো না মুজাদ্দিদের।কিন্তু সেটাই হলো।সেই আশ্চর্য সময়ের সাক্ষী হতে হলো তাকে। আসলে মানবজীবন বড্ড অদ্ভুত।কখন কি হয়ে যায় বলা মুশকিল।আর না চাইলেও যা ঘটে যায় সেটাই জীবনের চরম বাস্তবতা।এই বাস্তবতার সবচেয়ে বেশির ভাগ প্রয়োগ বোধহয় ঘটে কবিদের জীবনে। এই সমাজে কবিতার কতোখানি মূল্য তা নিয়ে বির্তক থাকতে পারে কিন্তু কবিতা যে সাহিত্যের সবচেয়ে সমৃদ্ধ শাখা সে বিষয়ে কারো সন্দেহ নেই। সমৃদ্ধ শাখা হয়েই বা লাভ কি? পেটে খাবার না থাকলে কবিতা আসবে কোথা থেকে। তখন কেবল কবি সুকান্তের কথাই মনে হয়–
“ক্ষুধার রাজ্যে পৃথিবী গদ্যময়
পূর্ণিমার চাঁদ যেন ঝলসানো রুটি।”

বইমেলা প্রাঙ্গণে এলেই মন ভালো হয়ে যায় তার। বহুবার এখানে এসেছে সে।তবে আগে আসা আর এখনকার আসার মধ্যে অনেক পার্থক্য।আগে আসতো শুধুই পাঠক হয়ে। আর এখন আসে লেখক ও পাঠক হয়ে। এই অনুভূতিটা অন্য রকম। ভাষায় প্রকাশ করা যায় না। নতুন বইয়ের গন্ধ যেনো মুজাদ্দিদকে পাগল করে দেয়। কেড়ে নেয় তার মন। নতুন বইয়ে যখন পাঠকের জন্য অটোগ্রাফ দেয় সে তখন মনটা একেবারে আনন্দে ভরে ওঠে তার। সে অনুভূতি একেবারে আকাশ ছোঁয়ে দেয়। এ আকাশ ছোঁয়া অনুভূতির সাথে আরো একটা অনুভূতি যুক্ত হয়েছে এবারের বইমেলায়। সেই অনুভূতি মুজাদ্দিদকে পরিচয় করিয়ে দিয়েছে নির্মম বাস্তবতার সাথে।

বইমেলার গেট দিয়ে ঢুকতেই মুজাদ্দিদের চোখ আটকে পড়ে মাঝবয়সী এক মানুষের দিকে। কাঁধে ঝোলানো ব্যাগ।দুই চারটে বই হাতে নিয়ে বইমেলায় আগত পাঠক দর্শনার্থীদের মনোযোগ আকর্ষণের চেষ্টা করছে। মুজাদ্দিদ এগিয়ে এলো মানুষটির কাছে। কিসের টানে মুজাদ্দিদ সেখানে গেলো সে বোধহয় নিজেও জানে না। মাঝে মাঝে এরকম হয় মানুষের কোন কারণে কি যেনো হয়ে যায় সে নিজেও বুঝতে পারে না। কিসের অদৃশ্য আকর্ষণে মানুষ খুব কাছাকাছি চলে যায়।
মুজাদ্দিদকে দেখেই ভদ্রলোকের চোখ চকচক করতে থাকে। হাতের বইটা তার দিকে তুলে ধরলো সে। আলতো স্বরে বললো- আমার লেখা।
মুজাদ্দিদ অবাক হবার ভঙ্গিতে খানিক তাকালো।তারপর জিজ্ঞেস করলো – কোন প্রকাশনী থেকে বের হয়েছে?
-কোন প্রকাশনী নয়। আমি নিজেই বের করেছি। প্রকাশনীগুলো অনেক টাকা চায়। আর কবিতার বই বের করতে চায় না।
এক মুহূর্তেই লোকটার প্রতি মায়া হলো মুজাদ্দিদের। আসলে কবিতা এখন কেউ পড়তে চায় না। একজন কবি হিসেবে সে সেটা বোঝে। গল্প, উপন্যাসের লেখকদের তুলনায় কবিদের সংগ্রামটা বোধহয় খানিক বেশিই। আর যার লেখালেখির জীবন শুরু কবিতা দিয়ে তার জন্য একজন কবির উঠে আসার গল্পটা অনুভব করাটা কিছু কষ্ট নয়।
-একটা বই নেবেন ভাই। লোকটার কন্ঠে মিনতির সুর।
-হুম, নিশ্চয়ই।
-মাত্র একশো টাকা।
-হুম, ঠিক আছে।
মানিব্যাগ থেকে টাকা বের করতে করতে মুজাদ্দিদ আবার বললো – কতোদিন ধরে কবিতা লেখেন?
-অনেকদিন।
-ক’টা বই বের করেছেন?
-এটাই প্রথম। অনেকবার বের করার উদ্যোগ নিয়েছি, হয় নি?
-ভালো। টাকা হাতে দেয়।
ভালো থাকবেন। লোকটার চোখটা মুহুর্তেই কেমন উজ্জ্বল হয়ে ওঠে।
বইটা হাতে নিয়ে ভীড়ের মাঝেই নিজের স্টলের দিকে হাঁটা দেয় মুজাদ্দিদ। কিন্তু কি যেনো হয় – বইটা খুলে দেখতে ইচ্ছে করে খুব। কাভারটা উল্টিয়ে অবাক হয় সে।হাতের লেখা। হুম, পুরো বইটিই হাতের লেখা। বুঝতে কষ্ট হয় না মুজাদ্দিদের।কতো যত্ন আর আদর লুকিয়ে এই বইয়ের ভিতর। প্রত্যেকটা কবিতা যেনো তার এক একটা সন্তান। এক একটা গভীর আবেগ। হাঁটতে হাঁটতেই একটা কবিতায় চোখ আটকে যায় মুজাদ্দিদের-

যত তারা হয়েছে নিখোঁজ, যত তারার আছে খোঁজ
আকাশ রাখেনি তা মনে
শব্দের পিঠে শব্দ লেগে, কবিতা হয়েছে রোজ
কি আশ্চর্য তুমিও রাখোনি গুনে
যতটুকু মনে আছে, তাতেই তুমি বেশ
আমি না হয় রয়ে যাবো, নিয়ে না পাওয়ার রেশ।
কবিতা, ভালো আছো তো?

মাথার ভিতর অজস্র শব্দের ঝড় উঠেছে। একটা ঘোর কাজ করছে মুজাদ্দিদের ভেতর। কি আশ্চর্য কথার গাঁথুনি। কি আশ্চর্য উপস্থাপন। এমন প্রতিভা এরকমভাবে লড়াই করেছে ভাবতেই বুকের ভেতরটা কেমন যেনো করে উঠলো মুজাদ্দিদ। কিন্তু সেসব নিয়ে আর বেশিক্ষণ ভাবতে পারলো না। দেখতে দেখতেই স্টলের সামনে এসে পৌঁছল সে।
স্টলের সামনে অনেক পাঠক। বই হাতে অটোগ্রাফের জন্য অপেক্ষা করছে তারা।প্রিয় লেখককে কাছে পেয়ে অটোগ্রাফ আর ফটোগ্রাফের মেতে রইলো তারা।

দেখতে দেখতে বইমেলা শেষ হলো। মুজাদ্দিদ হাতে তুলে নিলো সেই কবিতার বইটা। একে একে পড়তে লাগলো কবিতাগুলো। মন ছুঁয়ে যাওয়া শব্দের সমাহারে যেনো ডুবে রইলো সে।আস্তে আস্তে আবিষ্কার করলো প্রত্যেকটা কবিতা যেনো মনের ভেতরটা ধরে টান মারে।ভাবের নিগুঢ়তায় বন্দি হলো সে।
হাতের লেখা কবিতার বই।পুরো বইটি হাতের লেখাই সাজানো। চমৎকার হাতের লেখা। নতুন একটা আইডিয়া। কবির সঙ্গে দেখা করার খুব শখ হয় তার। কিন্তু কিভাবে? ঠিকানা লেখাই আছে। যাবো যাবো করেও যাওয়া হয় না। অবশেষে সময় বের করে যাওয়ার উদ্যোগ নেয় সে।ততক্ষণে কেটে গেছে তিন মাস।
এখানে ওখানে জিজ্ঞেস করে কবির ঠিকানায় এসে পৌঁছায় সে।টিন দিয়ে তৈরি একটা বাড়ি। বাড়ির সামনে একটা সাইনবোর্ড- কবিতা স্টোর। নিচে নাম ঠিকানা আর মোবাইল নম্বর। সাথে সাথেই মুজাদ্দিদের চোখ যেনো কপালে উঠে যায়। দেখা হয় কবির সাথে। ঘরের ভেতর জানালার কাছে ছোট্ট টেবিলে কাগজ কলম নিয়ে লেখছে সে। মুজাদ্দিদকে দেখে উঠে দাঁড়ালো সে।নিজেই বললো – কেমন আছেন?
-ভালো। আমাকে চিনতে পেরেছেন? বিস্মিত হলো মুজাদ্দিদ।
-চিনবো না কেনো।মোটে তো কুঁড়ি জন।
-মানে?
-মানে, বিশটা বই বেচতে পেরেছিলাম। সারা মাসের বইমেলায় কুঁড়িটা বই।কুঁড়িজন মানুষ। সবাই পড়ার জন্য নেয়নি। নিয়েছে দয়া করে।
-না না এমনটা বলবেন না।
-এটাই সত্যি মশাই। যাই হোক, বসুন না কেনো?
বেতের একটা মোড়ায় বসলো মুজাদ্দিদ।
সাগ্রহে জিজ্ঞেস করলেন কবি- আপনার কেমন কবিতা লাগবে। রাজনৈতিক, দেশের, জন্মদিনের, বিবাহ বার্ষিকীর নাকি প্রেমিকাকে দেয়ার জন্য?
-মানে?
-মানে, কেমন কবিতা চাইবেন লিখে দিবো।দুইশো টাকা লাগবো।
মুজাদ্দিদ যেনো আকাশ থেকে পড়লো।
-না না আমি সেজন্য আসি নি।
-তো কেনো এসেছেন?
-আসলে বইমেলা থেকে আপনার যে বই কিনেছিলাম পড়ে দারুণ লেগেছে আমার। অসাধারণ লেখেন আপনি। আপনাকে খুব দেখার আর আপনার সাথে কিছু সময় গল্প করার খুব ইচ্ছে হলো। তাই খুঁজতে খুঁজতে চলে এলাম।
-ও
-দেখুন, আমি নিজে একজন লেখন।লেখক কবিদের সম্মান করি।
-পেট চলছে তো?
-মানে?
-লেখে পেট চালাতে পারছেন?
-না ঠিক তেমনটা নয়? আমি অন্য একটা চাকরিও করি।
-তা হলে ঠিক আছে। দরদ দেখাতে এসেছেন।
মুজাদ্দিদ কি বলবে পারছে না।
হঠাৎ অঝোরে কাঁদতে শুরু করল কবি। অপ্রস্তুত হয়ে পড়লো মুজাদ্দিদ। কি বলবে বুঝতে পারছে না। অস্ফুটে স্বরে শুধু বললো – কাঁদছেন কেনো?
ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে অভিমান মাখা স্বরে কবি বলতে লাগলো – ঢাকায় গিয়েছিলাম অনেক আশা নিয়ে। যদি কিছু বই বেচতে পারি তা দিয়ে মেয়েটাকে ভালো ডাক্তার দেখাবো। ছেলেটার স্কুল ফিস দেবো। বউকে একটা শাড়ি কিনে দেবো।

বই বিক্রি গেলো কুঁড়িটা।দুই হাজার টাকা মাত্র। ঢাকায় আসা যাওয়া আর খেতেই পাঁচশো টাকা শেষ। পনেরোশো টাকা নিয়ে বাড়িতে আসলাম।
কবির কান্না যেনো আরো বাড়তে লাগলো। ডুকরে ডুকরে বলতে লাগলেন – ততক্ষণে সব শেষ ভাই। মেয়েটা আমাদের ছেড়ে চলে গেছে। আমার কাছে মোবাইল ছিলো না। কেউ খবরও দিতে পারে নি। রাগে অভিমানে বউ ছেলেটারে নিয়ে বাবার বাড়ি চলে গেছে। আত্মীয় স্বজন ভালো চোখে দেখে না।পরিচিত অনেকেই কবি বলে মশকরা করে।
এই কবিতার জন্য সব হারিয়েছি।রাতের পরে রাত জেগে, না খেয়ে শব্দ খুঁজেছি। কবিতা লিখেছি।
সেদিন থেকে ভেবেছি- বাঁচতে যদি হয় এই কবিতা নিয়েই বাঁচবো।সবটুকু আবেগ, দরদ নিয়ে কবিতা লিখেছি তাতে পেটে ভাত জোটে নি।আর এখন ফরমাইশের কবিতা লিখে দেই গরম ভাত খাই।
কবির চিবুক শক্ত হয়ে উঠেছে। কন্ঠটাও প্রতিবাদীর মতো। বলে – নানান রকম মানুষ আসে। রাজনৈতিক রুই কাতলা আসে। তাদের গুণগান দিয়ে সাজানো কবিতা লাগবে। লেখে দেই পয়সা পাই।কেউ কেউ কবিতা লেখে নিয়ে নিজের নামেই বই ছাপায়।বাহবা পায়, পুরস্কার পায়।আমি পাই টাকা। কেউ কেউ তো পুরো বই অর্ডার করে। দশ হাজারে বিক্রি করি পান্ডুলিপি। তাদের নাম হয় আমার পেট ভরে। কবিদের বই বের হয়, পুরস্কার পায় আমি পাই টাকা। প্রথম প্রথম কষ্ট হতো, এখন আর হয় না।ক্ষতি কি, কিসের এতো দরদ, ভালোবাসা? সব মিথ্যে। সবকিছুই মিথ্যে।
মুজাদ্দিদের চোখ কখন ভিজে এসেছে সে জানে না।ভিজে যাওয়া চোখেও সে স্পষ্ট দেখতে পেলো কবি একটা খাম টেবিল থেকে লুকানোর চেষ্টা করছে। মুজাদ্দিদেদ বুঝতে বাকি রইলো না – সেই খামে তার নিজের জন্য লেখা কবিতা সযতনে আছে।
বুকের ভেতর যে অনন্ত হাহাকার লালিত হয় তাকে কবি শব্দে রূপ দেবে না তাই কি হয়।
দমকা বাতাসে শুরু হয় ঝড়।টিনের চালে বৃষ্টির শব্দ। কবিতা স্টোরের ভিতরে দুইজন।একজন সত্যের ভালোবাসার টানে আর একজন জীবনের চরম বাস্তবতায়।
আচ্ছা সে কবির নাম কি? থাক, তার জেনে আর হবে কি?